‘শয়তানের নিঃশ্বাস’ নামে পরিচিত এক ধরনের রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করে বয়স্ক নারীদের সম্মোহিত করে স্বর্ণালংকার ও নগদ অর্থ হাতিয়ে নেওয়া আন্তঃজেলা প্রতারক চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেফতার করেছে নওগাঁ জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। দীর্ঘ তদন্ত, তথ্যপ্রযুক্তির বিশ্লেষণ এবং আন্তঃজেলা অভিযানের মাধ্যমে টাঙ্গাইল থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয়।
রোববার (২১ জুন) দুপুরে নওগাঁ পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম।
গ্রেফতারকৃতরা হলেন আবু হাসান, বাবু ও সবুজ। তাদের সবার বাড়ি নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ থানার চনপাড়া এলাকায়।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত কয়েক মাসে নওগাঁ জেলার বিভিন্ন এলাকায় বয়স্ক নারীদের টার্গেট করে অভিনব কৌশলে প্রতারণার একাধিক ঘটনা ঘটে। অপরাধীরা কথিত ‘শয়তানের নিঃশ্বাস’ নামে পরিচিত স্কোপোলামিন (Scopolamine) নামের একটি রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করে ভুক্তভোগীদের সাময়িকভাবে বিভ্রান্ত বা সম্মোহিত অবস্থায় নিয়ে যেত।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, রাসায়নিকটি কোনোভাবে নাকে বা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করলে আক্রান্ত ব্যক্তি সাময়িকভাবে স্মৃতিভ্রংশে ভুগতে পারেন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। তখন তারা অপরাধীদের কথামতো আচরণ করতে শুরু করেন। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা নিজেরাই কানের দুল, স্বর্ণালংকার, নগদ অর্থ, এমনকি বাসার আলমারি খুলে মূল্যবান সামগ্রী প্রতারকদের হাতে তুলে দিয়েছেন।
এ ধরনের প্রতারণার ঘটনায় নওগাঁ সদর থানায় তিনটি মামলা দায়ের হয়। মামলাগুলোর তদন্তে জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) একাধিকবার নারায়ণগঞ্জে অভিযান চালায়।
তদন্তের একপর্যায়ে তথ্যপ্রযুক্তির বিশ্লেষণ, মোবাইল ফোনের কল ডিটেইলস, লোকেশন ট্র্যাকিং এবং অন্যান্য তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ জানতে পারে, চক্রটির সদস্যরা টাঙ্গাইল জেলায় একই ধরনের আরেকটি অপরাধ সংঘটনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। পরে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলামের নির্দেশনায় ডিবির একটি দল টাঙ্গাইলের পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অভিযান চালিয়ে চক্রটির তিন সদস্যকে গ্রেফতার করে।
গ্রেফতারকৃতদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ থানার চনপাড়া এলাকাকে কেন্দ্র করে এ চক্রের ৮ থেকে ১০টি সক্রিয় গ্রুপ রয়েছে। এসব গ্রুপ দেশের বিভিন্ন জেলায় ঘুরে ঘুরে একই কৌশলে মানুষের কাছ থেকে স্বর্ণালংকার ও নগদ অর্থ হাতিয়ে নেয়। পুলিশের ধারণা, চক্রটি ইতোমধ্যে নওগাঁ, নারায়ণগঞ্জ, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় অন্তত ১০টির বেশি অপরাধ সংঘটিত করেছে।
প্রেস ব্রিফিংয়ে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, “এই চক্রটি পরিকল্পিতভাবে বয়স্ক নারীদের টার্গেট করে। প্রথমে একজন সদস্য বিপদগ্রস্ত বা অসহায় ব্যক্তির অভিনয় করে ভুক্তভোগীর কাছে সাহায্য চান। পরে আরেকজন এসে কথোপকথনে জড়িয়ে ফেলে। এরপর তৃতীয় ব্যক্তি এসে কথিত ‘শয়তানের নিঃশ্বাস’ বা রাসায়নিক স্প্রে প্রয়োগ করে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ভুক্তভোগী সম্মোহিত অবস্থায় চলে যান এবং অপরাধীদের কথামতো নিজের স্বর্ণালংকার ও টাকা-পয়সা তাদের হাতে তুলে দেন।”
তিনি আরও বলেন, “এটি একটি সংঘবদ্ধ আন্তঃজেলা প্রতারক চক্র। নওগাঁ জেলা পুলিশ এ ধরনের অপরাধ দমনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। চক্রের অন্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”
পুলিশ বিশেষ করে বয়স্ক নারী ও তাদের স্বজনদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে। অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে নির্জন স্থানে কথা বলা, কারও দেওয়া কোনো বস্তু শোঁকা বা মুখের কাছে নেওয়া এবং অচেনা ব্যক্তির কথায় বিভ্রান্ত না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে পুলিশ।
জেলা পুলিশের মতে, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং দ্রুত তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যমে এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধ সম্ভব। সংঘবদ্ধ এই প্রতারক চক্রের অন্য সদস্যদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
ডিএস.,.



















