০১:২০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

গুণীজনের অবমূল্যায়ন ও রাজনীতির সাংস্কৃতিক সংকট

যে সমাজ গুণীজনকে সম্মান দিতে জানে না, সে সমাজে ধীরে ধীরে গুণীজনের সংকট তৈরি হয় এ কথা ইতিহাস বহুবার প্রমাণ করেছে। রাষ্ট্র পরিচালনার মূল চালিকাশক্তি রাজনীতি; আর সেই রাজনীতিতেই যদি গুণ, জ্ঞান ও নৈতিকতার মূল্য না থাকে, তাহলে রাষ্ট্রের ভিত দুর্বল হয়ে পড়া অবশ্যম্ভাবী। সামনে জাতীয় নির্বাচন এই সময়ে দাঁড়িয়ে তাই রাজনীতির ভাষা, আচরণ ও মানসিকতা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।

রাজনীতি শব্দটির গভীরে তাকালে দেখা যায়, এটি কেবল ক্ষমতা অর্জনের কৌশল নয়; রাজনীতি মানে নীতি। ‘রাজার নীতি’—অর্থাৎ যাঁরা নেতৃত্ব দেবেন, তাঁদের চিন্তা, ভাষা ও সিদ্ধান্তে থাকতে হবে উদারতা, প্রজ্ঞা ও দায়িত্ববোধ। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় আমরা প্রায়ই দেখতে পাই, রাজনীতি নীতির জায়গা ছেড়ে ক্রমশ বাক্যবাণের লড়াইয়ে পরিণত হচ্ছে। যুক্তির বদলে কটু কথা, নীতির বদলে ব্যক্তিগত আক্রমণ, আর আদর্শের বদলে হেয় প্রতিপন্ন করার প্রতিযোগিতা যেন স্বাভাবিক চর্চা হয়ে উঠছে।

কথা বলা সবার পক্ষেই সম্ভব। কিন্তু রাজনীতি কখনোই ‘যা খুশি বলা’র জায়গা নয়। রাজনৈতিক বক্তব্যে থাকতে হয় সংযম, শালীনতা ও দায়িত্ববোধ। আদব-কায়দা ছাড়া কথা বলা ব্যক্তিত্বের পরিচয় দেয় না; বরং তা রাজনীতির মানকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। বিশেষ করে যারা দেশ পরিচালনার নেতৃত্ব দিতে চান, তাদের আচরণ ও ভাষা সাধারণ মানুষের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে। সেই দৃষ্টান্ত যদি অশালীন হয়, তাহলে তার প্রভাব পড়ে পুরো সমাজে।

গণতন্ত্রমুখী রাজনীতির অন্যতম শর্ত হলো ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা। গণতন্ত্র মানে একমত হওয়া নয়; গণতন্ত্র মানে ভিন্নমত থাকা সত্ত্বেও সহাবস্থান। কিন্তু প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে না দেখে যদি শত্রু হিসেবে দেখা হয়, তাহলে গণতন্ত্রের ভিত্তিই নড়বড়ে হয়ে যায়। প্রতিপক্ষকে হেয় করে কথা বলা, ব্যঙ্গ-বিদ্রূপে আক্রমণ করা বা ব্যক্তিগতভাবে অপমান করা শেষ পর্যন্ত রাজনীতিকেই হাস্যকর করে তোলে—এতে রাষ্ট্র, সমাজ বা জনগণের কোনো কল্যাণ হয় না।

রাজনীতিতে দেশপ্রেম একটি বড় শব্দ, কিন্তু তার অর্থ কেবল স্লোগানে সীমাবদ্ধ নয়। দেশপ্রেম মানে মানুষের মর্যাদা রক্ষা, সাম্যতা নিশ্চিত করা এবং জ্ঞানী ও গুণী মানুষদের সম্মান দেওয়া। যে রাজনীতি জ্ঞানকে অবজ্ঞা করে, গুণীজনকে কোণঠাসা করে এবং ভিন্নমতকে দমন করে—সে রাজনীতি শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়তে পারে না। ইতিহাস বলে, রাষ্ট্র এগিয়েছে তখনই, যখন নেতৃত্বে ছিলেন প্রজ্ঞাবান, উদার ও দায়িত্বশীল মানুষ।

রাজনীতি যারা করবেন, যারা দেশ পরিচালনার নেতৃত্বে আসবেন তাদের সবচেয়ে বড় গুণ হওয়া উচিত উদারতা। উদারতা মানে শুধু ক্ষমা নয়; উদারতা মানে ভিন্ন মত শোনা, সমালোচনা গ্রহণ করা এবং প্রয়োজন হলে নিজ অবস্থান সংশোধনের সাহস রাখা। অহংকার ও সংকীর্ণতা দিয়ে হয়তো সাময়িক ক্ষমতা ধরে রাখা যায়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা রাজনীতি ও রাষ্ট্র দুটোকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে।

ব্যক্তির ব্যবহারই তার ব্যক্তিত্বের পরিচয় বহন করে এ কথা সমাজে বহুল প্রচলিত। রাজনীতির ক্ষেত্রে এটি আরও বেশি সত্য। একজন রাজনীতিবিদের আচরণ, ভাষা ও সংযম তার পরিবার, সমাজ এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতিফলন হয়ে ওঠে। তাই রাজনীতিতে শালীন আচরণ ব্যক্তিগত বিষয় নয়; এটি জাতীয় সংস্কৃতির অংশ।

সামনে জাতীয় নির্বাচন। এই নির্বাচন কেবল সরকার পরিবর্তনের প্রশ্ন নয়; এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি কোন পথে যাবে তারও একটি বড় পরীক্ষা। ভোটাররা এখন আর শুধু উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি শুনে সিদ্ধান্ত নেন না; তারা দেখতে চান নেতৃত্বের ভাষা, মানসিকতা ও নৈতিক অবস্থান। কে কতটা সংযত, কে কতটা সহনশীল, কে কতটা রাষ্ট্রনায়কসুলভ এই প্রশ্নগুলোই আগামী দিনের রাজনীতিকে সংজ্ঞায়িত করবে।

সময় এসেছে রাজনীতিকে আবার মূল্যবোধের জায়গায় ফিরিয়ে আনার। গুণীজনকে সম্মান করা, ভিন্নমতকে শ্রদ্ধা করা, শালীন ভাষায় কথা বলা এবং দায়িত্বশীল আচরণ এই গুণগুলোই পারে রাজনীতিকে জনকল্যাণমুখী করতে। অন্যথায় রাজনীতি মানুষের আস্থা হারাবে, আর সেই আস্থাহীনতার সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা বহন করতে হবে রাষ্ট্রকেই।

লেখক: জাহাঙ্গীর আলম,সাংবাদিক ও কলামিস্ট

ডিএস

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

গুণীজনের অবমূল্যায়ন ও রাজনীতির সাংস্কৃতিক সংকট

প্রকাশিত : ১১:৪০:১৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

যে সমাজ গুণীজনকে সম্মান দিতে জানে না, সে সমাজে ধীরে ধীরে গুণীজনের সংকট তৈরি হয় এ কথা ইতিহাস বহুবার প্রমাণ করেছে। রাষ্ট্র পরিচালনার মূল চালিকাশক্তি রাজনীতি; আর সেই রাজনীতিতেই যদি গুণ, জ্ঞান ও নৈতিকতার মূল্য না থাকে, তাহলে রাষ্ট্রের ভিত দুর্বল হয়ে পড়া অবশ্যম্ভাবী। সামনে জাতীয় নির্বাচন এই সময়ে দাঁড়িয়ে তাই রাজনীতির ভাষা, আচরণ ও মানসিকতা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।

রাজনীতি শব্দটির গভীরে তাকালে দেখা যায়, এটি কেবল ক্ষমতা অর্জনের কৌশল নয়; রাজনীতি মানে নীতি। ‘রাজার নীতি’—অর্থাৎ যাঁরা নেতৃত্ব দেবেন, তাঁদের চিন্তা, ভাষা ও সিদ্ধান্তে থাকতে হবে উদারতা, প্রজ্ঞা ও দায়িত্ববোধ। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় আমরা প্রায়ই দেখতে পাই, রাজনীতি নীতির জায়গা ছেড়ে ক্রমশ বাক্যবাণের লড়াইয়ে পরিণত হচ্ছে। যুক্তির বদলে কটু কথা, নীতির বদলে ব্যক্তিগত আক্রমণ, আর আদর্শের বদলে হেয় প্রতিপন্ন করার প্রতিযোগিতা যেন স্বাভাবিক চর্চা হয়ে উঠছে।

কথা বলা সবার পক্ষেই সম্ভব। কিন্তু রাজনীতি কখনোই ‘যা খুশি বলা’র জায়গা নয়। রাজনৈতিক বক্তব্যে থাকতে হয় সংযম, শালীনতা ও দায়িত্ববোধ। আদব-কায়দা ছাড়া কথা বলা ব্যক্তিত্বের পরিচয় দেয় না; বরং তা রাজনীতির মানকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। বিশেষ করে যারা দেশ পরিচালনার নেতৃত্ব দিতে চান, তাদের আচরণ ও ভাষা সাধারণ মানুষের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে। সেই দৃষ্টান্ত যদি অশালীন হয়, তাহলে তার প্রভাব পড়ে পুরো সমাজে।

গণতন্ত্রমুখী রাজনীতির অন্যতম শর্ত হলো ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা। গণতন্ত্র মানে একমত হওয়া নয়; গণতন্ত্র মানে ভিন্নমত থাকা সত্ত্বেও সহাবস্থান। কিন্তু প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে না দেখে যদি শত্রু হিসেবে দেখা হয়, তাহলে গণতন্ত্রের ভিত্তিই নড়বড়ে হয়ে যায়। প্রতিপক্ষকে হেয় করে কথা বলা, ব্যঙ্গ-বিদ্রূপে আক্রমণ করা বা ব্যক্তিগতভাবে অপমান করা শেষ পর্যন্ত রাজনীতিকেই হাস্যকর করে তোলে—এতে রাষ্ট্র, সমাজ বা জনগণের কোনো কল্যাণ হয় না।

রাজনীতিতে দেশপ্রেম একটি বড় শব্দ, কিন্তু তার অর্থ কেবল স্লোগানে সীমাবদ্ধ নয়। দেশপ্রেম মানে মানুষের মর্যাদা রক্ষা, সাম্যতা নিশ্চিত করা এবং জ্ঞানী ও গুণী মানুষদের সম্মান দেওয়া। যে রাজনীতি জ্ঞানকে অবজ্ঞা করে, গুণীজনকে কোণঠাসা করে এবং ভিন্নমতকে দমন করে—সে রাজনীতি শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়তে পারে না। ইতিহাস বলে, রাষ্ট্র এগিয়েছে তখনই, যখন নেতৃত্বে ছিলেন প্রজ্ঞাবান, উদার ও দায়িত্বশীল মানুষ।

রাজনীতি যারা করবেন, যারা দেশ পরিচালনার নেতৃত্বে আসবেন তাদের সবচেয়ে বড় গুণ হওয়া উচিত উদারতা। উদারতা মানে শুধু ক্ষমা নয়; উদারতা মানে ভিন্ন মত শোনা, সমালোচনা গ্রহণ করা এবং প্রয়োজন হলে নিজ অবস্থান সংশোধনের সাহস রাখা। অহংকার ও সংকীর্ণতা দিয়ে হয়তো সাময়িক ক্ষমতা ধরে রাখা যায়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা রাজনীতি ও রাষ্ট্র দুটোকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে।

ব্যক্তির ব্যবহারই তার ব্যক্তিত্বের পরিচয় বহন করে এ কথা সমাজে বহুল প্রচলিত। রাজনীতির ক্ষেত্রে এটি আরও বেশি সত্য। একজন রাজনীতিবিদের আচরণ, ভাষা ও সংযম তার পরিবার, সমাজ এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতিফলন হয়ে ওঠে। তাই রাজনীতিতে শালীন আচরণ ব্যক্তিগত বিষয় নয়; এটি জাতীয় সংস্কৃতির অংশ।

সামনে জাতীয় নির্বাচন। এই নির্বাচন কেবল সরকার পরিবর্তনের প্রশ্ন নয়; এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি কোন পথে যাবে তারও একটি বড় পরীক্ষা। ভোটাররা এখন আর শুধু উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি শুনে সিদ্ধান্ত নেন না; তারা দেখতে চান নেতৃত্বের ভাষা, মানসিকতা ও নৈতিক অবস্থান। কে কতটা সংযত, কে কতটা সহনশীল, কে কতটা রাষ্ট্রনায়কসুলভ এই প্রশ্নগুলোই আগামী দিনের রাজনীতিকে সংজ্ঞায়িত করবে।

সময় এসেছে রাজনীতিকে আবার মূল্যবোধের জায়গায় ফিরিয়ে আনার। গুণীজনকে সম্মান করা, ভিন্নমতকে শ্রদ্ধা করা, শালীন ভাষায় কথা বলা এবং দায়িত্বশীল আচরণ এই গুণগুলোই পারে রাজনীতিকে জনকল্যাণমুখী করতে। অন্যথায় রাজনীতি মানুষের আস্থা হারাবে, আর সেই আস্থাহীনতার সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা বহন করতে হবে রাষ্ট্রকেই।

লেখক: জাহাঙ্গীর আলম,সাংবাদিক ও কলামিস্ট

ডিএস