চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের গুলিয়াখালী, বাড়বকুণ্ড, বাঁশবাড়িয়া, কুমিরা, ভাটিয়ারী, বারআউলিয়া ও আকিলপুর সমুদ্র সৈকত এলাকা থেকে দীর্ঘ ৩ মাস ধরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে একটি চক্র। সমুদ্রকে ৩ ভাগে ভাগ করে সেখানে রাতদিন বালু উত্তোলন চলছে। এতে একদিকে সমুদ্রতল থেকে বালু উত্তোলন করে উদ্ভিদ ও প্রাণীকুলে নেতিবাচক পরিবর্তন, ভূগর্ভস্থ পানি ও বায়ুদূষণ, প্রাকৃতিক ভূচিত্র নষ্ট করছে। এসব নেতিবাচক প্রভাবের ফলে প্রাকৃতিক পরিবেশ বিপন্ন হচ্ছে। মানুষও আক্রান্ত হচ্ছে। বালু উত্তোলনে সৃষ্ট বায়ুদূষণে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে। উদ্ভিদ ও প্রাণীকুলের মধ্যে পরিবর্তন ঘটার ফলে তাদের আবাসস্থল যেমন ধ্বংস হচ্ছে। তেমনি তাদের খাদ্যের উৎসও ধ্বংস হচ্ছে। ফলে মৎস্য প্রজনন-প্রক্রিয়া পাল্টে যাওয়ার পাশাপাশি চাষাবাদের জমিও নষ্ট হচ্ছে।
বালু উত্তোলনে পানিদূষণসহ নদীগর্ভের গঠনপ্রক্রিয়া বদলে যাচ্ছে এবং নদী ভাঙছে। পুরো হাইড্রোলজিক্যাল কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বালু উত্তোলনের কাছাকাছি মাটির ক্ষয় যেমন ঘটছে। তেমনি মাটির গুণাগুণও নষ্ট হচ্ছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ায় মাটির উর্বরতা নষ্ট হয়ে যায়। এ ছাড়া নলকূপে পানি পাওয়াও কষ্টকর হয়। জলবায়ু পরিবর্তনেও এই বালু উত্তোলনের প্রভাব রয়েছে। উত্তোলন-প্রক্রিয়া ও বালু পরিবহন জলবায়ু পরিবর্তনে সরাসরি ভূমিকা রাখে।
অন্যদিকে বালু উত্তোলনের ফলে সমুদ্র তীরবর্তী এলাকায় বেশ কিছু গভীর গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। নির্বিচারে উপকূলীয় বনাঞ্চল ধ্বংস হচ্ছে। অসংখ্য বন্যপ্রাণী বাস্তচ্যুত হয়েছে। বালুর পানি গ্রামের কৃষি জমি ও বাড়ী ঘরে গড়িয়ে ফসল, গাছপালা, গবাদিপশু ও স্থানীয় বাসিন্দাদের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করছে। আলেকদিয়ে, কুমিরা ও জোড়ামতল বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে যাওয়ায় বর্ষার মৌসুমে নোনা পানি ডুকে প্লাবিত হয়েছে ফসলের মাঠ ও বসতভিটা। শুধু বেড়িবাঁধ নয়, বিলুপ্ত হওয়ার সঙ্কা সরকারের কোটি টাকায় নির্মিত কুমিরা ব্রীজ। বালু উত্তোলনের ফলে ২০২২ সালের মে মাসে ভেঙ্গে যায় ঘাটের জেটি। নতুন করে গড়ে তুলা প্রায় ৪০ লক্ষ টাকার জেটিরও বেহাল দশা। ফাঁটল ধরেছে সম্পূর্ণ ব্রীজের। ঝুঁকির মধ্যে পারাপার করছেন সাধারণ যাত্রীরা।
ভাঙন দেখা দিয়েছে বেড়িবাঁধে। খসে পড়ছে শত কোটি টাকায় নির্মাণ করা বেড়িবাঁধের হাজার হাজার ব্লক। অস্তিত্ব সংকটে পড়ছে পর্যটনের অপার সম্ভাবনাময় গুলিয়াখালী, বাঁশবাড়িয়া ও আকিলপুর সমুদ্র সৈকত।
সমুদ্রজুড়ে অনিয়ন্ত্রিত ও অবৈজ্ঞানিক উপায়ে বালু উত্তোলনের ফলে দেশের প্রধান চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের প্রবেশমুখ কর্ণফুলীর মোহনায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। ইতোমধ্যেই ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে নৌজেটি, পরিবেশ-জীববৈচিত্র ও উপকূলরক্ষার বেড়িবাঁধ। অনিয়ন্ত্রিত বালি উত্তোলন চলতে থাকলে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের প্রবেশমুখ কর্ণফুলীর মোহনায় প্রভাব পড়বে।
এছাড়াও স্থানীয় জেলেরা মাছ শিকারে নানাভাবে হয়রানি ও হামলার শিকার হচ্ছেন প্রতিদিন। গতকাল সোমবার বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় রামদাস নামে এক জেলেকে সমুদ্রে মেরে ফেলে দিয়েছে বালু উত্তোলনকারীরা। এ ছাড়া লিটন দাস নামে আরও এক জেলেকে অপহরণ করে নিয়ে গেছে বালু খেকো। তবে তাকে দীর্ঘ ৮/৯ ঘণ্টা পর হাতিয়া থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।
গতকাল সোমবার দুপুর ১টার সময় উপজেলার বাড়বকুণ্ড এলাকায় সমুদ্র উপকূলে এ ঘটনা ঘটে। সমুদ্রে ফেলে দেওয়া নিখোঁজ জেলেকে উদ্ধারে কাজ করছে ফায়ার সার্ভিস ও নৌ-পুলিশ।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সকাল ১০টার সময় রামদাস ও লিটন দাস দুই ভাই মিলে নৌকায় নিয়ে সমুদ্রে মাছ শিকারে যায়। কিন্তু সমুদ্রে ড্রেজার দিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করার কারণে তাদের মাছ ধরার জাল ছিঁড়ে যায়। এসব বিষয়ে তারা দুই ভাই বালু উত্তোলনকারী ড্রেজারে দায়িত্বরত ব্যক্তিদের কাছে প্রতিবাদ করতে গেলে ড্রেজারের লোকেরা রাম দাসকে মেরে সমুদ্রে ফেলে দেয়। এসময় আরেক ভাই লিটন দাসকে অপহরণ করে বাল্কহেডে করে নিয়ে চলে যায় বালু উত্তোলনকারীরা।
স্থানীয় জেলেরা জানিয়েছেন, নভেম্বর মাস থেকে অবৈধভাবে সমুদ্রে থেকে বালু উত্তোলন করছে পরিবেশ বিধ্বংসী একটি চক্র। বর্তমান সময়ে মাঠে ভালো অবস্থানে থাকা বড় দুইটি রাজনৈতিক দলের অনেকে এসবের নেপথ্যে থাকায় ভয়ে কেউ মুখ খুলছেন না। রীতিমতো মাঝ সমুদ্রে ও সমুদ্র পাড়ে পাহারা বসিয়ে তারা বালু উত্তোলনের কাজ চালাচ্ছে। সেখানে যারাই আসছেন তাদেরকে নজরদারীতে রাখা হচ্ছে।
এদিকে সমুদ্রে নিখোঁজ রাম দাসকে খুঁজে পেতে পুলিশের দ্বারস্থ হয়েছেন তার স্ত্রী কনিকা দাস। তিনি বলেন, আমার স্বামী অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় তাকে মেরে সমুদ্রে ফেলে দেয় এবং আমার দেবর লিটন দাসকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। আমরা এ ঘটনায় জড়িতদের বিচার চাই।
অপরদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। যেখানে দেখা যাচ্ছে রাম দাসের মা ও তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা সমুদ্র পাড়ে গিয়ে আহাজারি করছেন। তারা জড়িতদের কঠিন শাস্তি দাবী করে কান্নারত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।
দীর্ঘদিন ধরে সমুদ্রে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হলেও উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট দপ্তর কোন ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো জেলা প্রশাসন, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ), পরিবেশ অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাগণ একজন আরেক জনের উপর দায় চাপাচ্ছে।
কুমিরা নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ওয়ালিউদ্দিন বলেন, ঘটনাটি আমরা শুনেছি। ঘটনাস্থলে নৌ-পুলিশের একটি টিম পাঠানো হয়েছে। হাতিয়া থানা হাট থেকে অপহরণ হওয়া লিটন দাসকে উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় ৬ জনকে আটক করা হয়েছে। ভোলা চ্যানেল থেকে এমবি নাবিল ফারহান নামক বাল্কহেডটিকেও আটক করা হয়েছে।
সীতাকুণ্ড মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ মজিবুর রহমান বলেন, নিখোঁজ হওয়া জেলেকে উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। অপহরণ হওয়া জেলে লিটন দাসকে উদ্ধার করা হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ ফখরুল ইসলাম বলেন, সমুদ্র থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ডিএস,..





















