তিস্তা নদীর পানি কমতে শুরু করলেও দুর্ভোগ কাটেনি নদীতীরবর্তী মানুষের। পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে গঙ্গাচড়া ও কাউনিয়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় শুরু হয়েছে তীব্র নদীভাঙন। ঝুঁকিতে পড়েছে দ্বিতীয় তিস্তা সড়ক সেতুর রক্ষা বাঁধ,রংপুর-কাকিনা আঞ্চলিক সড়ক এবং হাজারো মানুষের বসতভিটা।
একই সঙ্গে কয়েক হাজার পরিবার এখনো পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে।বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র আগামী কয়েক দিনে আবারও ভারী বৃষ্টিপাত ও তিস্তার পানি বৃদ্ধির আশঙ্কা প্রকাশ করায় নতুন করে উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়েছে তিস্তাপাড়ে।
রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে,মঙ্গলবার (৩০ জুন)দুপুরে ডালিয়া ব্যারাজ পয়েন্টে তিস্তার পানিপ্রবাহ রেকর্ড করা হয়েছে ৫১ দশমিক ৮৫ মিটার, যা বিপৎসীমার ৩০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।গত ১২ ঘণ্টায় সেখানে পানি ১৩ সেন্টিমিটার কমেছে।
একই সময়ে কাউনিয়া তিস্তা সেতু পয়েন্টেও পানি বিপৎসীমার ২৩ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়। তবে পানি কমলেও উজানে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে আগামী তিন দিনে আবারও নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে বলে আশঙ্কা করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
হঠাৎ পানি বৃদ্ধি ও তীব্র স্রোতে গঙ্গাচড়া উপজেলার মহিপুর এলাকায় দ্বিতীয় তিস্তা সড়ক সেতু রক্ষা বাঁধ এবং ডানতীর সংরক্ষণে নির্মিত গ্রোয়েন এলাকায় ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে।
কোলকোন্দ ও লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে অন্তত চার হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। চরাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং পাট, চিনাবাদাম ও আমনের বীজতলা তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকরা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
উপজেলার কোলকোন্দ,আলমবিদিতর,নোহালী, সদর,লক্ষ্মীটারী ও মর্ণেয়া ইউনিয়নের ২০টিরও বেশি গ্রামের শত শত বাড়িঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গ্রামীণ সড়ক ও কৃষিজমি এখনো পানির নিচে রয়েছে।বিশুদ্ধ পানির সংকট,গবাদিপশুর খাদ্যাভাব এবং খাদ্যসংকটে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন চরাঞ্চলের মানুষ।চর শংকরদহ গ্রামের কৃষক আব্দুল সাত্তার বলেন,“রাতারাতি পানি বাড়ায় ঘরবাড়ি ডুবে যায়। এখন পানি কিছুটা কমলেও নদীভাঙনের ভয় আরও বেড়েছে।”
আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নেওয়া ফাতেমা বেগম বলেন, “শিশু ও গবাদিপশু নিয়ে খুব কষ্টে আছি। এখনো কোনো ত্রাণ সহায়তা পাইনি।”
কৃষক আমির উদ্দিন বলেন,“দেড় একর জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। গবাদিপশুর খাবার নেই, আমনের বীজতলাও নষ্ট হওয়ার পথে।”
কাউনিয়া উপজেলার পাঞ্চরভাঙ্গা গ্রামের সাদেক আলী জানান, “কয়েকদিন ধরেই পানি ওঠানামা করছে। আবার পানি বাড়লে পরিবার ও গবাদিপশু নিয়ে উঁচু জায়গায় আশ্রয় নিতে হবে।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত বছরের ভাঙনের পর স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ না করে প্রায় ১৪ লাখ টাকা ব্যয়ে অস্থায়ী বাঁশের পাইলিং নির্মাণ করা হয়। কিন্তু চলতি বর্ষার প্রথম দফার পানির চাপে সেটি ধসে পড়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় ১৫০ মিটার এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।এতে দ্বিতীয় তিস্তা সড়ক সেতু, রংপুর-কাকিনা আঞ্চলিক সড়ক এবং আশপাশের বিস্তীর্ণ জনপদ হুমকির মুখে পড়েছে।
বর্ষার শুরুতেই দ্বিতীয় তিস্তা সড়কের সংযোগ সড়কের বিভিন্ন অংশে ধস, বড় বড় গর্ত ও ফাটল সৃষ্টি হয়েছে। এতে প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন যাত্রী ও যানবাহনের চালকরা।
স্থানীয় বাসিন্দা জহিরুল ইসলাম বলেন,“কয়েকদিনের বৃষ্টির পর রাস্তার বিভিন্ন জায়গা দেবে গেছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।”
পথচারী রজমান আলী বলেন,“সড়কের অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছে। আরও বৃষ্টি হলে চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।”
উপজেলা প্রকৌশলী শাহ মো. ওবায়দুর রহমান বলেন, “ধসের বিষয়টি পরিদর্শনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত অংশ দ্রুত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
অন্যদিকে বড়াইবাড়ি খেয়াঘাট থেকে বাগডোহরা পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ স্বেচ্ছাশ্রমে নির্মিত মাটির বাঁধেও ভাঙন শুরু হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, তিন বছর আগে সরকারি সহায়তা না পেয়ে নিজেরাই চাঁদা তুলে ও শ্রম দিয়ে বাঁধটি নির্মাণ করেছিলেন।
এই বাঁধ প্রায় ১২ হাজার পরিবারের বসতভিটা রক্ষা করে আসছে। তবে এবার উজানের ঢল ও পানির চাপের মুখে বাঁধটি হুমকির মুখে পড়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড ইতোমধ্যে ভাঙনরোধে ২০০টি জিও ব্যাগ ফেলেছে।
লক্ষ্মীটারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল হাদী বলেন, “সময়মতো জিও ব্যাগ ফেলা হলে পরিস্থিতি এত ভয়াবহ হতো না। গত বছর থেকেই বরাদ্দের কথা শুনছি, কিন্তু কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বাঁশের পাইলিংও প্রথম পানির চাপেই ভেঙে গেছে।”
কাউনিয়া উপজেলার বালাপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আনছার আলী বলেন, “পানি আবার বাড়লে নদীতীরবর্তী গ্রামগুলোতে বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। পানি কমলেই শুরু হবে ভয়াবহ নদীভাঙন।”
টেপামধুপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রাশেদুল ইসলাম বলেন, “রাতের বেলায় পানি বাড়লে নদীপাড়ের মানুষের দুর্ভোগ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। আবাদি জমিরও ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।”
উপজেলা ত্রাণ ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সজিবুল করীম জানান, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে এবং দ্রুত ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হবে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রুবেল হুসেন বলেন, “প্রাথমিক হিসাবে প্রায় ২০ হেক্টর আমন, ১ হেক্টর মাসকলাই, ২ হেক্টর বীজবাদাম ও আধা হেক্টর সবজির জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত হিসাব করা হচ্ছে।”
গঙ্গাচড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জেসমিন আক্তার বলেন, “প্রশাসন সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে।”
কাউনিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পাপিয়া সুলতানা বলেন, “চরঢুষমারা এলাকায় পানি প্রবেশ ও নদীভাঙনের খবর পাওয়া গেছে।জনপ্রতিনিধিদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে এবং বন্যা মোকাবিলায় সরকারি প্রস্তুতি রয়েছে।”
রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম বলেন, “রংপুর বিভাগ ও উজানে ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে।আগামী তিন দিন তিস্তার পানি আবারও বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের প্রয়োজনীয় সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।”
তিস্তাপাড়ের মানুষের দাবি,শুধু ত্রাণ বিতরণ নয়, নদীভাঙন রোধে দীর্ঘমেয়াদি টেকসই প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।না হলে প্রতি বর্ষায় একই দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি ঘটবে।
ডিএস./



















