কাটেনি বানভাসি মানুষের বিপদ। দেশের ১৪টি নদীর ২২ পয়েন্টে চলছে এই ভয়াবহ বন্যা। সিলেটের কানাইঘাটে শুরু হওয়া বন্যা এখন ব্রহ্মপুত্র অঞ্চল ছাড়িয়ে পদ্মা-যমুনা নদী অঞ্চল ছাড়িয়েছে। ফরিদপুর, রাজবাড়ী, মানিকগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত এসব অঞ্চলে বিভিন্ন নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে দেখা গেছে ।
তবে বগুড়া, জামালপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, নেত্রকোনা, সিলেটে ও সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। শুক্রবার বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র কর্মকর্তা সরদার উদয় রায়হান বলেন, উত্তরাঞ্চলের বন্যা এত দ্রুতই উন্নতি হবে না। যমুনা আর ব্রহ্মপুত্র কিছুটা শান্ত হলেও পদ্মা নদী শান্ত হতে আরও প্রায় দশদিন সময় লাগবে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় যমুনা নদীর পানি সমতলে হ্রাস পেতে পারে। সমতল হ্রাস অব্যাহত থাকতে পারে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি। এদিকে আগামী ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত সমতলে বৃদ্ধি অব্যাহত থাকতে পারে গঙ্গা-পদ্মা নদীর পানি । আগামী ২৪ ঘণ্টা পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ, জামালপুর এবং পদ্মা নদীর সুরেশ্বর পয়েন্টে বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই সময়ের মধ্যে টাঙ্গাইল এবং সিরাজগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকতে পারে।
সারাদেশের বন্যার ঘটনায় যমুনা নদীর পানি জামালপুরের বাহাদুরাবাদ ও গাইবান্ধার ফুলছড়ি এবং তিস্তা নদীর পানি ডালিয়া পয়েন্টে গত ৫০ বছরের সব রেকর্ড ভেঙে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত যমুনার পানি বাহাদুরাবাদ পয়েন্টে ১৫৮, ফুলছড়িতে ১৪৭, সারিয়াকান্দিতে ১২৬, কাজিপুরে ১২১ ও সিরাজগঞ্জে ৯৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। প্রতিনিধিদের পাঠানো বন্যার আরও খবর :ব্রহ্মপুত্র পাড়ের কৃষক রহিম মুন্সী বলেন,কদিন আগে ধানের দামে ভুগেছি, এখন পানিতে মরছি। ঘরে ঘরে পানি, পানিতে ডুবে গেছে পুরো কুড়িগ্রাম। ৮০ ভাগ নলকূপ পানির তলায় । কুড়িগ্রামের স্কুল শিক্ষিকা নওবুন্নেসা বলেন, ব্রহ্মপুত্রের পেট এত বড় হৈলে কী হৈবে, বালু ভরা পেটে কি পানি ধরে?’ ডিমলার তরুণ কৃষক সেলিম রানা ফেসবুকে লিখেছেন, ‘তিস্তায় সারা বছর পানি নাই, বান আইলেই তিস্তা ভাসায় আর ভাঙ্গে। অষ্টমীর চরের ফ্লেক্সি লোড ব্যবসায়ী মনজুর মিয়া (৪৫), চর শাখাহাতীর মিলন (৩৫), মেহেদী (৪০), খোর্দ বাঁশপাতা চরের কৃষক বাদশা মিয়া (৪৫), সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, চরের চেয়ারম্যান ও শিক্ষিত লোকেরা সবাই কাইম (উঁচু) এলাকায় থাকে। এদিকে চরের বাজেট ভূতে খায়।
বান আসে বান যায়, যেমন চর তেমনই থাকে। চিলমারী, রৌমারী, রাজীবপুর উপজেলায় চলছে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় । ২১ কি:মি: বাঁধের রাস্তার যেটুকু জেগে আছে, তাতে তিল ধারণের জায়গা নাই। রিকশা, ভ্যান, দোকানপাট, ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে গেছে। মোমবাতি-চিড়া-গুড় কেনার মতো দোকানও বন্ধ হয়েছে। রাস্তাঘাটও ভেঙে তলিয়ে গেছে, বন্ধ রেল চলাচল। ত্রাণ কার্যক্রম চালানোও কঠিন। ফলে যারা দিন আনে দিন খায়, তারা মহাসংকটে। ৭৭ ভাগ গরীব মানুষের অনাহারে মৃত্যুর ঝুঁকিতে। জলোচ্ছ্বাসে আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নিলেই বিপদ কেটে যায়, কিন্তু ১৫ দিন ঘরের চাল পর্যন্ত পানি থাকলে কেয়ামত নামবে। উলিপুর উপজেলার বুড়াবুড়ি ইউনিয়ন পরিষদের সচিব মো. কাওসার আলী জানান, ইউনিয়নের প্রায় ৯৫ ভাগ পরিবার পানিবন্দী। এরমধ্যে অনেকে বসত বাড়ি ত্যাগ না করলেও প্রায় ১০ হাজার পরিবার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বাঁধে আশ্রয় নিয়েছেন।
১৮ জুলাই পর্যন্ত কুড়িগ্রামে বন্যা দুর্গতদের জন্য ৫শ’ মেট্রিকটন চাল, ২ হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার এবং সাড়ে ১৩ লাখ টাকা জিআর ক্যাশ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সিরাজগঞ্জের বাঁধে আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুকনো খাবারের পাশাপাশি তাদের এখন জরুরি বিশুদ্ধ পানি ও শৌচাগারের পাশাপাশি গবাদি পশুর জন্যও খাদ্যের প্রয়োজন। গাইবান্ধায় ব্রহ্মপুত্র ও ঘাঘট নদীর পানি অব্যাহতভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। গাইবান্ধার জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, এবারের বন্যায় সুন্দরগঞ্জ, সাঘাটা, ফুলছড়ি ও গাইবান্ধা সদর উপজেলার ৩৪টি ইউনিয়নের ৪ লাক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২৯ হাজার ২৩০টি। এ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত বন্যা কবলিত এলাকায় জেলা ত্রাণ ভান্ডার থেকে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ১ হাজার মে. চাল ও ১০ লাখ টাকা এবং ১০ হাজার কার্টুন শুকনা খাবার। ওইসব সামগ্রী ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে বিতরণের কাজ চলছে। তবে ক্ষতির তুলনায় বরাদ্দ খুবই কম। এদিকে শুক্রবার গাইবান্ধার বন্যা কবলিত এলাকা পরিদর্শনে যান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রানমন্ত্রী ডা.এনামুর রহমান।তিনি বলেন, সরকারের ত্রাণ ভাণ্ডারে যথেষ্ট পরিমাণের ত্রাণ সামগ্রী মজুদ রয়েছে। কোনও বন্যার্ত মানুষ সরকারি ত্রাণ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হবে না।
পর্যায়ক্রমে বন্যার্ত এলাকার সব মানুষই ত্রাণ পাবে। গাইবান্ধার বানভাসী মানুষের জন্য ৫০০ বান্ডিল টিন, ১৫ লাখ টাকা, ২০০ মেট্রিক টন চাল ও শিশুখাদ্য, গো-খাদ্যের জন্য আরও ৫ লাখ টাকা, বিশুদ্ধ পানির ২ হাজার জেরিক্যান ও ৫০০ তাবু (ত্রিপল) বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া নতুন করে আরও চাল, নগদ টাকা বরাদ্দের প্রক্রিয়া চলছে।
এদিকে পদ্মায় উজানের পানির প্রবল স্রোতে পাটুরিয়া- দৌলতদিয়া নৌরুটে ফেরি চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। স্রোতের প্রতিকূলে চলতে গিয়ে বিকল হচ্ছে ফেরি। দেখা দিয়েছে ফেরি সংকট। পাটুরিয়া ঘাটে আটকে পড়েছে প্রতিদিন শত শত পণ্যবোঝাই ট্রাক ও বাস।


























