সময়ের সঙ্গে বিস্তৃত হচ্ছে নতুন শিল্প। উপজেলায় চারপাশে বিভিন্ন এলাকার নামের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ‘শিল্পাঞ্চল’ শব্দটি। পুরোনো-নতুন খাতে বিনিয়োগকে ঘিরে রাজধানীর পার্শ্ববর্তী এলাকায় কর্মচাঞ্চল্য বাড়ছে। এতে উম্মুক্ত হচ্ছে নতুন সম্ভাবনার দ্বার, তৈরি হচ্ছে লাখো মানুষের কর্মসংস্থান।
প্রাচ্যের ড্যান্ডি’-খ্যাত নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে শিল্পকারখানার গোড়াপত্তন আশির দশকে। বিশ্বমাতানো মুসলিন ও জামদানি শাড়ির সূতিকাগার সোনারগাঁ এখন শিল্পাঞ্চল’ হিসেবে ব্যাপক পরিচিত। দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে সোনারগাঁয়ের শিল্পাঞ্চলে। রাজধানীলাগোয়া ওই অঞ্চলে শিল্পায়নের অন্যতম অনুঘটক মেঘনা, শীতলক্ষ্যা ও ব্রহ্মপুত্র নদী। এ কারণে প্রায় দেড় যুগ আগে নতুন নতুন শিল্পের পথচলা শুরু হয়েছে। উপজেলার নদী গুলি ঘিরে গড়ে ওঠা তেমনি একটি সম্ভাবনাময় খাত হয়ে উঠছে জাহাজ নির্মাণশিল্প।
গ্রামের পথ চলতেই টুকটাক শব্দে কান ঝালাপালা হওয়ার উপক্রম। মেঘনা, শীতলক্ষ্যা ও ব্রহ্মপুত্র নদীর তীরঘেঁষে জাহাজ তৈরির অসংখ্য কারখানার দেখা মিলবে। কোনোটি সবে তৈরি হচ্ছে, কোনোটির নির্মাণকাজ সমাপ্তির পথে। বড় বড় জাহাজ দেখে যে কারও চোখ ধাঁধিয়ে যাবে। নদীর পাড়ের ওই চর গুলি এখন এলাকাবাসীর কাছে ‘জাহাজের চর’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। সোনারগাঁ উপজেলার সবচেয়ে বড় জাহাজ শিল্প কারখানা মেঘনাঘাট এলাকার আনন্দ শিপইয়ার্ড এন্ড স্লিপওয়েজ। মেঘনা ঘাটে একটি পাখি ডেকে উঠলে তার শব্দ বাতাসে ভেসে দূর-দূরান্তে চলে যেত। বর্ষায় এলাকাবাসীকে নৌকা চড়ে এখানে-ওখানে সময়ের ব্যবধানে এখন সেখানেই গড়ে উঠছে জাহাজ নির্মাণ শিল্প। কয়েক হাজার মানুষের পদচারণায় মেঘনা ঘাট এখন এক কর্মমুখর জনপদ। বর্তমানে মেঘনা গ্রুপ,বসুন্ধরা গ্রুপ ও আল- মোস্তফা গ্রুপ উন্নত প্রযুক্তির বিদেশে রপ্তানি যোগ্য জাহাজ নির্মাণকারী শিল্প কারখানা গড়ে তুলেছে সোনারগাঁয়ে। এছাড়াও ছোট বড় প্রায় অর্ধশতাধিক জাহাজ তৈরির কারখানা গড়ে তোলা হয়েছে।
উপজেলার জাহাজ কারখানাগুলোতে আড়াইশ ফুট থেকে শুরু করে শত ফুটের কোস্টার বা মালবাহী জাহাজ, সরোঙ্গা, ফেরি, জেটি, পন্টুন, বালুবাহী ট্রলার, বলগেট আর ড্রেজার তৈরি হয়। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই উপজেলার তৈরি জাহাজ রপ্তানি করা হচ্ছে। দিনভর টানা খুট-খাট আর টং-ঢং শব্দে মুখরিত এলাকায় জাহাজ নির্মাণের মহোৎসব চলছে।
রাজধানীর কোলঘেঁষা এই জনপদ একসময় অবহেলিত ছিল। বছরের অর্ধেক সময়ই নিচু এলাকাটি জলমগ্ন থাকত। কৃষিনির্ভর এলাকায় বছরে মাত্র একটি ফসল উৎপাদন হওয়ায় মানুষ খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাত। এমন এক সময়ে ওই এলাকার বাসিন্দা হারুন গাজী ও আলেক ব্যাপারি নারায়ণগঞ্জের বন্দর এলাকার সোনাকান্দায় ট্রলার তৈরির কথা জানতে পারেন। সেখানে গিয়ে শীতলক্ষ্যার বুকে জেগে ওঠা সামান্য চরে ট্রলার তৈরি করতে দেখেন তারা। এরপর নিজ গ্রামের মেঘনা চরাঞ্চলে ওই শিল্প চালুর উদ্যোগ নেন। মেঘনার প্রায় পতিত চরের জমিকে কাজে লাগাতে তারা একাধিকবার বিভিন্ন জাহাজ নির্মাণ কারখানাতে যান। জাহাজ মালিকদের সঙ্গেও কথা বলেন। তাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ২০০৫ সালে মেঘনা ঘাট এলাকায় দুটি জাহাজ নির্মাণ কারখানা চালু হয়। ওই কারখানা দুটি লাভের মুখ দেখার পর একে একে গড়ে উঠেছে অর্ধশত কারখানা।
জাহাজ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক বলেন, জাহাজ নির্মাণ শিল্প এ অঞ্চলে শিল্পায়নের নতুন দ্বার উন্মোচন করেছে। বহু মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। এলাকার মানুষ এখানকার কারখানাগুলোয় আড়াইশ ফুটের জাহাজ থেকে শুরু করে ১০০ ফুটের কোস্টার বা মালবাহী জাহাজ, সরোঙ্গা, ফেরি, জেটি, পন্টুন, বালুবাহী ট্রলার, বলগেট ও ড্রেজার তৈরি করা হচ্ছে। কিছু প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে উঠলে ও শিল্পের উদ্যোক্তাদের পুঁজিসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হলে ওই শিল্পটি সোনারগাঁ সহ দেশের উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।’
‘দেশভরা যার গোলা, ভাতে মরে তার পোলা’ লোহার মতোই কঠিন কাজ করা মানুষগুলোর দুরবস্থার কথা জানানোর জন্য এমন প্রবাদ এখানেও কানে বাজে। হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পরও ভালো নেই তারা। ‘কাজের তুলনায় বেতন অনেক কম’ হলেও নিজ এলাকায় কাজের সুযোগ পেয়ে খুশি অনেকেই। অন্যদিকে শিল্পের উদ্যোক্তারাও বলছেন, ‘শ্রমিকদের দৈনিক হাজিরা, প্রয়োজনীয় মালামাল কেনা, বিদ্যুৎ বিল আর জমির ভাড়া গুনতে একটু হেরফের হলেই লোকসানের মুখে পড়তে হয়। তারপরও সম্ভাবনাময় হওয়ায় এ শিল্প দিন দিন বাড়ছে।
সোনারগাঁ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আতিকুল ইসলাম বলেন, অনেক বছর ধরে সোনারগাঁয়ে ধীরে ধীরে জাহাজ শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে। এ শিল্পের কারণে এলাকার শত শত বেকার যুবকের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। এ উপজেলা নদী বেষ্টিত হওয়ায় অনেক এলাকায় জাহাজ নির্মাণকারী শিল্প কারখানা গড়ে উঠেছে।
বিজনেস বাংলাদেশ/বিএইচ




















