০৩:০২ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৮ মার্চ ২০২৬

হাসপাতালেই কেটে যায় দিন-রাত স্বাস্থ্য কর্মকর্তার

বর্ষার আকাশে আজ মেঘ নেই। মাথার উপরে চোখ জুড়ানো নীলাকাশ। হিম শীতল বাতাসের পরশে অন্যরকম এক ভালো লাগা। শ্যামল সুন্দর প্রকৃতি। বর্ষা আর শরতের মাঝে ঝলমলে রোদে জেগে উঠছে পৃথিবী। ঘড়ির কাটা সকাল সাতটার ঘর পার হয়েছে মাত্র। গ্রামের মেঠোপথে প্রাত:ভ্রমনে বেরিয়েছেন ডাঃ মো. রফিকুজ্জামান।

হাঁটতে হাঁটতে তখন তিনি ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে ঠায় দাড়িয়ে উদাস মনে তাকিয়ে আছেন। হঠাৎ বেজে উঠলো পকেটে থাকা মোবাইল। কানে তুলতেই ওপাশ থেকে কে যেন বলছেন, স্যার রাতে কয়েকজন লোক ঢাকা থেকে এসেছে। তাদের মধ্যে একজনের করোনার লক্ষণ আছে। ডা. রফিকুজ্জামানের সকালটা প্রতিদিন এভাবেই শুরু হয়।

আবাসিক কোয়ার্টারে এসে হাত মুখ ধুয়ে নাস্তা মুখে দিতে দিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চোখ বুলিয়ে নিলেন। ন’টা বাজার আগে অফিসের চেয়ারে বসে মেইলটা চেক করে হাসপাতালে এক চক্কর। একমাত্র পরিচ্ছন্নকর্মী নিয়ে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা কষ্টসাধ্য হলেও চারিদিকে চকচকে ঝকঝকে। এরই ফাঁকে ফার্মেসী বিভাগ ঘুরে হাজিরা খাতায় চোখ বুলিয়ে শুরু হলো স্টাফদের উদ্দেশ্যে ব্রিফিং।

ব্রিফিংয়ের ফাঁকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খবর এসেছে। সাথে সাথে তদারকির জন্য পাঠালেন দুজন স্বাস্থ্যকর্মীকে। ঘড়িতে তখন সকাল ১০টা। করোনা ফোকালপার্সন ডাঃ মাসুদুর রহমান পারভেজসহ কুইক রেসপনস টিমের অন্য সদস্য, ডাক্তার, নার্স, এমটি ল্যাব, এমটি ইপিআই, ড্রাইভার ও এমএলএসএসসহ টিমের সকল সদস্যদের নিয়ে করোনা স্যাম্পল কালেকশন, লকডাউন, আইসোলোশন নিয়ে এবার ব্রিফিং।

ব্রিফিং শেষ হতে না হতেই আবার ফোনের ডাক। ওপাশ থেকে অসুস্থ্য সন্তানের চিকিৎসা চেয়ে এক মায়ের আকুতি। বিবরণ শুনে তাকে পরামর্শ দেয়ার পর এবার সিভিল সার্জনের ফোন। যথারীতি তাঁর সাথে কথোপকথন শেষ করতেই তার কক্ষে ঢুকে পড়লেন একজন রোগী। ব্যবস্থাপত্র নিয়ে হাসিমুখে ফিরলেন মানুষটি।

সকাল সাড়ে ১১ টায় রাউন্ড শুরু। চিকিৎসাধীন রোগীদের খোঁজ খবর নিয়ে ফেরার পথে রোগীর পথ্যের খোঁজ খবর নেয়া শেষ।

করোনার কারণে হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা অনেক কমে গেছে। বেলা বেড়ে দুপুর হয়ে এলো, এবার ডা. রফিকুজ্জামান বেরিয়ে পড়লেন কমিউনিটি ক্লিনিক পরিদর্শনে। পরিদর্শন শেষে আবার যখন অফিসে বসলেন তখন ঘড়ির কাঁটায় দেড়টা বাজে। উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে করোনা ও বন্যাসহ বিভিন্ন বিষয়ের রিপোর্ট পাঠাতে দুপুর ২টা বেজে গেলো। দুপরের খাবারের জন্য ডাইনিংএ যাচ্ছেন আবার ফোন বেজে উঠলো। ওপাশ থেকে ছোট্ট শিশুর কান্নার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। তার ৫ বছরের শিশু বাবার সাথে খাবে বলে কান্না করছে। অনেক বুঝিয়ে তাকে ছাড়া সন্তানকে খেতে রাজি করালেন।

করোনাকাল শুরু হবার পর থেকে বাড়িতে যাওয়া অনেক কমে গেছে। গত সপ্তাহে বাড়ি যাওয়া হয়নি। বাড়ি থেকে হাসপাতালের দুরত্ব মাত্র ১৩ কিলোমিটার। তারপরও প্রতিদিন বাড়ি যাওয়া হয় না তাঁর।

বিকেল সাড়ে ৩টা, গাড়ি নিয়ে বেড়িয়ে পড়লেন করোনা আক্রান্ত রোগীরা আইসোলোশনে ঠিকমতো আছেন কিনা, ঔষধ ঠিকমতো খাচ্ছেন কি না এসব দেখার জন্য। এরপর ফুলছড়ি উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও অফিসার ইনচার্জ (ওসি)’র সঙ্গে করোনা সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা সেরে হাসপাতালের আবাসিক কক্ষে এসে হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হতেই পশ্চিম আকাশে সূর্য অস্ত গেল। কক্ষে বসে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম দেখতেই কয়েকজনকে মোবাইলে স্বাস্থ্যসেবা দিলেন।

করোনার যেসকল স্যাম্পল পাঠানো হয়েছিল তার রিপোর্ট জানতে আবার বসে পড়লেন ই-মেইল চেক করতে। ইতিমধ্যে মেইলে আসলো করোনা পজিটিভ ১ ব্যক্তির নাম। তার সাথে যোগাযোগ করার জন্য সরবরাহকৃত নাম্বারে বারবার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যাচ্ছিল না। কারণ ওই ব্যক্তির ফোনটি বন্ধ ছিল। পরে বিভিন্নভাবে চেষ্টা করে আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে যোগাযোগ করে তাকে আইসোলোশনে পাঠানোর ব্যবস্থা করলেন। রাত ১১ টায় ঘুমাতে যাওয়ার আগে কথা প্রসঙ্গে জানতে পারি ডাঃ মো. রফিকুজ্জামানের আবাসিক কোয়ার্টারে থাকার রহস্য।

তিনি আবাসিক কোয়ার্টারে থাকার পর থেকে নাকি হাসপাতালের বিদ্যুৎ বিল প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। আগে যেখানে বিদ্যুৎ বিল আসতো ১ লক্ষ ৪০ হাজার থেকে দেড় লক্ষ টাকা আর এখন বিল আসছে ৬৫ থেকে ৭০ হাজার টাকা। হাসপাতালে থাকলে নাকি বেশি সেবা দেয়া যায় কথা প্রসঙ্গে এমনটিই বললেন তিনি। এছাড়া ডাক্তার নার্সদের মানসিকতাও নাকি ভালো থাকে।

পারিবারিক জীবনে ডা. রফিকুজ্জামান ২ সন্তানের জনক। ২৭ তম বিসিএসের স্বাস্থ্য ক্যাডারে যোগদানের পর কর্মদক্ষতায় প্রমোশন নিয়ে ২০১৭ সালের ১৪ই ডিসেম্বর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হিসেবে ফুলছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগদান করেন ডাঃ রফিকুজ্জামান। তাঁর বাড়ি সদর উপজেলার বোয়ালী ইউনিয়নে। বৃহস্পতিবার সূর্যোদয় থেকে ঘুমাতে যাওয়ারি আগ পর্যন্ত কভিড-উনিশের বিরুদ্ধে একজন ডাক্তারের সংগ্রাম। ফ্রন্ট লাইনের যোদ্ধা হিসেবে করোনার শুরু থেকে প্রায় প্রতিদিন এভাবেই জয়ের আশায় অদৃশ্য শত্রু করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন ডা. রফিকুজ্জামান।

বিজনেস বাংলাদেশ/ প্রান্ত

ব‍্যবসায়িক কাজে দুবাই গিয়ে আটকা পড়েছে অভিনেত্রী ‘’অপ্সরা’

হাসপাতালেই কেটে যায় দিন-রাত স্বাস্থ্য কর্মকর্তার

প্রকাশিত : ০৬:২০:৫৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ৪ জুলাই ২০২০

বর্ষার আকাশে আজ মেঘ নেই। মাথার উপরে চোখ জুড়ানো নীলাকাশ। হিম শীতল বাতাসের পরশে অন্যরকম এক ভালো লাগা। শ্যামল সুন্দর প্রকৃতি। বর্ষা আর শরতের মাঝে ঝলমলে রোদে জেগে উঠছে পৃথিবী। ঘড়ির কাটা সকাল সাতটার ঘর পার হয়েছে মাত্র। গ্রামের মেঠোপথে প্রাত:ভ্রমনে বেরিয়েছেন ডাঃ মো. রফিকুজ্জামান।

হাঁটতে হাঁটতে তখন তিনি ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে ঠায় দাড়িয়ে উদাস মনে তাকিয়ে আছেন। হঠাৎ বেজে উঠলো পকেটে থাকা মোবাইল। কানে তুলতেই ওপাশ থেকে কে যেন বলছেন, স্যার রাতে কয়েকজন লোক ঢাকা থেকে এসেছে। তাদের মধ্যে একজনের করোনার লক্ষণ আছে। ডা. রফিকুজ্জামানের সকালটা প্রতিদিন এভাবেই শুরু হয়।

আবাসিক কোয়ার্টারে এসে হাত মুখ ধুয়ে নাস্তা মুখে দিতে দিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চোখ বুলিয়ে নিলেন। ন’টা বাজার আগে অফিসের চেয়ারে বসে মেইলটা চেক করে হাসপাতালে এক চক্কর। একমাত্র পরিচ্ছন্নকর্মী নিয়ে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা কষ্টসাধ্য হলেও চারিদিকে চকচকে ঝকঝকে। এরই ফাঁকে ফার্মেসী বিভাগ ঘুরে হাজিরা খাতায় চোখ বুলিয়ে শুরু হলো স্টাফদের উদ্দেশ্যে ব্রিফিং।

ব্রিফিংয়ের ফাঁকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খবর এসেছে। সাথে সাথে তদারকির জন্য পাঠালেন দুজন স্বাস্থ্যকর্মীকে। ঘড়িতে তখন সকাল ১০টা। করোনা ফোকালপার্সন ডাঃ মাসুদুর রহমান পারভেজসহ কুইক রেসপনস টিমের অন্য সদস্য, ডাক্তার, নার্স, এমটি ল্যাব, এমটি ইপিআই, ড্রাইভার ও এমএলএসএসসহ টিমের সকল সদস্যদের নিয়ে করোনা স্যাম্পল কালেকশন, লকডাউন, আইসোলোশন নিয়ে এবার ব্রিফিং।

ব্রিফিং শেষ হতে না হতেই আবার ফোনের ডাক। ওপাশ থেকে অসুস্থ্য সন্তানের চিকিৎসা চেয়ে এক মায়ের আকুতি। বিবরণ শুনে তাকে পরামর্শ দেয়ার পর এবার সিভিল সার্জনের ফোন। যথারীতি তাঁর সাথে কথোপকথন শেষ করতেই তার কক্ষে ঢুকে পড়লেন একজন রোগী। ব্যবস্থাপত্র নিয়ে হাসিমুখে ফিরলেন মানুষটি।

সকাল সাড়ে ১১ টায় রাউন্ড শুরু। চিকিৎসাধীন রোগীদের খোঁজ খবর নিয়ে ফেরার পথে রোগীর পথ্যের খোঁজ খবর নেয়া শেষ।

করোনার কারণে হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা অনেক কমে গেছে। বেলা বেড়ে দুপুর হয়ে এলো, এবার ডা. রফিকুজ্জামান বেরিয়ে পড়লেন কমিউনিটি ক্লিনিক পরিদর্শনে। পরিদর্শন শেষে আবার যখন অফিসে বসলেন তখন ঘড়ির কাঁটায় দেড়টা বাজে। উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে করোনা ও বন্যাসহ বিভিন্ন বিষয়ের রিপোর্ট পাঠাতে দুপুর ২টা বেজে গেলো। দুপরের খাবারের জন্য ডাইনিংএ যাচ্ছেন আবার ফোন বেজে উঠলো। ওপাশ থেকে ছোট্ট শিশুর কান্নার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। তার ৫ বছরের শিশু বাবার সাথে খাবে বলে কান্না করছে। অনেক বুঝিয়ে তাকে ছাড়া সন্তানকে খেতে রাজি করালেন।

করোনাকাল শুরু হবার পর থেকে বাড়িতে যাওয়া অনেক কমে গেছে। গত সপ্তাহে বাড়ি যাওয়া হয়নি। বাড়ি থেকে হাসপাতালের দুরত্ব মাত্র ১৩ কিলোমিটার। তারপরও প্রতিদিন বাড়ি যাওয়া হয় না তাঁর।

বিকেল সাড়ে ৩টা, গাড়ি নিয়ে বেড়িয়ে পড়লেন করোনা আক্রান্ত রোগীরা আইসোলোশনে ঠিকমতো আছেন কিনা, ঔষধ ঠিকমতো খাচ্ছেন কি না এসব দেখার জন্য। এরপর ফুলছড়ি উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও অফিসার ইনচার্জ (ওসি)’র সঙ্গে করোনা সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা সেরে হাসপাতালের আবাসিক কক্ষে এসে হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হতেই পশ্চিম আকাশে সূর্য অস্ত গেল। কক্ষে বসে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম দেখতেই কয়েকজনকে মোবাইলে স্বাস্থ্যসেবা দিলেন।

করোনার যেসকল স্যাম্পল পাঠানো হয়েছিল তার রিপোর্ট জানতে আবার বসে পড়লেন ই-মেইল চেক করতে। ইতিমধ্যে মেইলে আসলো করোনা পজিটিভ ১ ব্যক্তির নাম। তার সাথে যোগাযোগ করার জন্য সরবরাহকৃত নাম্বারে বারবার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যাচ্ছিল না। কারণ ওই ব্যক্তির ফোনটি বন্ধ ছিল। পরে বিভিন্নভাবে চেষ্টা করে আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে যোগাযোগ করে তাকে আইসোলোশনে পাঠানোর ব্যবস্থা করলেন। রাত ১১ টায় ঘুমাতে যাওয়ার আগে কথা প্রসঙ্গে জানতে পারি ডাঃ মো. রফিকুজ্জামানের আবাসিক কোয়ার্টারে থাকার রহস্য।

তিনি আবাসিক কোয়ার্টারে থাকার পর থেকে নাকি হাসপাতালের বিদ্যুৎ বিল প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। আগে যেখানে বিদ্যুৎ বিল আসতো ১ লক্ষ ৪০ হাজার থেকে দেড় লক্ষ টাকা আর এখন বিল আসছে ৬৫ থেকে ৭০ হাজার টাকা। হাসপাতালে থাকলে নাকি বেশি সেবা দেয়া যায় কথা প্রসঙ্গে এমনটিই বললেন তিনি। এছাড়া ডাক্তার নার্সদের মানসিকতাও নাকি ভালো থাকে।

পারিবারিক জীবনে ডা. রফিকুজ্জামান ২ সন্তানের জনক। ২৭ তম বিসিএসের স্বাস্থ্য ক্যাডারে যোগদানের পর কর্মদক্ষতায় প্রমোশন নিয়ে ২০১৭ সালের ১৪ই ডিসেম্বর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হিসেবে ফুলছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগদান করেন ডাঃ রফিকুজ্জামান। তাঁর বাড়ি সদর উপজেলার বোয়ালী ইউনিয়নে। বৃহস্পতিবার সূর্যোদয় থেকে ঘুমাতে যাওয়ারি আগ পর্যন্ত কভিড-উনিশের বিরুদ্ধে একজন ডাক্তারের সংগ্রাম। ফ্রন্ট লাইনের যোদ্ধা হিসেবে করোনার শুরু থেকে প্রায় প্রতিদিন এভাবেই জয়ের আশায় অদৃশ্য শত্রু করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন ডা. রফিকুজ্জামান।

বিজনেস বাংলাদেশ/ প্রান্ত