০৫:১৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

কামিল মাদ্রাসার দোকান বরাদ্দে অনিয়মে জড়িতদের শাস্তি দাবী সীতাকুণ্ডবাসীর

 

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড কামিল মাদ্রাসার জায়গা নিয়ে গড়ে ওঠা সিকিউর সিটি শপিং কমপ্লেক্সে দোকান বরাদ্দে নানা অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠেছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-শিক্ষকসহ সর্বস্তরের মানুষ। এ দাবীতে সোমবার সকাল থেকে মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত মার্কেটে তালা লাগিয়ে রাখে মাদ্রাসার বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা। বিষয়টি জানাজানি হলে মাদ্রাসার দোকান নিয়ে এমন অনিয়মের বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠে সীতাকুণ্ডের সর্বস্তরের মানুষ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তারা বিভিন্ন পোস্ট-কমেন্টসে অনিয়মের সাথে জড়িতদের অবিলম্বে শাস্তি দাবী করেন।

সরেজমিনে দেখা যায়, সিকিউর সিটির ৬৩ শতক জায়গার মধ্যে মাদ্রাসার জমির পরিমাণ ৩১ শতক। আনুপাতিক হারে ২০২২ সালের আগে পর্যন্ত মাদ্রাসাকে সর্বমোট ১০৪টি দোকান বরাদ্দ দেয়া হয়। পরবর্তীতে মাদ্রাসার তদন্তে দেখা যায় আরও ১৫টি দোকান মাদ্রাসার পাওনা রয়েছে। বিষয়টি সিকিউর সিটি কর্তৃপক্ষ জানার পর গত ৩ বছরে নানা টালবাহানা করে ওই পনেরটি দোকান বুঝিয়ে দেয়নি। আবার যে ১০৪টি দোকান দেয়া হয়েছে তার সবকটি দোকানই মার্কেটের পিছনের অংশে। আনুপাতিক হারে সিকিউর সিটিতে ভূমির মালিকগণ ও ডেভেলপর কোম্পানি সিকিউর প্রপার্টিজ সামনে পিছনে সমানভাবে পাওয়ার কথা থাকলেও এক্ষেত্রে মাদ্রাসার সাথে চরম জালিয়াতির আশ্রয় নেয়া হয়েছে। যার ফলে অন্যান্য অংশীদারদের শতাধিক দোকান ভাড়া বা বিক্রয় হলেও এ পর্যন্ত মাদ্রাসার ১০৪টি দোকানের একটিও ভাড়া হয়নি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিগত সরকারের আমলে গড়ে ওঠা মার্কেটটিতে মাদ্রাসার পক্ষে প্রকল্প কমিটির প্রধান ছিলেন ব্যবসায়ী কামাল উল্লাহ। যিনি নিজেই আবার এ মার্কেটের কতেক ভূমির মালিক। অর্থাৎ একদিকে তিনি এক পক্ষের মালিক অন্যদিকে তিনি অপর পক্ষ মাদ্রাসার প্রকল্প উপ-কমিটির প্রধান। ফলে দোকান বরাদ্দের সময় তিনি সামনের সারির দোকানগুলো নিজের জন্য রেখে মাদ্রাসাকে পেছনের দোকানগুলো ধরিয়ে দেন। এ তথ্য জানিয়েছেন খোদ সিকিউর সিটির ভাইস চেয়ারম্যান মোঃ আকতার হোসাইন মামুন। তিনি বলেন, মাদ্রাসাকে আমরা পিস্তল ঠেকিয়ে দোকান দেয়নি। তাদের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকল্প কমিটির প্রধান কামাল উল্লাহ দোকান বরাদ্দের সময় নিজের জন্য সামনের দোকান নিয়ে নিয়েছেন। তখন সিকিউর সিটি তাকে মাদ্রাসার সব দোকান পিছনে পড়ে যাচ্ছে জানালে তিনি বলতেন, ‘মাদ্রাসাকে আমি বুঝাবো।’

এদিকে সিকিউর সিটির বিরুদ্ধেও বিস্তর অভিযোগ রয়েছে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের। মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা ওসমান গণি বলেছেন, সিকিউর কর্তৃপক্ষ প্রথমে মাদ্রাসাকে ১০৪টি দোকান বরাদ্ধ দেয়। পরে আমরা তদন্ত করে দেখতে পায় মাদ্রাসার আরও ১৫টি দোকান পাওনা রয়েছে। ২০২২ সালে বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ার পর তিন বছরেও সিকিউর মাদ্রাসার ১৫টি দোকান বুঝিয়ে দেয়নি। কামাল উল্লাহ ও সিকিউর যোগসাজসে মাদ্রাসাকে সবগুলো দোকান পিছনে দিয়েছে। এমনকি মাদ্রাসার বরাদ্দ পাওয়া সামনের একমাত্র দোকানটি সিকিউর দখল করে বছরের পর বছর নিজেদের অফিস হিসাবে ব্যবহার করেছে। ৫০ হাজার টাকা ভাড়া মূল্যের ওই দোকানটি ৫ আগস্টের পর উদ্ধার করেছে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ।

তিনি আরও বলেন, সর্বশেষ ১৫টির মধ্যে ১২৮ নং দোকানটি মাদ্রাসাকে না জানিয়ে ও মাদ্রাসা কমিটির বর্তমান সভাপতি এডিসি (শিক্ষা) শরীফ উদ্দিনের মৌখিক নির্দেশনা অমান্য করে ২৭ লক্ষ টাকা বিক্রয় করে দিয়েছে। এরপর মাদ্রাসা ও সিকিউরের উপস্থিতে মার্কেট পরিমাপ করে ১২৭৬ স্কয়ার ফুট মাদ্রাসার পাওনা রয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। পরে সিকিউর কর্তৃপক্ষ নানা টালবাহানা করে গত ১১ জানুয়ারী বৈঠকে বসে। কিন্তু বৈঠকে ১৫টি দোকান ও অবশিষ্ট পরিমাণে জায়গা বুঝিয়ে দেয়ার লিখিত সিদ্ধান্তে স্বাক্ষর দিতে অপারগতা প্রকাশ করে সিকিউর। বিষয়টি জানাজানি হলে মাদ্রাসা ছাত্ররা ক্ষুব্ধ হয়।

সিকিউর সিটির ভাইস চেয়ারম্যান মোঃ আকতার হোসাইন মামুন বলেন, দোকান বুঝিয়ে দেয়া একটি চলমান পক্রিয়া। আমরা মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের কাছে ১৪ ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত সময় চেয়েছি।

ব্যবসায়ী কামাল উল্লাহ বলেন, মাদ্রাসার দোকান পিছনে হোক আর যেখানেই হোক মার্কেটের মধ্যেইতো আছে।

এসব বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) বলেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আমি পদাধিকার বলে অনেক প্রতিষ্ঠানের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছি। কিন্তু আমাকে বেশিরভাগ সময় দিতে হচ্ছে শিক্ষা ও আইসিটিতে। সিকিউর সিটির বিষয়টি মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ভাল বলতে পারবে। এছাড়া সেখানে আরও একাধিক মালিক রয়েছেন আপনি তাদের সাথেও কথা বলেতে পারেন।

সীতাকুণ্ডের কৃতি সন্তান ও সাবেক উপসচিব (অবসরপ্রাপ্ত) জসিম উদ্দিন মাহমুদ বলেন, সীতাকুণ্ড কামিল মাদ্রাসার দোকান বরাদ্দের সময়টা ছিল স্বৈরাচার আওয়ামী সরকার আমলের এবং দায়িত্ব প্রাপ্তরাও সে দলের উচ্ছিষ্টভোগী। বর্তমানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের গণঅভ্যূথানে গঠিত সরকারের আমলে অবশ্যই সে সময়কার দুর্নীতি-অনিয়মের বিচার হতে হবে। মাদ্রাসার দোকান বরাদ্দে যারাই জড়িত তাদেরকে দ্রুত তদন্ত পূর্বক আইনগত ব্যবস্থা নেয়া এখন সীতাকুণ্ডবাসীর প্রাণের দাবী।

ডিএস//

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

১২ ফেব্রুয়া‌রির নির্বাচন স্বাধীনতা রক্ষা করার নির্বাচন

কামিল মাদ্রাসার দোকান বরাদ্দে অনিয়মে জড়িতদের শাস্তি দাবী সীতাকুণ্ডবাসীর

প্রকাশিত : ১২:২৯:৩৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৫

 

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড কামিল মাদ্রাসার জায়গা নিয়ে গড়ে ওঠা সিকিউর সিটি শপিং কমপ্লেক্সে দোকান বরাদ্দে নানা অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠেছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-শিক্ষকসহ সর্বস্তরের মানুষ। এ দাবীতে সোমবার সকাল থেকে মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত মার্কেটে তালা লাগিয়ে রাখে মাদ্রাসার বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা। বিষয়টি জানাজানি হলে মাদ্রাসার দোকান নিয়ে এমন অনিয়মের বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠে সীতাকুণ্ডের সর্বস্তরের মানুষ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তারা বিভিন্ন পোস্ট-কমেন্টসে অনিয়মের সাথে জড়িতদের অবিলম্বে শাস্তি দাবী করেন।

সরেজমিনে দেখা যায়, সিকিউর সিটির ৬৩ শতক জায়গার মধ্যে মাদ্রাসার জমির পরিমাণ ৩১ শতক। আনুপাতিক হারে ২০২২ সালের আগে পর্যন্ত মাদ্রাসাকে সর্বমোট ১০৪টি দোকান বরাদ্দ দেয়া হয়। পরবর্তীতে মাদ্রাসার তদন্তে দেখা যায় আরও ১৫টি দোকান মাদ্রাসার পাওনা রয়েছে। বিষয়টি সিকিউর সিটি কর্তৃপক্ষ জানার পর গত ৩ বছরে নানা টালবাহানা করে ওই পনেরটি দোকান বুঝিয়ে দেয়নি। আবার যে ১০৪টি দোকান দেয়া হয়েছে তার সবকটি দোকানই মার্কেটের পিছনের অংশে। আনুপাতিক হারে সিকিউর সিটিতে ভূমির মালিকগণ ও ডেভেলপর কোম্পানি সিকিউর প্রপার্টিজ সামনে পিছনে সমানভাবে পাওয়ার কথা থাকলেও এক্ষেত্রে মাদ্রাসার সাথে চরম জালিয়াতির আশ্রয় নেয়া হয়েছে। যার ফলে অন্যান্য অংশীদারদের শতাধিক দোকান ভাড়া বা বিক্রয় হলেও এ পর্যন্ত মাদ্রাসার ১০৪টি দোকানের একটিও ভাড়া হয়নি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিগত সরকারের আমলে গড়ে ওঠা মার্কেটটিতে মাদ্রাসার পক্ষে প্রকল্প কমিটির প্রধান ছিলেন ব্যবসায়ী কামাল উল্লাহ। যিনি নিজেই আবার এ মার্কেটের কতেক ভূমির মালিক। অর্থাৎ একদিকে তিনি এক পক্ষের মালিক অন্যদিকে তিনি অপর পক্ষ মাদ্রাসার প্রকল্প উপ-কমিটির প্রধান। ফলে দোকান বরাদ্দের সময় তিনি সামনের সারির দোকানগুলো নিজের জন্য রেখে মাদ্রাসাকে পেছনের দোকানগুলো ধরিয়ে দেন। এ তথ্য জানিয়েছেন খোদ সিকিউর সিটির ভাইস চেয়ারম্যান মোঃ আকতার হোসাইন মামুন। তিনি বলেন, মাদ্রাসাকে আমরা পিস্তল ঠেকিয়ে দোকান দেয়নি। তাদের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকল্প কমিটির প্রধান কামাল উল্লাহ দোকান বরাদ্দের সময় নিজের জন্য সামনের দোকান নিয়ে নিয়েছেন। তখন সিকিউর সিটি তাকে মাদ্রাসার সব দোকান পিছনে পড়ে যাচ্ছে জানালে তিনি বলতেন, ‘মাদ্রাসাকে আমি বুঝাবো।’

এদিকে সিকিউর সিটির বিরুদ্ধেও বিস্তর অভিযোগ রয়েছে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের। মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা ওসমান গণি বলেছেন, সিকিউর কর্তৃপক্ষ প্রথমে মাদ্রাসাকে ১০৪টি দোকান বরাদ্ধ দেয়। পরে আমরা তদন্ত করে দেখতে পায় মাদ্রাসার আরও ১৫টি দোকান পাওনা রয়েছে। ২০২২ সালে বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ার পর তিন বছরেও সিকিউর মাদ্রাসার ১৫টি দোকান বুঝিয়ে দেয়নি। কামাল উল্লাহ ও সিকিউর যোগসাজসে মাদ্রাসাকে সবগুলো দোকান পিছনে দিয়েছে। এমনকি মাদ্রাসার বরাদ্দ পাওয়া সামনের একমাত্র দোকানটি সিকিউর দখল করে বছরের পর বছর নিজেদের অফিস হিসাবে ব্যবহার করেছে। ৫০ হাজার টাকা ভাড়া মূল্যের ওই দোকানটি ৫ আগস্টের পর উদ্ধার করেছে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ।

তিনি আরও বলেন, সর্বশেষ ১৫টির মধ্যে ১২৮ নং দোকানটি মাদ্রাসাকে না জানিয়ে ও মাদ্রাসা কমিটির বর্তমান সভাপতি এডিসি (শিক্ষা) শরীফ উদ্দিনের মৌখিক নির্দেশনা অমান্য করে ২৭ লক্ষ টাকা বিক্রয় করে দিয়েছে। এরপর মাদ্রাসা ও সিকিউরের উপস্থিতে মার্কেট পরিমাপ করে ১২৭৬ স্কয়ার ফুট মাদ্রাসার পাওনা রয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। পরে সিকিউর কর্তৃপক্ষ নানা টালবাহানা করে গত ১১ জানুয়ারী বৈঠকে বসে। কিন্তু বৈঠকে ১৫টি দোকান ও অবশিষ্ট পরিমাণে জায়গা বুঝিয়ে দেয়ার লিখিত সিদ্ধান্তে স্বাক্ষর দিতে অপারগতা প্রকাশ করে সিকিউর। বিষয়টি জানাজানি হলে মাদ্রাসা ছাত্ররা ক্ষুব্ধ হয়।

সিকিউর সিটির ভাইস চেয়ারম্যান মোঃ আকতার হোসাইন মামুন বলেন, দোকান বুঝিয়ে দেয়া একটি চলমান পক্রিয়া। আমরা মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের কাছে ১৪ ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত সময় চেয়েছি।

ব্যবসায়ী কামাল উল্লাহ বলেন, মাদ্রাসার দোকান পিছনে হোক আর যেখানেই হোক মার্কেটের মধ্যেইতো আছে।

এসব বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) বলেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আমি পদাধিকার বলে অনেক প্রতিষ্ঠানের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছি। কিন্তু আমাকে বেশিরভাগ সময় দিতে হচ্ছে শিক্ষা ও আইসিটিতে। সিকিউর সিটির বিষয়টি মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ভাল বলতে পারবে। এছাড়া সেখানে আরও একাধিক মালিক রয়েছেন আপনি তাদের সাথেও কথা বলেতে পারেন।

সীতাকুণ্ডের কৃতি সন্তান ও সাবেক উপসচিব (অবসরপ্রাপ্ত) জসিম উদ্দিন মাহমুদ বলেন, সীতাকুণ্ড কামিল মাদ্রাসার দোকান বরাদ্দের সময়টা ছিল স্বৈরাচার আওয়ামী সরকার আমলের এবং দায়িত্ব প্রাপ্তরাও সে দলের উচ্ছিষ্টভোগী। বর্তমানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের গণঅভ্যূথানে গঠিত সরকারের আমলে অবশ্যই সে সময়কার দুর্নীতি-অনিয়মের বিচার হতে হবে। মাদ্রাসার দোকান বরাদ্দে যারাই জড়িত তাদেরকে দ্রুত তদন্ত পূর্বক আইনগত ব্যবস্থা নেয়া এখন সীতাকুণ্ডবাসীর প্রাণের দাবী।

ডিএস//