জাতীয় নির্বাচনে পোস্টার ব্যবহার বন্ধের সিদ্ধান্ত নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কারে একটি সাহসী ও ইতিবাচক পদক্ষেপ। দীর্ঘদিন ধরেই নির্বাচনী পোস্টার পরিবেশ দূষণ, নগর বিশৃঙ্খলা এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের প্রতীক হয়ে উঠেছিল। নির্বাচন কমিশনের এই সিদ্ধান্ত নির্বাচনকে আরও শৃঙ্খলাবদ্ধ, আধুনিক ও জনবান্ধব করার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
প্রতিটি নির্বাচনের সময় শহর ও গ্রামজুড়ে দেয়াল, বৈদ্যুতিক খুঁটি, গাছ, সরকারি স্থাপনা পোস্টারে ছেয়ে যেত। এতে একদিকে যেমন নান্দনিকতা নষ্ট হতো, অন্যদিকে পরিবেশের ওপর পড়ত বিরূপ প্রভাব। নির্বাচন শেষে এসব পোস্টার অপসারণে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাড়তি অর্থ ও শ্রম ব্যয় করতে হতো। পোস্টার ব্যবহার বন্ধের মাধ্যমে এই অপ্রয়োজনীয় পরিবেশগত ও প্রশাসনিক চাপ অনেকাংশে কমবে।
পোস্টারনির্ভর প্রচারণা আর্থিক বৈষম্যও সৃষ্টি করত। যাঁদের অর্থনৈতিক সামর্থ্য বেশি, তাঁরা বিপুল পরিমাণ পোস্টার ছাপিয়ে দৃশ্যমান প্রচারে এগিয়ে থাকতেন। এতে তুলনামূলকভাবে স্বল্প অর্থসম্পন্ন প্রার্থী ও নতুন রাজনৈতিক মুখগুলো পিছিয়ে পড়ত। পোস্টার নিষিদ্ধের ফলে প্রচারণায় একটি তুলনামূলক সমতা আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যা গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার জন্য ইতিবাচক।
এ ছাড়া পোস্টার ঘিরে সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলার ঘটনাও নতুন নয়। পোস্টার লাগানো বা ছেঁড়াকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সময়ে সংঘর্ষ, হুমকি ও মামলা-মোকদ্দমার ঘটনা ঘটেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পোস্টার ব্যবহার বন্ধের পর এখনো পর্যন্ত কোথাও এ ধরণের সিচুয়েশন তৈরী হয় নি।
পোস্টার বন্ধের সিদ্ধান্ত যথাযথভাবে কার্যকর করতে হলে বিকল্প প্রচারণার পথকে শক্তিশালী করা জরুরি। ডিজিটাল প্রচার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, গণমাধ্যমে সমান সুযোগ, নির্বাচনী সভা ও প্রার্থীর সরাসরি জনসংযোগ-এই মাধ্যমগুলোকে নীতিমালার আওতায় এনে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। নতুবা ডিজিটাল ব্যবধান নতুন বৈষম্যের জন্ম দিতে পারে।
একই সঙ্গে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। অতীতে বিভিন্ন নির্বাচনে বিধিনিষেধ থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তা মানা হয়নি। পোস্টার নিষিদ্ধ হলেও যদি গোপনে বা ভিন্ন নামে প্রচারণা চলে, তাহলে সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। নির্বাচন কমিশনকে এ ক্ষেত্রে কঠোর ও নিরপেক্ষ ভূমিকা রাখতে হবে।
জাতীয় নির্বাচনে পোস্টার এর মাধ্যমে প্রচারণা বন্ধ করা নিঃসন্দেহে একটি স্মার্ট, পরিবেশবান্ধব এবং গণতান্ত্রিক উদ্যোগ। যদি এটি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং প্রচারণার বিকল্প পথগুলো কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হয়, তবে নির্বাচনব্যবস্থায় একটি স্বচ্ছ, সমতাপূর্ণ ও ইতিবাচক পরিবর্তন নিশ্চিত করা সম্ভব। ভোট শুধু ভোটের দিন নয়-পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়া গণতন্ত্রের মান নির্ধারণ করে। সেই অর্থে পোস্টারমুক্ত নির্বাচন গণতান্ত্রিক সংস্কারে একটি নতুন মানদণ্ড স্থাপন করছে।
লেখক : (ড. জাহিদ আহমেদ চৌধুরী) কলামিস্ট ও মানবাধিকার কর্মী
ডিএস./
























