০৯:২৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬

নবীনগরে “লতিরাজ” কচুর চাষ করে কৃষকের ভাগ্য পরিবর্তন

বাংলাদেশে কচুর বহুবিদ ব্যবহার রয়েছে, কচু শাক, কচুর ডগা, কচুর মুখি, ও লতি সবজি হিসাবে খাওয়া হয়ে থাকে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে লতিরাজ কচুর চাষ করা হচ্ছে। কচুতে প্রচুর পরিমান আয়রন ও ভিটামিন থাকে। কৃষি সপ্রসারণ অধিদফতরের হিসাবে বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৪৫ হেক্টর জমিতে পানিকচুর চাষ হচ্ছে, এ থেকে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ মন লতি পাওয়া যাবে। বর্তমানে বাংলাদেশে লতিকচুর অনেক জাত থাকলেও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে লতিরাজ নতুন জাত অবমুক্ত করা হয়েছে, এ লতি চাষ বেশ লাভজনক। লতিরাজ কচুর লতি সবুজ, সামান্য চেপ্টা,ও লম্বায় ৯০-১০০ সেমি. হয়। এ কচুর পাতার সংযোগ স্থলের ও বোঁটার রং বেগুনি, জীবন কাল ১৮০-২১০ দিন। লতিরাজ কচু আমাদের দেশের সব অঞ্চলেই চাষ করা যায। পলি, দো-আঁশ ও এটেল দো-আঁশ মাটিতে লতিরাজ কচু চাষের জন্য উপযুক্ত। বেলে মাটিতে রস ধরে রাখতে পারে না তাই এ মাটি লতি চাষের জন্য ভালো নয়। বৃষ্টির পানি জমেনা এবং প্রয়োজনে সহজেই পানি ধরে রাখা যায় এমন জমির কচু থেকে প্রচুর লতি পাওয়া যায়। লতির জন্য দুই ভাবে জমি তৈরী করা হয় ভেজা জমি তৈরি করার নিয়ম হলো-ধান রোপণের জমি যেভাবে তৈরি করা হয়ে থাকে সে ভাবে আর শুকনো ভাবে জমি তৈরির জন্য চার থেকে পাঁচটি আড়াআড়ি ভাবে চাষ ও মই দিয়ে জমি প্রস্তত করা হয়। আগাম লতি রোপনের জন্য কার্তিক( মধ্য অক্টোবর থেকে মধ্য নভেম্বর) লাগাতে হয়। একটি পূর্ণবয়স্ক পানিকচুর গোড়া থেকে যে সকল ছোট ছোট চারা বের হয়ে থাকে সে গুলোকেই বীজ হিসেবে জমিতে লাগানে হয় । চারা চার থেকে ছয় পাতার হলে সবল ও সতেজ গুলো রোপণের জন্য নির্বাচন করতে হয়। জমিতে চারা রোপণের সময় উপরের দিকের দুই থেকে তিনটি পাতা রোখে বাকি পাতা গুলো ছাঁটাই করে দিতে হবে।কোন চারা যদি গোড়ার দিকে বেশি লম্বা হয় তাহলে কিছু শিকড়সহ গোড়ার অংশবিশেষ ছাঁটাই করে দিতে হয়। কচুর সারি থেকে সারির দুরত্ব হবে ৬০ সেমি. এবং গাছ থেকে গাছ ৪৫ সেমি. দুরত্বে চারা রোপণ করতে হয়। চারা রোপণের জন্য মাটির গভীরতা হবে ৫-৬ সেমি । জমিতে চারা রোপণের সময় চারা যাতে হেলে না পড়ে সে জন্য মাটি কাদা করার সময় বেশি নরম করা যাবে না। গাছ কিছুটা বড় হলে গোড়ার হলুদ পাতা বা শুকিয়ে যাওয়া পাতা ছাঁটাই করে দিতে হয়। ক্ষেতে কোন প্রকার আগাছা জন্মাতে দেওয়া যাবে না। পানি কচুর গাছে লতি আসার সময় ক্ষেতে পানি জমতে দেওয়া যাবে না। আবার একেবার শুকনো রাখা যাবেনা শুকনো রাখলে লতি কম বের হয় বা দৈঘ্য কম হয়। প্রতি শতকে এমওপি ৭৫০ গ্রাম, ইউরিয়া ৬০০ গ্রাম, টিএসপি ৫০০ গ্রাম, গোবর ৫০কে.জি করে দিয়ে জমি তৈরির শেষ চাষের সময় দিতে হবে। ইউরিয়া সার ২/৩ কিস্তিতে প্রয়োগ করতে হবে। জমিতে কোন সময় দস্তা বা জিংকের অভাব থাকলে জিপসাম ও জিংক সালফেট সার ব্যবহার করতে হবে। কচু একটি জলজ উদ্ভিদ হলেও দীর্ঘ সময় ধরে জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না। বিশেষ করে লতি উৎপাদনের সময় জমিতে পানি ধরে রাখা উচিত নয়। কচুর সাধারনত কোন রোগ দেখা যায় না , রোগের মধ্যে কচুর পাতার মড়ক রোগ হয়ে থাকে। পাতার উপরে বাদামি থেকে বেগুনি রংয়ের গোলাকার দাগ দেখা যায়। পরবর্তীতে এ সমস্ত দাগ আকারে বড় হয়ে একত্রিত হয়ে যায় এবং পাতা ঝলসে যায়। পরে এ দাগ কচু ও কন্দে বিস্তার করে। রোগ দেখা দেওয়ার সাথে সাথে প্রতি লিটার পানিতে, ডাইথেন এম ৪৫ অথবা ২ গ্রাম রিডোমিল এম জেড-৭২ মিশিয়ে ১৫ দিন পরপর ৩-৪ বার প্রয়োগ করতে হবে। প্রয়োগের আগে ট্রিকস মিশিয়ে দিতে হবে। এ দিকে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জগলুল হায়দার জানান, অনেকেই লতিরাজ কচু চাষ করে বেকার সমস্যার সমাধান ও কৃষকের ভাগ্য পরিবর্তন হয়েছে উপজেলায় শতাধি কৃষক লতিরাজ চাষ করছে। নবীনগর উপজেলায় পৌর এলাকাসহ এ বছর ৪৫ হে. জমিতে লতিকচুর চাষ হয়েছে। এর মধ্যে ইব্রাহিমপুর, জিনদপুর, লাউর ফতেহপুর, পৌরসভা, শ্যমগ্রাম, নবীনগর পশ্চিম, কৃষ্ণনগর, বীরগাঁও, বড়াইল ইউনিয়নে সবচেয়ে বেশি আবাদ হয়। লতিকচুর মধ্যে বারি পানি কচু ১ বা লতিরাজ সবচেয়ে ভাল ও জনপ্রিয় জাত। এক বিঘা জমিতে প্রায় ৬০-৭০ মণ লতি পাওয়া যায়। কেজি প্রতি ৩০-৩৫ টাকা বিক্রি যায়, এতে প্রতি বিঘা জমি থেকে ১ লক্ষ টাকা আয় করা খুবই সহজ।

বিজনেস বাংলাদেশ/ এ আর

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

যশোর জেলা পুলিশের মাসিক কল্যাণ সভা অনুষ্ঠিত, ২০ সদস্যকে পুরস্কার প্রদান

নবীনগরে “লতিরাজ” কচুর চাষ করে কৃষকের ভাগ্য পরিবর্তন

প্রকাশিত : ০৫:০০:৪৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২২ মে ২০২২

বাংলাদেশে কচুর বহুবিদ ব্যবহার রয়েছে, কচু শাক, কচুর ডগা, কচুর মুখি, ও লতি সবজি হিসাবে খাওয়া হয়ে থাকে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে লতিরাজ কচুর চাষ করা হচ্ছে। কচুতে প্রচুর পরিমান আয়রন ও ভিটামিন থাকে। কৃষি সপ্রসারণ অধিদফতরের হিসাবে বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৪৫ হেক্টর জমিতে পানিকচুর চাষ হচ্ছে, এ থেকে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ মন লতি পাওয়া যাবে। বর্তমানে বাংলাদেশে লতিকচুর অনেক জাত থাকলেও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে লতিরাজ নতুন জাত অবমুক্ত করা হয়েছে, এ লতি চাষ বেশ লাভজনক। লতিরাজ কচুর লতি সবুজ, সামান্য চেপ্টা,ও লম্বায় ৯০-১০০ সেমি. হয়। এ কচুর পাতার সংযোগ স্থলের ও বোঁটার রং বেগুনি, জীবন কাল ১৮০-২১০ দিন। লতিরাজ কচু আমাদের দেশের সব অঞ্চলেই চাষ করা যায। পলি, দো-আঁশ ও এটেল দো-আঁশ মাটিতে লতিরাজ কচু চাষের জন্য উপযুক্ত। বেলে মাটিতে রস ধরে রাখতে পারে না তাই এ মাটি লতি চাষের জন্য ভালো নয়। বৃষ্টির পানি জমেনা এবং প্রয়োজনে সহজেই পানি ধরে রাখা যায় এমন জমির কচু থেকে প্রচুর লতি পাওয়া যায়। লতির জন্য দুই ভাবে জমি তৈরী করা হয় ভেজা জমি তৈরি করার নিয়ম হলো-ধান রোপণের জমি যেভাবে তৈরি করা হয়ে থাকে সে ভাবে আর শুকনো ভাবে জমি তৈরির জন্য চার থেকে পাঁচটি আড়াআড়ি ভাবে চাষ ও মই দিয়ে জমি প্রস্তত করা হয়। আগাম লতি রোপনের জন্য কার্তিক( মধ্য অক্টোবর থেকে মধ্য নভেম্বর) লাগাতে হয়। একটি পূর্ণবয়স্ক পানিকচুর গোড়া থেকে যে সকল ছোট ছোট চারা বের হয়ে থাকে সে গুলোকেই বীজ হিসেবে জমিতে লাগানে হয় । চারা চার থেকে ছয় পাতার হলে সবল ও সতেজ গুলো রোপণের জন্য নির্বাচন করতে হয়। জমিতে চারা রোপণের সময় উপরের দিকের দুই থেকে তিনটি পাতা রোখে বাকি পাতা গুলো ছাঁটাই করে দিতে হবে।কোন চারা যদি গোড়ার দিকে বেশি লম্বা হয় তাহলে কিছু শিকড়সহ গোড়ার অংশবিশেষ ছাঁটাই করে দিতে হয়। কচুর সারি থেকে সারির দুরত্ব হবে ৬০ সেমি. এবং গাছ থেকে গাছ ৪৫ সেমি. দুরত্বে চারা রোপণ করতে হয়। চারা রোপণের জন্য মাটির গভীরতা হবে ৫-৬ সেমি । জমিতে চারা রোপণের সময় চারা যাতে হেলে না পড়ে সে জন্য মাটি কাদা করার সময় বেশি নরম করা যাবে না। গাছ কিছুটা বড় হলে গোড়ার হলুদ পাতা বা শুকিয়ে যাওয়া পাতা ছাঁটাই করে দিতে হয়। ক্ষেতে কোন প্রকার আগাছা জন্মাতে দেওয়া যাবে না। পানি কচুর গাছে লতি আসার সময় ক্ষেতে পানি জমতে দেওয়া যাবে না। আবার একেবার শুকনো রাখা যাবেনা শুকনো রাখলে লতি কম বের হয় বা দৈঘ্য কম হয়। প্রতি শতকে এমওপি ৭৫০ গ্রাম, ইউরিয়া ৬০০ গ্রাম, টিএসপি ৫০০ গ্রাম, গোবর ৫০কে.জি করে দিয়ে জমি তৈরির শেষ চাষের সময় দিতে হবে। ইউরিয়া সার ২/৩ কিস্তিতে প্রয়োগ করতে হবে। জমিতে কোন সময় দস্তা বা জিংকের অভাব থাকলে জিপসাম ও জিংক সালফেট সার ব্যবহার করতে হবে। কচু একটি জলজ উদ্ভিদ হলেও দীর্ঘ সময় ধরে জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না। বিশেষ করে লতি উৎপাদনের সময় জমিতে পানি ধরে রাখা উচিত নয়। কচুর সাধারনত কোন রোগ দেখা যায় না , রোগের মধ্যে কচুর পাতার মড়ক রোগ হয়ে থাকে। পাতার উপরে বাদামি থেকে বেগুনি রংয়ের গোলাকার দাগ দেখা যায়। পরবর্তীতে এ সমস্ত দাগ আকারে বড় হয়ে একত্রিত হয়ে যায় এবং পাতা ঝলসে যায়। পরে এ দাগ কচু ও কন্দে বিস্তার করে। রোগ দেখা দেওয়ার সাথে সাথে প্রতি লিটার পানিতে, ডাইথেন এম ৪৫ অথবা ২ গ্রাম রিডোমিল এম জেড-৭২ মিশিয়ে ১৫ দিন পরপর ৩-৪ বার প্রয়োগ করতে হবে। প্রয়োগের আগে ট্রিকস মিশিয়ে দিতে হবে। এ দিকে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জগলুল হায়দার জানান, অনেকেই লতিরাজ কচু চাষ করে বেকার সমস্যার সমাধান ও কৃষকের ভাগ্য পরিবর্তন হয়েছে উপজেলায় শতাধি কৃষক লতিরাজ চাষ করছে। নবীনগর উপজেলায় পৌর এলাকাসহ এ বছর ৪৫ হে. জমিতে লতিকচুর চাষ হয়েছে। এর মধ্যে ইব্রাহিমপুর, জিনদপুর, লাউর ফতেহপুর, পৌরসভা, শ্যমগ্রাম, নবীনগর পশ্চিম, কৃষ্ণনগর, বীরগাঁও, বড়াইল ইউনিয়নে সবচেয়ে বেশি আবাদ হয়। লতিকচুর মধ্যে বারি পানি কচু ১ বা লতিরাজ সবচেয়ে ভাল ও জনপ্রিয় জাত। এক বিঘা জমিতে প্রায় ৬০-৭০ মণ লতি পাওয়া যায়। কেজি প্রতি ৩০-৩৫ টাকা বিক্রি যায়, এতে প্রতি বিঘা জমি থেকে ১ লক্ষ টাকা আয় করা খুবই সহজ।

বিজনেস বাংলাদেশ/ এ আর