যুক্তরাষ্ট্রে একটি বহুজাতিক কোম্পানিতে উচ্চ বেতনে চাকরি করতেন জুনায়েদ করিম যিনি উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ২০১৯ সালের শুরুতে দেশে ফিরে আসেন। কয়েক বন্ধু মিলে প্রতিষ্ঠা করেন একটি টেক্সটাইল কারখানা। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটির জন্য দ্বিতীয় প্রজন্মের একটি বেসরকারি ব্যাংক থেকে ৯১ কোটি টাকা ঋণ নেন।
কারখানাটি যখন উৎপাদনে চলে আসে তখন ২০২০ সালের মধ্য জানুয়ারি। সারা পৃথিবী তখন কোভিড-১৯ নামের একটি ভাইরাসে বিপর্যস্ত ও স্তব্ধ। বন্ধ সকল আন্তর্জাতিক বাণিজ্য। জুনায়েদ করিমদের টেক্সটাইল কারখানাটি যে কার্যাদেশ পেয়েছিল তা কিছুদিনের মধ্যেই স্থগিত হয়ে যায়। ওই সময় নতুন কোনো কার্যাদেশও নিতে পারেনি সদ্য প্রতিষ্ঠিত কারখানাটি।
এসএমই ঋণের কিস্তি পরিশোধের বাধ্যবাধকতা মার্চ ২০২১ পর্যন্ত স্থগিত।
বড় ঋণের ক্ষেত্রে মেয়াদ না বাড়ালে নতুন করে ৪০ হাজার কোটি টাকা খেলাপি হতে পারে।
ব্যাংক মালিক ও ব্যবসায়ীরা মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে একমত।
এর মধ্যে মার্চে বাংলাদেশে হানা দেয় কোভিড-১৯ ভাইরাস। সরকারি বিধিনিষেধের কারণে বন্ধ হয়ে যায় সারাদেশের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড। জুনায়েদ করিমদের কারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকলেও কর্মচারী বেতন, ইউটিলিটি বিল ও ব্যাংক ঋণ মিলিয়ে প্রতি মাসে কয়েক কোটি টাকার চাপ। এর মধ্যে ব্যাংক ঋণের কিস্তির চাপ সাময়িক সময়ের জন্য মুক্তি দেয় বাংলাদেশ সরকারের নীতিসহায়তা। অর্থাৎ ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক তার প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ঋণের কিস্তি আদয়ে জোর-জবরদস্তি করতে পারেনি। পাশাপাশি খেলাপি তালিকায়ও তার প্রতিষ্ঠানের নাম ওঠেনি। কিন্তু বাকি খরচের অধিকাংশই কারখানাকে বহন করতে হয়েছে।
যখন বিশ্ব অর্থনীতি সচল হতে শুরু করে তখন আবার ইউরোপে করোনার দ্বিতীয় ধাক্কা পরিস্থিতি আরো কঠিন করে তোলে। গত কয়েক মাসে যেসব কার্যাদেশ পেয়েছিল তার অর্থ পরিশোধে ১৮০ দিনের ডেফার্ড সুবিধা চায় ক্রেতা। পাশাপাশি নতুন কোনো কার্যাদেশও ঢোকেনি তার প্রতিষ্ঠানে।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই ২০২১ সালের জানুয়ারি জুনায়েদ করিমদের মতো অসংখ্য উদ্যোক্তার জন্য মহা আতঙ্ক হয়ে হাজির হয়েছে। কারণ, সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ঋণগ্রহীতাদের জন্য ‘ঋণের কিস্তি স্থগিতকরণ’ সুবিধা দিয়েছিল ব্যাংকগুলো। কিন্তু ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে তাদের সামনে বাড়তি চাপ হয়ে আবির্ভূত হয়েছে ব্যাংক ঋণের কিস্তি; যা পরিশোধের সক্ষমতায় এখনো পৌঁছাতে পারেনি করোনা মহামারিতে ক্ষতিগ্রস্ত অধিকাংশ ব্যবসায়ী। এর মধ্যেই বিশ্বব্যাপী হাজির হয়েছে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ যা নতুন করে ধাক্কা দিচ্ছে বিশ্ব অর্থনীতিকে। এদিকে বড় গ্রাহকদের ঋণ পরিশোধের সময়সীমা বাড়ানো প্রসঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকেও এখন পর্যন্ত কোনো ঘোষণা আসেনি। সরকার নতুন কোনো ঘোষণা না দিলে জানুয়ারি থেকেই বড় ঋণ গ্রহিতাদের নিয়মিত ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হবে। পাশাপাশি ঋণ পরিশোধ করতে হবে ব্যক্তি বা ভোক্তা ঋণের গ্রাহকদেরকের।
এদিকে আগামি মার্চ পর্যন্ত ক্ষুদ্র, কুটির, ছোট ও মাঝারি (এমএসএমই) ঋণের কিস্তি পরিশোধের বাধ্যবাধকতা স্থগিতকরণের মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে বিজনেস বাংলাদেশকে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম।
কিন্তু অন্য গ্রাহকরা সামনের কঠিন পরিস্থিতি নিয়ে আতঙ্কিত। ব্যক্তিগত বা কনজুমার ঋণ নিয়েছেন এমন অনেক গ্রাহক করোনাকালে চাকরি হারিয়েছেন যারা এখনো কোথাও চাকরি পানিন। অসংখ্য উদ্যোক্তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীর রপ্তানি আদেশ বাতিল হয়েছে কিংবা রপ্তানি বিল দীর্ঘ সময়ের জন্য আটকে আছে, কিংবা রপ্তানি আদেশই পাচ্ছেন না অনেকে। তাই সরকার ঋণ পরিশোধের সময়সীমা আরো বাড়ানোর বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত না নিলে ব্যাংক এবং গ্রাহক উভয়েই সংকটে পড়বে বলে মনে করছেন ব্যাংক মালিক ও ব্যবসায়ীরা।
কারণ এমনিতেই বাংলাদেশের ব্যাংক খাত ৯৪ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণের চাপে রয়েছে। এর মধ্যে ঋণ পরশোধের সময়সীমা বাড়ানো না হলে ২০২১ সালের প্রথম প্রান্তিকে নতুন করে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা খেলাপি হয়ে যাবে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে। নতুন করে এই বিপুল অংকের ঋণ খেলাপি হয়ে গেলে ব্যাংকগুলোর আর্থিক মানে মারাত্মক ধস নামবে যার ভয়ানক নেতিবাচক প্রভাব দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে পড়ার আশঙ্কাই বেশি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সব ধরনের ঋণের কিস্তি পরিশোধের বাধ্যবাধকতা স্থগিতের মেয়াদ আরো অন্তত ছয় মাস বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজ বা এফবিসিসিআই। ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত সময় বাড়ানোর দাবি জানিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে চিঠি দিয়েছে সংগঠনটি।
এ প্রসঙ্গে এফবিসিসিআই সহসভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘ইউরোপ-আমেরিকায় করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে যেভাবে লকডাউন শুরু হয়েছে, তাতে আমরা শঙ্কিত ও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছি। এতে আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য রপ্তানি কেমন হবে, তা এখনো নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। এ অবস্থায় ব্যবসায়ীরা যদি তাদের মূলধন ব্যাংকে ফেরত দেন, তাহলে ভবিষ্যতে টিকে থাকা কঠিন হবে। এ অবস্থায় ঋণ পরিশোধে অব্যাহতির সময় আগামী জুন পর্যন্ত বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে।’
ব্যাংক মালিকরাও অনুধাবন করছেন ঋণ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা স্থগিতকরণের মেয়াদ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা। মেয়াদ বাড়ানোর পক্ষে স্পষ্ট মত ব্যক্ত করে ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস-এর (বিএবি) চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার বলেন, ‘ঋণ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা স্থগিতের মেয়াদ বাড়ানো না হলে ব্যাংকই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ তখন ব্যাংকগুলোতে বিপুল খেলাপি হয়ে যাবে যা ব্যাংকগুলোর অর্থনৈতিক ভিত্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।’
বেসরকারি এক্সিম ব্যাংকের উদ্যোক্তা ও নাসা গ্রুপের কর্নধার মি. মজুমদার বলেন, ব্যবসায়ী ও ব্যাংকার হিসেবে আমি অর্থনীতির বর্তমান চিত্র খুব স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। আমি ব্যাংকঋণ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা স্থগিতের মেয়াদ বাড়ানোর পক্ষে। কারণ দেশে প্রায় এক বছর কোনো ব্যবসা নেই। দুই মাস ব্যবসা না থাকাই যেকোন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রুগ্ন হয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট। সেখানে এক বছর ব্যবসা না থাকায় কারও কারও প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। যারা আছে, তারাও কোনো রকমে টিকে থাকার চেষ্টা করছে। এ অবস্থায় শুধু ফার্মাসিউটিক্যাল খাত বাদে সবার জন্য এ ঋণ সুবিধার মেয়াদ বাড়ানো ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।’
ব্যাংকের ঋণের কিস্তি পরিশোধের বাধ্যবাধকতা স্থগিতকরণের মেয়াদ বাড়াতে ব্যবসায়ীদের দাবির প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘করোনা পরিস্থিতির কারণে অর্থনীতিতে সৃষ্ট ক্ষতি মেটাতে ২০২০ সালের পুরো সময়টিতে ঋণ পরিশোধে ছাড়সহ বিভিন্ন সুবিধা দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে এমএসএমই ঋণের কিস্তি পরিশোধের বাধ্যবাধকতা স্থগিতকরণের মেয়াদ ২০২১ সালের মার্চ পর্যন্ত বাড়ানোর বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি সপ্তাহেই এ বিষয়ে সার্কুলার জারি করা হতে পারে। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে ক্ষতির শঙ্কায় বড় ব্যবসায়ীরা এ সময়সীমা আরও বাড়ানোর দাবি আমাদের কাছে জানিয়েছেন। ব্যাংকগুলোর ওপর এর কী প্রভাব পড়বে, তা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে ব্যবসায়ীদের দাবির বিষয়টি পর্যালোচনা করে দেখা হবে।’
বিজনেস বাংলাদেশ/ এ আর





















