নেত্রকোনার হাওরে নৌকাডুবির ঘটনায় ময়মনসিংহের ৫নং চরসিরতা ইউনিয়নের কোনাপাড়া গ্রামে এক পরিবারের আটজন নিহত হয়েছে। এ ঘন্টনায় এলাকা শোকে মাতম।
বুধবার (৫ আগষ্ট) রাত ১০ টা থেকে লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স একের পর এক আসতে থাকে। অ্যাম্বুলেন্সের বাজনায় মানুষ হাজারো মানুষ ছুটে আসছে। এই বুঝি লাশ এসেছে। লাশ পৌঁছ মাত্রই আকাশ-বাতাস যেন ভারি হয়ে এলো। এর আগে সন্ধ্যায় নিহতদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, নিহতের পরিবারকে সান্তনা দিতে হাজার হাজার মানুষের ঢল নেমেছে। বুক ফাটা কান্না আর স্বজনদের আহাজারিতে স্তব্ধ পুরো গ্রাম। হাফেজ সন্তানকে হারিয়ে মা কখনো অজ্ঞান হচ্ছে আবার স্বজনরা মাথায় পানি ডেলে সুস্থ করার চেষ্টা করছেন। মায়ের চিৎকারে বাড়িতে কান্নার রোল পড়ে যায়। দেখতে আসা লোকজনও চোখের পানি মুছছেন বারং বার।
সরেজমিন গিয়ে জানা যায়, মারকাজুস সুন্নাহ মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান শিক্ষক হাফেজ মাহফুজুর রহমান (৪০), তার এক ছেলে হাফেজ ও এক ছেলে মাদ্রাসার ছাত্র নেত্রকোনার হাওরে নৌকাডুবির ঘটনায় মারা যান। এছাড়াও তার এক ভাগ্নে, দুই ভাতিজা ও দুই ভাতিজার মৃত্যু হয়েছে।
হাফেজ মাহফুজুর রহমানসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা হলেন- তার ছেলে হাফেজ মাহবুবুর রহমান আসিফ (১৮) এবং মাদ্রাসার ছাত্র মাহমুদ (১৬), ভাগ্নে মাদ্রাসার ছাত্র মো.রেজাউল করিম (২১) এবং
হাফেজ মাহফুজুর রহমানের বড় ভাই ফজর মিয়ার ছেলে মুজাহিদ আহমেদ (১৪) এবং যুবায়ের (২০)। তারা দুইজনই হাফেজ ছিলেন। তার ছোট ভাই ওয়াইজ উদ্দিনের দুই মেয়ের মৃত্যু হয়েছে। মৃত বাচ্চারা হলো- জুলফা (১১) ও লুবনা আক্তার( ১৩)। দুুই মেয়ে স্থানীয় মহিলা মাদরাসায় পড়াশোনা করতেন।

খোজ নিয়ে জানা যায়, একই গ্রামের হেলাল উদ্দিনের ছোট ভাই ও এক ছেলে মারা গেছেন। তারা হলেন- তার ভাই মাদ্রাসার শিক্ষক আজহার (৩০) ও ছেলে দোকানদার জাহিদ হোসেন (২০) এবং স্থানীয় রশিদ মিয়ার ছেলে মাদ্রাসা শিক্ষক রতনের (৩০) মৃত্যু হয়েছে। তিনি স্থানীয় স্থানীয় মারকাজুস সুন্নাহ মাদ্রাসার শিক্ষক ছিলেন। এছাড়াও এই গ্রামের মৃত সাইফুল ইসলামের ছেলে রাকিবুল ইসলামের (২২) মৃত্যু হয়েছে। তিনি ঢাকার একটি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করতেন এবং চরগোবিন্দপুর গ্রামের ( বর্তমান ৩১ নং ওয়ার্ল্ড) মাদ্রাসা শিক্ষক জহিরুল ইসলাম (৩২) নামের আরো একজনের মৃত্যু হয়েছে। তিনি মৃত তালেব মেম্বারের সন্তান।
এদিকে পাশের বাড়ির মুক্তিযোদ্ধা ইদ্রিস আলীর ছেলে চরখরিচা মাদ্রাসার শিক্ষক হামিদুল ইসলামের (৩৫) মৃত্যু হয়েছে এবং মৃত সাইফুল ইসলামের ছেলে ঢাকার মাদ্রাসা শিক্ষক রাকিবুল ইসলামের (২২) এখনো সন্ধান পায়নি পরিবার। এছাড়াও গৌরীপুর উপজেলার ধোপাজাঙ্গালিয়া গ্রামের আবুল কালামের ছেলে শফিকুর রহমান (৪০) ও তার ছেলে সামাআনের (১০) মৃত্যু হয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, মারকাজুস সুন্নাহ মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান শিক্ষক হাফেজ মাহফুজুর রহমানের উদ্যোগেই আনন্দ ভ্রমণের উদ্দেশ্যে মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা নেত্রকোনার মিনি কক্সবাজার নামে খ্যাত হাওরে রওনা দিয়েছিল। কিন্তু তাদের এটাই যে শেষ আনন্দ সেটা কে জানত! কেউ হাফেজ আবার কেউ মাদ্রাসার শিক্ষক ছিল। পরিবারের মুখের দিকে তাকালে কষ্টে বুকটা ফেটে যায়।
শফিকুল ইসলাম নামের একজন বলেন, নৌকাডুবি এমন করুন মৃত্যুর ঘটনা ইতিহাসে স্বরণীয় হয়ে থাকবে। আমাদের গ্রাম, ইউনিয়ন কিংবা ময়মনসিংহের এমন ঘটনা কখনো ঘটেনি। চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনা। নিহতের পরিবারের স্বান্তনা দেওয়ার ভাষা হারিয়ে ফেলেছি।
নিহত জুলফা ও লুবনার মামাতো ভাই ইমন বলেন, ফুটফুটে দুটি মেয়ে। মুখটা চোখের সামনে সবসময় ভেসে উঠে। এমন মৃত্যু কখনো কল্পনাও করিনি। লাশ দাফন বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০ টায় হওয়ার কথা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
উল্লেখ্য- নেত্রকোনার মদন উপজেলার উচিতপর হাওরে নৌকায় ভ্রমণ আনন্দ করতে গিয়ে ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। নৌকায় ৪৮ জনের মধ্যে কেউ কেউ সাতার কেটে বাঁচতে পারলেও তারা বাঁচতে পারেনি। মদনের উচিতপুরের সামনের হাওর গোবিন্দশ্রী রাজালীকান্দা নামক স্থানে নৌকাটি ডুবে গিয়েছিল।
৫ নম্বর চরসিরতা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু সায়িদ বলেন, এটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। খবর পেয়ে তাৎক্ষণিক নেত্রকোনার মদন উপজেলায় চলে যাই। আর বাড়িতে লাশ পৌঁছে দেয়ার ব্যাবস্থা করি। নিহতদের প্রায় সবাই মাদ্রাসা শিক্ষক ও শিক্ষার্থী ছিলেন।
ময়মনসিংহ কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি ফিরোজ তালুকদার বলেন, নিহতদের লাশ রাতেই পরিবারের কাছে পৌঁছে দেয়া হয়েছে। মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় নিহতদের বাড়িতে উপচে পড়া মানুষের ভিড় জমেছে, তাই সেখানে পুলিশ পাঠানো হয়েছে।
ময়মনসিংহ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইফুল ইসলাম বলেন, নিহত ১৭ জন ময়মনসিংহের বাসিন্দা। এর মধ্যে গৌরীপুর উপজেলার দুজন, সদর উপজেলার সিরতা ইউনিয়নের ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।
বিজনেস বাংলাদেশ/বিএইচ





















