মোছা. নাসিমা বেগমের (২৫) ২০১৪ সালে বিয়ে হয়। ২০১৭ সালে গর্ভে সন্তান আসার পর তার ভ্যান চালক স্বামী রফিকুল ইমলাম সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। মামার বাড়ীতে থেকে অন্যের বাড়িতে কাজ করে চলে তার জীবন। মুজিববর্ষে টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার ঝাওয়াইল গ্রামের আশ্রয়ণ প্রকল্পে তিনি একটি ঘর বরাদ্দ পান। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছ থেকে সহযোগিতায় চায়ের দোকান শুরু করেন। প্রতিদিন তার ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা আয় হয়। এ দিয়ে তিনি তার ছেলে ও মাকে নিয়ে শান্তিতে বসবাস করতে পারছেন। শুধু নাসিমা বেগম নয়, তার মতো গোপাপুরের ঝাওয়াইল গ্রামের মডেল আশ্রয়ণ প্রকল্পের ১৭ টি পরিবার স্বাবলম্বী হয়েছেন।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, জেলায় তিন হাজার ২০৬টি ভূমিহীন, গৃহহীন পরিবার চিহ্নিত করা হয়। এদের মধ্যে দুই হাজার ৯৯৩টি পরিবারকে বাড়ি দেওয়া হয়েছে। এ জেলায় অবৈধ দখলে থাকা ১৫০ বিঘা খাস জমি উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার করা জমিতে আশ্রয় প্রকল্পের বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়াও আশ্রয়ণের বাসিন্দাদের স্বাবলম্বী করতে ভ্যান গাড়ি, সেলাই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সেলাই মেশিন বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়াও প্রশাসনের হস্তক্ষেপে বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত থাকা ব্যক্তিদের স্ব স্ব কাজ নিশ্চিত করা হয়েছে। গোপালপুর উপজেলায় ১৮৪ জন ভূমিহীন ও গৃহহীনদের মাঝে মুজিববর্ষের ঘর প্রদান করা হয়েছে। গত বছর ২১ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ উপজেলাকে ভূমি ও গৃহহীন মুক্ত ঘোষণা করেছেন।
সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, ঝাওয়াইল আশ্রয়ণ প্রকল্পে পাশাপাশি দুই জায়গায় ৩৩ টি পরিবার বসবাস করছে। সকলেই মিলে মিশে শান্তিতে আছে। কেউ রান্নার কাজে ব্যস্ত, কেউ ঘর গোছাতে ব্যস্ত আবার কেউ সন্তান নিয়ে সময় পার করছে। এ যেন তাদের মধ্যে উৎসবের আমেজ বইছে।
নাসিমা বেগম বলেন, জন্মের পর বাবার অভাবের সংসারে কষ্টে বড় হয়েছি। বিয়ের পর স্বামীর সংসারে শান্তিতে বসবাস করলেও তার মৃত্যুতে আমার জীবনে আবার অন্ধকার নেমে আসে। দুই তিন দিনও না খেয়ে থাকতে হয়েছে। দোকানের আয়ে এখন আমার সংসার ভাল চলছে। বর্তমানে আমার বাড়িতে শান্তিতেই আছি।
তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে জমিসহ পাকা দালান পাওয়া নিজের কাছে স্বপ্নের মতো মনে হয়। এই চায়ের দোকান না থাকলে আমার ছেলে ও মাকে নিয়ে পথে বসা ছাড়া আর কোন উপায় ছিলো না। আজ পর্যন্ত কখনও উপজেলা প্রশাসনের কাছ থেকে খালি হাতে ফিরে আসিনি।
তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমি কৃতজ্ঞ। তার উদ্যোগে কারণে আমার মতো আশ্রয়হীন মানুষের ঠিকানা হয়েছে। এছাড়াও ঈদসহ বিভিন্ন উৎসবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমাদের খাদ্য সামগ্রী, টাকা, জামা কাপড় দিয়ে সহযোগিতা করে।
ভ্যান পাওয়া মন্টু চন্দ্র রায় বলেন, আগে শ্রমিকের কাজ করতাম। এক দিন কাজ করলে আরেক দিন বসে থাকতে হতো। নিয়োমিত কাজ না হওয়ায় ঘর পাওয়ার পরও খুব কষ্টে চলতে হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বিনামূল্যে ভ্যান পাওয়ার পর প্রতিদিন ভ্যান চালাই। যা আয় হয়, তা দিয়ে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে শান্তিতে বসবাস করি।
মন্টু রায়ের স্ত্রী সুমিতা চন্দ্র রায় বলেন, ঝাওয়াইল বাজারে রাস্তার পাশে একটি ছাউনী তুলে প্রায় ২০ বছর বসবাস করছি। সেখানে ঝড়, বৃষ্টি ছাড়াও ছাউনী ভেঙে পড়ার ভয়ে কোন দিন শান্তিতে ঘুমাতে পারিনি। এখন আমার আপন ঠিকানায় সন্ধার পরই শান্তিতে ঘুমাতে পারি। এছাড়াও আগে সন্তান নতুন জামা কাপড় চাইলে অভাবের সংসারে তাদের চাহিদা পূরণ করতে পারিনি। এখন প্রধানমন্ত্রী হাসিনার দয়ায় জমিসহ ঘর ও ভ্যান পেয়ে সবার চাহিদা পূরণ করে শান্তিতেই আছি।
অপর বাসিন্দা জহিরুল ইসলাম বলেন, আগে দোকান ভাড়া নিয়ে মুরগীর ব্যবসার করতাম। সে সময় তেমন বিক্রি হতো না। উপজেলা প্রশাসনের কাছ থেকে ভ্যান পাওয়ার পর বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে মুরগী বিক্রি করতে পারছি। এতে আমার বিক্রি বেশি হওয়ায় লাভ বেশি হচ্ছে। সব মিলিয়ে আগের চেয়ে আমরা বেশি স্বাবলম্বী হচ্ছি। ইতিপূর্বে আশ্রয়ণ প্রকল্পে যেতে আমাদের অনেক কষ্ট হতো। নতুন জেলা প্রশাসক জসীম উদ্দীন হায়দার আশ্রয়ণ প্রকল্প পরিদর্শন করে নতুন পাকা রাস্তা করে দেয়ায় আমাদের অনেক উপকার হয়েছে। তার প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ।
গোপালপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার পারভেজ মল্লিক বলেন, মুজিববর্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সবচেয়ে বড় উপহার হলো ভূমি ও গৃহহীনদের ঘর দেয়া। প্রত্যেককে দুই শতাংশ জমিসহ ১৮৪ জনের মাঝে ঘর দেয়া হয়েছে। তাদের প্রত্যেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন সহায়তাও দিয়েছেন। পুর্নবাসন করার পর অনেকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ায় জেলা প্রশাসক স্যারের নির্দেশনায় নারী পুরুষ অনেককে সরকারি জমিতে দোকান করে দেয়া, অনেককে ভ্যান দেয়া হয়েছে। এরপরও যারা রাজমিস্ত্রিসহ বিভিন্ন পেশার কাজ জানতো তাদের আমাদের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পে সম্পৃক্ত করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক জসীম উদ্দীন হায়দার বলেন, মুজিববর্ষে সারাদেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গৃহ ও ভূমিহীনদের জমিসহ ঘর দেয়ার কর্মসূচিতে টাঙ্গাইলেও আমরা প্রায় তিন হাজার পরিবারের মাঝে জমিসহ ঘর হস্তান্তর করেছি। এখন তাদের স্বাবলম্বী প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে আশ্রয়ণ প্রকল্পের সকল সদস্যদের প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের স্বাবলম্বী করার চেষ্টা চলছে। বিভিন্ন জাতীয় দিবস, ঈদসহ বিভিন্ন উৎসবে নতুন কাপড় খাদ্য সহায়তা দিয়ে তাদের পাশে প্রশাসন সর্বদা রয়েছে।
বিজনেস বাংলাদেশ/ বিএইচ




















