রাজধানীর তুরাগ থেকে আশুলিয়া বাজার ৩.৭১ কিলোমিটার সার্ভিস লেন উন্মুক্ত। পুরো প্রকল্প শেষ হলে কমবে ঢাকা-আশুলিয়া করিডোরের যানজট, গতি বাড়বে শিল্প ও পণ্য পরিবহনে।
রাজধানীর সঙ্গে সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের যোগাযোগে নতুন গতি আনতে নির্মাণাধীন ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ৩ দশমিক ৭১ কিলোমিটার সার্ভিস লেন যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। তুরাগ নদী থেকে আশুলিয়া বাজার পর্যন্ত এই সড়ক উন্মুক্ত হওয়ায় দীর্ঘদিনের যানজটকবলিত এই করিডোরে সরাসরি যোগাযোগের নতুন সুযোগ তৈরি হলো। বুধবার সকালে ধউর ব্রেীজের উপরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম আনুষ্ঠানিকভাবে সড়কটি উন্মুক্ত করেন।
অনুষ্ঠানে ঢাকা-১৮ আসনের সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন, ঢাকা-১৯ আসনের সংসদ সদস্য দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বাবু, সেতু বিভাগের সচিব ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এবং প্রকল্পের ইপিসি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশনের (ঈগঈ) প্রেসিডেন্ট মি. চি উয়ে উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, পুরো এক্সপ্রেসওয়ে চালু হলে ঢাকার সঙ্গে সাভার, আশুলিয়া, বাইপাইল, নবীনগর ও ঢাকা ইপিজেডের যোগাযোগব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসবে। বিশেষ করে পোশাকশিল্পসহ শিল্পকারখানার কাঁচামাল ও উৎপাদিত পণ্য পরিবহন এবং প্রতিদিনের শ্রমিক-কর্মচারীদের যাতায়াতে সময় ও ব্যয় কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
শিল্পাঞ্চলের যানজটই বড় চ্যালেঞ্জ
সাভার-আশুলিয়া দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল। প্রতিদিন হাজার হাজার যানবাহন ও বিপুলসংখ্যক মানুষ এই পথে চলাচল করেন। দীর্ঘদিনের যানজটে পণ্য পরিবহনের সময় বাড়ার পাশাপাশি শিল্পকারখানার উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমেও এর প্রভাব পড়ছে।
ঢাকা-১৯ আসনের সংসদ সদস্য দেওয়ান সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, আশুলিয়ার মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল যানজটের স্থায়ী সমাধান। এক্সপ্রেসওয়ে পুরোপুরি চালু হলে ইপিজেডকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আসবে। বিদেশি ক্রেতা ও ব্যবসায়ীদের যানজটে সময় নষ্ট হওয়ার সমস্যাও কমবে। ঢাকা-১৮ আসনের সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, এক্সপ্রেসওয়ে চালু হলে দূরপাল্লার যানবাহন ঢাকার ভেতরের সড়কে চাপ না বাড়িয়ে দ্রæতগতিতে চলাচল করতে পারবে। এতে রাজধানীর যানজট কমার পাশাপাশি বিমানবন্দরমুখী যাতায়াতও সহজ হবে।
২৪ কিলোমিটার উড়ালসড়ক ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২৪ কিলোমিটার এলিভেটেড সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে। এর সঙ্গে থাকছে ১০ দশমিক ৪৮ কিলোমিটার র্যাম্প, ১৬ দশমিক ৫৮ কিলোমিটার এট-গ্রেড সড়ক, ৪ দশমিক ০৫ কিলোমিটার বাইপাইল ট্রাম্পেট ইন্টারচেঞ্জ এবং দুটি সেতু। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক ও আশুলিয়া-সাভার এলাকার বিদ্যমান সড়কের ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি রাজধানীর সঙ্গে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগ আরও দ্রæত করার সুযোগ তৈরি হবে। ভবিষ্যতে বিমানবন্দরমুখী যানবাহনের জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ করিডোর হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে মেট্রোরেল এমআরটি লাইন-১-এর স্টেশনগুলোর সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
ব্যয় ২৭ হাজার কোটি টাকা সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ও চীন সরকারের যৌথ অর্থায়নে জিটুজি ভিত্তিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। দ্বিতীয় সংশোধিত ডিপিপি অনুযায়ী প্রকল্পের ব্যয় ২৭ হাজার ৪৫ দশমিক ৬৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকার দিচ্ছে ১৩ হাজার ৮০৩ দশমিক ১৬ কোটি টাকা এবং চায়না এক্সিম ব্যাংক দিচ্ছে ১৩ হাজার ২৪২ দশমিক ৫২ কোটি টাকা। চীনের ঈগঈ চুক্তিভিত্তিক ঊচঈ পদ্ধতিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পের মেয়াদ ২০১৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে ২০৩০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত। জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি ৬৬ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ৫৬ দশমিক ০২ শতাংশ।
অর্থনীতিতে প্রভাবের প্রত্যাশা
প্রকল্পের নথিতে বলা হয়েছে, ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে চালু হলে শিল্পাঞ্চলের পরিবহনব্যবস্থায় গতি আসবে। কাঁচামাল ও পণ্য পরিবহনে সময় কমার পাশাপাশি শ্রমিকদের যাতায়াত সহজ হবে। প্রকল্পটি দেশের জিডিপিতে প্রায় শূন্য দশমিক ২১৪ শতাংশ পর্যন্ত অবদান রাখতে পারে বলেও নথিতে উল্লেখ রয়েছে। অনুষ্ঠানে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, সরকারের লক্ষ্য জনভোগান্তি কমানো এবং দেশের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে গতি আনা। আশুলিয়া রুটটি ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক্সপ্রেসওয়ে ও সার্ভিস লেন পুরোপুরি চালু হলে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে নতুন গতি আসবে। তিনি নির্মাণ কাজের গুণগত মান বজায় রেখে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ সম্পূর্ণ করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, প্রকৌশলী ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশ দেন।
ঈগঈ-এর প্রেসিডেন্ট মি. চি উয়ে বলেন, ৩ দশমিক ৭১ কিলোমিটার সার্ভিস লেন উন্মুক্ত করা প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী পুরো প্রকল্পের কাজ শেষ করার প্রত্যাশা রয়েছে তাদের। তবে প্রকল্পের পূর্ণ সুফল পেতে এখন অপেক্ষা করতে হবে পুরো এক্সপ্রেসওয়ে চালু হওয়া পর্যন্ত। কারণ, তুরাগ থেকে আশুলিয়া বাজার পর্যন্ত নতুন সড়কটি একটি অংশের যান চলাচল সহজ করলেও সাভার-আশুলিয়ার দীর্ঘদিনের যানজটের স্থায়ী সমাধান নির্ভর করছে পুরো প্রকল্পের সময়মতো ও কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর।
ডিএস./




















