চট্টগ্রামের ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হয়েছে। ২৫২ বছরের পুরানো জেলা প্রশাসকের অফিসে এবার প্রথমবারের মতো নিয়োগ পেলেন নারী জেলা প্রশাসক। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ফরিদা খানম এই গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হন।
১৭৭২ সালে চট্টগ্রামের জেলা কালেক্টর অফিস প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ১৯০ জন জেলা প্রশাসক দায়িত্ব পালন করেছেন, কিন্তু ব্রিটিশ শাসন, পাকিস্তান আমল বা স্বাধীনতার পরেও কোন নারী এই দায়িত্ব পাননি। এবারই প্রথম চট্টগ্রামে এই পদে নারী হিসেবে নিয়োগ পেলেন ফরিদা খানম।
ফরিদা খানম তার এই দায়িত্বপালনের সুযোগকে সৌভাগ্য হিসেবে মনে করেন। তিনি বলেন, “মানবতার জন্য এবং চট্টগ্রামের মানুষের জন্য এমন কিছু করতে চাই, যা শত বছর পরেও শ্রদ্ধা, সম্মান এবং ভালোবাসার সঙ্গে চট্টগ্রামের মানুষ আমার নাম স্মরণ করবে।”
১২ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর, ফরিদা খানম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়কে একটি জনকল্যাণমুখী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার জন্য একাধিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেন, “রুটিন কাজের বাইরে গিয়ে চেষ্টা করছি, জেলা প্রশাসকের অফিসকে মানুষের আস্থা ও নির্ভরতার জায়গায় নিয়ে যেতে।”
তিনি আরও জানান, “সিস্টেমের কারণে অনেক সময় সেবা প্রার্থীদের সমস্যাগুলো যথাযথভাবে জানানো হয় না। তাই আমি সাপ্তাহিক বুধবার নির্ধারিত শুনানি ছাড়াও, প্রতি মাসে একদিন গণশুনানির আয়োজন করার পরিকল্পনা করছি। এই শুনানিতে সকল জেলা প্রশাসক কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকবেন, এবং গণশুনানিতে উঠে আসা সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করা হবে।”
দুর্নীতি এবং মানবাধিকারের প্রতি তার দৃঢ় অবস্থান প্রকাশ করে ফরিদা খানম বলেন, “যেখানে দুর্নীতি বা মানবাধিকারের অবমূল্যায়ন দেখব, সেখানেই আমি হস্তক্ষেপ করব।” তিনি তার বাবার শিক্ষাকে স্মরণ করে বলেন, “আমার বাবা কখনো সততার সঙ্গে আপস করেননি। তিনি বলতেন, ‘সততার সঙ্গে যোগ্য হয়ে ওঠো, এবং সাধারণ মানুষের সেবা করতে নিজেকে নিয়োজিত করো।'”
বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য যারা জীবন দিয়েছেন তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ফরিদা বলেন, “রক্তস্নাত একটি অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আমরা নতুন বাংলাদেশ পেয়েছি। আমি সেই বাংলাদেশকে সততা ও দক্ষতার সঙ্গে প্রতিনিধিত্ব করতে চাই।”
চট্টগ্রামকে একটি আধুনিক নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে ফরিদা খানম সকলের সহযোগিতা কামনা করেছেন। তিনি বলেন, “চট্টগ্রামের কৃষ্টি ও সংস্কৃতির মতো মানুষের হৃদয়ও বড়। আমি বিশ্বাস করি, চট্টগ্রামকে আধুনিক নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে সবাই আমাকে আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করবেন।”
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিভিন্ন বিভাগ ও দপ্তরের সংস্কার শুরু করেছেন। এরই অংশ হিসেবে গত ২০ আগস্ট চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলার জেলা প্রশাসককে (ডিসি) প্রত্যহার করে নিয়েছিল। অবশেষে ২৩ দিন পর নতুন জেলা প্রশাসক পেয়েছিল চট্টগ্রামসহ অন্যান্য জেলা।
গত ৯ সেপ্টেম্বর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মাঠ প্রশাসন-২ শাখার উপসচিব হোসনা আফরোজ সই করা এক প্রজ্ঞাপনে ফরিদা খানমকে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়।
জানা যায়, ফরিদা খানম ২০০৬ সালে সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ে প্রথম যোগদান করে কর্মজীবন শুরু করেন। এরপর রংপুর ও নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সহকারী কমিশনার, নরসিংদী জেলার পলাশ উপজেলা, সদর উপজেলা ও শরীয়তপুর সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে যোগ্যতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন ফরিদা খানম।
এরপর টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সিনিয়র সহকারী কমিশনার, ফেনী জেলার দাগনভূঞাঁ উপজেলা ও নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বিসিএস ক্যাডারের এই কর্মকর্তা।
এছাড়া মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরে প্রেষণে উপপরিচালক (ম্যাজিস্ট্রেট), বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনে উপপ্রধান, ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরে উপপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ফরিদা খানম।
চট্টগ্রাম জেলায় জেলা প্রশাসক হিসেবে যোগদানের পূর্বে তিনি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে উপসচিব হিসেবে সংযুক্ত ছিলেন।
শিক্ষাজীবনে ফরিদা খানম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে ২০০১ সালে অনার্স এবং ২০০২ সালে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। ২৫তম বিসিএস কর্মকর্তা হিসেবে ২০০৬ সালে প্রশাসন ক্যাডারে যোগদান করেন।
ডিএস//






















