চট্টগ্রাম-ঢাকা মহাসড়কে বেড়েছে রপ্তানিকৃত তৈরি পোশাক চুরির ঘটনা। গত বছরের প্রতিমাসে একটি কাভার্ডভ্যান থেকে পণ্য চুরির ঘটনা ঘটলেও এ বছর তার পরিমাণ আরও বেড়েছে। চলতি বছরের বিগত আট মাসেই রপ্তানি পণ্য চুরির ঘটনা ঘটেছে ২৪টি কাভার্ডভ্যান থেকে। গার্মেন্টস সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রপ্তানি করা পোশাকবাহী গাড়ি থেকে চুরি ঠেকানো না গেলে কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি বিদেশের মাটিতে ধ্বংস হবে দেশের সুনাম।
বাংলাদেশ কাভার্ডভ্যান-ট্রাক-প্রাইমমুভার পণ্য পরিবহন মালিক এসোসিয়েশনের মহাসচিব চৌধুরী জাফর আহমদ বিজনেস বাংলাদেশকে বলেন, কভার্ডভ্যান থেকে রপ্তানির তৈরি পোশাক চুরির ঘটনায় আমরা অতিষ্ঠ। কোনমতেই থামানো যাচ্ছে না চুরি। তবে গত বছরের চেয়ে চলতি বছরে পণ্য চুরির ঘটনা বেড়েছে। চলতি বছরে বিগত আট মাসে ২৪টি কাভার্ডভ্যান থেকে রপ্তানি পণ্য চুরির ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ প্রতিমাসে তিনটি কাভার্ডভ্যান থেকে রপ্তানির তৈরি পোশাক চুরির ঘটনা ঘটছে। গত বছর প্রতিমাসে একটি কাভার্ডভ্যান থেকে পণ্য চুরির ঘটনা ঘটেছে।
ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি মালিক সমিতি সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালের ১৯ জানুয়ারিতে রপ্তানির জন্য ঢাকা উত্তরা ক্লাসিক ট্রেডিং কর্পোরেশন গার্মেন্টস থেকে ৩৪২ কার্টন তৈরি পোশাক কাভার্ডভ্যানে চট্টগ্রামের পোর্ট লিংক ডিপোতে আনা হয়। সেখান থেকে কার্টনভর্তি ৩৬ হাজার ৭শ পিস পোশাক মালেশিয়ার ক্লাসিক ফ্যাশনে পাঠানো হয়। মালেশিয়ার ক্রেতা কার্টন খুলে গণনা করে দেখেন ২২ হাজার ৫শ’ ৭৮ পিস পোশাক কম আছে। যার বাজারমূল্য প্রায় ৩৫ লাখ টাকা।
এ ঘটনায় ১ ফেব্রুয়ারি নগরীর সদরঘাট থানায় একটি মামলা দায়ের করেন সদরঘাটের সুলতানিয়া পরিবহনের মালিক নুর আলম রনি। তারপর গত আড়াই বছরেও চুরি যাওয়া মালামাল কিংবা চুরির সাথে অভিযুক্ত কেউ ধরা পড়েনি। দীর্ঘদিন ধরে এভাবেই চলছে রপ্তানি পণ্য চুরি।
বন্দরে আনার পথে ৮ মাসে ২৪ চুরি:
চলতি বছরের বিগত আট মাসে চট্টগ্রাম-ঢাকা মহাসড়কে ২৪টি কাভার্ডভ্যান থেকে রপ্তানি পোশাক চুরির ঘটনা ঘটেছে। এরমধ্যে গত ১৮ মার্চ উয়েস্ট নিট ওয়্যারের ১৫ হাজার ১৭৮ পিস জ্যাকেট, ২৩ মার্চ একই প্রতিষ্ঠানের এক হাজার জ্যাকেট, একই দিনে ২০ হাজার একশো জ্যাকেট কাভার্ড্যভ্যান থেকে চুরি করা হয়। জ্যাকেটগুলো আমেরিকা, ইতালি, জাপান ও জার্মানিতে রপ্তানি করা হয়।
একইভাবে, গত ১১ ফেব্রুয়ারি গাজীপুরের মিক নিটের দুই হাজার ৯৪৭, ২২ মার্চ গাজীপুরের প্রোটেক্স গার্মেন্টসের সাত হাজার ৫২৭, ১২ এপ্রিল ফতুল্লার নেক্সট কম্পোজিটের দুই হাজার ২৩২, ১৪ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের ফকির ফ্যাশনের এক লাখ ৪৭, ১৫ এপ্রিল সিদ্ধিরগঞ্জের কায়সার সানকো জেবি টেক্সটাইলের তিন হাজার, ১৮ এপ্রিল ৫১৬, ২৯ এপ্রিল গাজীপুরের এপিএস নিট কম্পোজিটের তিন হাজার ৭০৫, ৫ মে আদমজীর ইয়েস্টার জিন্স লিমিটেডের ৬ হাজার, ৫ মে ফতুল্লার ফেইম এপারেলসের ৩০ হাজার ৫৪৩ হাজার পিস পোশাক চুরির ঘটনা ঘটে।
এছাড়া গত ২৫ মে ফ্রেন্ডস লজিস্টিকের ৮৭০, ৮ জুন গাজীপুরের টেকনো ফাইভারের ৯ হাজার ২৭০, ২৩ জুন একই প্রতিষ্ঠানের ২৫শ পিস, ৩০ জুন লুফ ফ্রেইট লিমিটেডের ৮ হাজার ৬৭০, ৫ জুলাই আশুলিয়ার ইভ ড্রেস শার্টসের তিন হাজার, ৬ জুলাই গাজিপুরের এভার ফ্যাশনের এক লাখ এক হাজার ২১৪, ১২ জুলাই আরমানা এপারেলসের নয় হাজার ৯০, একই দিনে গাজীপুরের সীরক এপারেলসের ৫২৩, কাইজার নিটওয়্যারসের দুই হাজার ৭৯৯, ১১ মে আশুলিয়ার জয়স্ত্রী নিটওয়্যারসের সাত হাজার ১১, কালিয়াকৈরের করিম টেক্সটাইলের চার হাজার ৭১০, ১৫ মার্চ কালিগঞ্জের কোর স্পান এ্যাপারেলের ১ হাজার ২৩২, ১৪ জুলাই গুডলাক ট্রান্সপোর্ট এন্ড ট্রেডিংয়ের ৪৯৫, ৮ জুলাই শাহ পরিবহনের দুই লাখ ২৮ হাজার ৮৭২ এবং পিস রপ্তানিযোগ্য তৈরি পোশাক চুরি করা হয়েছে কাভার্ড ভ্যান থেকে। ঢাকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করতে চট্টগ্রাম বন্দরে আনার পথে এসব গার্মেন্টস পণ্য চুরি করা হয়।
চুরি ঠেকাতে দেয়া হয় যে ১০ প্রস্তাবনা
পণ্য চুরি রোধে হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপির কাছে ১০টি প্রস্তাবনা দিয়েছে বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ডভ্যান, ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি মালিক সমিতি। গত আগস্ট মাসে এসব প্রস্তাব দেয়া হয়।
প্রস্তাবনায় বলা হয়- সকল ট্রান্সপোর্ট এজেন্সির বৈধ কাগজ আছে কিনা তা যাছাই করা, মালামাল চুরির বিষয়ে বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও এফবিসিসিআই’র যৌথ উদ্যোগে তদারকি টিম গঠন করা, সুনির্দিষ্ট আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ছাড়া যত্রতত্র গাড়ি তল্লাশি না করা, রপ্তানি মালামাল বোঝাই গাড়িতে বিজিএমইএর স্টিকার ও ম‚ল সড়কের বাইরে ডানে-বামে যাওয়া বন্ধ করা, ট্রান্সপোর্ট এজেন্সির মালিকের অতীতের রেকর্ড ভাল আছে কিনা তা যাছাই করে পণ্য বোঝাই করা।
প্রস্তাবনায় আরও বলা হয়, রপ্তানি পোশাকের কার্টনে স্ব স্ব প্রতিষ্ঠানের নাম থাকা, পণ্য চট্টগ্রামে পৌঁছানোর পর সংশ্লিষ্ট সিএন্ডএফ এজেন্টের নিজে দায়িত্বে মালামাল বুঝে নেয়া, স্টক লটের তৈরি পোশাক বিজিএমইএ যাছাই করে রপ্তানির অনুমতি দেয়া কারণ চুরি হওয়া পণ্য স্টক লটের ব্যবসায়ীরা ছাড়া আর কেউ ক্রয় করে না এবং পণ্য চুরির পর বিভিন্ন থানায় দায়ের করা মামলার আসামিদের গ্রেপ্তার করা।





















