আবারও অশান্ত হয়ে উঠেছে কুষ্টিয়ার ঝাউদিয়া ইউনিয়নের আস্থানগর গ্রাম। গত ২ মে বিকালে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে কেরামত আলী বিশ্বাস ও ফজলু মন্ডল গ্রুপের সংঘর্ষে ৪জন নিহত ও অন্তত ১৫ জন আহত হন। এই ঘটনায় পৃথক পৃথক দু’টি হত্যা মামলায় সাবেক ও বর্তমান চেয়ারম্যান সহ ৯৮ জনকে আসামি করা হয়েছে।
ঘটনার পরদিন ৩ মে সংঘর্ষে নিহত মতিয়ার মন্ডলের ভাই আশরাফুল বাদী হয়ে ৭১ জনকে আসামি করে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। উক্ত মামলায় ঝাউদিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক চেয়ারম্যান কেরামত আলী।
অন্যদিকে, একই দিন নিহত রহিম মালিথার ছেলে রফিকুল বাদী হয়ে ২৭জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। এই মামলায় বর্তমান চেয়ারম্যান মেহেদি কেও আসামী করা হয়েছে।
পৃথক পৃথক দুটি হত্যা মামলায় ৯৮ জন আসামির মধ্যে এ পর্যন্ত ১১ জন আসামিকে আটক করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানার অফিসার ইনচার্জ মোস্তাফিজুর রহমান। আটককৃতরা হলেন- ১. বিল্লাল হোসেন মন্ডল (৪৫) পিতা তাইজাল মন্ডল, ২. মুছাব জোয়াদ্দার (৬০) পিতা মৃত আফতাব জোয়াদ্দার, ৩. খোকন আলী (৩৬) পিতা মৃত গঞ্জের বিশ্বাস ৪. উজ্জ্বল বিশ্বাস (২২) পিতা শফিরউদ্দিন বিশ্বাস, ৫. হাফিজুর রহমান (৪০) পিতা মোয়াজ্জেম মন্ডল, ৬. সেলিম আলী মন্ডল (৩৫) পিতা মৃত মইনুদ্দীন মন্ডল, ৭. আসাদুল মন্ডল (৪৫) পিতা মৃত রোজদার মন্ডল, ৮. রাজু আহমেদ (২৭) পিতা হায়দার আলী মন্ডল, ৯. টোকন মন্ডল (৩০) পিতা মৃত গঞ্জের মন্ডল, ১০. সাবান আলী (৩৮) পিতা আইনুদ্দিন মন্ডল, ১১. ইছাহক মন্ডল (৩৫) পিতা মৃত হারেজ মন্ডল সর্বসাং- আস্থানগর, থানা- ই.বি, জেলা- কুষ্টিয়া।
এদিকে চাঞ্চল্যকর ৩ হত্যা মামলার পলাতক আসামি ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সভাপতি সাবেক চেয়ারম্যান কেরামত আলী বিশ্বাস র্যাবের হাতে আটক হয়েছেন বলে দাবি করেছেন তার পরিবার। কেরামত আলীর স্ত্রী সামসুন্নাহার জানান, গত ৫মে বৃহস্পতিবার দুপুর আড়াইটার দিকে আমার ছোট ননদ রাশু ফোন দিয়ে বলেন তার ভাইকে র্যাব-১২ আটক করে নিয়ে গেছে। এরপর থেকে রাশু আর ফোন রিসিভ করছে না। পরে জানতে পারি রাশুর ননদের ছেলে রাব্বি র্যাব দিয়ে আমার স্বামীকে (কেরামত আলী) ধরিয়ে দিয়েছে।
তবে আটকের বিষয়ে কুষ্টিয়া র্যাব-১২ সিপিসি-১ এর কোম্পানি কমান্ডার স্কোয়াড্রন লীডার মোহাম্মদ ইলিয়াস খান এর মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, কেরামত আলী বিশ্বাস নামের কাউকে আটক করা হয়নি।
স্থানীয়দের বরাত দিয়ে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে ঝাউদিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক চেয়ারম্যান কেরামত আলী বিশ্বাস গ্রুপের সঙ্গে ফজলু মন্ডল গ্রুপের বিরোধ চলে আসছিল। ফজলু মন্ডল আগে বিএনপি’র রাজনীতির সাথে যুক্ত থাকলেও বর্তমানে তিনি আওয়ামীলীগের রাজনীতিতে সক্রিয়। সোমবার সন্ধ্যার আগে উভয় গ্রুপের লোকজন দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে একে অপরের ওপর হামলে পড়ে। এতে উভয়পক্ষের ৪ জন নিহত হন। ঈদের দিন মঙ্গলবার বিকালে বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে আস্থানগর কবরস্থানে তাদের দাফন সম্পন্ন হয়। ঘটনার পর থেকে গ্রেফতার আতঙ্কে গ্রামটি পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে। তাছাড়া নিহতদের পরিবারে চলছে স্বজন হারানোর আহাজারি।
স্থানীয় বাসিন্দারা আরো জানান, ঝাউদিয়া ইউনিয়নে এইরকম হত্যাকান্ড এবারই প্রথম নয়। দীর্ঘদিনের অশান্ত জনপদে বিভিন্ন সময় খুন হয়েছেন অনেকেই। ১৯৯৭ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি ঝাউদিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল আজিজকে খুন করা হয়। ১৯৯৯ সালের ১৭ জানুয়ারি খুন হন চেয়ারম্যান আলী আকবার। ওই সময় উপনির্বাচনে জাসদের আঞ্চলিক কমান্ডার আজিবর মেম্বারের বড় ভাই খয়বার রহমান চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তাকেও ২০০০ সালের ৫ নভেম্বর ইউনিয়ন পরিষদের ভেতরে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করা হয়। একই দিনে হত্যাকারীদের পাঁচজনকেও পিটিয়ে হত্যা করে এলাকাবাসী। খয়বার নিহত হওয়ার পরে আজিবর নিজেই ২০০৩ সালের নির্বাচনে দাঁড়ান এবং অস্ত্রের মুখে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এ সময় এলাকায় কমিউনিস্ট পার্টির প্রভাব বাড়তে থাকে। পরিস্থিতি প্রতিকূলে চলে যাওয়ায় ইউপি সদস্য মিজানুর রহমানের কাছে দায়িত্ব দিয়ে আজিবর ভারতে পালিয়ে যান। পরে ভারতে অবস্থানকালে তিনি খুন হন। আজিবরের আরেক ভাই দুলাল খুন হওয়ার মধ্য দিয়ে চরমপন্থি ওই পরিবারের তিন ভাইয়ের গল্প শেষ হয়ে যায়। চারজন চেয়ারম্যান ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে ঝাউদিয়ায় খুন হয়েছেন আস্থানগরের আজিজুল মন্ডল, বাথইলের পলান মন্ডল, ছলিমদ্দিন, উদয়পুরের আফতাব মেম্বর, মঞ্জু, বাখইল গ্রামের মজিদ, আজাদ, ঝাউদিয়ার আব্দুল হালিম, হাতিয়ার মাথা জোয়াদ্দার, মাছপাড়ার আক্কাস সর্দার, ছামছুদ্দিন, রহিম, রাজ্জাক, ফজু ফকির, ফিরোজ, শাহাজ উদ্দিন, ইমন আলী, আকালি ও সর্বশেষ সোমবার বিকালে আস্থানগরের কাশেম, লান্টু মন্ডল, রহিম মালিথা এবং মতিয়ার সহ ৫১জন।
এ ঘটনায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানার অফিসার ইনচার্জ মোস্তাফিজুর রহমান জানান, নতুন করে সংঘর্ষ এড়াতে এবং লুটপাটের সুযোগ বন্ধ করতে এলাকায় অতিরিক্তি পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ইতিমধ্যে এজাহারনামীয় ১১জন আসামিকে আটক করা হয়েছে তাছাড়া অনান্য আসামিদের ধরতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
সবশেষ এ নিউজ লেখা পর্যন্ত এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে এবং গ্রেফতার আতঙ্কে পুরো আস্থানগর গ্রাম পুরুষশূন্য হয়ে গেছে। তাছাড়া যেকোনো মুহূর্তে আবারও সংঘর্ষের আশঙ্কায় নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে এলাকাবাসীরা।
বিজনেস বাংলাদেশ/বিএইচ




















