০২:৫১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২৬

সারা শরীরে ছ্যাঁকা, চুলও কেটে দেন স্বামী

এক ছেলের মা নিলুফার (২৭)। নির্যাতনের আঘাতে ছটফট করছেন নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে। তার মুখ, চোখ, হাতসহ শরীরের বেশির ভাগ অংশেই খুন্তির ছ্যাঁকা। মাথার চুল কাটা। আর এ অবস্থার একমাত্র কারণ তার স্বামী।

স্বামী মোশারফ হোসেন ওরফে উজ্জ্বলের (৩৫) নির্মম নির্যাতনের কারণে বর্তমানে তিনি গুরুতর অসুস্থ। যৌতুক না পেয়ে তার স্বামী এমনটা করেছেন বলে অভিযোগ করেন নিলুফার। নোয়াখালী শহরের বছিরার দোকান এলাকায় এ ঘটনা ঘটেছে।

নিলুফার ও তার পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে প্রাণ বাঁচাতে রাতের অন্ধকারে নিলুফার বাবার বাড়িতে আশ্রয় নেন। কবিরহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয় তাকে। সেখান থেকে তাকে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করেন মোশারফ। ভয়ে তিনি হাসপাতাল ছেড়ে বাবার বাড়িতে চলে যান। অবস্থার অবনতি হলে ওই গৃহবধূকে গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের একাধিক নার্স নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘নিলুফার শরীরে অসংখ্য পোড়া দাগ আছে। মুখ, চোখ, হাত, পাসহ শরীরের এমন কোনো অঙ্গ নেই যেখানে তাকে ছ্যাঁকা দেওয়া হয়নি।’

এ ঘটনায় আজ মঙ্গলবার নোয়াখালীর সুধারাম থানা মামলা করেছেন নিলুফারের বাবা ইউছুফ আলী।

জামাতা মোশারফ হোসেনের বিচার দাবি করে ইউছুফ আলী বলেন, ‘পশু ছাড়া কোনো মানুষ এমন অমানুষিক নির্যাতন করতে পারে না। হাসপাতালের লোকজনও নিলুফারের শারীরিক অবস্থা দেখে আঁতকে উঠেছেন।’

নিলুফার ইয়াসমিনের বাবার বাড়ি নোয়াখালীর কবিরহাট উপজেলার বড় রামদেবপুর গ্রামে। নির্যাতনের শিকার ওই গৃহবধূ নিলুফার ইয়াছমিন জানান, প্রায় নয় বছর আগে বেগমগঞ্জ উপজেলার খানপুর গ্রামের মোশারফ হোসেনের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। তাদের সংসারে আট বছরের এক ছেলে আছে। ছেলেটি বাকপ্রতিবন্ধী। বিয়ের কয়েক বছর পর তার স্বামী বিদেশ যান। বিদেশে যাওয়ার সময় নোয়াখালী শহরের বছিরার দোকান এলাকায় তাকে একটি বাসা ভাড়া করে দেন। তিনি সেখানেই ছেলেকে নিয়ে থাকতেন। চার বছর থাকার পর মোশারফ প্রায় দেড় মাস আগে দেশে ফেরেন। এরপর বিভিন্ন অজুহাতে তার ওপর নির্যাতন শুরু করেন মোশারফ।

ওই গৃহবধূ অভিযোগ করেন, মোশারফ তাকে বাপের বাড়ি থেকে যৌতুক এনে দিতে চাপ দেন। বাধ্য হয়ে ৬ ডিসেম্বর তিনি বাবার কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা এনে দেন। ১৮ ডিসেম্বর আরও টাকা এনে দিতে বলেন মোশারফ। এ নিয়ে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে রাত নয়টার দিকে মোশারফ বাসার দরজা-জানালা বন্ধ করে ছেলেকে বেধে রাখেন। এর পর গরম খুন্তি দিয়ে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছ্যাঁকা দেন। মাথার চুলও কেটে দেন। ছেলের গলায় ছোরা ধরে তাকে চিৎকার দিতে দেওয়া হয়নি। রাত ১০টার দিকে তিনি বাসা থেকে কৌশলে ছেলেকে নিয়ে পালিয়ে কবিরহাটে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নেন। ২০ ডিসেম্বর বিকেলে তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। এ খবর পেয়ে মোশারফ পরের দিন শনিবার রাতে সন্ত্রাসী নিয়ে তাকে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে থেকে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করেন। পরে তিনি ভয়ে সেখান থেকে চলে যান।

এদিকে নির্যাতনের শিকার গৃহবধূ দেখতে আজ সোমবার হাসপাতালে যান নোয়াখালী জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দীপক জ্যোতি খীসা ও নোয়াখালী সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজী মো. আবদুর রহীম।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজী মো. আবদুর রহীম বলেন, ‘বিষয়টিকে তারা সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন। অভিযুক্ত স্বামী ও তার সহযোগীদের যত দ্রুত সম্ভব আইনের আওতায় আনা হবে।’

বিজনেস বাংলাদেশ/বিএইচ

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

সারা শরীরে ছ্যাঁকা, চুলও কেটে দেন স্বামী

প্রকাশিত : ০৯:৩৬:৩৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ ডিসেম্বর ২০১৯

এক ছেলের মা নিলুফার (২৭)। নির্যাতনের আঘাতে ছটফট করছেন নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে। তার মুখ, চোখ, হাতসহ শরীরের বেশির ভাগ অংশেই খুন্তির ছ্যাঁকা। মাথার চুল কাটা। আর এ অবস্থার একমাত্র কারণ তার স্বামী।

স্বামী মোশারফ হোসেন ওরফে উজ্জ্বলের (৩৫) নির্মম নির্যাতনের কারণে বর্তমানে তিনি গুরুতর অসুস্থ। যৌতুক না পেয়ে তার স্বামী এমনটা করেছেন বলে অভিযোগ করেন নিলুফার। নোয়াখালী শহরের বছিরার দোকান এলাকায় এ ঘটনা ঘটেছে।

নিলুফার ও তার পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে প্রাণ বাঁচাতে রাতের অন্ধকারে নিলুফার বাবার বাড়িতে আশ্রয় নেন। কবিরহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয় তাকে। সেখান থেকে তাকে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করেন মোশারফ। ভয়ে তিনি হাসপাতাল ছেড়ে বাবার বাড়িতে চলে যান। অবস্থার অবনতি হলে ওই গৃহবধূকে গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের একাধিক নার্স নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘নিলুফার শরীরে অসংখ্য পোড়া দাগ আছে। মুখ, চোখ, হাত, পাসহ শরীরের এমন কোনো অঙ্গ নেই যেখানে তাকে ছ্যাঁকা দেওয়া হয়নি।’

এ ঘটনায় আজ মঙ্গলবার নোয়াখালীর সুধারাম থানা মামলা করেছেন নিলুফারের বাবা ইউছুফ আলী।

জামাতা মোশারফ হোসেনের বিচার দাবি করে ইউছুফ আলী বলেন, ‘পশু ছাড়া কোনো মানুষ এমন অমানুষিক নির্যাতন করতে পারে না। হাসপাতালের লোকজনও নিলুফারের শারীরিক অবস্থা দেখে আঁতকে উঠেছেন।’

নিলুফার ইয়াসমিনের বাবার বাড়ি নোয়াখালীর কবিরহাট উপজেলার বড় রামদেবপুর গ্রামে। নির্যাতনের শিকার ওই গৃহবধূ নিলুফার ইয়াছমিন জানান, প্রায় নয় বছর আগে বেগমগঞ্জ উপজেলার খানপুর গ্রামের মোশারফ হোসেনের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। তাদের সংসারে আট বছরের এক ছেলে আছে। ছেলেটি বাকপ্রতিবন্ধী। বিয়ের কয়েক বছর পর তার স্বামী বিদেশ যান। বিদেশে যাওয়ার সময় নোয়াখালী শহরের বছিরার দোকান এলাকায় তাকে একটি বাসা ভাড়া করে দেন। তিনি সেখানেই ছেলেকে নিয়ে থাকতেন। চার বছর থাকার পর মোশারফ প্রায় দেড় মাস আগে দেশে ফেরেন। এরপর বিভিন্ন অজুহাতে তার ওপর নির্যাতন শুরু করেন মোশারফ।

ওই গৃহবধূ অভিযোগ করেন, মোশারফ তাকে বাপের বাড়ি থেকে যৌতুক এনে দিতে চাপ দেন। বাধ্য হয়ে ৬ ডিসেম্বর তিনি বাবার কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা এনে দেন। ১৮ ডিসেম্বর আরও টাকা এনে দিতে বলেন মোশারফ। এ নিয়ে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে রাত নয়টার দিকে মোশারফ বাসার দরজা-জানালা বন্ধ করে ছেলেকে বেধে রাখেন। এর পর গরম খুন্তি দিয়ে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছ্যাঁকা দেন। মাথার চুলও কেটে দেন। ছেলের গলায় ছোরা ধরে তাকে চিৎকার দিতে দেওয়া হয়নি। রাত ১০টার দিকে তিনি বাসা থেকে কৌশলে ছেলেকে নিয়ে পালিয়ে কবিরহাটে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নেন। ২০ ডিসেম্বর বিকেলে তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। এ খবর পেয়ে মোশারফ পরের দিন শনিবার রাতে সন্ত্রাসী নিয়ে তাকে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে থেকে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করেন। পরে তিনি ভয়ে সেখান থেকে চলে যান।

এদিকে নির্যাতনের শিকার গৃহবধূ দেখতে আজ সোমবার হাসপাতালে যান নোয়াখালী জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দীপক জ্যোতি খীসা ও নোয়াখালী সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজী মো. আবদুর রহীম।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজী মো. আবদুর রহীম বলেন, ‘বিষয়টিকে তারা সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন। অভিযুক্ত স্বামী ও তার সহযোগীদের যত দ্রুত সম্ভব আইনের আওতায় আনা হবে।’

বিজনেস বাংলাদেশ/বিএইচ