০৮:২১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২২ মে ২০২৬

বৈঠায় ভর করে চলে ওদের সংসার

*নোনাজলে ভাসে মান্তা সম্প্রদায়
* মুজিব বর্ষের ঘরে ঠাই হবে ওদের

রাশিদা বেগম। বয়স পঞ্চাশের উপরে। রোগাক্রান্ত শরীর নিয়ে চলছে তার জীবন-সংগ্রাম। ছোট্ট একটি ডিঙি নৌকা নিয়ে এখনো নদীতে ছুঁটে বেড়ান পেটের তাগিদে। মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। যা আয় হয়, তা দিয়েই চলে রাশিদার দুই ছেলে ও এক মেয়ে সহ পাঁচ সদস্যের সংসার। কৈশোর বয়স থেকেই কোমল হাতে তুলে নিয়েছে বৈঠা। যে বয়সে সহপাঠীদের সঙ্গে রাশিদার হই-হুল্লোড় আর গোল্লাছুট-কানামাছি খেলার কথা ছিল, সেই বয়সে সংসারের বোঝা বইতে হয়েছে। জীবনের ক্লান্তিলগ্নে এসেও জলকন্যা রাশিদার জীবন-সংগ্রাম থেমে নেই এখনো। তার এ সংগ্রামী জীবনের সঙ্গী উজ্জল সরদার। বয়সে ভাটা পরেছে তারও। তবুও দুজনে মিলে মাছ ধরছে বুড়াগৌরাঙ্গ নদীতে। রাশিদা-উজ্জল এই জলদম্পতির ঠিকানা বলতে শুধুই ছাউনি ঘেরা নৌকা। সারাদিনের কর্মযজ্ঞ শেষে আশ্রয়ের খোজে আসেন পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার চরমোন্তাজ ইউনিয়নের  খালে।

সরেজমিনে দেখা যায়, বুড়াগৌরাঙ্গ নদীতে ঢেউয়ের তালে তালে দুলছে একঝাক নৌকার বহর। কাছে গিয়ে দেখা যায় নৌকার সামনে বসে আছে রাশিদা নামের এক মাঝি। কথা হয় তার সাথে। নদীতে থাকার গল্প জানতে চাইলে সব ক্লান্তি ছাপিয়ে হেসে ওঠেন রাশিদা। বললেন তার জীবন কাহিনী। তার বয়স যখন ৮-১০ বছর তখন তাদের ভিটেবাড়ি হারায় নদীভাঙনে। সহায়-সম্পদ হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছি। এরপরে ঠাঁই মেলে নৌকায়। সে বয়সেই বাবা-মায়ের সঙ্গে নৌকায় করে মাছ ধরতে ধরতে ছাড়তে হয় জন্মভূমি। ঠাই মেলে রাঙ্গাবালীর চরমোন্তাজের ¯øুইস খালে। শুধু আমিই নই। আমাদের মত ৮৬ পরিবার এখানে আশ্রয় পেয়েছে। ভিটে-মাটি হারানোর কথা বলতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন ষাটোর্ধ্ব আম্বিয়া। তিনি অশ্রæভেজা চোখে বলেন, ‘বাবারে এক সময় ঘরবাড়ি, জায়গা-জমিও আছিল। নদী ভাঙনে আমাগো সব নিয়া নেছে। এরপর স্বামীরে নিয়া এইহানে (এখানে) ৩০ বছর আগে আইছি। পেটের জ্বালা মিটাইতে মাছ ধরা শুরু করছি।’ এ বয়সে পরিশ্রম করতে কষ্ট হয় কিনা, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাগো জীবনটা এরকমই। বইয়া (বসে) থাকলে খামু কী? কে খাওয়াইবে আমাগো?।’

স্থানীয়দের তথ্যমতে, প্রথম পাঁচটি নৌকা নিয়ে তারা এখানে এসেছিল ¯øুইস খালে। বর্তমানে ওই এলাকায় ৮৬টি পরিবারের বসবাস রয়েছে। নদীতে থাকায় তারা এখানে ‘মান্তা সম্প্রদায়’ হিসাবে পরিচিতি লাভ করে। মান্তা বহরে শিশু রয়েছে এক শতাধিক। এসব পরিবারে কর্মঠ নারী সদস্যরা। তাদের ওপর নির্ভর করেই চলে সংসার। তবে বংশ পরম্পরায় জলেভেসে চলা মান্তা সম্প্রদায়ের মধ্যে পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে।

প্রশাসনের তথ্যানুযায়ী, তাদের অনেকেই ভোটাধিকারের সুযোগ ও সরকারি বিভিন্ন সহায়তা পাচ্ছেন। ইতোমধ্যে ২৯টি পরিবার মাথা গোঁজার ঠাঁই পেয়েছে। মুজিববর্ষ উপলক্ষ্যে তাদের দেওয়া হয়েছে স্বপ্নের ঠিকানা। এখন তারা ডাঙার সেমিপাকা ঘরে থাকেন, আর নদীতে গিয়ে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। কিন্তু এখনো প্রায় ৫৭টি পরিবার রয়েছে। যাদের ঠিকানা নদীতেই।
চরমোন্তাজ ইউপি চেয়ারম্যন একে সামসুদ্দিন বলেন, ‘মান্তা সম্প্রদায়ের জীবন-মান উন্নয়নে আমরা অনেকেই কাজ করে আসছি। আর এখনো সেই কাজ অব্যাহত রয়েছে।’

এদিকে শিক্ষার আলো যাদের কাছে ছিল বিলাসিতা, সেই মান্তারা পড়ালেখা শিখছে। একটি বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে ভাসমান বোট স্কুলের প্রি-প্রাইমারিতে পড়ালেখা করছে ৫০ শিশু। ২০১৯ সালের ১৮ অক্টোবরে এ কার্যক্রম শুরু হয়। তবে এখনো শিক্ষার আলোর বাইরে আছে ৫০ জনেরও বেশি শিশু। স্কুলপড়ুয়া শিশু জামিল বলেন, ‘তাদের বাবা-মা নদীতে মাছ ধরেন। আর তারা সহপাঠীদের সঙ্গে স্কুলে যান, পড়ালেখা করেন।’

মান্তাদের ভাসমান বোট স্কুলের প্রধান শিক্ষক আইয়ুব খান বলেন, ‘মান্তারা আগে ডাঙার মানুষের কাছ থেকে বৈষম্যের শিকার হতো। কিন্তু এখন তারা ডাঙার মানুষের সঙ্গে মিশতে শুরু করেছে। দূর হচ্ছে সেই বৈষম্যও।’ তিনি আরও বলেন, ‘ডাঙার শিশুদের মতোই তারাও পড়ালেখা করছে। উচ্চশিক্ষিত হওয়ার স্বপ্ন বুনছে। বাবা-মা কষ্ট করলেও সন্তানদের নতুন জীবন দিতে স্কুলগামী করছে অনেকেই।’

উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ডাঃ জহির উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘মান্তা সম্প্রদায়ের লোকজন সরকারি সুযোগ-সুবিধার আওতায় এসেছে। ইতোমধ্যে মুজিববর্ষের ঘরসহ স্থায়ী ঠিকানা পেয়েছে ২৯ জন। ৩০টি ঘরের কাজ চলমান এবং মান্তা শিশুদের শিক্ষার আওতায় আনতে স্কুল নির্মাণেরও পরিকল্পনা রয়েছে।’

বিজনেস বাংলাদেশ/ হাবিব

জনপ্রিয়

ইউরেনিয়াম নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে কড়া বার্তা ইরানের

বৈঠায় ভর করে চলে ওদের সংসার

প্রকাশিত : ০১:৪৬:৩৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ৫ মার্চ ২০২৩

*নোনাজলে ভাসে মান্তা সম্প্রদায়
* মুজিব বর্ষের ঘরে ঠাই হবে ওদের

রাশিদা বেগম। বয়স পঞ্চাশের উপরে। রোগাক্রান্ত শরীর নিয়ে চলছে তার জীবন-সংগ্রাম। ছোট্ট একটি ডিঙি নৌকা নিয়ে এখনো নদীতে ছুঁটে বেড়ান পেটের তাগিদে। মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। যা আয় হয়, তা দিয়েই চলে রাশিদার দুই ছেলে ও এক মেয়ে সহ পাঁচ সদস্যের সংসার। কৈশোর বয়স থেকেই কোমল হাতে তুলে নিয়েছে বৈঠা। যে বয়সে সহপাঠীদের সঙ্গে রাশিদার হই-হুল্লোড় আর গোল্লাছুট-কানামাছি খেলার কথা ছিল, সেই বয়সে সংসারের বোঝা বইতে হয়েছে। জীবনের ক্লান্তিলগ্নে এসেও জলকন্যা রাশিদার জীবন-সংগ্রাম থেমে নেই এখনো। তার এ সংগ্রামী জীবনের সঙ্গী উজ্জল সরদার। বয়সে ভাটা পরেছে তারও। তবুও দুজনে মিলে মাছ ধরছে বুড়াগৌরাঙ্গ নদীতে। রাশিদা-উজ্জল এই জলদম্পতির ঠিকানা বলতে শুধুই ছাউনি ঘেরা নৌকা। সারাদিনের কর্মযজ্ঞ শেষে আশ্রয়ের খোজে আসেন পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার চরমোন্তাজ ইউনিয়নের  খালে।

সরেজমিনে দেখা যায়, বুড়াগৌরাঙ্গ নদীতে ঢেউয়ের তালে তালে দুলছে একঝাক নৌকার বহর। কাছে গিয়ে দেখা যায় নৌকার সামনে বসে আছে রাশিদা নামের এক মাঝি। কথা হয় তার সাথে। নদীতে থাকার গল্প জানতে চাইলে সব ক্লান্তি ছাপিয়ে হেসে ওঠেন রাশিদা। বললেন তার জীবন কাহিনী। তার বয়স যখন ৮-১০ বছর তখন তাদের ভিটেবাড়ি হারায় নদীভাঙনে। সহায়-সম্পদ হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছি। এরপরে ঠাঁই মেলে নৌকায়। সে বয়সেই বাবা-মায়ের সঙ্গে নৌকায় করে মাছ ধরতে ধরতে ছাড়তে হয় জন্মভূমি। ঠাই মেলে রাঙ্গাবালীর চরমোন্তাজের ¯øুইস খালে। শুধু আমিই নই। আমাদের মত ৮৬ পরিবার এখানে আশ্রয় পেয়েছে। ভিটে-মাটি হারানোর কথা বলতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন ষাটোর্ধ্ব আম্বিয়া। তিনি অশ্রæভেজা চোখে বলেন, ‘বাবারে এক সময় ঘরবাড়ি, জায়গা-জমিও আছিল। নদী ভাঙনে আমাগো সব নিয়া নেছে। এরপর স্বামীরে নিয়া এইহানে (এখানে) ৩০ বছর আগে আইছি। পেটের জ্বালা মিটাইতে মাছ ধরা শুরু করছি।’ এ বয়সে পরিশ্রম করতে কষ্ট হয় কিনা, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাগো জীবনটা এরকমই। বইয়া (বসে) থাকলে খামু কী? কে খাওয়াইবে আমাগো?।’

স্থানীয়দের তথ্যমতে, প্রথম পাঁচটি নৌকা নিয়ে তারা এখানে এসেছিল ¯øুইস খালে। বর্তমানে ওই এলাকায় ৮৬টি পরিবারের বসবাস রয়েছে। নদীতে থাকায় তারা এখানে ‘মান্তা সম্প্রদায়’ হিসাবে পরিচিতি লাভ করে। মান্তা বহরে শিশু রয়েছে এক শতাধিক। এসব পরিবারে কর্মঠ নারী সদস্যরা। তাদের ওপর নির্ভর করেই চলে সংসার। তবে বংশ পরম্পরায় জলেভেসে চলা মান্তা সম্প্রদায়ের মধ্যে পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে।

প্রশাসনের তথ্যানুযায়ী, তাদের অনেকেই ভোটাধিকারের সুযোগ ও সরকারি বিভিন্ন সহায়তা পাচ্ছেন। ইতোমধ্যে ২৯টি পরিবার মাথা গোঁজার ঠাঁই পেয়েছে। মুজিববর্ষ উপলক্ষ্যে তাদের দেওয়া হয়েছে স্বপ্নের ঠিকানা। এখন তারা ডাঙার সেমিপাকা ঘরে থাকেন, আর নদীতে গিয়ে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। কিন্তু এখনো প্রায় ৫৭টি পরিবার রয়েছে। যাদের ঠিকানা নদীতেই।
চরমোন্তাজ ইউপি চেয়ারম্যন একে সামসুদ্দিন বলেন, ‘মান্তা সম্প্রদায়ের জীবন-মান উন্নয়নে আমরা অনেকেই কাজ করে আসছি। আর এখনো সেই কাজ অব্যাহত রয়েছে।’

এদিকে শিক্ষার আলো যাদের কাছে ছিল বিলাসিতা, সেই মান্তারা পড়ালেখা শিখছে। একটি বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে ভাসমান বোট স্কুলের প্রি-প্রাইমারিতে পড়ালেখা করছে ৫০ শিশু। ২০১৯ সালের ১৮ অক্টোবরে এ কার্যক্রম শুরু হয়। তবে এখনো শিক্ষার আলোর বাইরে আছে ৫০ জনেরও বেশি শিশু। স্কুলপড়ুয়া শিশু জামিল বলেন, ‘তাদের বাবা-মা নদীতে মাছ ধরেন। আর তারা সহপাঠীদের সঙ্গে স্কুলে যান, পড়ালেখা করেন।’

মান্তাদের ভাসমান বোট স্কুলের প্রধান শিক্ষক আইয়ুব খান বলেন, ‘মান্তারা আগে ডাঙার মানুষের কাছ থেকে বৈষম্যের শিকার হতো। কিন্তু এখন তারা ডাঙার মানুষের সঙ্গে মিশতে শুরু করেছে। দূর হচ্ছে সেই বৈষম্যও।’ তিনি আরও বলেন, ‘ডাঙার শিশুদের মতোই তারাও পড়ালেখা করছে। উচ্চশিক্ষিত হওয়ার স্বপ্ন বুনছে। বাবা-মা কষ্ট করলেও সন্তানদের নতুন জীবন দিতে স্কুলগামী করছে অনেকেই।’

উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ডাঃ জহির উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘মান্তা সম্প্রদায়ের লোকজন সরকারি সুযোগ-সুবিধার আওতায় এসেছে। ইতোমধ্যে মুজিববর্ষের ঘরসহ স্থায়ী ঠিকানা পেয়েছে ২৯ জন। ৩০টি ঘরের কাজ চলমান এবং মান্তা শিশুদের শিক্ষার আওতায় আনতে স্কুল নির্মাণেরও পরিকল্পনা রয়েছে।’

বিজনেস বাংলাদেশ/ হাবিব