প্রকাশ্য রাস্তায় সংঘটিত নৃশংস সহিংস অপরাধের বিরুদ্ধে বিচার বিভাগের কঠোর অবস্থান আরও একবার স্পষ্ট হলো।বহুল আলোচিত গণপিটুনির মামলায় আদালতের রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন আইন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, এই রায় সমাজে অপরাধ দমনে একটি শক্ত বার্তা দেবে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
মঙ্গলবার(২৭ জানুয়ারী) দুপুরে রংপুরের সিনিয়র দায়রা জজ আদালতের বিচারক ফজলে খোদা মো. নাজির এই রায় ঘোষণা করেন।আদালতে রায় ঘোষণার সময় উপস্থিত ছিলেন নিহতের স্বজনরা।রায় শুনে তারা সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং বলেন,“দীর্ঘ সময় লেগেছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমরা ন্যায়বিচার পেয়েছি।তবে মামলা ও বিচার কাজ চলার সময় হত্যা মামলার আসামীরা আদালতে উপস্থিত ছিলেন।পরে আসামীদের কঠোর নিরাপত্তায় কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন-মো. শিমুল মিয়া (পিতা: মো. শুকুর আলী), মো. রাকিব মিয়া (পিতা: মো. বাবুল মিয়া), মো. শফিকুল ইসলাম (পিতা: মো. হেলাল মিয়া) এবং মো. হোসেন মিয়া (পিতা: মো. সুমন মিয়া)। তারা সবাই রংপুর জেলার মিঠাপুকুর থানার বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা।
মামলার বিবরণে জানা যায়, ২০২৪ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি রাতে মিঠাপুকুর থানাধীন কুটিপাড়া গ্রামসংলগ্ন একটি কাঁচা রাস্তায় এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। পূর্ব শত্রুতার জেরে আসামিরা ভুক্তভোগী মো. মামুন মিয়ার পিতা রশিদ মিয়াকে দেশীয় অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি মারধর করেন। একপর্যায়ে তাকে রাস্তায় ফেলে নির্মমভাবে পিটিয়ে গুরুতর আহত করা হয়। এ সময় তার কাছ থেকে নগদ ১ হাজার ৬৫০ টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগও উঠে।
স্থানীয়রা গুরুতর আহত অবস্থায় রশিদ মিয়াকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।ঘটনার পর নিহতের ছেলে মো. মামুন মিয়া বাদী হয়ে মিঠাপুকুর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার তদন্তে পুলিশ ঘটনার সত্যতা পায় এবং চার জনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করে।
রাষ্ট্রপক্ষ মামলাটি প্রমাণে আদালতে ১৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য উপস্থাপন করে। সাক্ষ্য-প্রমাণ, জেরা এবং উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলে মত দেন।
রাষ্ট্রপক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেন বিজ্ঞ পিপি অ্যাডভোকেট মো. আকতার উদ্দিন। অপরদিকে আসামিপক্ষে পৃথকভাবে দাঁড়ান অ্যাডভোকেট মো. আব্দুর রশিদ চৌধুরী, অ্যাডভোকেট শাহীন আলম খন্দকার, অ্যাডভোকেট মো. আবু সাঈদ সুমন এবং অ্যাডভোকেট মো. আফিকুর রহমান আরিফ। সার্বিকভাবে মামলাটি পরিচালনায় যুক্ত ছিলেন অ্যাডভোকেট মো. কামরুল হাসান সুকুন।
আইন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই রায় সমাজে অপরাধ দমনে একটি শক্ত বার্তা দেবে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে প্রকাশ্য রাস্তায় সংঘটিত সহিংস অপরাধের বিরুদ্ধে বিচার বিভাগের কঠোর অবস্থান আবারও স্পষ্ট হলো।
মামলাটির পক্ষে আইনগত লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন অ্যাডভোকেট মো. আবু সাঈদ সুমন এবং অ্যাডভোকেট মো. আফিকুর রহমান আরিফ।মামলাটি পরিচালনায় করেন অ্যাডভোকেট মো. কামরুল হাসান সুকুন। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আদালতের এই রায়কে তারা ন্যায়বিচারের একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন।
রায় ঘোষণার পর অ্যাডভোকেট মো. আবু সাঈদ সুমন বলেন,এই রায় প্রমাণ করে-আইন নিজের গতিতেই চলে এবং শেষ পর্যন্ত সত্য ও ন্যায়ের জয় হয়।প্রকাশ্য রাস্তায় কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারে না-এই বার্তাই আজ আদালত স্পষ্টভাবে দিয়েছে।”
অ্যাডভোকেট মো. আফিকুর রহমান আরিফ বলেন,গণপিটুনি বা সংঘবদ্ধ সহিংসতা কোনো ভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিচার বিভাগ যে এ ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে শূন্য সহনশীল অবস্থান নিয়েছে, এই রায় তারই প্রতিফলন। এটি ভবিষ্যতে এমন অপরাধ রোধে বড় ভূমিকা রাখবে।”\
অ্যাডভোকেট মো. কামরুল হাসান সুকুন বলেন,এই রায় শুধু একটি মামলার নিষ্পত্তি নয়, এটি একটি সামাজিক বার্তা। মানুষকে বুঝতে হবে-অপরাধের বিচার আদালতেই হবে, রাস্তায় নয়। আইন হাতে তুলে নেওয়ার পরিণতি কী হতে পারে, এই রায় সেটিই দেখিয়ে দিল।”
আইন বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশে প্রকাশ্য সহিংসতা ও গণপিটুনির ঘটনা যেভাবে বেড়েছে,এই রায় সেখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকবে। বিশেষ করে জনসমক্ষে সংঘটিত অপরাধের ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের দৃঢ় অবস্থান সমাজে আইনের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়াবে।
রায় ঘোষণার পর নিহতের স্বজনরা আবেগঘন কণ্ঠে বলেন,“এই রায় আমাদের হারানো মানুষকে ফিরিয়ে দেবে না। তবে আমরা বিশ্বাস করি, ভবিষ্যতে যেন আর কোনো পরিবার এভাবে প্রিয়জন হারাতে না হয়-সে ক্ষেত্রে এটি একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।”
স্থানীয় সচেতন মহলও এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছে। তাদের মতে, আইনের শাসন তখনই কার্যকর হয়, যখন অপরাধী যেই হোক না কেন-তার বিরুদ্ধে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়।
এই রায় শুধু একটি মামলার নিষ্পত্তি নয়; বরং সমাজে সহিংসতার বিরুদ্ধে একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা। আইন হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা রোধ এবং আইনের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এমন রায় ভবিষ্যতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ডিএস./




















