চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত হয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম টানেল । গত ২৮ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু টানেলের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। টানেল উদ্বোধন করার পর শুরু হয়েছে যান চলাচল। তবে টানেল দিয়ে শিল্পায়নের ভারী যান চলাচলের জন্য নির্মিত হচ্ছে ছয় লেন বিশিষ্ট মেগা সড়ক। এদিকে টানেল উদ্বোধন হলেও এখনো সম্পন্ন হয়নি টানেল সংযোগের পিএবি ছয় লেন মেগা সড়কের কাজ।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কালাবিবির দিঘির মোড় থেকে ক্রসিং ওয়াই জংশন পর্যন্ত জায়গা অধিগ্রহণ করে ৮ কিলোমিটার ছয় লেন সড়ক নির্মাণ করছে সড়ক ও জনপথ বিভাগ। এই অধিগ্রহণের প্রথম ধাপে ৮৭ কোটি দ্বিতীয় ধাপে ২৭ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়। দেখা যাচ্ছে, এই ৮ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে কালাবিবির দিঘির মোড় থেকে ক্রসিং পর্যন্ত সড়কের কাজ চলমান রয়েছে। এর মধ্যে ৮ কিলোমিটার এই সড়কের জন্য জায়গা অধিগ্রহণ করলেও এখনো পর্যন্ত সড়কটি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হয়নি। এই ৮কিলোমিটার সড়কের মধ্যে কালাবিবির দিঘির মোড় থেকে চাতরী চৌমুহনী পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার সড়কের বাম পাশের কিছু জায়গা এখনো সড়কের জন্য উদ্ধার হয়নি। এই ছয় লেন সড়কের দেড় কিলোমিটার সড়কের বাম পাশে এখনো পরিপূর্ণ সড়ক নির্মাণ হয়নি। আর এই সুযোগে উদ্ধার না হওয়া জায়গার উচ্ছেদের নোটিশ নিয়ে সওজ সার্ভিয়ার সুভাশীষ অবৈধভাবে অর্থ আদায় ও হয়রানীর করছে ভূমি মালিকদের। এমনটাই অভিযোগ করছে হয়রানীর শিকার হওয়া বেশ কয়েকজন ভূমি মালিক।
হয়রানী ও অর্থ আদায়ের বিষয়টি অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, এই দেড় কিলোমিটার সড়কের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ জন ভূমি মালিক রয়েছে। এর মধ্যে অনেকের জায়গা অধিগ্রহণে না পড়লেও তারা উচ্ছেদের নোটিশ পেয়েছে। হয়রানীর শিকার হওয়া ভূমি মালিকরা বলছে সওজের সার্ভিয়ার শুভাশীষ নোটিশ দিয়ে তাদের থেকে বড় ধরণের অর্থ দাবি করছে। কেউ দিচ্ছে আর কেউ না দিলে তাদেরকে উচ্ছেদ করবে বলে হুমকি প্রদান করছে। এ নিয়ে অনেকে আবার আদালতে মামলাও দায়ের করেছে। হয়রানীর শিকার হওয়া তার মধ্যে একজন বাঁশখালী উপজেলার বাসিন্দা মোকাম্মেল হক। টানেল সংযোগ সড়কের প্রবেশ পথের পিএবি সড়কের পূর্বে তার ১ গন্ডা জায়গা রয়েছে। ওই ভুক্তভোগীর দাবি তার জায়গা অধিগ্রহণের মধ্যে পড়েনি। তার পরেও তাকে উচ্ছেদ নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
গত ২৩ সালের অক্টোবর মাসের ১০ তারিখ সওজের উপ বিভাগীয় প্রকৌশলী জামাল উদ্দীন স্বাক্ষরিত একটি নোটিশ মোকাম্মেল হকের কাছে পৌছায়। আর নোটিশে সওজ সার্ভিয়ার ব্যাপক গোজামিলের আশ্রয় নেয়। পরে এই নোটিশ দিয়ে বিভিন্নভাবে উচ্ছেদের হুমকি প্রদান করেন। এদিকে এই উচ্ছেদ নোটিশের বিরুদ্ধে আদালতে নিষেধাজ্ঞা মামলা দায়ের করেন ভুক্তভোগী মোকাম্মেল হক।
নোটিশে উল্লেখ করা হয়, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের অধিগ্রহণকৃত ভূমির উপর আপনার কর্তৃক অবৈধভাবে নির্মিত “দোকান ঘর ” সরাইয়া নেওয়ার প্রসঙ্গে। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের অধীনে ন্যস্ত জনস্বার্থে ব্যবহৃত নিম্ন তফসীলভুক্ত সরকারী অধিগ্রহণকৃত ভূমির অর্থাৎ Right of Way (ROW) এর মধ্যে/পার্শ্ববর্তী সড়ক সংলগ্ন ভূমিতে (Road side land) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের যে মন্ত্রণালয়ের অধীনে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের বৈধ কর্তৃপক্ষের বিনা অনুমতিতে অবৈধভাবে জবর দখল করে সরকারী সম্পদের উপর অনুপ্রবেশ এবং এই সম্পদের উপর জনসাধারণের সার্বিক অধিকার খর্ব করেছেন। একই সঙ্গে ইহা যানবাহন,পথচারী, এবং বিভিন্ন সরকারী দপ্তর, ইত্যাদির নির্বিঘ্নে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছেন। যা হাইওয়ে আইন ১৯২৫ এর ৪ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে এবং ১৯৯৪ সনের ৬নং আইনের ৮নং ধারা অনুযায়ী সর্বশেষ জারিকৃত মহাসড়ক (নিরাপত্তা, সংরক্ষন, চলাচল নিয়ন্ত্রন) বিধিমালা ২০০১ এর ৬নং উপ-বিধি অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অবৈধভাবে নির্মিত “দোকান ঘর” সরিয়ে নেয়ার জন্য পটিয়া সড়ক উপ-বিভাগের কর্মকর্তা/কর্মচারী বিভিন্ন সময় আপনাকে অনুরোধ করলেও বিষয়টি আপনি আমলে নিচ্ছেন না।
এমতাবস্থায়, আগামী (তিন) দিনের মধ্যে সরকারী ভূমির উপর অবৈধভাবে নির্মিত “দোকান ঘর ” সরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ করা হলো। অন্যথায় আপনার বিরুদ্ধে মহাসড়ক নিরাপত্তা বিধিমালা অনুসারে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
নোটিশটি নিয়ে মোকাম্মেল হকের সাথে কথা বললে তিনি নোটিশে অসঙ্গতি তাকে হয়রানীর কথা জানান। তিনি বলেন, দলীল ও ডকুমেন্টে আমার জায়গা চাতরী মৌজা হলেও নোটিশে আমার জায়গাটি খিলপাড়া মৌজায় দেখানো হয়। জায়গার মালিক হিসেবে আমার নাম মোকাম্মেল হক হলেও নোটিশে আমার নাম মোকারম পিতা অজ্ঞাত দেখানো হয়। আমি তার সাথে কাগজপত্র নিয়ে যোগাযোগ করেছি। যে আমার জায়গা অধিগ্রহণে পড়েনি। তার পরেও কেন আমাকে নোটিশ দিয়ে বার বার হয়রানী করছে। পরিমাপও আমার জায়গা অধিগ্রহণে নাই।
এদিকে বিষয়টি অনুসন্ধান করলে বেরিয়ে আসে শুভাশীষের বিরুদ্ধে আরেক গুরুতর অভিযোগ। মূলত মোকাম্মেল নামের ওই ব্যক্তির যে জায়গা রয়েছে তার পিছনে রয়েছে আরব প্রপার্টিজ নামের একটি রিয়েল স্টেট কোম্পানির জায়গা। মূলত এই কোম্পনি থেকে বড় ধরণের অর্থের মাধ্যমে মোকাম্মেলের জায়গা উচ্ছেদ করে আরব প্রপার্টিজের সামনে খালি করে দেয়া। শুধু মোকাম্মেল নয় অধিগ্রহণের জায়গা না পড়া এরকম অনেক জায়গার মালিককে নোটিশ দিয়ে হয়রানী করার অভিযোগ ওঠেছে সওজের সার্ভিয়ার এই সুভাশীষের বিরুদ্ধে।
হয়রানীর শিকার হওয়া আজম নামের আরেক ভুক্তভোগী জানান আসলে আমাদের জায়গা অধিগ্রহণ হয়নি। কিন্তু সওজ সার্ভিয়ার আমাদের নানাভাবে হয়রানী করতেছে। আমরা এলএ শাখার সংবাদ দেখিয়েছি। ওনারা আমাদের জায়গা খানিক এদিকে আছে আবার বলে পিছনে আছে।এভাবে অনেক মানুষকে হয়রানী করতেছে।
সওজ সূত্রে জানা যায়, টানেলের সংযোগ সড়কের সঙ্গে সংযুক্ত করতে পিএবি সড়কের কর্ণফুলীর শিকলবাহা ওয়াই জংশন থেকে আনোয়ারা কালাবিবির দীঘির মোড় পর্যন্ত ৪০৭ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রায় ৮ কিলোমিটার ১৮ ফুট প্রস্থের এই সড়কটিকে ৬ লেনে উন্নীত করা হয়েছে। যার প্রস্থ হয়েছে ১৬০ ফুট। ১৬০ ফুটের ছয় লেনের মধ্যে ১২০ ফুটে হবে চারটি লেন, যা দিয়ে চলবে বড় বড় যানবাহন আর বাকি ৪০ ফুটে হবে দুটি লেন যা দিয়ে চলবে স্থানীয় ছোট যানগুলো। চট্টগ্রাম সিটি আউটার রিং রোড হয়ে বঙ্গবন্ধু টানেলের ভেতর দিয়ে পিএবি সড়ক হয়ে যানবাহন উঠবে কক্সবাজার মহাসড়কে।
ভুক্তভুগীদের এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সওজ’র সার্ভিয়ার সুভাশীষ চাকমা বলেন, নোটিশে হয়তো ভুল হয়েছে পরবর্তীতে আমরা সংশোধন করে নিব। তবে যে আরব প্রপার্টিজের সাথে অবৈধ লেনদেনের বিষয়ে অস্বীকার করে বলেন, এটা আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ দিচ্ছে এটি সত্য নয়। মূল কথা হচ্ছে এই জায়গার মালিক যদি সওজ হয় তাহলে আমরা উচ্ছেদ করে উদ্ধার করে নিব। যদি জায়গাটি সওজের না হয় তাহলে বাদ দিয়ে দিব।
এসব বিষয়ে সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ)’র নির্বাহী প্রকোশলী সুমন সিংহ বলেন, আমাদের থেকে এভাবে করার সুযোগ নাই। ডিসি অফিস যেভাবে আমাদের পরিমাপ দিয়েছে আমরা সেভাবে কাজ করতেছি। এখানে অবৈধ কাওকে সুবিধা দেওয়ার সুযোগ নাই।
বিজনেস বাংলাদেশ/এমএইচটি






















