১০:০০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

গোলাপ চাষে ব্যাপক সফলতা ভালোবাসা দিবসকে সামনে রেখে ৫ লাখ টাকা বিক্রির আশা

পেঁয়াজ ও সবজি আবাদে দেশজুড়ে পাবনার সুখ্যাতি থাকলেও ৫ বছর আগেও বাণিজ্যিকভাবে ফুল বাগান ছিলো না এ জেলায়। তবে এখন পাবনায় কয়েক হেক্টর জমিতে করা হয়েছে বাণিজ্যিক ফুল বাগান। সবজি ও অন্যান্য চাষে দফায় দফায় লোকসানে পড়লেও গোলাপ বাগানে ব্যাপক সফলতা মিলেছে পাবনার টেবুনিয়ার ভজেন্দ্রপুরের তিন ভাইয়ের। ভালোবাসা দিবসকে কেন্দ্র করে এ মাসে ৫ লাখ টাকার গোলাপ বিক্রির আশা তাদের।

বাগান সংশ্লিষ্টরা জানায়, তিন ভাই খন্দকার শরিফুল আলম রানা, খন্দকার আশরাফুল হক শাহিন ও জাফরুল্লাহ। ভজেন্দ্রপুরে তাদের বাগান করা এ পৈতৃক জমিতে ছিলো বাঁশঝাড়। অন্যান্য জমিতে সবজি ও অন্যান্য চাষাবাদ হতো। কিন্তু কোনোভাবেই নিজেদের ভাগ্য বদল সম্ভব হচ্ছিলো না। উল্টো দফায় দফায় সবজি চাষে লোকসান গুণতে হয়েছে। এ অবস্থায় তিনজনের মধ্যকার বড়ভাই শরিফুল আলম রানা গোলাপ বাগান করার পরামর্শ দেন। তিনি ঢাকায় দীর্ঘদিন নার্সারির সাথে জড়িত। এবিষয়ে তার কিছুটা অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান থাকায় তার পরামর্শে বাঁশঝাড় তুলে দিয়ে মাত্র দেড় বিঘা জমিতে গোলাপ বাগান করার প্রস্তুতি নেয়া হয়। ভারত এবং দেশের যশোর ও সাভার সহ কয়েকটি অঞ্চল থেকে ১০ হাজার চারা এনে রোপণ করা হয়। শুরুতেই ফুলের ভালো উৎপাদন ও দামে এ বাগানে আগ্রহ বাড়ে তিন ভাইয়ের। ফলে প্রয়োজনীয় পরিচর্যায় ব্যাপক লাভ ও সফলতায় বেড়েছে বাগানের পরিসর। দেড় বিঘা জমি থেকে চার বিঘার তিনটি বাগানে রুপ নিয়েছে। শুরুতে নিজেরা পরিচর্যা করলেও এখন এ বাগানগুলোতে সারাবছর কমপক্ষে ৫ জন করে শ্রমিক কাজ করেন। এ বাগানে জুমুলিয়া, বিউটি, ভার্গো ও বমবম সহ এখন ৭ প্রজাতির গোলাপ রয়েছে। এসব ফুল লাল, শেড পিংক, অরেঞ্জ, হলুদ ও সাদা রং এর।

বাগান দেখভাল ও বিপণনের দায়িত্বে থাকা ইউনুফ জানান, সারাবছরই গোলাপের কম বেশি চাহিদা থাকে। বছরের সাধারণ সময়ে প্রতিমাসে গড়ে দেড় থেকে দুই লাখ টাকার গোলাপ বিক্রি হয়। মাসে খরচ হয় ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা। তবে নভেম্বরের শেষের দিক থেকে গোলাপের চাহিদা বাড়তে থাকে, দামও বাড়ে। ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত গোলাপের চাহিদা ব্যাপক। বিশেষত ফেব্রুয়ারি মাসে অসম্ভব চাহিদা। এজন্য এ মাসকে সামনে রেখে বাগানকে অতিরিক্ত যত্ন ও পরিচর্যাও করতে হয়।
তিনি জানান, এ সপ্তাহজুড়েও ১০০ পিছ গোলাপের দাম ২ হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকার মধ্যে রয়েছে। সামনে ভালোবাসা দিবস, তাই দুএকদিনের মধ্যে এর দাম বেড়ে প্রতি ১০০ পিছ গোলাপ সাড়ে ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকায় গিয়েও ঠেকবে। এদিক থেকে এ মাসে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকার ফুল বিক্রির আশা করছি।

অন্যান্যদের সাথে বাগানে কাজ করতে এসেছেন বাগান মালিকদের একজন খন্দকার শরিফুল আলম রানার ছেলে সাকিব। লেখাপড়ার পাশাপাশি নিয়মিতই বাবা চাচাদের সাথে গোলাপ বাগানের কাজে তাদের সহযোগিতা করেন জানিয়ে তিনি বলেন, একদিন পর পর ফুল তোলা হয়। শীতাকালে আড়াই থেকে ৪ হাজার পিছ পর্যন্ত ফুল ওঠে। সবচেয়ে ঢাল সিজনেও ১২০০ থেকে ১৫০০ পিছ করে ফুল ওঠে। ভালোবাসা দিবস সহ পুরো ফেব্রুয়ারি মাসে নানা দিবস থাকায় ফুলের চাহিদা বেড়েছে। বাগানে কাজের ব্যস্ততাও বেড়েছে বলে জানান তিনি।

এযাবৎ পোকামাকড় বা রোগবালাইয়ের আক্রমণ না হওয়ায় ব্যাপকভাবে লাভবান হচ্ছেন বাগান মালিকপক্ষ। এতে আগ্রহ বাড়ায় সম্প্রসারণ ঘটছে বাগানের। সৃষ্টি হচ্ছে নতুন নতুন কর্মসংস্থানের। বাগান যেনো শ্রমজীবীদের জন্যও আশির্বাদ হয়ে এসেছে। এব্যাপারে বাগান শ্রমিক মোশাররফ হোসেন বলেন, সবকিছুই এখন মেশিনের মাধ্যমে করা হচ্ছে। এজন্য লেবারের দরকার কমে যাচ্ছে। এরমধ্যে এসব বাগান হওয়ায় আমাদের কাজের সুযোগ বেড়েছে। মাসে ১৫ হাজার টাকা বেতনে কাজ করি। বাগানে একদিন পর পর গোলাপ কাটি, মাঝে মাঝে মাটি আলগা করা, সার কীটনাশক প্রয়োগ, সেচ দেয়া ও কুড়ি কাটা সহ পরিচর্যামূলক সকল কাজ করি।

জেলা কৃষি বিভাগ বলছে, বছর পাঁচেক আগেও জেলায় তেমন বাণিজ্যিক ফুল বাগান ছিলো না। তবে গত কয়েক বছরে এ ফুল বাগান বেড়েছে। পাবনা সদর, সুজানগর, চাটমোহর ও আটঘরিয়া সহ কয়েকটি উপজেলায় গোলাপ বাগান বেশি হচ্ছে। তবে এদের সাফল্যে আগ্রহী হয়ে অন্যান্য উপজেলায়ও এ বাগানকরণে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন উদ্যোক্তারা। বর্তমানে জেলায় ১২ হেক্টর জমিতে ফুল বাগান হয়েছে। এরমধ্যে ২ হেক্টরে গোলাপ বাগান রয়েছে। সময়ের সাথে এ পরিমাণ বাড়ছে বলেও জানায় কৃষি বিভাগ।

এব্যাপারে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক মো. রোকনুজ্জামান বলেন, কয়েকটি উপজেলায় প্রাথমিকভাবে বাণিজ্যিকভাবে গোলাপ চাষ শুরু হয়েছে। শুরুতেই তারা ভালো লাভবানও হচ্ছে। প্রতি একর জমিতে প্রায় দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা লাভের মুখ দেখছে। একারণে অনেকেই গোলাপ চাষে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। কৃষি বিভাগ এটিকে দারুণ ইতিবাচক বিষয় হিসেবে দেখছে। এক্ষেত্রে আমাদের মাঠকর্মীদের নির্দেশনা দেয়া আছে। তারা মাঠপর্যায়ে চাষিদের পোকামাকড় ও রোগবালাই থেকে ফুল রক্ষা এবং উৎপাদন বৃদ্ধিতে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছেন। ভজেন্দ্রপুরের ওই তিন ভাইয়ের মত অন্যরাও গোলাপ চাষে ব্যাপক সফলতার মুখ দেখবেন বলেও আশাবাদ এ কর্মকর্তার।

ডিএস//

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

গোলাপ চাষে ব্যাপক সফলতা ভালোবাসা দিবসকে সামনে রেখে ৫ লাখ টাকা বিক্রির আশা

প্রকাশিত : ০৫:৩৪:০৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৫

পেঁয়াজ ও সবজি আবাদে দেশজুড়ে পাবনার সুখ্যাতি থাকলেও ৫ বছর আগেও বাণিজ্যিকভাবে ফুল বাগান ছিলো না এ জেলায়। তবে এখন পাবনায় কয়েক হেক্টর জমিতে করা হয়েছে বাণিজ্যিক ফুল বাগান। সবজি ও অন্যান্য চাষে দফায় দফায় লোকসানে পড়লেও গোলাপ বাগানে ব্যাপক সফলতা মিলেছে পাবনার টেবুনিয়ার ভজেন্দ্রপুরের তিন ভাইয়ের। ভালোবাসা দিবসকে কেন্দ্র করে এ মাসে ৫ লাখ টাকার গোলাপ বিক্রির আশা তাদের।

বাগান সংশ্লিষ্টরা জানায়, তিন ভাই খন্দকার শরিফুল আলম রানা, খন্দকার আশরাফুল হক শাহিন ও জাফরুল্লাহ। ভজেন্দ্রপুরে তাদের বাগান করা এ পৈতৃক জমিতে ছিলো বাঁশঝাড়। অন্যান্য জমিতে সবজি ও অন্যান্য চাষাবাদ হতো। কিন্তু কোনোভাবেই নিজেদের ভাগ্য বদল সম্ভব হচ্ছিলো না। উল্টো দফায় দফায় সবজি চাষে লোকসান গুণতে হয়েছে। এ অবস্থায় তিনজনের মধ্যকার বড়ভাই শরিফুল আলম রানা গোলাপ বাগান করার পরামর্শ দেন। তিনি ঢাকায় দীর্ঘদিন নার্সারির সাথে জড়িত। এবিষয়ে তার কিছুটা অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান থাকায় তার পরামর্শে বাঁশঝাড় তুলে দিয়ে মাত্র দেড় বিঘা জমিতে গোলাপ বাগান করার প্রস্তুতি নেয়া হয়। ভারত এবং দেশের যশোর ও সাভার সহ কয়েকটি অঞ্চল থেকে ১০ হাজার চারা এনে রোপণ করা হয়। শুরুতেই ফুলের ভালো উৎপাদন ও দামে এ বাগানে আগ্রহ বাড়ে তিন ভাইয়ের। ফলে প্রয়োজনীয় পরিচর্যায় ব্যাপক লাভ ও সফলতায় বেড়েছে বাগানের পরিসর। দেড় বিঘা জমি থেকে চার বিঘার তিনটি বাগানে রুপ নিয়েছে। শুরুতে নিজেরা পরিচর্যা করলেও এখন এ বাগানগুলোতে সারাবছর কমপক্ষে ৫ জন করে শ্রমিক কাজ করেন। এ বাগানে জুমুলিয়া, বিউটি, ভার্গো ও বমবম সহ এখন ৭ প্রজাতির গোলাপ রয়েছে। এসব ফুল লাল, শেড পিংক, অরেঞ্জ, হলুদ ও সাদা রং এর।

বাগান দেখভাল ও বিপণনের দায়িত্বে থাকা ইউনুফ জানান, সারাবছরই গোলাপের কম বেশি চাহিদা থাকে। বছরের সাধারণ সময়ে প্রতিমাসে গড়ে দেড় থেকে দুই লাখ টাকার গোলাপ বিক্রি হয়। মাসে খরচ হয় ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা। তবে নভেম্বরের শেষের দিক থেকে গোলাপের চাহিদা বাড়তে থাকে, দামও বাড়ে। ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত গোলাপের চাহিদা ব্যাপক। বিশেষত ফেব্রুয়ারি মাসে অসম্ভব চাহিদা। এজন্য এ মাসকে সামনে রেখে বাগানকে অতিরিক্ত যত্ন ও পরিচর্যাও করতে হয়।
তিনি জানান, এ সপ্তাহজুড়েও ১০০ পিছ গোলাপের দাম ২ হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকার মধ্যে রয়েছে। সামনে ভালোবাসা দিবস, তাই দুএকদিনের মধ্যে এর দাম বেড়ে প্রতি ১০০ পিছ গোলাপ সাড়ে ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকায় গিয়েও ঠেকবে। এদিক থেকে এ মাসে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকার ফুল বিক্রির আশা করছি।

অন্যান্যদের সাথে বাগানে কাজ করতে এসেছেন বাগান মালিকদের একজন খন্দকার শরিফুল আলম রানার ছেলে সাকিব। লেখাপড়ার পাশাপাশি নিয়মিতই বাবা চাচাদের সাথে গোলাপ বাগানের কাজে তাদের সহযোগিতা করেন জানিয়ে তিনি বলেন, একদিন পর পর ফুল তোলা হয়। শীতাকালে আড়াই থেকে ৪ হাজার পিছ পর্যন্ত ফুল ওঠে। সবচেয়ে ঢাল সিজনেও ১২০০ থেকে ১৫০০ পিছ করে ফুল ওঠে। ভালোবাসা দিবস সহ পুরো ফেব্রুয়ারি মাসে নানা দিবস থাকায় ফুলের চাহিদা বেড়েছে। বাগানে কাজের ব্যস্ততাও বেড়েছে বলে জানান তিনি।

এযাবৎ পোকামাকড় বা রোগবালাইয়ের আক্রমণ না হওয়ায় ব্যাপকভাবে লাভবান হচ্ছেন বাগান মালিকপক্ষ। এতে আগ্রহ বাড়ায় সম্প্রসারণ ঘটছে বাগানের। সৃষ্টি হচ্ছে নতুন নতুন কর্মসংস্থানের। বাগান যেনো শ্রমজীবীদের জন্যও আশির্বাদ হয়ে এসেছে। এব্যাপারে বাগান শ্রমিক মোশাররফ হোসেন বলেন, সবকিছুই এখন মেশিনের মাধ্যমে করা হচ্ছে। এজন্য লেবারের দরকার কমে যাচ্ছে। এরমধ্যে এসব বাগান হওয়ায় আমাদের কাজের সুযোগ বেড়েছে। মাসে ১৫ হাজার টাকা বেতনে কাজ করি। বাগানে একদিন পর পর গোলাপ কাটি, মাঝে মাঝে মাটি আলগা করা, সার কীটনাশক প্রয়োগ, সেচ দেয়া ও কুড়ি কাটা সহ পরিচর্যামূলক সকল কাজ করি।

জেলা কৃষি বিভাগ বলছে, বছর পাঁচেক আগেও জেলায় তেমন বাণিজ্যিক ফুল বাগান ছিলো না। তবে গত কয়েক বছরে এ ফুল বাগান বেড়েছে। পাবনা সদর, সুজানগর, চাটমোহর ও আটঘরিয়া সহ কয়েকটি উপজেলায় গোলাপ বাগান বেশি হচ্ছে। তবে এদের সাফল্যে আগ্রহী হয়ে অন্যান্য উপজেলায়ও এ বাগানকরণে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন উদ্যোক্তারা। বর্তমানে জেলায় ১২ হেক্টর জমিতে ফুল বাগান হয়েছে। এরমধ্যে ২ হেক্টরে গোলাপ বাগান রয়েছে। সময়ের সাথে এ পরিমাণ বাড়ছে বলেও জানায় কৃষি বিভাগ।

এব্যাপারে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক মো. রোকনুজ্জামান বলেন, কয়েকটি উপজেলায় প্রাথমিকভাবে বাণিজ্যিকভাবে গোলাপ চাষ শুরু হয়েছে। শুরুতেই তারা ভালো লাভবানও হচ্ছে। প্রতি একর জমিতে প্রায় দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা লাভের মুখ দেখছে। একারণে অনেকেই গোলাপ চাষে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। কৃষি বিভাগ এটিকে দারুণ ইতিবাচক বিষয় হিসেবে দেখছে। এক্ষেত্রে আমাদের মাঠকর্মীদের নির্দেশনা দেয়া আছে। তারা মাঠপর্যায়ে চাষিদের পোকামাকড় ও রোগবালাই থেকে ফুল রক্ষা এবং উৎপাদন বৃদ্ধিতে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছেন। ভজেন্দ্রপুরের ওই তিন ভাইয়ের মত অন্যরাও গোলাপ চাষে ব্যাপক সফলতার মুখ দেখবেন বলেও আশাবাদ এ কর্মকর্তার।

ডিএস//