পার্বত্য জেলা বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার দুর্গম পথ অতিক্রম করে প্রচুর বিদেশি গরু আসছে দেশে। স্থানীয় গরু বাজার ইজারাদারদের রিসিটে এসব গরু বিক্রি দেখানো হয়। গত ১৭ মে বুধবার একদিনে ৫-৬ ট্রাক ভর্তি করে আলীকদম-লামা-চকরিয়া সড়ক দিয়ে গরু পাচারের দৃশ্য চোখে পড়ে। বিক্রির রিসিটে গরু গুলো স্থানীয় উল্লেখ করা হলেও বাস্তবে সে গুলো উন্নত ব্রাহামা জাতের। যা বাংলাদেশের খামারি বা কৃষক লালন পালন করেন না।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শুল্ক ফাঁকি দিয়ে প্রচুর পরিমান বিদেশি গরু আমদানি করছে একটি চক্র। থাইল্যান্ডের ব্রাহামা জাতের গরু মায়ানমার হয়ে আসছে বাংলাদেশে। অবৈধ আমদানিকারকরা নিরাপদ রোড হিসেবে সীমান্তবর্তী আলীকদমকে বেছে নিয়েছে। আন্তর্জাতিক গরু পাচারকারী এই সিন্ডিকেটে যুক্ত আছে কক্সবাজার-টেকনাফের একটি চক্র। বিগত দিনে শুল্ক আদায় কর্তৃপক্ষ ও সীমান্তরক্ষীদের চাপে পড়ে চোরা সিন্ডিকেটটি এখন পার্বত্য আলীকদম পোয়ামুহুরি সড়ক বেছে নিয়েছে। গত একমাস যাবৎ প্রতিদিন ট্রাক ভর্তি গরু নিয়ে ওই সড়ক দিয়ে লামা-আলীকদম ফাঁসিয়াখালী রাস্তা দিয়ে মহাসড়ক হয়ে দেশের বিভিন্ন শহরে পৌঁছে যায় থাইল্যান্ডি এইসব গরু।
আরো জানা যায়, এসব গরু উজ্জ্বল সুন্দর রঙ, আকৃতিতে অনেক বড় হওয়ায় সবার নজর কারে। ব্রাহামা জাতের গরু অল্প সময়ে সময়ে অনেক বড় আকার ধারণ করে। প্রতিটি গরু বিক্রি হয়, দুই থেকে তিন, সাড়ে তিন লাখ টাকায়। এর ফলে চোরা কারবারি মরিয়া হয়ে এই জাতের গরু আমদানি করছে। এতে প্রচুর পরিমান সরকারের শুল্ক ফাঁকিসহ দেশীয় মুদ্রা পাচার হচ্ছে বিদেশে। এই কাজের সাথে আলীকদম নয়াপাড়া ইউনিয়নের কয়েকজন জনপ্রতিনিধি জড়িত।
অপরদিকে বিদেশি গরু চোরাইপথে আসায় ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে দেশের খামারিরা। ইতিপূর্বে সরকার দেশীয় খামারিদের কথা ভেবে মায়ানমার থেকে গরু আমদানি বন্ধের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু একটি চক্র সীমান্তরক্ষী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্টদের চোখ ফাঁকি দিয়ে, অবৈধভাবে গরু আমদানি করে চলছে। আসন্ন কোরবানি উপলক্ষে এসব গরু দেশীয় বাজারে সরবরাহের টার্গেটে ইতিমধ্যে বিপুল পরিমাণে গরু আমদানী করেছে। পশুসম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০১৬ সালে সরকারের কৃত্রিম প্রজনন নীতিমালার অধীনে বেসরকারিভাবে এবং ব্যক্তি উদ্যোগে ব্রাহামা গরু আমদানি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। স্থানীয় সূত্র মতে, মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর অসাধু সদস্য, বাংলাদেশ ও মায়ানমার দালালদের সহযোগিতায় নদী ও পাহাড়ি পথে গরু গুলো নিয়ে আসা হচ্ছে। ট্রাকে ট্রাকে ব্রাহামা জাতের থাইল্যান্ডি গরুর আসার বিষয়টি সবার নজরে আসে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন জানান, প্রতিদিন পোয়ামুহুরি সড়কের ১০ কিলোমিটার পয়েন্টে রীতিমত বিদেশি গরুর হাট বসে। প্রতেক্ষদর্শীরা জানায়, গত চার দিন আগে ৯০টি ব্রাহামা জাতের গরু বিক্রি হয়েছে মাত্র এক কোটি টাকায়। যার স্থানীয় বাজার মূল্য আড়াই থেকে তিন কোটি হতে পারে। স্থানীয়দের সন্দেহ, এইসব গরু ক্রয় করতে বিগত এক বছরে নিশ্চয় কয়েক’শ কোটি টাকা অবৈধভাবে হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করেছে একটি চক্র।
লামা-আলীকদমের কয়েকজন খামারি, ডেইরি খাতে তাদের বিনিয়োগ ও বাস্তবতা দেখে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তারা জানান, অবৈধ পশু আমদানিকারীদের কারণে ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্থ হবেন তারা। এসব খামারিদের সারা বছরের স্বপ্ন কোরবানির হাট। কিন্তু গরু চোরা কারবারিরা বিদেশী গরু এনে খামারীদের স্বপ্ন ভেঙ্গে দেয়। এর ফলে নিরুৎসাহিত হয়ে ক্রমেই দেশের ডেইরি শিল্প ধ্বংস হওয়ার পথে।
বান্দরবান জেলা প্রশাসক ইয়াছমিন পারভীন তিবরীজি সাংবাদিককে জানান, এই বিষয়টি তিনি জানেন না। আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেরুবা ইসলাম সাংবাদিককে জানান, ১৮ মে বুধবার বিকেলে অভিযান চালিয়ে অবৈধভাবে পাচারে প্রস্তুতি নেয়া ২৫টি থাইল্যান্ডি ব্রাহামা জাতের গরু বোঝাই ২টি ট্রাক আটক করেছে। তৎক্ষনাৎ গরুর সঠিক কোন কাগজপত্র দেখাতে না পারায় ২৫টি গরু, ২টি ট্রাক ও এক পাচারকারীকে আলীকদম থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। ট্রাক ২টি লাইসেন্স নাম্বার যথাক্রমে চট্টমেট্রো ট- ১১-১২১৯ ও চট্টমেট্রো ট- ১১-১২৫৪।
বিজনেস বাংলাদেশ/ এ আর




















