বিজনেস বাংলাদেশ/ হাবিব
সন্ধ্যা নামার আগে ঘরমুখো মানুষের যাত্রা নির্বিঘ্ন করতে রাস্তায় ব্যস্ত ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা। তাদের লক্ষ্য, ইফতারের আগে নগরীর মানুষ যেন নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছতে এবং প্রিয়জনদের নিয়ে একসঙ্গে ইফতার করতে পারেন। অথচ এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পুলিশ সদস্যদের প্রিয়জনদের সঙ্গে ইফতার করা সম্ভব হয় না। যার কারণে পথেই ইফতার সারতে হচ্ছে তাদের, তাও আবার অল্প সময়ের মধ্যে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকার প্রতিটি মোড়ে এই চিত্র দেখা যায়। নিজের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পরিবারের সঙ্গে ইফতার করতে না পারলেও খুব একটা দুঃখ নেই এই পুলিশ সদস্যদের। তাদের ভাষ্য, বাবা-মা, স্ত্রী, সন্তানের বাইরে সব পুলিশ সদস্যরাও একটি বড় পরিবার। কম সময় হলেও এই পরিবার মিলে ইফতারি করার মধ্যে আনন্দ রয়েছে। রাজধানীর বেশ কয়েকটি মোড় দেখা গেছে, ডিউটিতে থাকা ট্রাফিক পুলিশের সদস্যদের ইফতারের জন্য আলাদা বরাদ্দ রয়েছে। সে বরাদ্দের মধ্যে থাকে খেজুর, ছোলা, মুড়ি, বেশ কয়েকটি ইফতার আইটেমসহ একটি করে পানির বোতল। তবে বরাদ্দে পাওয়া ইফতার সামগ্রীর সঙ্গে নিজেদের অর্থায়নে আরও কিছু খাবার যুক্ত করেন তারা।
ধানমন্ডি ৩২ নাম্বার মোড়ে দায়িত্বে থাকা ট্রাফিক পুলিশ (সার্জেন্ট) সুমন কুমার মহন্ত বলেন, ‘আমাদের তো রাস্তা ছেড়ে এসে অন্য সবার মতো ইফতার করার সুযোগ নেই। কিছু সময় রাস্তায় (ট্রাফিক পুলিশ) কেউ না থাকলে, পুরো এলাকায় হযবরল লেগে যাবে। ফলে বাধ্য হয়ে পথে থাকতে হয়, পথেই ইফতার করতে হয়।
রাস্তায় দায়িত্বে থাকা ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের ইফতারের জন্য আলাদা বরাদ্দ থাকলে সময় মতো কেউ ইফতার করার সুযোগ পায়না ।সোনারগাঁও মোড়ে দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশ(সার্জেন্ট) মোঃ আসাদু্জ্জামান জুয়েল এর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন,ইফতারের আগে ডিউটিতে থাকা ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের কাছে ইফতার পৌঁছে দেওয়া হয় ঠিকই স্পটে সেগুলো একসঙ্গে করে সবাই মিলে খাওয়া হয় না কোনো দিন।মাগরিবের আজান দেওয়ার কিছু সময় আগে ইফতার সাজান কয়েকজন ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা কিন্তু বাকিরা ডিউটিতে। দ্রুত সময়ের মধ্যে মুড়ি, ছোলা, পেয়াজুসহ অন্যান্য খাবার মেশানো শেষে শরবত ও পানির কয়েকটি বোতল পৌঁছে দেওয়া হয় রাস্তায় যারা সিগন্যালে ডিউটি করছেন তাদের কাছে। আজান শুনে মাঝ রাস্তায় দাঁড়িয়ে রোজা ভাঙতে হয় আমাদের ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের।
সোনারগাঁও মোড়ে একজন ট্রাফিক ইন্সপেক্টর, চারজন সার্জেন্ট, দুইজন এএসআই, চারজন কনস্টেবল ও অতিরিক্ত চারজন সার্জেন্ট নিয়ে দায়িত্ব পালন করছেন। দায়িত্বে থাকা সবার জন্য ইফতারের আয়োজন করা হয়েছে। রমজানের শুরু থেকে বিকাল বেলায় রাস্তায় অতিরিক্ত যানবাহন ও যাত্রীদের চাপ থাকে।ঘরমুখো মানুষের ফেরার পথে যানজট নিরসন করে সন্ধ্যা ছয়টার মধ্যে যেন মানুষ বাড়ি ফিরতে পারেন সে ব্যবস্থা নিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ।নগরীতে চলমান মেট্রোরেলের কাজ, ওয়াসার খোঁড়াখুঁড়ি, বিশৃঙ্খল যান চলাচল, ভারী বৃষ্টি হলে সম্ভাব্য জলাবদ্ধতা- এগুলো যানজট নিরসনে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
নগরীর অন্য আরেকটি ব্যস্ততম মগবাজার মোড় এই বিষয়ে ট্রাফিক পুলিশ(সার্জেন্ট)ওমর ফারুক শিপন এর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন,আজকের বিজনেস বাংলাদেশ’কে বলেন, ‘রমজান উপলক্ষে ইফতার এর আগ মহুর্তে নগরীর প্রতিটি মোড়ে অতিরিক্ত গাড়ির পেশার থাকে সবার তাড়া থাকে সময় মতো ইফতার টি বাসায় গিয়ে করবে পরিবার এর সাথে তাই সবাই যে যার মতো করে তাড়াহুড়া করে,ইফতার টি ও সময় মতো কোনো দিন করা হয়েছে বলে আমার মনে হয়না,আর বাসায় যাওয়ার কথা তো আমার কল্পনা ও করতে পারি না।মেট্রোরেলের কাজকে মাথায় রেখে আমরা একটু অতিরিক্ত সতর্ক আছি। যানজট সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসার চেষ্টা করছি। আমাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী আমরা আমাদের সর্বোচ্চ দিয়ে দায়িত্ব পালন করছি বলে জানান এই ট্রাফিক পুলিশ কর্মকর্তা ।
ট্রাফিকের পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর ও দক্ষিণ- এই চার বিভাগের প্রতিটিতেই যানজট নিরসন ও অফিস ফেরত মানুষদের চলাচল স্বাভাবিক করতে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে আজকের বিজনেস বাংলাদেশকে জানিয়েছেন স্ব-স্ব বিভাগের প্রধানগণ। পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে- গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন, যাতে এলোপাতাড়ি গাড়ি দাঁড়িয়ে জট তৈরি না হয়; বিকাল তিনটা থেকে সিনিয়র অফিসারদের মাঠে থেকে দায়িত্ব পালন; প্রত্যেক থানা এলাকায় যেসব গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলো রয়েছে, সেখানে ক্রাইম পুলিশের দায়িত্ব পালন; মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাদের কাজের সমন্বয়; বিকল্প রাস্তা ব্যবহার; খালি গাড়ি এনে যাত্রী পরিবহনের ব্যবস্থা; ট্রাফিক পুলিশকে সহায়তা করার জন্য পিএমও থেকে প্রতিটি বিভাগে অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন করা হয়েছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) পাঁচটি বিভাগের একটি হলো ট্রাফিক বিভাগ। দুঃখের বিষয় হলো পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তীব্র শব্দদূষণে এ বিভাগের ১১ দশমিক ৮ শতাংশ সদস্যের শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস) ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।
গবেষণা জরিপে রাজধানীর বেশ কয়েকটি এলাকার ২২০ জন ট্রাফিক পুলিশ সদস্য অংশ নেন। এলাকাগুলো হলো ধানমন্ডি, সায়েন্সল্যাব, মহাখালী, যাত্রাবাড়ী, শাহবাগ ও মতিঝিল।১৫ দশমিক ৫ শতাংশ ট্রাফিক পুলিশ জানায়, সাধারণভাবে মোবাইলে কথা শুনতে তাদের অসুবিধা হয়। ১৯ দশমিক ১ ভাগ ট্রাফিক পুলিশ জানায়, ঘরের অন্য সদস্যদের তুলনায় বেশি ভলিউম দিয়ে তাদের টিভি দেখতে হয়। আর ৩৩ দশমিক ৯ ভাগ ট্রাফিক পুলিশ জানায়, অন্যরা উচ্চস্বরে কথা না বললে তাদের কথা শুনতে কষ্ট হয়। এদিকে ৮ দশমিক ২ ভাগ ট্রাফিক পুলিশ জানায়, কয়েক ঘণ্টা দায়িত্ব পালনের পর তারা ঘূর্ণিরোগ, মাথা ভনভন করা, বমি বমি ভাব ও ক্লান্তির সমস্যায় ভোগেন।নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেটের অভাবে ভোগান্তি ও পোহাতে ট্রাফিক সদস্যদের যার ফলে সারাবছরই নানা রোগ ব্যাধিতে ভুগতে হতো এই ট্রাফিক সদস্যদের।
কঠোর পরিশ্রম গাধার খাটুনির পরও অন্য বাহিনীর চেয়ে অনেক সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয় ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা। রোদ-বৃষ্টি, ধুলো-বালি আর শব্দ দূষণ ট্রাফিক পুলিশের নিত্যসঙ্গী। দিন-রাত রাস্তায় থাকার কারণে নানা রোগে ভুগছেন তারা। এরমধ্যে সাইনোসাইটিস, শ্বাসকষ্ট, মাথাব্যথা লেগে থাকে সারাবছরই। যানবাহনের তীব্র হর্নের কারণে শ্রবণ সমস্যায়ও ভোগেন অনেকে। ট্রাফিক শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণেও আছে নানা বিড়ম্বনা।ট্রাফিক পুলিশ অবিরাম কষ্ট করে,এতো ত্যাগ এর পরও কিছু মানুষ ট্রাফিক পুলিশের সমালোচনা করে।

গাড়িচালক ও পথচারীদের বেশিরভাগেরই রয়েছে আইন না মানার প্রবণতা। আইন মানাতে গেলেই নানা ধরনের হুমকি-ধমকির মুখোমুখি হতে হয় ট্রাফিক পুলিশকে। তারপরও এসব সামাল দিয়েই দায়িত্ব পালন করেন তারা। রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে দায়িত্ব পালনরত ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে তাদের দুঃখ-কষ্টের নানা কথা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ট্রাফিক পুলিশের কয়েকজন সদস্য আজকের বিজনেস বাংলাদেশ তে বলেন,কনস্টেবল ও সার্জেন্টরা দিনে আট ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করলেও ইন্সপেক্টর থেকে ওপরের কর্মকর্তারা ১৫ থেকে ১৮ ঘণ্টা কাজ করেন। তারা আরও জানান, ট্রাফিক পুলিশের কোনও ছুটি নেই। কাঙ্ক্ষিত পদোন্নতি নেই। শুধু কি তাই? দিন-রাত পরিশ্রমের পরও তাদের জন্য কোনও ধন্যবাদও নেই।
দুর্ঘটনাসহ নানা ঝুঁকির মধ্যে ব্যস্ততম সড়কে কাজ করেন ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা। এরপরও তাদেরকেই যানজটের জন্য নিত্য সাধারণ মানুষের গালমন্দ শুনতে হয়। সড়কে যানজট না থাকলে সেই কৃতিত্ব আর তাদের ভাগ্যে জোটে না।সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পুলিশের অন্যান্য বিভাগের কর্মকর্তারা ঝুঁকি ভাতা পেলেও ট্রাফিক (নিরস্ত্র) বিভাগের কর্মকর্তারা তা পান না।ঢাকা মহানগর ট্রাফিক পুলিশের যুগ্ম-কমিশনার বলেন, ‘ট্রাফিক পুলিশের অনেক সমস্যা আছে, যা বলে শেষ করা যাবে না।


























