নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চল ও জনবহুল উপজেলা রূপগঞ্জে প্রায় ২৫ হাজার অটোরিক্সা-ইজিবাইক গিলে খাচ্ছে সরকারের বিদ্যুৎ ব্যাবহার নিয়ন্ত্রন করে সঞ্চয় করা বিদ্যুৎ। যেখানে দোকান-পাট,মার্কেট রাত ৮ টায় বন্ধ করা , সপ্তাহিক ছুটি বাড়ানো সহ বেশি মাত্রায় ব্যবহারের জায়গা গুলোতে বিদ্যুৎ ব্যাবহার নিয়ন্ত্রন করে সাশ্রয়ের চেষ্টা চলছে। লোডশেডিংয়ের মাধ্যমে সমতা আনা হচ্ছে। ঠিক সে সময়ে সঞ্চয় করা বিদ্যুৎ গিলে খাচ্ছে অটোরিক্সা ও ইজিবাইক।
সড়ক-মহাসড়ক শাখা সড়ক ও আনাচে-কানাচে দাপিয়ে বেড়ানো অসংখ্য ব্যাটারী চালিত যান সাশ্রয় করা বিদ্যুতের বিশাল অংশ বৈধ ও অবৈধ পন্থায় সাবার করে দিচ্ছে। বিদ্যুৎখেকু এ ধরনের ব্যাটারিচালিত যানবাহনে ছেয়ে গেছে উপজেলার গ্রাম-গঞ্জে হাটবাজারের অলিগলি। এসব যানবাহন ব্যাটারির মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ায় এবং অবৈধ পন্থায় বিদ্যুৎ ব্যাবহারের মাধ্যমে একদিকে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে অন্যদিকে বিদ্যুতের অবাধ ব্যাবহারে জাতিয় গ্রিডে চাপ পরছে। উপজেলার ৮০ শতাংশ গ্যারেজেই এসব অটোরিক্সা ও ইজিবাইকের ব্যাটারি চার্জ করতে ব্যবহার করা হচ্ছে অবৈধ বিদ্যুৎ লাইন। অনেক স্থানে চলছে মিটার টেম্পারিং এর মতো ঘটনা। এতে সৃষ্ঠ বিদ্যুৎ ঘাটতি লোডশেডিংয়ের মাধ্যমে সমতা আনতে হচ্ছে।
অটোরিক্সা ও ইজিবাইক সংশ্লিষ্টদের সাথে কথাবলে তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, সাধারণত একটি ইজিবাইকের জন্য চার থেকে পাঁচটি ১২ ভোল্টের ১২০ এম্পিয়ার আওয়ারের লিড এ্যাসিড ব্যাটারি সংযোজন করা হয়। আর প্রতি সেট ব্যাটারি চার্জের জন্য গড়ে ৯০০ থেকে ১১০০ ওয়াট হিসেবে পাঁচ থেকে ছয় ইউনিট ( কমপক্ষে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা) বিদ্যুৎ খরচ হয়। আর এতে সে হিসাবে উপজেলার প্রায় ২৫ হাজার ইজি বাইক বা ব্যাটারিচালিত রিকশা চার্জের জন্য জাতীয় গ্রিড থেকে প্রতিদিন ২৭.৫ মেগাওয়াট এবং মাসে ৮২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ খরচ হওয়ার কথা। কিন্তু ৮০ ভাগ ইজিবাইকের গ্যারেজে চুরি করে ও লুকিয়ে বিদ্যুৎ ব্যবহার অন্যথায় বানিজ্যিক মিটার ব্যাবহার না করে বাসা বাড়ির আবাসিক বিদ্যুৎ সংযোগে এসব ব্যাটারি রিচার্জ করায় সরকার প্রায় ৬৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে প্রতিদিন বিপুল পরিমান রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বিদ্যুৎ বিভাগ। পাশাপাশি জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের ওপর চাঁপ বাড়ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাণিজ্যিক ভিত্তিতে গড়ে ওঠা চার্জিং গ্যারেজের মালিকরা প্রতিটি ইজিবাইক থেকে রাতভর একটি গাড়ির শুধুমাত্র চার্জের জন্য নিচ্ছেন ১০০ থেকে ১৫০ টাকা করে। বেশ কয়েকটি এলাকার অটোরিকশা গ্যারেজে ঘুরে জানা গেছে, এসব গ্যারেজে ব্যাটারি চার্জ দিতে গিয়ে অনেকবিদ্যুৎ বিল দিতে হয়। যে কারণে গ্যারেজ মালিকরা খরচ কমিয়ে বাড়তি টাকা আয়ের জন্য অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে থাকে। তবে এসব অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ নেয়ার পেছনে পল্লী বিদ্যুতের একদল অসাধু কর্মকর্তা জরিত থাকার অভিযোগ রয়েছে। যে কারণে বিদ্যুত খাতে সরকার প্রতিদিন বিপুল পরিমান রাজস্ব হারাচ্ছেন। বিদ্যুৎ ঘাটতি পুরনে এবং ব্যবহার কমাতে সরকার লোডশেডিংয়ের মাধ্যমে সমতা আনছে। বিদ্যুতের ব্যবহার কমাতে ধর্মিয় প্রবিত্র স্থান মসজিদ গুলোতে নামাজের সময় ছাড়া শীতাতপ নিয়ন্ত্রণযন্ত্র (এসি) বন্ধ রাখার নির্দেশনা দিয়েছে।

সেই সাথে সরকারি অফিসে বিদ্যুতের ব্যবহার কমানোর নির্দেশনা দিয়েছে। কিন্তু বিদ্যুৎ গিলে খাওয়ার অন্যতম মাধ্যম ইজিবাইক ও অটোরিকশা বিষয়ে কোনও নির্দেশনা ও সিদ্ধান্ত আসছেনা। উপজেলায় কি পরিমান ইজিবাইক, ব্যাটারিচালিত রিকসা ও ভ্যান চলাচল করছে তারও কোন পরিসংখ্যান নেই কোন দপ্তরে। অথচ এই ব্যাটারিচালিত যানবাহনের কারণেই আজ দেশব্যাপী বিদ্যুত ঘাটতির কারণে লোডশেডিংয়ের কবলে পরতে হয়েছে বলে জানিয়েছেন উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি মহাসড়ক দাপিয়ে বেড়ানো এসব যানবাহনের কারণেই একের পর এক দুর্ঘটনায় অসংখ্য প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। এ সমস্থ যান মহাসড়ক গুলোতে চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। অভিযোগ রয়েছে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ, ট্রাফিক বিভাগ ও হাই ওয়ে পুলিশকে নিয়মিত মাসোহারা দিয়েই রাস্তায় চলাচল করছে ব্যাটারী চালিত এসব যানবাহন।
জেলা প্রশাসন বা ট্রাফিক বিভাগের কাছে এ যানবাহনের সুনিদৃষ্ট সংখ্যার কোনো পরিসংখ্যান না থাকলেও ধারণা করা হয় পুরো নারায়ণগঞ্জ জেলার ৫টি উপজেলায় বর্তমানে কমপক্ষে ৫০ হাজারের বেশি অটোরিকশা চলাচল করছে। বিশেষ করে ব্যাস্ত নগরী রূপগঞ্জ শিল্পাঞ্চল এলাকায় এর সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ২৫ হাজারের মতো। তবে সাধারণ মানুষের মতে, যেখানে বিদ্যুতের ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে সেখানে এই যানগুলোতে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার বিদ্যুতের অপচয় ছাড়া আর কিছুই না। সরকারের উচিৎ বিকল্প পথ তৈরী করা। অন্যথায় এব্যপারে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া।
ভুলতা এলাকার ইজিবাইক চালক জসিম বলেন, অটোরিক্সা,ইজিবাইকের ব্যাটারী চার্জ দেওয়ায় বিদ্যতের উপড় চাঁপ পড়ছে এটা ঠিক। কিন্তু সরকার থেকে আমাদের বিকল্প ব্যবস্থা করে দেওয়া হোক যাহাতে বিদ্যুৎ বিহীন অটোরিক্সা, ইজিবাইকের ব্যাটারী গুলো চার্জ দেওয়া যায়। তবে আমরা ইজিবাইক চালক-মালিক কেউ বেকার হবোনা যাত্রীরাও কমখরচে রাস্তায় চলাচল করতে পারবে। অন্যদিকে বিদ্যুতের উপড়ও চাঁপ কমে যাবে।
উপজেলার ভুলতা গাউছিয়া এলাকায় অবস্থিত ট্রাফিক ক্যাম্পের ট্রাফিক ইন্সপেক্টার (টিআই) ফারুক জানান,আমরা মহাসড়কে যানজট ও দুর্ঘটনা কমাতে ইজিবাইকের অবাধ বিচরণ ঠেকাতে প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছি। মহাসড়কে ব্যাটারী চালিত যান পেলেই আমরা আইনের আওতায় এনে ব্যবস্থা গ্রহন করছি। মাসহারা ও টোকেনের বিয়য়ে তিনি বলেন, আমরা কোনও মাসহারা বা টোকেন বানিজ্য করিনা মহাসড়কে ইজিবাইক দেখলেই আইনগত ব্যাবস্থা গ্রহন করে থাকি।
এ ব্যাপারে রূপগঞ্জ পুর্বাচল পল্লী বিদ্যুতের ডিজিএম লাভিবুল বাসার জানান, আমরা বিদ্যুতের অবৈধ ব্যবহার রোধ কল্পে প্রতিনিয়ত দিন-রাত কাজ করে যাচ্ছি। আমরা সপ্তাহে ৬ দিন রাতেও বিদ্যুতের অবৈধ ব্যবহার বন্ধে অভিযান পরিচালনা করছি।আগষ্ট মাসে প্রায় আমার এলাকায় ১৩ টি অবৈধ ভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার কারীকে চিহিন্ন করে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। গত মাসেও অভিযানের মাধ্যমে আমরা ক্ষতিগ্রস্থ ইউনিটের অর্থ বাবদ ৯১১৭২৬ টাকা আদায় করেছি। কিন্তু বিভিন্ন নেতাদের সুপারিশ ও হস্তক্ষেপে বাধাগ্রস্থ হচ্ছি।
তিনি আরও বলেন,সরকারীভাবে দেশের বিভিন্ন জায়গায় সোলার প্যানেলর মাধ্যমে বড় বড় সেতুতেও লাইট জালানো হচ্ছে পাশাপাশি বোরো ক্ষেতে পানি সেচের জন্যও ব্যবহার করা হচ্ছে। তেমনিভাবে সোলার সিস্টেমে চার্জিং স্টেশন নির্মান করা গেলেও গ্রিডের ওপর চাঁপ কমে যাবে। এতে করে ব্যাটারিচালিত যানবাহনের কারণে বিদ্যুতের যে ঘাটতি হচ্ছে তা অনেকাংশে কমে আসবে।
বিজনেস বাংলাদেশ/ হাবিব




















