০৮:১৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

সিদ্ধান্ত ছাড়াই রোহিঙ্গা-মিয়ানমার সংলাপ শেষ

সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয়েছে মিয়ানমারের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের তৃতীয় দফার সংলাপ। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়ে তৃতীয়বারের মতো কথা বলতে বুধবার কক্সবাজারে এসেছেন মিয়ানমার ও আসিয়ান সংস্থার উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল। দুই দিনের সফরে আসা প্রতিনিধিদলটি ৪৭ সদস্যের রোহিঙ্গা প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলেন।

প্রতিনিধিদলের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের বুধবার এবং আজ বৃহস্পতিবার সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ সময় রোহিঙ্গাদের রাখাইনে ফিরে যেতে মিয়ানমারের প্রতিনিধিদল বার বার অনুরোধ করেন।

প্রতিনিধিদল রোহিঙ্গাদের বলেন, ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কার্ড (এনভিসি) নিয়ে স্বদেশে ফিরে যেতে। কিন্তু, রোহিঙ্গারা তা প্রত্যাখ্যান করে বলেন, পূর্ণ নাগরিকতাসহ নানা সুযোগ-সুবিধা দিলেই ফিরবেন, এর আগে নয়।

কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের এক্সটেনশন ৪ ক্যাম্পে রোহিঙ্গা কমিউনিটি নেতাদের সঙ্গে মিয়ানমার ও আসিয়ান প্রতিনিধিদলের সংলাপ হয়। সংলাপে অংশ নেন ৪১ জন রোহিঙ্গা কমিউনিটি নেতা ও ছয় জন নারী নেত্রী।

মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিক সংস্থা ও অর্থনীতিক বিভাগের পরিচালক চ্যান অ্যায়ের নেতৃত্বে নয় সদস্য বিশিষ্ট প্রতিনিধিদলে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্র, ত্রাণ ও পুনর্বাসন, শ্রম ও অভিবাসন এবং তথ্য মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা রয়েছেন। একইভাবে সাত সদস্যের আসিয়ান প্রতিনিধিদলে আসিয়ানভুক্ত রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা রয়েছেন।

বৈঠকে অংশ নেয়া রোহিঙ্গা কমিউনিটি নেতা মুহিব উল্লাহ জানান, ‘‘মিয়ানমারের প্রতিনিধিদল সেই পুরনো কথা বার বার বলছেন। ‘এনভিসি’ কার্ড নিয়ে আমরা কোনোভাবেই মিয়ানমারে ফিরব না। এ কথা বলার পরও দীর্ঘদিন পরে এসে সেই সেই কথা নতুন করে শুরু করছে মিয়ানমার। সংলাপে নতুনত্ব বলতে কিছুই নেই।’’

রোহিঙ্গা নেতা মাস্টার সিরাজ আহমদ বলেছেন, ‘‘এটি মিয়ানমারের নাটক। আন্তর্জাতিক আদালতে চলমান মামলা ভিন্নখাতে নিতে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলাকে কৌশল হিসেবে নিয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরানো ছাড়া আমি কিছুই দেখছি না।’’

আরেক রোহিঙ্গা নেতা ডা. জোবায়ের আহমদ বলেছেন, ‘‘বৈঠকে আমরা বার বার অনুরোধ করেছি, আমাদের মিয়ানমারের নাগরিকত্ব দেয়া হউক। কিন্তু, মিয়ানমারের প্রতিনিধিদলটি বিষয়টি এড়িয়ে যান। এতে করে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সুরাহা দেখছি না।’’

রোহিঙ্গা নারী নেত্রী জামালিদা বেগম বলেন, ‘‘রাখাইনে মুসলিম রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতনের বিষয়টি কিছুতেই বিশ্বাস করাতে পারছি না মিয়ানমারের প্রতিনিধিদলকে। তারা রাখাইনে সহিংস ঘটনা শুনতে রাজি নয়। তারা বলছেন- তোমরা (রোহিঙ্গারা) প্রথমে ‘এনভিসি’ কার্ড নাও, পরে পূর্ণ নাগরিকত্ব দেয়া হবে। কিন্তু, ‘এনভিসি’ কার্ডের মধ্যে নানা শর্ত জুড়ে দেয়া হচ্ছে।’’

কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসনের অতিরিক্ত সচিব শামসুদ্দোজা জানান, মিয়ানমারের নয় সদস্যের ও আসিয়ানের সাত সদস্যের প্রতিনিধিদল দুই দিনের সফরে কক্সবাজারে এসেছেন। প্রথম দিনে উখিয়ার কুতুপালং এক্সটেনশন-৪ ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে সংলাপ শেষ করেছেন। বৃহস্পতিবার সকালে একই স্থানে পুনরায় সংলাপ শুরুর হয়ে দুপুর ২টার দিকে শেষ হয়।

এর আগে চলতি বছরের ২৭ জুলাই মিয়ানমারের পররাষ্ট্র সচিব মিন্ট থোয়ের নেতৃত্বে ১৯ সদস্যের একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদল রোহিঙ্গা ক্যাম্প সফর করেন। এ সময় আসিয়ানের প্রতিনিধিদলটিও সঙ্গে ছিলেন। তারা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুতে রোহিঙ্গাদের যৌথ সংলাপে অংশ নেয়।

এছাড়া ২০১৮ সালের ১১ এপ্রিল মিয়ানমারের সমাজকল্যাণমন্ত্রী উইন মিয়াট আয়ের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলতে উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এসেছিলেন। রোহিঙ্গাদের সঙ্গে সংলাপ করতে দুই দিনের সফরে তৃতীয়বার মিয়ানমারের প্রতিনিধিদলটি কক্সবাজারে আসেন।

বৃহস্পতিবার বিকেলে প্রতিনিধিদলটি ঢাকার উদ্দেশ্যে কক্সবাজার ত্যাগ করেন।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইনে সহিংস ঘটনায় প্রাণভয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে ১১ লাখের অধিক রোহিঙ্গা। ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে বাংলাদেশ মিয়ানমার প্রত্যাবাসন চুক্তি স্বাক্ষর হয়।

বিজনেস বাংলাদেশ/এম মিজান

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

নওগাঁর নিয়ামতপুরে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ মামলায় তিন যুবক গ্রেপ্তার

সিদ্ধান্ত ছাড়াই রোহিঙ্গা-মিয়ানমার সংলাপ শেষ

প্রকাশিত : ০৬:২৪:১৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ ডিসেম্বর ২০১৯

সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয়েছে মিয়ানমারের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের তৃতীয় দফার সংলাপ। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়ে তৃতীয়বারের মতো কথা বলতে বুধবার কক্সবাজারে এসেছেন মিয়ানমার ও আসিয়ান সংস্থার উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল। দুই দিনের সফরে আসা প্রতিনিধিদলটি ৪৭ সদস্যের রোহিঙ্গা প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলেন।

প্রতিনিধিদলের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের বুধবার এবং আজ বৃহস্পতিবার সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ সময় রোহিঙ্গাদের রাখাইনে ফিরে যেতে মিয়ানমারের প্রতিনিধিদল বার বার অনুরোধ করেন।

প্রতিনিধিদল রোহিঙ্গাদের বলেন, ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কার্ড (এনভিসি) নিয়ে স্বদেশে ফিরে যেতে। কিন্তু, রোহিঙ্গারা তা প্রত্যাখ্যান করে বলেন, পূর্ণ নাগরিকতাসহ নানা সুযোগ-সুবিধা দিলেই ফিরবেন, এর আগে নয়।

কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের এক্সটেনশন ৪ ক্যাম্পে রোহিঙ্গা কমিউনিটি নেতাদের সঙ্গে মিয়ানমার ও আসিয়ান প্রতিনিধিদলের সংলাপ হয়। সংলাপে অংশ নেন ৪১ জন রোহিঙ্গা কমিউনিটি নেতা ও ছয় জন নারী নেত্রী।

মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিক সংস্থা ও অর্থনীতিক বিভাগের পরিচালক চ্যান অ্যায়ের নেতৃত্বে নয় সদস্য বিশিষ্ট প্রতিনিধিদলে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্র, ত্রাণ ও পুনর্বাসন, শ্রম ও অভিবাসন এবং তথ্য মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা রয়েছেন। একইভাবে সাত সদস্যের আসিয়ান প্রতিনিধিদলে আসিয়ানভুক্ত রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা রয়েছেন।

বৈঠকে অংশ নেয়া রোহিঙ্গা কমিউনিটি নেতা মুহিব উল্লাহ জানান, ‘‘মিয়ানমারের প্রতিনিধিদল সেই পুরনো কথা বার বার বলছেন। ‘এনভিসি’ কার্ড নিয়ে আমরা কোনোভাবেই মিয়ানমারে ফিরব না। এ কথা বলার পরও দীর্ঘদিন পরে এসে সেই সেই কথা নতুন করে শুরু করছে মিয়ানমার। সংলাপে নতুনত্ব বলতে কিছুই নেই।’’

রোহিঙ্গা নেতা মাস্টার সিরাজ আহমদ বলেছেন, ‘‘এটি মিয়ানমারের নাটক। আন্তর্জাতিক আদালতে চলমান মামলা ভিন্নখাতে নিতে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলাকে কৌশল হিসেবে নিয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরানো ছাড়া আমি কিছুই দেখছি না।’’

আরেক রোহিঙ্গা নেতা ডা. জোবায়ের আহমদ বলেছেন, ‘‘বৈঠকে আমরা বার বার অনুরোধ করেছি, আমাদের মিয়ানমারের নাগরিকত্ব দেয়া হউক। কিন্তু, মিয়ানমারের প্রতিনিধিদলটি বিষয়টি এড়িয়ে যান। এতে করে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সুরাহা দেখছি না।’’

রোহিঙ্গা নারী নেত্রী জামালিদা বেগম বলেন, ‘‘রাখাইনে মুসলিম রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতনের বিষয়টি কিছুতেই বিশ্বাস করাতে পারছি না মিয়ানমারের প্রতিনিধিদলকে। তারা রাখাইনে সহিংস ঘটনা শুনতে রাজি নয়। তারা বলছেন- তোমরা (রোহিঙ্গারা) প্রথমে ‘এনভিসি’ কার্ড নাও, পরে পূর্ণ নাগরিকত্ব দেয়া হবে। কিন্তু, ‘এনভিসি’ কার্ডের মধ্যে নানা শর্ত জুড়ে দেয়া হচ্ছে।’’

কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসনের অতিরিক্ত সচিব শামসুদ্দোজা জানান, মিয়ানমারের নয় সদস্যের ও আসিয়ানের সাত সদস্যের প্রতিনিধিদল দুই দিনের সফরে কক্সবাজারে এসেছেন। প্রথম দিনে উখিয়ার কুতুপালং এক্সটেনশন-৪ ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে সংলাপ শেষ করেছেন। বৃহস্পতিবার সকালে একই স্থানে পুনরায় সংলাপ শুরুর হয়ে দুপুর ২টার দিকে শেষ হয়।

এর আগে চলতি বছরের ২৭ জুলাই মিয়ানমারের পররাষ্ট্র সচিব মিন্ট থোয়ের নেতৃত্বে ১৯ সদস্যের একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদল রোহিঙ্গা ক্যাম্প সফর করেন। এ সময় আসিয়ানের প্রতিনিধিদলটিও সঙ্গে ছিলেন। তারা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুতে রোহিঙ্গাদের যৌথ সংলাপে অংশ নেয়।

এছাড়া ২০১৮ সালের ১১ এপ্রিল মিয়ানমারের সমাজকল্যাণমন্ত্রী উইন মিয়াট আয়ের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলতে উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এসেছিলেন। রোহিঙ্গাদের সঙ্গে সংলাপ করতে দুই দিনের সফরে তৃতীয়বার মিয়ানমারের প্রতিনিধিদলটি কক্সবাজারে আসেন।

বৃহস্পতিবার বিকেলে প্রতিনিধিদলটি ঢাকার উদ্দেশ্যে কক্সবাজার ত্যাগ করেন।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইনে সহিংস ঘটনায় প্রাণভয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে ১১ লাখের অধিক রোহিঙ্গা। ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে বাংলাদেশ মিয়ানমার প্রত্যাবাসন চুক্তি স্বাক্ষর হয়।

বিজনেস বাংলাদেশ/এম মিজান