০২:৪৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৭ মে ২০২৬

পাবনায় সাধারণের আস্থা অর্জন করেছে কমিউনিটি ক্লিনিক

পাবনায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করেছে কমিউনিটি ক্লিনিক। জ্বর, ঠান্ডাসহ সাধারণ রোগের পাশাপাশি যক্ষা প্রতিরোধেও কাজ করছেন এখানকার স্বাস্থ্যকর্মীরা। কমেছে প্রতারক ও হাতুড়ে ডাক্তারের তৎপরতাও। তবে, সেবাপ্রত্যাশী বৃদ্ধি পাওয়ায় ওষুধের বরাদ্দ বৃদ্ধির দাবি স্থানীয়দের।

স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, সপ্তাহে ছয়দিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩ টা পর্যন্ত প্রান্তিক পর্যায়ে চিকিৎসা সেবা দেয়া হয় এসব কমিউনিটি ক্লিনিকে। জ্বর, ঠাণ্ডা, চুলকানি, ওজন ও প্রেশার পরিমাপ, ডায়বেটিস পরীক্ষাসহ প্রাথমিক প্রায় সকল রোগের চিকিৎসা দেয়া হয়। দেয়া হয় বিনামূল্যে প্রায় ২৮ ধরণের ঔষধও। শুধু সাধারণ রোগের নয়, নারীদের গর্ভবতীকালীন ও সন্তান প্রসব পরবর্তী স্বাস্থ্য পরীক্ষার পাশাপাশি দেয়া হয় পরামর্শ ও চিকিৎসা। সন্তান প্রসবের জন্য এসব ক্লিনিকে ধাত্রীও রয়েছেন, যারা এসব ক্লিনিকে সন্তান প্রসব করিয়ে থাকেন। এছাড়া শিশু মৃত্যুহার কমাতে যক্ষ্মা, হেপাটাইটিস বি, নিউমোনিয়া, হাম, রুবেলাসহ প্রায় ১০ টি রোগের ৭ টি প্রতিষেধক দেয়া হয় এসকল ক্লিনিকগুলোতে। জন্মের থেকেই শিশুরা এ টিকা বা প্রতিষেধক পেয়ে থাকেন। সন্তান সম্ভবা মহিলাদের দেয়া হয় টিডি (টিটেনাস ও ডিপথেরিয়া) রোগের প্রতিষেধক। এছাড়া মাঠপর্যায়ে করোনার টিকা প্রদানও করানো হয়েছে এ সকল ক্লিনিকগুলোতে।

পাবনা সদর উপজেলা হেলথ অফিসের তথ্যমতে, উপজেলার ১০ টি ইউনিয়নে ৩০ টি ব্লকে প্রায় ৪৬ টি কমিউনিটি ক্লিনিকে প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষকে এ চিকিৎসা সেবা দেয়া হচ্ছে। প্রতিটি ক্লিনিকে ১ জন করে ক্লিনিক হেলথকেয়ার প্রোভাইডার প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৬০ জন মানুষকে এ সেবা দিচ্ছেন। এতে গ্রামের অসচেতন মানুষের ভোগান্তি কমেছে, কমেছে নানামুখী দুর্ঘটনা। প্রাথমিক সকল রোগের চিকিৎসার পাশাপাশি বিনামূল্যে দেয়া হচ্ছে ঔষধ। জটিল রোগের ক্ষেত্রে রোগীদের রেফার্ড করা হয় হেলথ অফিসে কর্মরত সহকারী সার্জনদের কাছে। সেখানেও বিনামূল্যে সার্জনরা দেন জটিল রোগের চিকিৎসা। কোনো পরীক্ষা নিরীক্ষার প্রয়োজনে বাইরে যেতে হলে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে সুপারিশের মাধ্যমে লাঘব করে দেন এ সংশ্লিষ্ট বিল। তবে যক্ষ্মা, ডেঙ্গু, করোনা সহ বেশ কয়েকটি রোগের পরীক্ষা হেলথ অফিসেই বিনামূল্যে করানো হয়।

হেলথ অফিস তথ্যমতে, চলতি বছরের আগস্ট মাসে উপজেলার জন্ম থেকে ১১ মাস বয়সী ৯১৪ জন শিশুকে বিভিন্ন রোগের টিকা বা প্রতিষেধক দেয়া হয়েছে। তবে মাস বিবেচনায় এ সংখ্যা বৃদ্ধি বা হ্রাস পেয়ে থাকে। সে হিসেবে প্রতিবছর উপজেলায় প্রায় সাড়ে ১১ হাজার জন শিশু এ টিকা পেয়ে থাকে। একইভাবে চলতি মাসে এ সকল কমিউনিটি ক্লিনিক ও এর আওতাধীন কেন্দ্র থেকে ৬৯৪ জন গর্ভবতী ও ১৭৮৫ জন ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী মহিলা টিডি (টিটেনাস ও ডিপথেরিয়া) রোগের টিকা বা প্রতিষেধক পেয়েছেন। এছাড়া উপজেলার ১১ জন গর্ভবতী মহিলার নরমাল ডেলিভারি করিয়েছেন এসকল ক্লিনিকের ধাত্রীরা।

এদিকে প্রান্তিক পর্যায়ে এসকল সেবা প্রদানের ফলে উল্লেখযোগ্য হারে শিশু মৃত্যু কমেছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে প্রান্তিক পর্যায়ে বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ঔষধ পেয়ে স্বস্তি প্রকাশ করছেন সাধারণ মানুষ। চর আশুতোষপুর কমিউনিটি ক্লিনিকে বাচ্চার জন্য চিকিৎসা নিতে আসা খালেদা জানান, বাচ্চার ঠান্ডা জ্বর। একইসাথে কোমরের নিচে চুলকানিও হয়েছে। জিনিসপত্রের যে দাম তাতে খেয়ে বেঁচে থাকাই কষ্টকর। ডাক্তার দেখানোর টাকা আর কই থাকে। এখানে বিনামূল্যে ঔষধ দেয়। বাচ্চার বুকে মেশিন ধরে দেখে ঔষধ দিলো। টাকা ছাড়া চিকিৎসা ও ঔষধ গরীবের আর কি লাগে?
আরেক সেবাপ্রত্যাশি বৃদ্ধ সমিরন বেগম বলেন, স্বামী মারা গেছেন অনেক আগেই। ছেলে ভাত কাপড় দেয়। আমার বয়স হইছে, সারা শরীরে রোগ বালাই। সংসারে ৫/৬ জন লোককে আমার ছেলে একা কামাই করে খাওয়ায়। এর মধ্যে এতো ঔষধ কিভাবে কিনে দেবে? এখান থেকে ফ্রিতে ব্যাথার ঔষধ পাই। ঔষধ খেলে ব্যথা কমে, অন্তত ঘুমটা তো পারতে পারি।
জহিরপুর কমিউনিটি ক্লিনিকের হেলথকেয়ার প্রোভাইডার তাছলিমা জানান, প্রাথমিক সকল রোগের চিকিৎসা আমরা দিয়ে থাকি। যা ঔষধ দেয়া হয় তা পর্যাপ্ত। তবে কিছু কিছু ঔষধের বরাদ্দ আরেকটু বেশি পেলে ভালো হয়। একেকটি ক্লিনিকে আমরা একজন করে দায়িত্ব পালন করি। এতোগুলা মানুষকে সেবা দেয়া ও অফিসিয়াল কাজ করা একার পক্ষে কষ্টকর। এক্ষেত্রে আমাদের জনবল বৃদ্ধি করা হলে সেবার মান আরো বাড়বে।

পাবনা সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা জান্নাতুল ফেরদৌস জানান, খুব অল্প জনবল দিয়ে আমরা সর্বোচ্চ চিকিৎসা সেবাটাই দেয়ার চেষ্টা করছি। সপ্তাহে ছয়দিন এসকল ক্লিনিকগুলোতে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা ও ঔষধ দেয়া হয়। প্রয়োজন হলে স্বাস্থ্যকর্মীরা আমাদের সহকারী সার্জনদের কাছে পাঠান। প্রাথমিক প্রায় সকল রোগের ২৮ ধরণের ঔষধ দেয়া হয়। রোগীদের সাধারণত ৩ দিনের ঔষধ বিনামূল্যে দেয়া হয় এবং পরবর্তী প্রয়োজনে বাইরে থেকে ক্রয় করে ডোজ সম্পন্ন করার পরামর্শ দেয়া হয়। তবে ঔষধের বরাদ্দ বাড়ালে রোগীদের বাইরে থেকে আর ঔষধ কিনতে হবে না।

বিজনেস বাংলাদেশ/একে

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

চাঁদপুরে বাবার স্মৃতি বিজড়িত খোদ্দ খাল খননের উদ্বোধন করলেন তারেক রহমান

পাবনায় সাধারণের আস্থা অর্জন করেছে কমিউনিটি ক্লিনিক

প্রকাশিত : ০৩:৫১:২৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ অক্টোবর ২০২৩

পাবনায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করেছে কমিউনিটি ক্লিনিক। জ্বর, ঠান্ডাসহ সাধারণ রোগের পাশাপাশি যক্ষা প্রতিরোধেও কাজ করছেন এখানকার স্বাস্থ্যকর্মীরা। কমেছে প্রতারক ও হাতুড়ে ডাক্তারের তৎপরতাও। তবে, সেবাপ্রত্যাশী বৃদ্ধি পাওয়ায় ওষুধের বরাদ্দ বৃদ্ধির দাবি স্থানীয়দের।

স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, সপ্তাহে ছয়দিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩ টা পর্যন্ত প্রান্তিক পর্যায়ে চিকিৎসা সেবা দেয়া হয় এসব কমিউনিটি ক্লিনিকে। জ্বর, ঠাণ্ডা, চুলকানি, ওজন ও প্রেশার পরিমাপ, ডায়বেটিস পরীক্ষাসহ প্রাথমিক প্রায় সকল রোগের চিকিৎসা দেয়া হয়। দেয়া হয় বিনামূল্যে প্রায় ২৮ ধরণের ঔষধও। শুধু সাধারণ রোগের নয়, নারীদের গর্ভবতীকালীন ও সন্তান প্রসব পরবর্তী স্বাস্থ্য পরীক্ষার পাশাপাশি দেয়া হয় পরামর্শ ও চিকিৎসা। সন্তান প্রসবের জন্য এসব ক্লিনিকে ধাত্রীও রয়েছেন, যারা এসব ক্লিনিকে সন্তান প্রসব করিয়ে থাকেন। এছাড়া শিশু মৃত্যুহার কমাতে যক্ষ্মা, হেপাটাইটিস বি, নিউমোনিয়া, হাম, রুবেলাসহ প্রায় ১০ টি রোগের ৭ টি প্রতিষেধক দেয়া হয় এসকল ক্লিনিকগুলোতে। জন্মের থেকেই শিশুরা এ টিকা বা প্রতিষেধক পেয়ে থাকেন। সন্তান সম্ভবা মহিলাদের দেয়া হয় টিডি (টিটেনাস ও ডিপথেরিয়া) রোগের প্রতিষেধক। এছাড়া মাঠপর্যায়ে করোনার টিকা প্রদানও করানো হয়েছে এ সকল ক্লিনিকগুলোতে।

পাবনা সদর উপজেলা হেলথ অফিসের তথ্যমতে, উপজেলার ১০ টি ইউনিয়নে ৩০ টি ব্লকে প্রায় ৪৬ টি কমিউনিটি ক্লিনিকে প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষকে এ চিকিৎসা সেবা দেয়া হচ্ছে। প্রতিটি ক্লিনিকে ১ জন করে ক্লিনিক হেলথকেয়ার প্রোভাইডার প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৬০ জন মানুষকে এ সেবা দিচ্ছেন। এতে গ্রামের অসচেতন মানুষের ভোগান্তি কমেছে, কমেছে নানামুখী দুর্ঘটনা। প্রাথমিক সকল রোগের চিকিৎসার পাশাপাশি বিনামূল্যে দেয়া হচ্ছে ঔষধ। জটিল রোগের ক্ষেত্রে রোগীদের রেফার্ড করা হয় হেলথ অফিসে কর্মরত সহকারী সার্জনদের কাছে। সেখানেও বিনামূল্যে সার্জনরা দেন জটিল রোগের চিকিৎসা। কোনো পরীক্ষা নিরীক্ষার প্রয়োজনে বাইরে যেতে হলে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে সুপারিশের মাধ্যমে লাঘব করে দেন এ সংশ্লিষ্ট বিল। তবে যক্ষ্মা, ডেঙ্গু, করোনা সহ বেশ কয়েকটি রোগের পরীক্ষা হেলথ অফিসেই বিনামূল্যে করানো হয়।

হেলথ অফিস তথ্যমতে, চলতি বছরের আগস্ট মাসে উপজেলার জন্ম থেকে ১১ মাস বয়সী ৯১৪ জন শিশুকে বিভিন্ন রোগের টিকা বা প্রতিষেধক দেয়া হয়েছে। তবে মাস বিবেচনায় এ সংখ্যা বৃদ্ধি বা হ্রাস পেয়ে থাকে। সে হিসেবে প্রতিবছর উপজেলায় প্রায় সাড়ে ১১ হাজার জন শিশু এ টিকা পেয়ে থাকে। একইভাবে চলতি মাসে এ সকল কমিউনিটি ক্লিনিক ও এর আওতাধীন কেন্দ্র থেকে ৬৯৪ জন গর্ভবতী ও ১৭৮৫ জন ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী মহিলা টিডি (টিটেনাস ও ডিপথেরিয়া) রোগের টিকা বা প্রতিষেধক পেয়েছেন। এছাড়া উপজেলার ১১ জন গর্ভবতী মহিলার নরমাল ডেলিভারি করিয়েছেন এসকল ক্লিনিকের ধাত্রীরা।

এদিকে প্রান্তিক পর্যায়ে এসকল সেবা প্রদানের ফলে উল্লেখযোগ্য হারে শিশু মৃত্যু কমেছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে প্রান্তিক পর্যায়ে বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ঔষধ পেয়ে স্বস্তি প্রকাশ করছেন সাধারণ মানুষ। চর আশুতোষপুর কমিউনিটি ক্লিনিকে বাচ্চার জন্য চিকিৎসা নিতে আসা খালেদা জানান, বাচ্চার ঠান্ডা জ্বর। একইসাথে কোমরের নিচে চুলকানিও হয়েছে। জিনিসপত্রের যে দাম তাতে খেয়ে বেঁচে থাকাই কষ্টকর। ডাক্তার দেখানোর টাকা আর কই থাকে। এখানে বিনামূল্যে ঔষধ দেয়। বাচ্চার বুকে মেশিন ধরে দেখে ঔষধ দিলো। টাকা ছাড়া চিকিৎসা ও ঔষধ গরীবের আর কি লাগে?
আরেক সেবাপ্রত্যাশি বৃদ্ধ সমিরন বেগম বলেন, স্বামী মারা গেছেন অনেক আগেই। ছেলে ভাত কাপড় দেয়। আমার বয়স হইছে, সারা শরীরে রোগ বালাই। সংসারে ৫/৬ জন লোককে আমার ছেলে একা কামাই করে খাওয়ায়। এর মধ্যে এতো ঔষধ কিভাবে কিনে দেবে? এখান থেকে ফ্রিতে ব্যাথার ঔষধ পাই। ঔষধ খেলে ব্যথা কমে, অন্তত ঘুমটা তো পারতে পারি।
জহিরপুর কমিউনিটি ক্লিনিকের হেলথকেয়ার প্রোভাইডার তাছলিমা জানান, প্রাথমিক সকল রোগের চিকিৎসা আমরা দিয়ে থাকি। যা ঔষধ দেয়া হয় তা পর্যাপ্ত। তবে কিছু কিছু ঔষধের বরাদ্দ আরেকটু বেশি পেলে ভালো হয়। একেকটি ক্লিনিকে আমরা একজন করে দায়িত্ব পালন করি। এতোগুলা মানুষকে সেবা দেয়া ও অফিসিয়াল কাজ করা একার পক্ষে কষ্টকর। এক্ষেত্রে আমাদের জনবল বৃদ্ধি করা হলে সেবার মান আরো বাড়বে।

পাবনা সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা জান্নাতুল ফেরদৌস জানান, খুব অল্প জনবল দিয়ে আমরা সর্বোচ্চ চিকিৎসা সেবাটাই দেয়ার চেষ্টা করছি। সপ্তাহে ছয়দিন এসকল ক্লিনিকগুলোতে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা ও ঔষধ দেয়া হয়। প্রয়োজন হলে স্বাস্থ্যকর্মীরা আমাদের সহকারী সার্জনদের কাছে পাঠান। প্রাথমিক প্রায় সকল রোগের ২৮ ধরণের ঔষধ দেয়া হয়। রোগীদের সাধারণত ৩ দিনের ঔষধ বিনামূল্যে দেয়া হয় এবং পরবর্তী প্রয়োজনে বাইরে থেকে ক্রয় করে ডোজ সম্পন্ন করার পরামর্শ দেয়া হয়। তবে ঔষধের বরাদ্দ বাড়ালে রোগীদের বাইরে থেকে আর ঔষধ কিনতে হবে না।

বিজনেস বাংলাদেশ/একে