গতকাল ছিলো ঐতিহাসিক ১০ মে। দিনটি বিশেষ কারণে দারুণ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ ১৯৭৯ সালের ১০ মে বিশ্বমানবতার কাছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়েছিলেন তার কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানা। সেদিন সুইডেনের স্টকহোমে অনুষ্ঠিত সর্ব-ইউরোপীয় বাকশালের এক সম্মেলন থেকে বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনার পক্ষে প্রথমবারের মতো ঘৃণ্য ওই হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবি তোলেন তার ছোট বোন শেখ রেহানা।
ওই সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনাকে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগদানের জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছিলো। কিন্তু তখন ভারত থেকে সুদূর সুইডেনে গিয়ে সম্মেলনে যোগ দেয়া তার পক্ষে সম্ভব ছিলো না। তাই সর্ব-ইউরোপীয় নেতারা শেখ হাসিনার প্রতিনিধিত্ব করতে লন্ডনে অবস্থানরত শেখ রেহানাকে অনুরোধ করেন। দিল্লি থেকে ফোনে শেখ হাসিনাও বোনকে বলেন, সম্মেলনে যেতে। অনুষ্ঠানে কী বলতে হবে সে বিষয়ে তিনি টেলিফোনে ছোট বোনকে নির্দেশনা দেন। শেখ রেহানা সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন।
সম্মেলনের প্রধান অতিথি শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে তার পাঠানো বাণী পাঠ করেন শেখ রেহানা। বড় বোনের পক্ষে বক্তব্যও দেন তিনি। এটাই ছিলো কোনো রাজনৈতিক সমাবেশে শেখ রেহানার প্রথম বক্তব্য রাখা। আন্তর্জাতিক এই সম্মেলনের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর কাছে তিনিই সর্বপ্রথম পঁচাত্তরের কলঙ্কজনক ও নারকীয় হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবি তোলেন। সেদিন ইউরোপের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, জাতিসংঘের মহাসচিব, জাতিসংঘের হিউম্যান রাইটস কমিশনের চেয়ারম্যান, আমেরিকার কংগ্রেসের হিউম্যান রাইটস কমিটির চেয়ারম্যান, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের চেয়ারম্যানসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনের প্রধানের কাছে বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার হত্যার বিচারের প্রশ্নে বাংলাদেশ সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করার অনুরোধ জানিয়েছিলেন তিনি।
পঁচাত্তরের পৈশাচিক বর্ণনা দিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে শেখ রেহানার আবেগঘন বক্তব্য সে অনুষ্ঠানে এক হৃদয়বিদারক পরিবেশ সৃষ্টি করেছিলো। হলভর্তি প্রবাসী বাঙালি নারী-পুরুষ, বিদেশি রাজনীতিবিদ, পার্লামেন্ট সদস্য ও সাংবাদিকরা পিনপতন নীরবতায় তার বক্তব্য শোনেন।
১৯৭৫ সালে সপরিবারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর জাতি ছিল স্তম্ভিত, দিকনির্দেশনাহীন। দেশে তখন সামরিক শাসন চলেছে। ছিলো না কোনো বাকস্বাধীনতাও। তখন শুধু দেশে কেন, দেশের বাইরেও কেউ এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রতিবাদ করার সাহস দেখাতে পারেনি। এমন পরিস্থিতিতে ১৯৭৯ সালের ১০ স্টকহোমে সর্ব-ইউরোপীয় বাকশালের সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক উত্থান-পতন ও নানা ঘটনাবলীর পর ১৯৯৬ সালে জনগণের ভোটে আবারও ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা দেশের প্রচলিত আইনে স্বাভাবিক পন্থায় পিতৃহত্যাকারীদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন। এরপর ১৯৯৭ সালের ১২ মার্চ বিচারকাজ শুরু হয়। ১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর বিচারক কাজী গোলাম রসুল ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশের আদেশ দিয়ে জাতির পিতা হত্যাকাণ্ড মামলার রায় ঘোষণা করেন।
পরবর্তীতে ২০০৯ সালের ১৯ নভেম্বর ওই মামলার আপিলের তথা চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করা হয়। ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি পাঁচ আসামির ফাঁসির রায় কার্যকর হয়, পিতা হত্যার বিচারের মাধ্যমে কলঙ্কমুক্ত হয় দেশ, জাতি।
যদিও বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে জড়িত এখন পর্যন্ত ছয়জনের ফাঁসি হয়েছে। বাকি আছেন আরও পাঁচজন। তারা হলেন- আব্দুর রশীদ, শরীফুল হক ডালিম, মোসলেম উদ্দিন, রাশেদ চৌধুরী ও এবিএমএইচ নূর চৌধুরী। এরমধ্যে রাশেদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে এবং নূর চৌধুরী কানাডায় অবস্থান করছেন। অন্যদিকে আব্দুর রশীদ, শরীফুল হক ডালিম ও মোসলেম উদ্দিন কোথায় আছেন সেই খোঁজ এখন পর্যন্ত অজানা।

























