গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার তুমলিয়া ইউনিয়নের চুয়ারিয়াখোলা গ্রামে কুঞ্জ মেলাটি বসছে ১শ বছর ধরে। ৩ দিনের এই মেলাটি বসে ইংরেজী নতুন বছর অর্থাৎ জানুয়ারীর প্রথম সপ্তাহে এবং পৌষ মাসের শেষের দিকে। আশপাশের জেলার মানুষ আসে প্রাচীনকাল থেকে চলে আসেন এই মেলার অংশ হতে।
জানা গেছে, উপজেলার চুয়ারিয়াখোলা গ্রামের শ্রী শ্রী কানাইলাল মন্দির কমিটির উদ্যোগে ৩ দিনব্যাপী কুঞ্জ মেলার আয়োজন করা হয়। কুঞ্জ মেলার প্রথম দিন খাবার সামগ্রী, দ্বিতীয় দিন দেশী-বিদেশী মাছ এবং তৃতীয় দিন খাবার সামগ্রী ও মাছ একসাথে বসে মেলা প্রাঙ্গণে। রাধা-কৃẲ যুগলের লীলা কির্তি উপলক্ষে সনাতন ধর্মের লোকজন এ কুঞ্জ মেলার আয়োজন করেন। সনাতন ধর্মের লোকজন টানা ১৫দিন নিরামিষ খায় এবং মেলার শেষ দিন আমিষ খাদ্য গ্রহণ ও পূজা অর্চ্যনার মধ্য দিয়ে শেষ হয় তাদের আনুষ্ঠানিকতা। মেলায় জামাতা ও আত্মীয়স্বজনকে আমন্ত্রণ করে আপ্যায়ন করার রেওয়াজও চলে। বাড়িতে বাড়িতে বানানো হয় খই, মুড়কি, নারকেলের ও চালের নাড়ু। মেলা থেকে দই কিনে নিয়ে মুড়কি দিয়ে খাওয়ার রেওয়াজটিও ধরে রেখেছেন এলাকাবাসী।
সরেজমিনে শুক্রবার সকালে মেলা প্রাঙ্গনে গিয়ে দেখা গেল, পণ্যের পসরা নিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ও স্থানীয় বিভিন্ন এলাকা থেকে এসেছেন আরও শতাধীক ব্যবসায়ীরা। মিষ্টান্ন, খেলনা, চুড়ি, ফিতা, আলতা থেকে ঘরগৃহস্থালির বিচিত্র জিনিস। মেলায় নিমকি-মুড়কি, ফুচকা-চটপটি, ঝালমুড়ি-চানাচুর, মিষ্টি ও জিলাপিই বিক্রি করা হচ্ছে ৫০টিরও বেশি দোকানে। বিক্রিও হচ্ছে দেদারছে। কারণ মেলায় দর্শনার্থীরা নিমকি-মুড়কি, ফুচকা-চটপটি, ঝালমুড়ি-চানাচুর খাওয়ায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এছাড়া মেলায় এসে শেষে যে মিষ্টি ও জিলাপি এবং ফল কিনেই বাড়ি ফিরতে হয়। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলছে নাগরদোলা। আর আছে হাতি, ঘোড়া, নৌকা ও নিশান টার্গেট (স্যুট)।
ঢাকার ডেমরা থেকে পঞ্চাশোর্ধ সাহেরা বেগম কুঞ্জ মেলায় চুড়ি নিয়ে এসেছেন। তিনি জানান, এবার তিনি প্রথম এই কুঞ্জ মেলায় এসেছেন। বিভিন্ন জনের কাছে এই কুঞ্জ মেলার কথা শুনে তার এখানে আসা। অনেক লোকজন এবং বেচাবেনাও ভাল। তবে মেলায় মহিলা ও শিশু ক্রেতাই বেশি বলে জানান তিনি।
মেলায় আসা স্যুটারম্যান জানান, এবার নিয়ে ৪ বছর ধরে তিনি মেলায় আসেন। পচুর মানুষ দেখে তার খুব ভাললাগে। তার এখানে মূলত শিশু-কিশোর ও তরুণ বয়সের লোকজন বেশি আসে। ৫ স্যুট ১০ টাকা। নিজের টার্গেট নিশানা দেখতে নানুর সাথে আসে উপজেলার শিশুমেলা আইডিয়াল স্কুলের ৩য় শ্রেণির সৃজন রায়।
মেলায় নরসিংদী থেকে খেলনার দোকান নিয়ে এসেছেন পঞ্চাশোর্ধ আফজাল উদ্দিন। তিনি বললেন, আমি বেশ কয়েক বছর ধরেই এখানে আসি। পুরোনো ঐতিহ্য ধরে রেখেছে এখানকার কুঞ্জ মেলাটি। বেচাকেনা যাই হউক একসাথে এত দর্শনার্থী দেখে ভালই লাগে। একই কথা বলেন, দক্ষিণ চুয়ারিয়াখোলা গ্রামের চটপটি বিক্রেতা সুজন মিয়া (২৬), নরসিংদীর মনোহরদি থেকে নাগরদোলা নিয়ে আসা হানিফা (৩৫) ও কৃẲ দাস (৪০)। তারা জানান, প্রতি জন ২০ টাকা করে টিকিট নিয়ে তারপর নাগর দোলায় চড়তে হয়। আর সবাইকে ১২টি রাউন্ড দেওয়া হয়। তবে শুধু তারা না। তাদের এই টিমের সাথে ৬ জন করে শ্রমিক আনতে হয়। তবে মেলার ক্রেতা নিয়ে তারা সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন।
উপজেলার জাঙ্গালীয়ার রয়েন থেকে শুভাস চন্দ্র দাস ও মোক্তারপুরের বাঘুন থেকে পরিমল চন্দ্র পাল মাটির তৈরি তৈজসপত্র নিয়ে এসেছেন। তাদের দোকানে পিঠা ও রুটি তৈরি পাতিল কিনতে ভীর করেচেন তুমলিয়া ইউনিয়নের দড়িপাড়া গ্রামের গৃহবধূ শিখা সরকার, লিপি সরকার ও দিনা সরকার। মাটির তৈজসপত্র কিনতে আসা পঞ্চাশোর্ধ অবলা রাণী দাস জানান, কারণ শীতের সময় গ্রামে পিঠা খাওয়ার ধুম পড়ে যায়। তাই পিঠা তৈরির পাত্রের জন্য তিনি প্রতি বছর মেলায় আসেন।
মেলায় বাঁশ-বেতের তৈরি নানা রকম জিনিস নিয়ে আকবর আলী (৪৯) এসেছেন জামালপুর জেলা থেকে। তার সাথে আসেন একই এলাকার ধীরেন্দ্র (৪৮)। তারা প্রতি বছর এই মেলায় আসেন। আগে বাপ-চাচারা আসতেন। তাদের বয়স হওয়াতে তারা এখন আর আসেন না। তাই বংশ পরম্পরায় তারা আসেন।
শ্রী শ্রী কানাইলাল মন্দির ও মেলার আয়োজক কমিটির সভাপতি মুকুল চন্দ্র দে বলেন, ১শ বছর পূর্ণ হলো এই কুঞ্জ মেলার। মূলত পৌষ মাসের মেষের দিকে এই কুঞ্জ মেলা বসে। কানাইলাল মন্দির রাধা-কৃẲের লিলা কির্তি ১৫ দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিদিন ও রাতে পালা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। একেবারে শেষের ৩দিন হয় রাধা-কৃẲের লিলা কির্তি উপলক্ষে এই কুঞ্জ মেলা বসে কানাইলাল মন্দিরের অদূরে চুয়ারিয়াখোলা গ্রামে। রাধা-কৃẲের লিলা কির্ত করতে গেলে তাদের সেবা করতে হয়। আর সেবা করতে গেলে মিষ্টি ও ফলসহ বিভিন্ন উপকরণ লাগে, সেই উপকরণের যোগান দিতেই শুরুতে ছোট্ট পরিসরে এই মেলার আয়োজন। তারপর থেকে দিনে দিনে এর আয়োজন বৃহৎ পরিসরে হচ্ছে। এখন মেলায় বিভিন্ন রকমের শতাধীক দোকান বসে এই কুঞ্জ মেলায়। তবে মেলা থেকে যে আয় হয় তা মন্দিরের কল্যাণ ষ্ট্রাষ্টে জমা হয়।
তিনি আরো জানান, মেলা উপলক্ষে কোনো ঘোষণা দেওয়া হয় না। ১শ বছর সময় ধরে এই দিনে মেলাটি বসে। দূরদূরান্তের মানুষ এখনো আসছে মেলায় যোগ দিতে। সে কারণে সব রকমের সুবিধা রাখতে আয়োজক কমিটি প্রায় এক মাস আগে থেকে সব প্রস্তুতি নিয়ে থাকে। এবারও সে রকম প্রস্তুতি নেওয়া হয়। মেলার নিরাপত্তার জন্য মেলা আয়োজরা স্বেচ্ছাসেবক মোতায়েন রাখা হয়।
তুমলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আবুবকর বাক্কু মিয়া বলেন, গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী মেলার ইতিহাস ধরে রাখতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে চলেছে শ্রী শ্রী কানাইলাল মন্দির কমিটির সদস্যরা। প্রতিবছর তাঁরা স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে অব্যাহত রেখেছেন এই মেলার আয়োজন।
বিজনেস বাংলাদেশ/ এ আর




















