০৩:৪৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৩ মে ২০২৬

প্রধান শিক্ষকের বেতনের টাকায় বিদ্যালয়ের উন্নয়ন

  • ময়মনসিংহ
  • প্রকাশিত : ০৩:৩০:০৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৭ জুলাই ২০২২
  • 65

দূর থেকে মনে হবে বাগানের মধ্যে একটি বিদ্যালয়। শিশুরা মাঠে খেলাধুলা করছে। স্কুলে ঢুকতেই চোখে পড়বে বাংলাদেশের মানচিত্র। দেওয়ালে দেওয়ালে চিত্রকর্মে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে জাতীয় ফুল শাপলা, রয়েল বেঙ্গল টাইগার, ইলিশ, কাঁঠাল, দোয়েল পাখিসহ বিভিন্ন প্রকার ছবি। বিদ্যালয়ের বারান্দা সাজানো হয়েছে ফুলের টবে। শ্রেণিকক্ষের চার দিকের দেওয়ালে আঁকা হয়েছে মানচিত্র, ফুল, ফলের ছবি।

এমনই সাজানো-গোছানো ডেকুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এটি ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার অচিন্তপুর ইউনিয়নে অবস্থিত। ১৯৭১ সালে এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি স্থাপন করা হয়।

বিদ্যালয়ে সাত রঙের সারিবদ্ধ প্যানেল লাইট ও মাঠজুড়ে সাত রঙের বেশকয়েকটি পতাকা। ভবনের সামনে দেওয়ালে ডিজিটাল সাইনবোর্ড। তাতে ভেসে ওঠে বিদ্যালয়ের নাম, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের নামসহ তাদের বিভিন্ন উক্তি।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, স্কুলের গেটে স্থাপন করা করা হয়েছে বাংলাদেশের মানচিত্র। লাল-সবুজ রঙে স্কুলের নতুন ও পুরনো ভবনের দেওয়ালে শোভা পাচ্ছে বিশিষ্ট কবি-সাহিত্যিক, মুক্তিযুদ্ধ ও বিভিন্ন শিক্ষামূলক চিত্রকর্ম। স্কুলের সামনে গড়ে তোলা হয়েছে ফুল-ফল ও সবজির বাগান। বিদ্যালয়ে রয়েছে ছাদ বাগান। শ্রেণিকক্ষ, দাপ্তরিক রুম পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পরিপাটি করে সাজানো গোছানো। ওয়াস রুমগুলো পরিষ্কার ও দুর্গন্ধমুক্ত। রয়েছে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থাও।

বিদ্যালয় সূত্র জানায়, প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ অলি উল্লাহ মাত্র চার বছরে সরকারি সহায়তা ও নিজের বেতনের একাংশ ব্যয় করে প্রতিষ্ঠানটিকে আধুনিক মডেল বিদ্যালয় রূপান্তর করেছন। এমন কাজে মুগ্ধ অভিভাবক, এলাকাবাসী, শিক্ষকসহ শিক্ষা অফিসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাও।

বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র ফয়সাল বলেন, আমাদের স্যাররা অনেক ভাল। আমাদের আদর করে। নিয়মিত ক্লাস নেন, পিটি করান। আমরা আনন্দের সঙ্গে স্কুলে এসে লেখাপড়া করি।

কাওসার নামের একই শ্রেণীর আরেক ছাত্র বলেন, আমাদের স্কুলটা অনেক সুন্দর। স্যারদের সঙ্গে আমরাও বাগানে কাজ করি। আমাদের স্কুলটা এত সুন্দর যে আমাদের অনেক ভাল লাগে।

স্থানীয় আলমগীর হোসেন তালুকদার বলেন, ডেকুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মত এমন সাজানো গোছানো বিদ্যালয় গৌরীপুর এমনকি ময়মনসিংহ জেলার কোথাও নেই। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সরকারি সহায়তা ও নিজের বেতনের একাংশের টাকায় এমন একটি বিদ্যালয় উপহার দিয়েছেন।

মোশাররফ হোসেন তালুকদার বলেন, আমাদের এ বিদ্যালয় দীর্ঘদিন ধরে কোনো কমিটি নেই। আহব্বায়ক কমিটি, সরকারি সহায়তা ও বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ অলি উল্লাহর প্রচেষ্টায় আমাদের বিদ্যালয় ময়মনসিংহের সেরা।

বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সিরাজুল ইসলাম বলেন, মোহাম্মদ অলি উল্লাহ স্যার প্রধান শিক্ষক হিসাবে যোগদান করার পর থেকে বিদ্যালয়ের অনেক উন্নয়ন হয়েছে। তিনি নিজের মত বিদ্যালয়টিকে পরিপাটি করে নিয়েছেন। বিদ্যালয়ের কিছু সমস্যা রয়েছে সেগুলো তাড়াতাড়ি সমাধান করা প্রয়োজন।

এ বিষয়ে স্কুলের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ অলি উল্লাহ বলেন, শিশুদের স্কুলমুখী ও শিক্ষাগ্রহণে মনযোগী করে তোলার জন্য চার বছর আগে বিদ্যালয়টিকে সুন্দর, পরিপাটি করে সাজানোর পরিকল্পনা করি। সরকারি সামান্য উন্নয়ন বরাদ্দের টাকায় এটি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। পরে সরকারি বরাদ্দ ও নিজের বেতনের কিছু টাকা দিয়ে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা শুরু করি। এভাবে চার বছরের চেষ্টায় বিদ্যালয়টিকে একটি দৃষ্টিনন্দন আধুনিক স্কুলে রূপান্তর করার চেষ্টা করেছি। তবে, সরকারি সহায়তা পেলে আরও সুন্দর করে সাজানো যেতো।

তিনি আরও বলেন, আমার বিদ্যালয়ে ৩২২ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। এর বিপরীতে আটজন শিক্ষকের প্রয়োজন থাকলেও রয়েছে পাঁচজন। এরমধ্যে একজন ছুটিতে আরেকজন আইনি ঝামেলায় রয়েছেন। যে কারণে বর্তমানে শিক্ষক মাত্র তিনজন। এতো কম শিক্ষক দিয়ে পাঠদান সম্ভব নয়।

উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মনিকা পারভীন বলেন, ওনার ইচ্ছা আছে। আমি যখন প্রথম ওই বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখি টিন সেডের ঘরটা ছিল একেবারেই ব্যবহার অনুপযোগী। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয় টিন সেড ঘরটা ঠিক করার। পরে তিনি নিজেই এলাকাবাসীর সহায়তায় ঘরটি ঠিক করে ফেলেন।

তিনি বলেন, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ অলি উল্লাহ অনেক ভাল মনের মানুষ। পরিকল্পনা রয়েছে ওই বিদ্যালয়ে একটি সুইমিংপুল ও একটি রিডিং রুম করার। যেসব শিক্ষার্থীরা লেখাপড়ায় দুর্বল, তারা যেন আগে এসে পড়ার সুযোগ পায়।

বিজনেস বাংলাদেশ/ এ আর

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

ইউরেনিয়াম নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে কড়া বার্তা ইরানের

প্রধান শিক্ষকের বেতনের টাকায় বিদ্যালয়ের উন্নয়ন

প্রকাশিত : ০৩:৩০:০৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৭ জুলাই ২০২২

দূর থেকে মনে হবে বাগানের মধ্যে একটি বিদ্যালয়। শিশুরা মাঠে খেলাধুলা করছে। স্কুলে ঢুকতেই চোখে পড়বে বাংলাদেশের মানচিত্র। দেওয়ালে দেওয়ালে চিত্রকর্মে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে জাতীয় ফুল শাপলা, রয়েল বেঙ্গল টাইগার, ইলিশ, কাঁঠাল, দোয়েল পাখিসহ বিভিন্ন প্রকার ছবি। বিদ্যালয়ের বারান্দা সাজানো হয়েছে ফুলের টবে। শ্রেণিকক্ষের চার দিকের দেওয়ালে আঁকা হয়েছে মানচিত্র, ফুল, ফলের ছবি।

এমনই সাজানো-গোছানো ডেকুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এটি ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার অচিন্তপুর ইউনিয়নে অবস্থিত। ১৯৭১ সালে এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি স্থাপন করা হয়।

বিদ্যালয়ে সাত রঙের সারিবদ্ধ প্যানেল লাইট ও মাঠজুড়ে সাত রঙের বেশকয়েকটি পতাকা। ভবনের সামনে দেওয়ালে ডিজিটাল সাইনবোর্ড। তাতে ভেসে ওঠে বিদ্যালয়ের নাম, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের নামসহ তাদের বিভিন্ন উক্তি।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, স্কুলের গেটে স্থাপন করা করা হয়েছে বাংলাদেশের মানচিত্র। লাল-সবুজ রঙে স্কুলের নতুন ও পুরনো ভবনের দেওয়ালে শোভা পাচ্ছে বিশিষ্ট কবি-সাহিত্যিক, মুক্তিযুদ্ধ ও বিভিন্ন শিক্ষামূলক চিত্রকর্ম। স্কুলের সামনে গড়ে তোলা হয়েছে ফুল-ফল ও সবজির বাগান। বিদ্যালয়ে রয়েছে ছাদ বাগান। শ্রেণিকক্ষ, দাপ্তরিক রুম পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পরিপাটি করে সাজানো গোছানো। ওয়াস রুমগুলো পরিষ্কার ও দুর্গন্ধমুক্ত। রয়েছে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থাও।

বিদ্যালয় সূত্র জানায়, প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ অলি উল্লাহ মাত্র চার বছরে সরকারি সহায়তা ও নিজের বেতনের একাংশ ব্যয় করে প্রতিষ্ঠানটিকে আধুনিক মডেল বিদ্যালয় রূপান্তর করেছন। এমন কাজে মুগ্ধ অভিভাবক, এলাকাবাসী, শিক্ষকসহ শিক্ষা অফিসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাও।

বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র ফয়সাল বলেন, আমাদের স্যাররা অনেক ভাল। আমাদের আদর করে। নিয়মিত ক্লাস নেন, পিটি করান। আমরা আনন্দের সঙ্গে স্কুলে এসে লেখাপড়া করি।

কাওসার নামের একই শ্রেণীর আরেক ছাত্র বলেন, আমাদের স্কুলটা অনেক সুন্দর। স্যারদের সঙ্গে আমরাও বাগানে কাজ করি। আমাদের স্কুলটা এত সুন্দর যে আমাদের অনেক ভাল লাগে।

স্থানীয় আলমগীর হোসেন তালুকদার বলেন, ডেকুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মত এমন সাজানো গোছানো বিদ্যালয় গৌরীপুর এমনকি ময়মনসিংহ জেলার কোথাও নেই। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সরকারি সহায়তা ও নিজের বেতনের একাংশের টাকায় এমন একটি বিদ্যালয় উপহার দিয়েছেন।

মোশাররফ হোসেন তালুকদার বলেন, আমাদের এ বিদ্যালয় দীর্ঘদিন ধরে কোনো কমিটি নেই। আহব্বায়ক কমিটি, সরকারি সহায়তা ও বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ অলি উল্লাহর প্রচেষ্টায় আমাদের বিদ্যালয় ময়মনসিংহের সেরা।

বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সিরাজুল ইসলাম বলেন, মোহাম্মদ অলি উল্লাহ স্যার প্রধান শিক্ষক হিসাবে যোগদান করার পর থেকে বিদ্যালয়ের অনেক উন্নয়ন হয়েছে। তিনি নিজের মত বিদ্যালয়টিকে পরিপাটি করে নিয়েছেন। বিদ্যালয়ের কিছু সমস্যা রয়েছে সেগুলো তাড়াতাড়ি সমাধান করা প্রয়োজন।

এ বিষয়ে স্কুলের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ অলি উল্লাহ বলেন, শিশুদের স্কুলমুখী ও শিক্ষাগ্রহণে মনযোগী করে তোলার জন্য চার বছর আগে বিদ্যালয়টিকে সুন্দর, পরিপাটি করে সাজানোর পরিকল্পনা করি। সরকারি সামান্য উন্নয়ন বরাদ্দের টাকায় এটি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। পরে সরকারি বরাদ্দ ও নিজের বেতনের কিছু টাকা দিয়ে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা শুরু করি। এভাবে চার বছরের চেষ্টায় বিদ্যালয়টিকে একটি দৃষ্টিনন্দন আধুনিক স্কুলে রূপান্তর করার চেষ্টা করেছি। তবে, সরকারি সহায়তা পেলে আরও সুন্দর করে সাজানো যেতো।

তিনি আরও বলেন, আমার বিদ্যালয়ে ৩২২ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। এর বিপরীতে আটজন শিক্ষকের প্রয়োজন থাকলেও রয়েছে পাঁচজন। এরমধ্যে একজন ছুটিতে আরেকজন আইনি ঝামেলায় রয়েছেন। যে কারণে বর্তমানে শিক্ষক মাত্র তিনজন। এতো কম শিক্ষক দিয়ে পাঠদান সম্ভব নয়।

উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মনিকা পারভীন বলেন, ওনার ইচ্ছা আছে। আমি যখন প্রথম ওই বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখি টিন সেডের ঘরটা ছিল একেবারেই ব্যবহার অনুপযোগী। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয় টিন সেড ঘরটা ঠিক করার। পরে তিনি নিজেই এলাকাবাসীর সহায়তায় ঘরটি ঠিক করে ফেলেন।

তিনি বলেন, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ অলি উল্লাহ অনেক ভাল মনের মানুষ। পরিকল্পনা রয়েছে ওই বিদ্যালয়ে একটি সুইমিংপুল ও একটি রিডিং রুম করার। যেসব শিক্ষার্থীরা লেখাপড়ায় দুর্বল, তারা যেন আগে এসে পড়ার সুযোগ পায়।

বিজনেস বাংলাদেশ/ এ আর