০৩:৫৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৫ মে ২০২৪

রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় দুই রাজনৈতিক পরাশক্তি ভারত এবং চীনের ভূমিকা

বর্তমানে রোহিঙ্গারা পৃথিবীর সবচেয়ে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে থাকা ও নির্যাতিত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী। তারা তাদের নিজ দেশে হয়েছে প্রত্যাখ্যাত। অথচ আরাকানের হাজার বছরের সোনালী ইতিহাসের নির্মাতা এসকল রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীই। মিয়ানমার সরকারের দাবি রোহিঙ্গারা হলো বাংলাদেশি যারা অবৈধভাবে মিয়ানমারে বসবাস করছিলো। যদিও ইতিহাস ভিন্ন কথা বলে। যুগ যুগ ধরে নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের নিধন ও বিতাড়ন শুরু হয় মূলত ১৯৭৮ সালের শুরু থেকে যা ধারাবাহিক ভাবে এখন পর্যন্ত চলছে। সর্বশেষ ২০১৭ সালের আগষ্টে ঢলের মত আসা শরনার্থীসহ বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শরনার্থীর মোট সংখ্যা ১০ লক্ষাধিক। মানবিক বিপর্যয়ে পতিত এসব অসহায় মানুষের কষ্ট লাঘবে পাশে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশের সরকার এবং জনগণ। সেই সাথে মুসলিম বিশ্বের নেতৃবৃন্দসহ আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলকে নাড়া দিয়েছে এ অমানবিকতা। আমার আজকের এই প্রতিবেদনে রোহিঙ্গা সংকটে মোকাবিলায় দুই আঞ্চলিক পরাশক্তি ভারত এবং চীনের অংশগ্রহণ কতটুকু তা তুলেধরা হয়েছে।

আরাকান ছিলো স্বাধীন ও সমৃদ্ধ এক জনপদের নাম।বঙ্গোপসাগর ও নাফ নদীর দক্ষিণ -পশ্চিম মোহনা বেষ্টিত আরাকান-ইয়োমো নামের দীর্ঘ পর্বতশৃঙ্গ আরাকানকে মিয়ানমারের অন্যান্য অঞ্চল থেকে আলাদা করেছে। এই অঞ্চলটির প্রাচীন নাম ব্রাহ্ম জনপদ এবং বর্তমানে রাখাইন।ঐতিহাসিক তথ্যসূত্র থেকে আমরা জানতে পারি ১৪৩০-১৭৮৪ সাল পর্যন্ত ২২,০০০ বর্গ মাইল আয়তনের এই অঞ্চলটি একটি স্বাধীন রাজ্য ছিলো।১৮২৪ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তৎকালীন বার্মা দখল করলে আরাকান রাজ্যটি ব্রিটিশ ডোমিনিয়নের অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৪৪ সালে বার্মা ব্রিটিশদের থেকে স্বাধীনতা লাভ করলে আরাকান স্থায়ী ভাবে বার্মার অংশ হয় এবং ১৯৮১ সালে মিয়ানমারের সামরিক সরকার “আরাকান রাজ্যের” নাম পরিবর্তন করে “রাখাইন প্রদেশ ” নামকরণ করে। মিয়ানমার সরকারের দাবি রোহিঙ্গারা হলো ভারতীয়, বাঙালী ও চাঁটগাইয়া সেটলার,যাদেরকে ব্রিটিশরা আরাকানে এনেছে। কিন্তু ঐতিহাসিক ভাবে এটি প্রতিষ্ঠিত যে, ব্রিটিশরা বার্মায় শাসক হিসেবে আসার কয়েক শতাব্দী আগে হতেই রোহিঙ্গারা আরাকানে পূর্ণাঙ্গ জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

এরিই সমর্থনে একটি বহুল আলোচিত তথ্য রয়েছে ১৭৯৯ সালে প্রকাশিত ফ্রান্সিস বুকাননের বইয়ে। সেখানে তিনি উল্লেখ করেছিলেন, আরাকানে দুই ধরনের জনগোষ্ঠী রয়েছে -ইকাইন(রাখাইন)ও রুইঙ্গ্যা( রোহিঙ্গা)। সে হিসেবে রোহিঙ্গারাই আরাকান বা রাখাইনের একমাত্র ভূমিপুত্র জাতি।এমনকি মিয়ানমারের সংবিধানে বুনিয়াদি জাতির যে সংজ্ঞা প্রদান করা হয়েছে তাতেও রোহিঙ্গাদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু সব ঐতিহাসিক প্রমাণ উপেক্ষা করে বর্মী সরকার বার বার এ অভিযোগ উত্থাপন করে যে রোহিঙ্গারা ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে সদ্য অভিবাসিত একটি উপজাতি।

১৯৬২ সালে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখলের পর রোহিঙ্গাদের প্রতি রাষ্ট্রীয় বৈষম্য বাড়তে থাকে।১৯৮২ সালে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সরকার নাগরিকত্ব আইন জারি করে,সেখানে পূর্নাঙ্গ,সহযোগী ও অভিবাসী নাগরিকত্বের বিধান রাখা হয়। সেই আইনে রোহিঙ্গাদের কোনো ধরনের নাগরিকত্ব প্রদান না করে তাদের পুরোপুরি অস্বীকার করা হয়। ফলে নাগরিকত্ব হারিয়ে কয়েক পুরুষ ধরে বসবাস করা ভিটেতেই রোহিঙ্গারা হয়ে পড়ে উদ্বাস্তু।মিয়ানমারের শাসকগোষ্ঠী ও বর্ণবাদীদের দ্বারা রোহিঙ্গা বিতাড়ন শুরু হয় ১৭৮৪ সালের পর থেকে এরপর সময়ে সময়ে কোনো একটি কারণ তৈরী করে তারা রোহিঙ্গাদের নিজস্ব বসতভিটা থেকে বিতাড়ন করতে থাকে। এক হিসেবে উঠে আসে গত চার দশকে ১৫-২০ লাখ রোহিঙ্গা অন্যত্র পাড়ি জমিয়েছে। দেশ ছাড়া এসকল রোহিঙ্গারা প্রধানত বাংলাদেশে আসে।এছাড়াও মালেশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ভারত,পাকিস্তান, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তারা। রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘ কালের হলেও ২০১৭ সালের ২৫ আগষ্ট মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সরকার রোহিঙ্গা নিধন অপারেশন শুরু করলে এটি বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষন করে। এই দফায় মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী অমানবিকার সীমা লঙ্ঘন করে,মিয়ানমার সরকারের এই বর্বরতাকে জাতিগত নির্মূল অভিযান (Ethnic cleansing) এবং গনহত্যা বলে অবহিত করেছে জাতিসংঘ। জাতিসংঘের সভাপতি অ্যান্তনিও গুতেরাস( আগস্ট, ২০১৯) উক্ত পরিস্থিতি সম্পর্কে বলেন,বিশ্বের সবচেয়ে কম সময়ে তৈরী হওয়ার শরনার্থী এবং এটি ছিলো মানবাধিকারের জন্য একটি দুঃস্বপ্ন।

একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত রাখাইনের এই রোহিঙ্গা সম্প্রদায় এরপরে আমরা ফিলিস্তিন ও কাশ্মীরিদের কথা বলতে পারি। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় এই তিন ভূখণ্ডের মূল সমস্যার সাথে উপনিবেশিকতার গভীর সম্পর্ক। বিংশ শতাব্দীর ব্রিটিশ উপনিবেশিকতার পরিণাম এই তিন ভূখণ্ডের আজকের এই সংকট। অষ্টম শতকে বার্মা ব্রিটিশ উপনিবেশের অন্তর্ভুক্ত হয়। এসময়ে ব্রিটিশদের সাথে রাখাইন রোহিঙ্গাদের গভীর সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল ,বার্মিজ জাতীয়তাবাদের সাথে রোহিঙ্গা জাতীয়তাবাদের সংকট তীব্র হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ে জাপানিরা বার্মা আক্রমণ করলে অং সান সুচির বাবা জেনারেল অং সান ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং রাখাইনের রোহিঙ্গারা বৃটিশদের পক্ষ অবলম্বন করে। ব্রিটিশরা রোহিঙ্গাদের স্বাধীন আরাকানের প্রতিশ্রুতি দেয় সমর্থন আদায়ের জন্য যদিও তারা রাখতে পারেনি। এই বৈপরিত্যমূলক অবস্থানের জন্য বার্মিজ এবং রোহিঙ্গাদের মধ্যে অবিশ্বাস গড়ে ওঠে। এবং বার্মার স্বাধীনতা আন্দোলনের মূলধারা থেকে রোহিঙ্গারা বিছিন্ন হয়ে পড়ে। থেরাভেদা বৌদ্ধ ধর্মের ধারক রাষ্ট্র হিসেবে বার্মা রোহিঙ্গাদের ধর্ম ইসলামকে বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি হুমকি হিসেবে ভাবতে শুরু করে আর এই সুযোগ লুফে নেয় মিয়ানমারের জান্তা সরকার। তারা বৌদ্ধ ভিক্ষুকদের সহানুভূতি পাবার পাশাপাশি বৌদ্ধ উগ্রপন্থীদের উস্কে দিয়ে বার্মা ছাড়ানোর পরিকল্পনা করে। আরো একটি কারণ এই রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞের প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে সেটি হলো,রাখাইন স্টেটে চীন ও ভারতের ভূ-রাজনৈতিক আগ্রহের কারনে বিপুল বিনিয়োগ সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়।এই সম্ভাবনা প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে সেখানে বসবাসরত রোহিঙ্গারা সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে। যা জান্তা সরকার কোনো ভাবেই মেনে নিতে পারছিলোনা। তাই এই সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করতে মিয়ানমার থেকে চিরতরে রোহিঙ্গাদের বিতাড়িত করার জন্য এই নজিরবিহীন নিধনযজ্ঞ চালায়। তবে বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞরাই মনে করেন রোহিঙ্গা নিধনের মূল কারণ হলো জাতীয়তাবাদ উৎসারিত বর্ণবাদ।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে রোহিঙ্গাদের পক্ষে সারাবিশ্বে অনেক মানুষের মধ্যেই সহানুভূতিশীল জনমত তৈরী হয়ে আছে,অনেক প্রোপাগাণ্ডা স্বত্বেও সারাবিশ্বের মানুষ রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অপরাধের নিন্দা জানাচ্ছে তবুও মিয়ানমার কেনো এই উদ্বেগ -উৎকণ্ঠাকে আমলে নিচ্ছে না? এই প্রশ্নের উত্তর অনেকাংশেই আমরা পেয়ে যাবো রোহিঙ্গা ইস্যুতে এশিয়ার দুই পরাশক্তি চীন এবং ভারত কি স্ট্র্যাটিজি ফলো করছে তা বিশ্লেষণ করলেই। সম্প্রতি সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য,ফ্রান্স এই রোহিঙ্গা নিধনের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং তা বন্ধে কূটনীতিক তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে। চীন,রাশিয়া রোহিঙ্গাদের প্রতি অবিচারের ব্যাপারে সমবেদনা জানালেও মিয়ানমারের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের প্রস্তাবিত কঠোর ব্যাবস্থা গ্রহণ বরাবরই নারাজ। বরং তারা এ সমস্যা সমাধানে মিয়ানমারকে আরো সময় দিতে আগ্রহী। রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ বন্ধুপ্রতীম রাষ্ট্র ভারত এবং চীনের ভূমিকা বিশ্ববাসীকে রীতিমতো হতবাক করেছে।এরকম একটি মানবিক ইস্যুতে মিয়ানমারের প্রতি চীন- ভারতের কেনো এ সমর্থন?
ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বের বিচারে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার উভয়েই চীন এবং ভারতের জন্য সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দুটি দেশই বঙ্গোপসাগরে উপকূলবর্তী। রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত ” চেক অব ব্যালেন্স” নীতি অনুসরণ করছে। এটা তাদের রাজনৈতিক স্ট্যাটিজি। রোহিঙ্গা নিপিড়ন প্রশ্নে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন ভারত সরকার বেশ নীরব। অনেক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন মোদী এবং বিজেপির ইসলাম ফোবিয়ার হয়তো এর পেছনের কারণ। অনেকে আবার ২৫ আগষ্টের ঘটনার পেছনে মোদী সরকারের মদদ আছে বলে ধারনা করছে। মিয়ানমারের প্রতি ভারতের ভাতৃত্ব সুলভ আচরণের আরেকটি কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় আধিপত্য বিস্তারে চীনের যে আগ্রাসী ভূমিকা তার বিপরীতে মিয়ানমারকে কাছে টেনে কৌশলগত অবস্থানে পরিবর্তন আনতে চাইছে মোদী সরকার। আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সাথে ভারতের ভৌগোলিক যোগসূত্রের মাধ্যম হচ্ছে মিয়ানমার। এছাড়াও ভারতের “লুক ইস্ট পলিসি ” বাস্তবায়নের অন্যতম নিয়ামক হচ্ছে এই মিয়ানমার। তবে রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত এবং চীন একই পৃষ্ঠায় রয়েছে। রাখাইন রাজ্যে উভয় দেশই কম বেশি বিনিয়োগ করে যাচ্ছে এবং সে অঞ্চলে মিয়ানমার সরকারের নেতৃত্বকে সমর্থন দিচ্ছে। চীনের বড় বিনিয়োগের বিপরীতে ভারত সেখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বিনোদন পরিষেবার মত খাতগুলো প্রবেশের পদক্ষেপ নিচ্ছে। এছাড়াও মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর সাথে ভারত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরিতে উন্মুখ কারণ ভারতের উত্তর -পূর্ব রাজ্যগুলোতে বিদ্রোহের শায়েস্তা করতে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর সহযোগিতা ভারতের কাম্য। ভারত তার নিজ স্বার্থে রোহিঙ্গা ইস্যুতে ক্রমাগত কূটনৈতিক ও নৈতিক উদাসীনতা প্রদর্শন করছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ইউএন ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন ও মানবাধিকার বিষয়ক আরো কিছু আন্তর্জাতিক সংগঠনের গণহত্যাসহ যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ থাকা সত্বেও নেপিদোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক রক্ষার নামে ভারত দৃঢ় নৈতিক অবস্থান গ্রহণে নারাজ। বিশেষজ্ঞদের মতে বাংলাদেশ এবং মিয়ানমারের বন্ধু রাষ্ট্র ভারত রোহিঙ্গা ইস্যুতে উল্লেখযোগ্য কিছু পদক্ষেপ নিতে পারতো।তাতে সংকট পুরোপুরি নিরসন না হলেও হতভাগ্য রোহিঙ্গাদের দুর্দশা কিছুটা কমতো। ভূ-অর্থনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে ভারত মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য দায়ী ব্যাক্তিদের বিচার করাতে মিয়ানমারকে বাধ্য করতে পারতো বা অন্তত এটা নিশ্চিত করতো যে এমন জঘন্য অপরাধ আর ঘটবে না। কিন্তু এসবের কিছুই করছেনা ভারত এতে বরং তাদের নৈতিক দুর্বলতর বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।

চীনের সাথে বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকলেও রোহিঙ্গা সংকটে চীন আন্তর্জাতিক ফোরামে মিয়ানমারের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছে। অনেকেই মনে করে চীনের এই ভূমিকার পেছনে ভূরাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিবেচনা কাজ করেছে আবার অনেকে ধর্মীয় সম্প্রতির কথাও উল্লেখ করেছে। চীনের রাষ্ট্রীয় দর্শন অনুযায়ী যে কোনো রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও সংহতি একটি প্রধান বিষয়। রোহিঙ্গা প্রশ্নটিকে মিয়ানমার প্রথমেই তাদের রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা ও নিরাপত্তার সাথে সম্পর্কিত বলে সংজ্ঞায়িত করেছে। রোহিঙ্গাদের সন্ত্রাসী হিসেবে আখ্যায়িত করার জন্য চেষ্টা করেছে। যা চীনের নিজস্ব রাষ্ট্রকাঠামোর দর্শনের সাথে সংগতিপূর্ণ। উপরন্তু চীন তার নিজ দেশের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পশ্চিমাঞ্চলে এ ধরনের সমস্যার আশংকা করে। যেহেতু চীন নিজ রাষ্ট্রকে সবার উপরে স্থান দেয় সেহেতু এই বিষয়ে সমর্থন দিতে চীন দ্বিধা বোধ করেনি। মিয়ানমারের সাথে চীনের কৌশলগত হিসেবের ক্ষেত্রটি হচ্ছে, মালাক্কা প্রণালীর বিকল্প একটি পথ খোঁজা। চীনের প্রধান আমদানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে তেল- গ্যাস,এই পণ্যগুলো যায় মালাক্কা প্রণালী দিয়ে। চীন এই ব্যাপারে সচেতন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যদি তাদের কোন সংঘাতের আশংকা তৈরী হয় তাহলে যুক্তরাষ্ট্র এই প্রণালী অবরুদ্ধ করে দিতে পারে। এই জন্য চীন সরাসরি বঙ্গোপসাগরে যাবার একটি পথ ব্যাবহার করতে চায়। যেহেতু বঙ্গোপসাগরের একটি বড় অংশ জুড়ে মিয়ানমারের অবস্থান সেহেতু মিয়ানমারকে হাতে রাখা চীনের জন্য একটি বিরাট কৌশলগত চিন্তা।

বর্তমান সময়ে সবচেয়ে আলোচিত সংকট হলো রোহিঙ্গা সংকট। এটি এখন শুধু আর মিয়ানমারের সমস্যা নয় বরং আঞ্চলিক সমস্যার রূপ নিয়েছে।রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী ও কার্যকরী সমাধানে মিয়ানমারের অনীহা, অনমনীয়তা সমস্যাটকে আরো জটিল করে তুলছে।এই সংকটের আশু কোনো সমাধান আছে কিনা সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। আন্তর্জাতিক মহলের রোহিঙ্গা ইস্যুতে কেবল ত্রাণ সহায়তা ও সমবেদনা জানানো ছাড়া প্রত্যক্ষ কোনো পদক্ষেপ গ্রহণে আগ্রহ প্রকাশ করতে দেখা যাচ্ছে না। তারা জাতিসংঘের মাধ্যমে এই সমস্যা সমাধানে আগ্রহী। কিন্তু চীনের আপত্তির কারণে জাতিসংঘ কোনো কার্যকরী পদক্ষেপই নিতে পারছে না। রোহিঙ্গা ইস্যুতে সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী বাংলাদেশ। মানবিক কারণে লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা শরনার্থীকে আশ্রয় দিলেও নিজ দেশের নিরাপত্তার বিষয়টি এখন জটিল আকার ধারন করেছে। চুক্তির পরও রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে চাইছে না মিয়ানমার। উপরন্তু রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের বন্ধু রাষ্ট্র চীন এবং ভারতের মৌনতা বাংলাদেশের শঙ্কা বৃদ্ধি করছে। অনেকেই রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীন ও ভারতকে কাছে না পাওয়াকে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ব্যার্থতা বলে মনে করছে।তাই আমি মনে করি রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় আমরা যে পলিসি অনুসরন করছি এটা পরিবর্তন করা দরকার।দিপাক্ষিক পলিসির পরিবর্তে বহুপাক্ষিক পলিসি হাতে নিতে হবে।তৃতীয় কোনো পক্ষকে সাথে নিয়ে এগুতে হবে।চীন এবং ভারতের সমর্থন জরুরী সে ক্ষেত্রে।যেহেতু রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি এবং এর কেন্দ্রবিন্দু মিয়ানমারে সেহেতু এর সমাধান সেখানেই নিহিত। এই সংকট সমাধানের জন্য মিয়ানমারকে মূল সমস্যার সমাধান করতে হবে। রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিয়ে তাদের নাগরিকত্বসহ অন্যান্য অধিকার দিতে হবে।বেষম্যমূলক নীতির অবসানের মাধ্যমে তাদের স্বাভাবিক জীবন যাপনের সূযোগ করে দিতে হবে। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের অপপ্রচার, জাতিগত বিদ্বেষ ও উগ্র জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যাবস্থা নিতে হবে।আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় চাপ প্রয়োগ না করলে মিয়ানমার মূল সমস্যা সমাধানে উদ্যগী হবে না। আন্তর্জাতিক কূটনীতির সাফল্য আর মিয়ানমার সরকারের শুভবুদ্ধির জাগরণ এই পরিস্থিতির সমাধান করবে বলে আমরা আশাবাদী।

তাসনুভা রাগদা
শিক্ষার্থী (এম.এ),চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

বিজনেস বাংলাদেশ/একে

রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় দুই রাজনৈতিক পরাশক্তি ভারত এবং চীনের ভূমিকা

প্রকাশিত : ০৪:০৭:২২ অপরাহ্ন, রবিবার, ৭ এপ্রিল ২০২৪

বর্তমানে রোহিঙ্গারা পৃথিবীর সবচেয়ে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে থাকা ও নির্যাতিত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী। তারা তাদের নিজ দেশে হয়েছে প্রত্যাখ্যাত। অথচ আরাকানের হাজার বছরের সোনালী ইতিহাসের নির্মাতা এসকল রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীই। মিয়ানমার সরকারের দাবি রোহিঙ্গারা হলো বাংলাদেশি যারা অবৈধভাবে মিয়ানমারে বসবাস করছিলো। যদিও ইতিহাস ভিন্ন কথা বলে। যুগ যুগ ধরে নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের নিধন ও বিতাড়ন শুরু হয় মূলত ১৯৭৮ সালের শুরু থেকে যা ধারাবাহিক ভাবে এখন পর্যন্ত চলছে। সর্বশেষ ২০১৭ সালের আগষ্টে ঢলের মত আসা শরনার্থীসহ বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শরনার্থীর মোট সংখ্যা ১০ লক্ষাধিক। মানবিক বিপর্যয়ে পতিত এসব অসহায় মানুষের কষ্ট লাঘবে পাশে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশের সরকার এবং জনগণ। সেই সাথে মুসলিম বিশ্বের নেতৃবৃন্দসহ আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলকে নাড়া দিয়েছে এ অমানবিকতা। আমার আজকের এই প্রতিবেদনে রোহিঙ্গা সংকটে মোকাবিলায় দুই আঞ্চলিক পরাশক্তি ভারত এবং চীনের অংশগ্রহণ কতটুকু তা তুলেধরা হয়েছে।

আরাকান ছিলো স্বাধীন ও সমৃদ্ধ এক জনপদের নাম।বঙ্গোপসাগর ও নাফ নদীর দক্ষিণ -পশ্চিম মোহনা বেষ্টিত আরাকান-ইয়োমো নামের দীর্ঘ পর্বতশৃঙ্গ আরাকানকে মিয়ানমারের অন্যান্য অঞ্চল থেকে আলাদা করেছে। এই অঞ্চলটির প্রাচীন নাম ব্রাহ্ম জনপদ এবং বর্তমানে রাখাইন।ঐতিহাসিক তথ্যসূত্র থেকে আমরা জানতে পারি ১৪৩০-১৭৮৪ সাল পর্যন্ত ২২,০০০ বর্গ মাইল আয়তনের এই অঞ্চলটি একটি স্বাধীন রাজ্য ছিলো।১৮২৪ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তৎকালীন বার্মা দখল করলে আরাকান রাজ্যটি ব্রিটিশ ডোমিনিয়নের অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৪৪ সালে বার্মা ব্রিটিশদের থেকে স্বাধীনতা লাভ করলে আরাকান স্থায়ী ভাবে বার্মার অংশ হয় এবং ১৯৮১ সালে মিয়ানমারের সামরিক সরকার “আরাকান রাজ্যের” নাম পরিবর্তন করে “রাখাইন প্রদেশ ” নামকরণ করে। মিয়ানমার সরকারের দাবি রোহিঙ্গারা হলো ভারতীয়, বাঙালী ও চাঁটগাইয়া সেটলার,যাদেরকে ব্রিটিশরা আরাকানে এনেছে। কিন্তু ঐতিহাসিক ভাবে এটি প্রতিষ্ঠিত যে, ব্রিটিশরা বার্মায় শাসক হিসেবে আসার কয়েক শতাব্দী আগে হতেই রোহিঙ্গারা আরাকানে পূর্ণাঙ্গ জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

এরিই সমর্থনে একটি বহুল আলোচিত তথ্য রয়েছে ১৭৯৯ সালে প্রকাশিত ফ্রান্সিস বুকাননের বইয়ে। সেখানে তিনি উল্লেখ করেছিলেন, আরাকানে দুই ধরনের জনগোষ্ঠী রয়েছে -ইকাইন(রাখাইন)ও রুইঙ্গ্যা( রোহিঙ্গা)। সে হিসেবে রোহিঙ্গারাই আরাকান বা রাখাইনের একমাত্র ভূমিপুত্র জাতি।এমনকি মিয়ানমারের সংবিধানে বুনিয়াদি জাতির যে সংজ্ঞা প্রদান করা হয়েছে তাতেও রোহিঙ্গাদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু সব ঐতিহাসিক প্রমাণ উপেক্ষা করে বর্মী সরকার বার বার এ অভিযোগ উত্থাপন করে যে রোহিঙ্গারা ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে সদ্য অভিবাসিত একটি উপজাতি।

১৯৬২ সালে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখলের পর রোহিঙ্গাদের প্রতি রাষ্ট্রীয় বৈষম্য বাড়তে থাকে।১৯৮২ সালে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সরকার নাগরিকত্ব আইন জারি করে,সেখানে পূর্নাঙ্গ,সহযোগী ও অভিবাসী নাগরিকত্বের বিধান রাখা হয়। সেই আইনে রোহিঙ্গাদের কোনো ধরনের নাগরিকত্ব প্রদান না করে তাদের পুরোপুরি অস্বীকার করা হয়। ফলে নাগরিকত্ব হারিয়ে কয়েক পুরুষ ধরে বসবাস করা ভিটেতেই রোহিঙ্গারা হয়ে পড়ে উদ্বাস্তু।মিয়ানমারের শাসকগোষ্ঠী ও বর্ণবাদীদের দ্বারা রোহিঙ্গা বিতাড়ন শুরু হয় ১৭৮৪ সালের পর থেকে এরপর সময়ে সময়ে কোনো একটি কারণ তৈরী করে তারা রোহিঙ্গাদের নিজস্ব বসতভিটা থেকে বিতাড়ন করতে থাকে। এক হিসেবে উঠে আসে গত চার দশকে ১৫-২০ লাখ রোহিঙ্গা অন্যত্র পাড়ি জমিয়েছে। দেশ ছাড়া এসকল রোহিঙ্গারা প্রধানত বাংলাদেশে আসে।এছাড়াও মালেশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ভারত,পাকিস্তান, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তারা। রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘ কালের হলেও ২০১৭ সালের ২৫ আগষ্ট মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সরকার রোহিঙ্গা নিধন অপারেশন শুরু করলে এটি বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষন করে। এই দফায় মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী অমানবিকার সীমা লঙ্ঘন করে,মিয়ানমার সরকারের এই বর্বরতাকে জাতিগত নির্মূল অভিযান (Ethnic cleansing) এবং গনহত্যা বলে অবহিত করেছে জাতিসংঘ। জাতিসংঘের সভাপতি অ্যান্তনিও গুতেরাস( আগস্ট, ২০১৯) উক্ত পরিস্থিতি সম্পর্কে বলেন,বিশ্বের সবচেয়ে কম সময়ে তৈরী হওয়ার শরনার্থী এবং এটি ছিলো মানবাধিকারের জন্য একটি দুঃস্বপ্ন।

একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত রাখাইনের এই রোহিঙ্গা সম্প্রদায় এরপরে আমরা ফিলিস্তিন ও কাশ্মীরিদের কথা বলতে পারি। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় এই তিন ভূখণ্ডের মূল সমস্যার সাথে উপনিবেশিকতার গভীর সম্পর্ক। বিংশ শতাব্দীর ব্রিটিশ উপনিবেশিকতার পরিণাম এই তিন ভূখণ্ডের আজকের এই সংকট। অষ্টম শতকে বার্মা ব্রিটিশ উপনিবেশের অন্তর্ভুক্ত হয়। এসময়ে ব্রিটিশদের সাথে রাখাইন রোহিঙ্গাদের গভীর সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল ,বার্মিজ জাতীয়তাবাদের সাথে রোহিঙ্গা জাতীয়তাবাদের সংকট তীব্র হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ে জাপানিরা বার্মা আক্রমণ করলে অং সান সুচির বাবা জেনারেল অং সান ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং রাখাইনের রোহিঙ্গারা বৃটিশদের পক্ষ অবলম্বন করে। ব্রিটিশরা রোহিঙ্গাদের স্বাধীন আরাকানের প্রতিশ্রুতি দেয় সমর্থন আদায়ের জন্য যদিও তারা রাখতে পারেনি। এই বৈপরিত্যমূলক অবস্থানের জন্য বার্মিজ এবং রোহিঙ্গাদের মধ্যে অবিশ্বাস গড়ে ওঠে। এবং বার্মার স্বাধীনতা আন্দোলনের মূলধারা থেকে রোহিঙ্গারা বিছিন্ন হয়ে পড়ে। থেরাভেদা বৌদ্ধ ধর্মের ধারক রাষ্ট্র হিসেবে বার্মা রোহিঙ্গাদের ধর্ম ইসলামকে বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি হুমকি হিসেবে ভাবতে শুরু করে আর এই সুযোগ লুফে নেয় মিয়ানমারের জান্তা সরকার। তারা বৌদ্ধ ভিক্ষুকদের সহানুভূতি পাবার পাশাপাশি বৌদ্ধ উগ্রপন্থীদের উস্কে দিয়ে বার্মা ছাড়ানোর পরিকল্পনা করে। আরো একটি কারণ এই রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞের প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে সেটি হলো,রাখাইন স্টেটে চীন ও ভারতের ভূ-রাজনৈতিক আগ্রহের কারনে বিপুল বিনিয়োগ সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়।এই সম্ভাবনা প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে সেখানে বসবাসরত রোহিঙ্গারা সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে। যা জান্তা সরকার কোনো ভাবেই মেনে নিতে পারছিলোনা। তাই এই সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করতে মিয়ানমার থেকে চিরতরে রোহিঙ্গাদের বিতাড়িত করার জন্য এই নজিরবিহীন নিধনযজ্ঞ চালায়। তবে বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞরাই মনে করেন রোহিঙ্গা নিধনের মূল কারণ হলো জাতীয়তাবাদ উৎসারিত বর্ণবাদ।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে রোহিঙ্গাদের পক্ষে সারাবিশ্বে অনেক মানুষের মধ্যেই সহানুভূতিশীল জনমত তৈরী হয়ে আছে,অনেক প্রোপাগাণ্ডা স্বত্বেও সারাবিশ্বের মানুষ রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অপরাধের নিন্দা জানাচ্ছে তবুও মিয়ানমার কেনো এই উদ্বেগ -উৎকণ্ঠাকে আমলে নিচ্ছে না? এই প্রশ্নের উত্তর অনেকাংশেই আমরা পেয়ে যাবো রোহিঙ্গা ইস্যুতে এশিয়ার দুই পরাশক্তি চীন এবং ভারত কি স্ট্র্যাটিজি ফলো করছে তা বিশ্লেষণ করলেই। সম্প্রতি সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য,ফ্রান্স এই রোহিঙ্গা নিধনের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং তা বন্ধে কূটনীতিক তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে। চীন,রাশিয়া রোহিঙ্গাদের প্রতি অবিচারের ব্যাপারে সমবেদনা জানালেও মিয়ানমারের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের প্রস্তাবিত কঠোর ব্যাবস্থা গ্রহণ বরাবরই নারাজ। বরং তারা এ সমস্যা সমাধানে মিয়ানমারকে আরো সময় দিতে আগ্রহী। রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ বন্ধুপ্রতীম রাষ্ট্র ভারত এবং চীনের ভূমিকা বিশ্ববাসীকে রীতিমতো হতবাক করেছে।এরকম একটি মানবিক ইস্যুতে মিয়ানমারের প্রতি চীন- ভারতের কেনো এ সমর্থন?
ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বের বিচারে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার উভয়েই চীন এবং ভারতের জন্য সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দুটি দেশই বঙ্গোপসাগরে উপকূলবর্তী। রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত ” চেক অব ব্যালেন্স” নীতি অনুসরণ করছে। এটা তাদের রাজনৈতিক স্ট্যাটিজি। রোহিঙ্গা নিপিড়ন প্রশ্নে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন ভারত সরকার বেশ নীরব। অনেক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন মোদী এবং বিজেপির ইসলাম ফোবিয়ার হয়তো এর পেছনের কারণ। অনেকে আবার ২৫ আগষ্টের ঘটনার পেছনে মোদী সরকারের মদদ আছে বলে ধারনা করছে। মিয়ানমারের প্রতি ভারতের ভাতৃত্ব সুলভ আচরণের আরেকটি কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় আধিপত্য বিস্তারে চীনের যে আগ্রাসী ভূমিকা তার বিপরীতে মিয়ানমারকে কাছে টেনে কৌশলগত অবস্থানে পরিবর্তন আনতে চাইছে মোদী সরকার। আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সাথে ভারতের ভৌগোলিক যোগসূত্রের মাধ্যম হচ্ছে মিয়ানমার। এছাড়াও ভারতের “লুক ইস্ট পলিসি ” বাস্তবায়নের অন্যতম নিয়ামক হচ্ছে এই মিয়ানমার। তবে রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত এবং চীন একই পৃষ্ঠায় রয়েছে। রাখাইন রাজ্যে উভয় দেশই কম বেশি বিনিয়োগ করে যাচ্ছে এবং সে অঞ্চলে মিয়ানমার সরকারের নেতৃত্বকে সমর্থন দিচ্ছে। চীনের বড় বিনিয়োগের বিপরীতে ভারত সেখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বিনোদন পরিষেবার মত খাতগুলো প্রবেশের পদক্ষেপ নিচ্ছে। এছাড়াও মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর সাথে ভারত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরিতে উন্মুখ কারণ ভারতের উত্তর -পূর্ব রাজ্যগুলোতে বিদ্রোহের শায়েস্তা করতে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর সহযোগিতা ভারতের কাম্য। ভারত তার নিজ স্বার্থে রোহিঙ্গা ইস্যুতে ক্রমাগত কূটনৈতিক ও নৈতিক উদাসীনতা প্রদর্শন করছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ইউএন ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন ও মানবাধিকার বিষয়ক আরো কিছু আন্তর্জাতিক সংগঠনের গণহত্যাসহ যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ থাকা সত্বেও নেপিদোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক রক্ষার নামে ভারত দৃঢ় নৈতিক অবস্থান গ্রহণে নারাজ। বিশেষজ্ঞদের মতে বাংলাদেশ এবং মিয়ানমারের বন্ধু রাষ্ট্র ভারত রোহিঙ্গা ইস্যুতে উল্লেখযোগ্য কিছু পদক্ষেপ নিতে পারতো।তাতে সংকট পুরোপুরি নিরসন না হলেও হতভাগ্য রোহিঙ্গাদের দুর্দশা কিছুটা কমতো। ভূ-অর্থনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে ভারত মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য দায়ী ব্যাক্তিদের বিচার করাতে মিয়ানমারকে বাধ্য করতে পারতো বা অন্তত এটা নিশ্চিত করতো যে এমন জঘন্য অপরাধ আর ঘটবে না। কিন্তু এসবের কিছুই করছেনা ভারত এতে বরং তাদের নৈতিক দুর্বলতর বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।

চীনের সাথে বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকলেও রোহিঙ্গা সংকটে চীন আন্তর্জাতিক ফোরামে মিয়ানমারের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছে। অনেকেই মনে করে চীনের এই ভূমিকার পেছনে ভূরাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিবেচনা কাজ করেছে আবার অনেকে ধর্মীয় সম্প্রতির কথাও উল্লেখ করেছে। চীনের রাষ্ট্রীয় দর্শন অনুযায়ী যে কোনো রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও সংহতি একটি প্রধান বিষয়। রোহিঙ্গা প্রশ্নটিকে মিয়ানমার প্রথমেই তাদের রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা ও নিরাপত্তার সাথে সম্পর্কিত বলে সংজ্ঞায়িত করেছে। রোহিঙ্গাদের সন্ত্রাসী হিসেবে আখ্যায়িত করার জন্য চেষ্টা করেছে। যা চীনের নিজস্ব রাষ্ট্রকাঠামোর দর্শনের সাথে সংগতিপূর্ণ। উপরন্তু চীন তার নিজ দেশের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পশ্চিমাঞ্চলে এ ধরনের সমস্যার আশংকা করে। যেহেতু চীন নিজ রাষ্ট্রকে সবার উপরে স্থান দেয় সেহেতু এই বিষয়ে সমর্থন দিতে চীন দ্বিধা বোধ করেনি। মিয়ানমারের সাথে চীনের কৌশলগত হিসেবের ক্ষেত্রটি হচ্ছে, মালাক্কা প্রণালীর বিকল্প একটি পথ খোঁজা। চীনের প্রধান আমদানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে তেল- গ্যাস,এই পণ্যগুলো যায় মালাক্কা প্রণালী দিয়ে। চীন এই ব্যাপারে সচেতন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যদি তাদের কোন সংঘাতের আশংকা তৈরী হয় তাহলে যুক্তরাষ্ট্র এই প্রণালী অবরুদ্ধ করে দিতে পারে। এই জন্য চীন সরাসরি বঙ্গোপসাগরে যাবার একটি পথ ব্যাবহার করতে চায়। যেহেতু বঙ্গোপসাগরের একটি বড় অংশ জুড়ে মিয়ানমারের অবস্থান সেহেতু মিয়ানমারকে হাতে রাখা চীনের জন্য একটি বিরাট কৌশলগত চিন্তা।

বর্তমান সময়ে সবচেয়ে আলোচিত সংকট হলো রোহিঙ্গা সংকট। এটি এখন শুধু আর মিয়ানমারের সমস্যা নয় বরং আঞ্চলিক সমস্যার রূপ নিয়েছে।রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী ও কার্যকরী সমাধানে মিয়ানমারের অনীহা, অনমনীয়তা সমস্যাটকে আরো জটিল করে তুলছে।এই সংকটের আশু কোনো সমাধান আছে কিনা সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। আন্তর্জাতিক মহলের রোহিঙ্গা ইস্যুতে কেবল ত্রাণ সহায়তা ও সমবেদনা জানানো ছাড়া প্রত্যক্ষ কোনো পদক্ষেপ গ্রহণে আগ্রহ প্রকাশ করতে দেখা যাচ্ছে না। তারা জাতিসংঘের মাধ্যমে এই সমস্যা সমাধানে আগ্রহী। কিন্তু চীনের আপত্তির কারণে জাতিসংঘ কোনো কার্যকরী পদক্ষেপই নিতে পারছে না। রোহিঙ্গা ইস্যুতে সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী বাংলাদেশ। মানবিক কারণে লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা শরনার্থীকে আশ্রয় দিলেও নিজ দেশের নিরাপত্তার বিষয়টি এখন জটিল আকার ধারন করেছে। চুক্তির পরও রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে চাইছে না মিয়ানমার। উপরন্তু রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের বন্ধু রাষ্ট্র চীন এবং ভারতের মৌনতা বাংলাদেশের শঙ্কা বৃদ্ধি করছে। অনেকেই রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীন ও ভারতকে কাছে না পাওয়াকে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ব্যার্থতা বলে মনে করছে।তাই আমি মনে করি রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় আমরা যে পলিসি অনুসরন করছি এটা পরিবর্তন করা দরকার।দিপাক্ষিক পলিসির পরিবর্তে বহুপাক্ষিক পলিসি হাতে নিতে হবে।তৃতীয় কোনো পক্ষকে সাথে নিয়ে এগুতে হবে।চীন এবং ভারতের সমর্থন জরুরী সে ক্ষেত্রে।যেহেতু রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি এবং এর কেন্দ্রবিন্দু মিয়ানমারে সেহেতু এর সমাধান সেখানেই নিহিত। এই সংকট সমাধানের জন্য মিয়ানমারকে মূল সমস্যার সমাধান করতে হবে। রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিয়ে তাদের নাগরিকত্বসহ অন্যান্য অধিকার দিতে হবে।বেষম্যমূলক নীতির অবসানের মাধ্যমে তাদের স্বাভাবিক জীবন যাপনের সূযোগ করে দিতে হবে। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের অপপ্রচার, জাতিগত বিদ্বেষ ও উগ্র জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যাবস্থা নিতে হবে।আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় চাপ প্রয়োগ না করলে মিয়ানমার মূল সমস্যা সমাধানে উদ্যগী হবে না। আন্তর্জাতিক কূটনীতির সাফল্য আর মিয়ানমার সরকারের শুভবুদ্ধির জাগরণ এই পরিস্থিতির সমাধান করবে বলে আমরা আশাবাদী।

তাসনুভা রাগদা
শিক্ষার্থী (এম.এ),চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

বিজনেস বাংলাদেশ/একে