০৪:১০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২৬

না’গঞ্জে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে ডায়রিয়ার প্রকোপ

নারায়ণগঞ্জে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে ডায়রিয়ার প্রকোপ। প্রতিদিন গড়ে চারশ’র বেশি রোগী নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে (ভিক্টোরিয়া) ভর্তি হচ্ছেন। আক্রান্তদের মধ্যে শিশু রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে। শিশুদের পাশাপাশি নবজাতকরাও আক্রান্ত হচ্ছে। মার্চের শুরু থেকে জেলায় ডায়রিয়ার প্রকোপ বাড়লেও বর্তমানে কম বয়সীদের আক্রান্তের হার বেড়েছে বলে জানিয়েছে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ।
এদিকে রোগীর চাপ সামলাতে ডায়রিয়া ওয়ার্ডের বাইরে ১০টি শয্যার ব্যবস্থা করা হয়েছে। রাজধানীর আইইডিসিআর কেন্দ্র থেকে আট সদস্যের একটি টিম সেখানে গিয়ে কাজ করছে।
অপরদিকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে একদিকে কাংখিত সেবা না পাওয়া অন্যদিকে নার্সদের র্দুব্যবহারের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন রোগীদের স্বজনরা।
নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে (ভিক্টোরিয়া) ঘুরে দেখা যায়, ডায়রিয়া ওয়ার্ডে আক্রান্তদের উপচে পড়া ভীড়। হাসপাতালের ডায়রিয়া ওয়ার্ডের বারান্দাতেও জায়গা নেই। রোগী সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকরা। অনেক শিশুদের কাহিল অবস্থায় নিয়ে আসছেন তাদের স্বজনরা। অধিক রোগী হওয়ায় এক বেডে একাধিক রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
হাসপাতালে অসুস্থ শিশুকে ভর্তি করার আগে দুই বছরের শিশু আনিসা মায়ের কোলে কাতরাচ্ছে। অশ্রুসজল চোখে দিশেহারা মা ওয়ার্ডে একটি বেড পাওয়ার অপেক্ষায় দাড়িয়েছিলেন। মেয়ের কষ্টে কথা বলতে পারছিলেন না। বেড না পাওয়ায় অন্য একটি শিশুর পাশেই শুইয়ে দিয়ে স্যালাইন পুশ করেন নার্স।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে আনিসার মা আশা বেগম বলেন, সকাল থেকে মেয়ের পেট খারাপ। প্রথমে ঘরোয়াভাবে চিকিৎসা করি। কিন্তু অবস্থা আরো খারাপ হয়েছে। এজন্য এখানে নিয়ে আসছি।
সাংবাদিক এম আর কালাম জানান, তার নাতি সায়মা হাসান সিলভীকে গত মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১২টায় হাসপাতালে নিয়ে আসেন। সেখানে দুটি স্যালাইন দিয়ে বাসায় নিয়ে যেতে বলে। কিন্তু বাসায় আনার পর অবস্থা আবার খারাপ হয়ে যায়। পরে বুধবার সকাল সাড়ে ৮টায় দ্রুত অ্যাম্বুলেন্সযোগে মহাখালী কলেরা হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করি।
সাংবাদিক এম এ খান মিঠু জানান, তার মেয়েও মঙ্গলবার রাত থেকে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়। হাসপাতালে নিয়ে সন্তোষজনক চিকিৎসা পাইনি। বর্তমানে বাসায় রেখেই তার চিকিৎসা করানো হচ্ছে।
চিকিৎসা নিতে আসা অনেক ডায়রিয়া রোগীর স্বজনরা অভিযোগ করেন,হাসপাতালের নার্সদের অসৌজন্যমূলক আচরন আমাদের অনেক কস্ট দিয়েছে। দশবার বললে একবার জবাব দেয়। আবার সামান্যতেই রেগে যায়।
হাসপাতালের তথ্যমতে,এপ্রিলের শুরু থেকে গত বুধবার বিকাল ৫টা পর্যন্ত মোট ৫ হাজার ৩৯৫ জন ডায়রিয়া জনিত কারণে ভর্তি করা হয়েছে। এছাড়া ২০ এপ্রিল সকাল ৮ থেকে বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত ১৫৮ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। যার মধ্যে অধিকাংশ শিশুরোগী। ১৯ এপ্রিল সারাদিনে শিশু রোগী ভর্তি হয় ৮৪ জন, ১৮ এপ্রিল ছিল ১৩৭ জন, ১৭ এপ্রিল ছিল ৯৬ জন,১৬ এপ্রিল ছিল ১০৭ জন, ১৫ এপ্রিল ছিল ৯৪ জন, ১৪ এপ্রিল ছিল ৯৬ জন, ১৩ এপ্রিল ১১১ জন শিশু রোগী ভর্তি ছিলেন। এছাড়াও প্রতিদিন প্রায় শতাধিক শিশু রোগীর বহি.বিভাগে চিকিৎসা হচ্ছে।
মাসের শুরুর দিকে রোগীর চাপ থাকলেও এখন শিশুদের সংখ্যা কম ছিল। কিন্তু এখন অন্যান্য রোগীর পাশাপাশি শিশুদের সংখ্যাও বাড়ছে। শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় গরমে সহজেই তারা ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে।
ডায়রিয়া বিভাগের সিনিয়র স্টাফ নার্স পারুল বেগম বলেন, কথা বলার সময় নেই। রোগীর স্বজনরা দাঁড়িয়ে আছেন। খাতায় তাদের নাম লেখার সময় পাচ্ছি না। আগের তুলনায় রোগী অনেক বেড়েছে। শয্যা সংখ্যা অনেক কম। এ কারণে এক শয্যায় একাধিক রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. এস কে ফরহাদ হাসপাতালে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত শিশু রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়ে বলেন,শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় গরমে সহজেই তারা ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। গরমের মাত্রা দিন দিন বাড়ছে। আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে এই সমস্যা দেখা দিচ্ছে। অধিক তাপমাত্রায় খাবারে দ্রুত জীবাণু জন্ম নেয়। এছাড়া রাস্তার খাবার, লেবুর শরবত। সবাই একসঙ্গে এসব খাচ্ছে এবং রোগটি ছড়াচ্ছে।
এছাড়াও পানি দূষণের ফলে ডায়রিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। অনেক জায়গায় সোয়ারেজ লাইনের ভেতর দিয়ে ওয়াসার পাইপ নেওয়া হয়েছে। এতে ওয়াসার পাইপের লিকেজ দিয়ে ড্রেনের দূষিত পানি প্রবেশ করছে। এছাড়া কলেরা রোগের জীবানু পাওয়া গেছে।
তিনি আরো বলেন, অতিরিক্ত চাপ সামলাতে ডায়রিয়া ওয়ার্ডে ১০টি শয্যার পাশাপাশি বাইরে আরও ১০টি শয্যা সংযুক্ত করা হয়েছে। এই ২০ শয্যা দিয়ে চাপ সামলানো অসম্ভব হলে পুরুষ সার্জারি ওয়ার্ডে ব্যবস্থা করা হবে। ইতোমধ্যে ওয়ার্ডটি খালি করে রেখেছি। তবে এখন পর্যন্ত প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হলে অধিকাংশ রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন। আর গুরুতরদের শুধু ওয়ার্ডে ভর্তি রাখা হচ্ছে।

বিজনেস বাংলাদেশ/বিএইচ

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

আপনাদের একটি ভোটই পারে বিএনপিকে ক্ষমতায় নিয়ে আসতে: ব্যারিস্টার ফারজানা শারমিন পুতুল

না’গঞ্জে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে ডায়রিয়ার প্রকোপ

প্রকাশিত : ০৪:৩৩:৫৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২১ এপ্রিল ২০২২

নারায়ণগঞ্জে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে ডায়রিয়ার প্রকোপ। প্রতিদিন গড়ে চারশ’র বেশি রোগী নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে (ভিক্টোরিয়া) ভর্তি হচ্ছেন। আক্রান্তদের মধ্যে শিশু রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে। শিশুদের পাশাপাশি নবজাতকরাও আক্রান্ত হচ্ছে। মার্চের শুরু থেকে জেলায় ডায়রিয়ার প্রকোপ বাড়লেও বর্তমানে কম বয়সীদের আক্রান্তের হার বেড়েছে বলে জানিয়েছে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ।
এদিকে রোগীর চাপ সামলাতে ডায়রিয়া ওয়ার্ডের বাইরে ১০টি শয্যার ব্যবস্থা করা হয়েছে। রাজধানীর আইইডিসিআর কেন্দ্র থেকে আট সদস্যের একটি টিম সেখানে গিয়ে কাজ করছে।
অপরদিকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে একদিকে কাংখিত সেবা না পাওয়া অন্যদিকে নার্সদের র্দুব্যবহারের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন রোগীদের স্বজনরা।
নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে (ভিক্টোরিয়া) ঘুরে দেখা যায়, ডায়রিয়া ওয়ার্ডে আক্রান্তদের উপচে পড়া ভীড়। হাসপাতালের ডায়রিয়া ওয়ার্ডের বারান্দাতেও জায়গা নেই। রোগী সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকরা। অনেক শিশুদের কাহিল অবস্থায় নিয়ে আসছেন তাদের স্বজনরা। অধিক রোগী হওয়ায় এক বেডে একাধিক রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
হাসপাতালে অসুস্থ শিশুকে ভর্তি করার আগে দুই বছরের শিশু আনিসা মায়ের কোলে কাতরাচ্ছে। অশ্রুসজল চোখে দিশেহারা মা ওয়ার্ডে একটি বেড পাওয়ার অপেক্ষায় দাড়িয়েছিলেন। মেয়ের কষ্টে কথা বলতে পারছিলেন না। বেড না পাওয়ায় অন্য একটি শিশুর পাশেই শুইয়ে দিয়ে স্যালাইন পুশ করেন নার্স।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে আনিসার মা আশা বেগম বলেন, সকাল থেকে মেয়ের পেট খারাপ। প্রথমে ঘরোয়াভাবে চিকিৎসা করি। কিন্তু অবস্থা আরো খারাপ হয়েছে। এজন্য এখানে নিয়ে আসছি।
সাংবাদিক এম আর কালাম জানান, তার নাতি সায়মা হাসান সিলভীকে গত মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১২টায় হাসপাতালে নিয়ে আসেন। সেখানে দুটি স্যালাইন দিয়ে বাসায় নিয়ে যেতে বলে। কিন্তু বাসায় আনার পর অবস্থা আবার খারাপ হয়ে যায়। পরে বুধবার সকাল সাড়ে ৮টায় দ্রুত অ্যাম্বুলেন্সযোগে মহাখালী কলেরা হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করি।
সাংবাদিক এম এ খান মিঠু জানান, তার মেয়েও মঙ্গলবার রাত থেকে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়। হাসপাতালে নিয়ে সন্তোষজনক চিকিৎসা পাইনি। বর্তমানে বাসায় রেখেই তার চিকিৎসা করানো হচ্ছে।
চিকিৎসা নিতে আসা অনেক ডায়রিয়া রোগীর স্বজনরা অভিযোগ করেন,হাসপাতালের নার্সদের অসৌজন্যমূলক আচরন আমাদের অনেক কস্ট দিয়েছে। দশবার বললে একবার জবাব দেয়। আবার সামান্যতেই রেগে যায়।
হাসপাতালের তথ্যমতে,এপ্রিলের শুরু থেকে গত বুধবার বিকাল ৫টা পর্যন্ত মোট ৫ হাজার ৩৯৫ জন ডায়রিয়া জনিত কারণে ভর্তি করা হয়েছে। এছাড়া ২০ এপ্রিল সকাল ৮ থেকে বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত ১৫৮ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। যার মধ্যে অধিকাংশ শিশুরোগী। ১৯ এপ্রিল সারাদিনে শিশু রোগী ভর্তি হয় ৮৪ জন, ১৮ এপ্রিল ছিল ১৩৭ জন, ১৭ এপ্রিল ছিল ৯৬ জন,১৬ এপ্রিল ছিল ১০৭ জন, ১৫ এপ্রিল ছিল ৯৪ জন, ১৪ এপ্রিল ছিল ৯৬ জন, ১৩ এপ্রিল ১১১ জন শিশু রোগী ভর্তি ছিলেন। এছাড়াও প্রতিদিন প্রায় শতাধিক শিশু রোগীর বহি.বিভাগে চিকিৎসা হচ্ছে।
মাসের শুরুর দিকে রোগীর চাপ থাকলেও এখন শিশুদের সংখ্যা কম ছিল। কিন্তু এখন অন্যান্য রোগীর পাশাপাশি শিশুদের সংখ্যাও বাড়ছে। শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় গরমে সহজেই তারা ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে।
ডায়রিয়া বিভাগের সিনিয়র স্টাফ নার্স পারুল বেগম বলেন, কথা বলার সময় নেই। রোগীর স্বজনরা দাঁড়িয়ে আছেন। খাতায় তাদের নাম লেখার সময় পাচ্ছি না। আগের তুলনায় রোগী অনেক বেড়েছে। শয্যা সংখ্যা অনেক কম। এ কারণে এক শয্যায় একাধিক রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. এস কে ফরহাদ হাসপাতালে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত শিশু রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়ে বলেন,শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় গরমে সহজেই তারা ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। গরমের মাত্রা দিন দিন বাড়ছে। আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে এই সমস্যা দেখা দিচ্ছে। অধিক তাপমাত্রায় খাবারে দ্রুত জীবাণু জন্ম নেয়। এছাড়া রাস্তার খাবার, লেবুর শরবত। সবাই একসঙ্গে এসব খাচ্ছে এবং রোগটি ছড়াচ্ছে।
এছাড়াও পানি দূষণের ফলে ডায়রিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। অনেক জায়গায় সোয়ারেজ লাইনের ভেতর দিয়ে ওয়াসার পাইপ নেওয়া হয়েছে। এতে ওয়াসার পাইপের লিকেজ দিয়ে ড্রেনের দূষিত পানি প্রবেশ করছে। এছাড়া কলেরা রোগের জীবানু পাওয়া গেছে।
তিনি আরো বলেন, অতিরিক্ত চাপ সামলাতে ডায়রিয়া ওয়ার্ডে ১০টি শয্যার পাশাপাশি বাইরে আরও ১০টি শয্যা সংযুক্ত করা হয়েছে। এই ২০ শয্যা দিয়ে চাপ সামলানো অসম্ভব হলে পুরুষ সার্জারি ওয়ার্ডে ব্যবস্থা করা হবে। ইতোমধ্যে ওয়ার্ডটি খালি করে রেখেছি। তবে এখন পর্যন্ত প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হলে অধিকাংশ রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন। আর গুরুতরদের শুধু ওয়ার্ডে ভর্তি রাখা হচ্ছে।

বিজনেস বাংলাদেশ/বিএইচ