১২:১৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

টাঙ্গাইলের মানবিক ‘নার্স’ হন ফাহিমা

স্কুল জীবনেই বিভিন্ন পেশা সম্পর্কে অবগত হন ফাহিমা আক্তার। মানুষকে সরাসরি সেবা দিতে অন্যান্য পেশায় পারিবারিক ও সামাজিক বাঁধা রয়েছে। তবে নার্স হিসেবে সেবা দিতে কোন বাঁধা নেই। সেই চিন্তা চেতনা থেকে বড় হয়ে নার্স হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন ফাহিমা। পড়াশোনা শেষে তার নার্স হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হয়। ফাহিমা আক্তার টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। বর্তমানে তিনি টাঙ্গাইলের মানবিক নার্স হিসেবে পরিচিত।
ফাহিমা আক্তার টাঙ্গাইল সদর উপজেলার উত্তর তারটিয়া গ্রামের বীরমুক্তিযোদ্ধা মো. মোজাম্মেল হোসেনের মেয়ে। চার বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে তিনি তৃতীয়। ১৯৯৭ সালে পাশ্ববর্তী বাসাইল উপজেলার আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাশ করেন। ওই বছরই তিনি টাঙ্গাইল নাসিং ইনস্টিটিউট এন্ড মিডওয়াইফাইফারি কলেজে ডিপ্লোমা ইন নার্সিং এন্ড ডিপ্লোমা ইন মিডওয়াইফারি বিষয়ে ভর্তি হন। ২০০৩ সালে ডিপ্লোমা ইন নার্সিং এন্ড ডিপ্লোমা ইন মিডওয়াইফারি শেষ করে ঢাকার একটি প্রাইভেট ক্লিনিকে চাকরি নেন। সেখানে তিনি ১০ বছর চাকরি করেন। পরবর্তীতে ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি নার্স পদে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে চাকরি শুরু করেন। ২০১৪ সালের জুন মাসে তিনি টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে যোগদান করেন। তারপর থেকে তিনি সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, বিশ্বমহামারি করোনাকালীন সময়ে মৃত্যুর ভয়ে টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে অনেকেই দায়িত্ব পালন করতে অনীহা প্রকাশ করেছেন। কাউকে কোন দায়িত্ব দিলেও আতঙ্কেও কারনে দায়িত্ব নিতে চায়নি। তবে ফাহিমা আক্তার করোনাকালীন সময়ে স্বেচ্ছায় দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি করোনাকারীন টানা ১৫ থেকে এক মাস পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছেন। স্বজনরা রোগির কাছে আসতে ভয় পেলেও ফাহিমা রাত দিন শত শত রোগিকে সেবা প্রদান করেছেন। তার সেবা অসংখ্য রোগি সুস্থ হয়েছেন। শুধু করোনাকালীন সময় নয়, বর্তমান সময়েও ঈদসহ যে কোন উৎসবের আনন্দ বাদ দিয়ে ফাহিমা টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালের রোগিদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। পরিবারের আপন সদস্যদের মতো ফাহিমাও রোগির পাশে দাঁড়ান। যে কারনে টাঙ্গাইলে ফাহিমা মানবিক নার্স হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন। এই সেবার ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে ফাহিমা সকলের দোয়া ও সহযোগিতা কামনা করেছেন।
লাভলু মিয়া নামের এক রোগির স্বজন বলেন, গত দুই চার বছরে তিন বার টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে রোগি নিয়ে এসেছি। যতবার ফাহিমা আপার সাথে দেখা হয়েছে ততবার তার কাছ থেকে সর্বোচ্চ সেবা পেয়েছি। অনেক সময় দেখা যায়, নার্সরা রোগির স্বজনদের সাথে খারাপ আচরণ করেন। কিন্তু ফাহিমা আপার ক্ষেত্রে সেটি কখনও পাইনি। তার উজ্জল ভবিষ্যত কামনা করি।
ফাহিমা আক্তার বলেন, অন্য পেশা থেকে সরাসরি সেবা দিতে গেলে পারিবারিক ও সামাজিকভাবে নানা কথা শুনতে হয়। সেক্ষেত্রে বাঁধাও থাকে। কিন্তু নার্স হিসেবে মানুষকে সরাসরি সেবা দিতে পারিবারিক ও সামাজিকভাবে তেমন কথা শুনতে হয় না, বাঁধাও থাকে না। সেই লক্ষ্যে মানুষকে সেবা দিতে নার্স হয়েছি। মানুষকে সেবা দিতে ভাল লাগে তাই সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি। নার্স হতে আমার বাবা মাসহ পরিবারের সকল সদস্যদের সার্বিক সহযোগিতা পেয়েছি।
তিনি আরও বলেন, করোনাকালিন সময়ে মৃত্যুর ভয়ে অনেকেই দায়িত্ব নিতে চায়নি। তবে মনে হতো ঘরে থাকলেও আমার মৃত্যু হতে পারে। তাই আমি হাসপাতালে এসে রোগিদের সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। পেছন থেকে আমার মেডামরা অনেক সাহস দিয়েছেন। এছাড়াও আমাদের টিমের সদস্য সজীব হোসাইন, আন্তাজ আলী, সেলিম মিয়া ও হামিদ মিয়াও সার্বক্ষনিক সহযোগিতা করেছেন। তাদের কারনেও সেবা দেয়া আমার পক্ষে সহজ হয়েছে।
টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালের নার্সিং সুপার ভাইজার হেলেনা খানম বলেন, আমি প্রায় ১০ বছর যাবত লক্ষ করছি ফাহিমা দায়িত্ব নিতে পছন্দ করে। নিরিবিলিভাবে কাজ করে সেই দায়িত্ব বাস্তবায়নও করেন তিনি। আমি তার আরও সফলতা কামনা করি।
হাসপাতালের উপ-সেবা তত্ত¡াবধায়ক খোদেজা খাতুন বলেন, করোনাকালীন সময়ে কেউ নিজে থেকে ডিউটি করার জন্য দায়িত্ব নিতে চাইতো না। তবে ফাহিমা নিজেই দায়িত্ব নিয়েছেন। তার অসুস্থ ছেলেকে বাসায় রেখে টানা কয়েক সপ্তাহ হাসপাতালে থেকে শত শত মানুষকে সততার সাথে সেবা দিয়েছেন। সে আসলেও একজন মানবিক নার্স।

বিজনেস বাংলাদেশ/ bh

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

নারায়ণগঞ্জে চারটিতে ধানের শীষ এবং একটিতে শাপলা কলি বিজয়ী

টাঙ্গাইলের মানবিক ‘নার্স’ হন ফাহিমা

প্রকাশিত : ০৪:৫৬:১০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১২ মে ২০২৩

স্কুল জীবনেই বিভিন্ন পেশা সম্পর্কে অবগত হন ফাহিমা আক্তার। মানুষকে সরাসরি সেবা দিতে অন্যান্য পেশায় পারিবারিক ও সামাজিক বাঁধা রয়েছে। তবে নার্স হিসেবে সেবা দিতে কোন বাঁধা নেই। সেই চিন্তা চেতনা থেকে বড় হয়ে নার্স হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন ফাহিমা। পড়াশোনা শেষে তার নার্স হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হয়। ফাহিমা আক্তার টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। বর্তমানে তিনি টাঙ্গাইলের মানবিক নার্স হিসেবে পরিচিত।
ফাহিমা আক্তার টাঙ্গাইল সদর উপজেলার উত্তর তারটিয়া গ্রামের বীরমুক্তিযোদ্ধা মো. মোজাম্মেল হোসেনের মেয়ে। চার বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে তিনি তৃতীয়। ১৯৯৭ সালে পাশ্ববর্তী বাসাইল উপজেলার আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাশ করেন। ওই বছরই তিনি টাঙ্গাইল নাসিং ইনস্টিটিউট এন্ড মিডওয়াইফাইফারি কলেজে ডিপ্লোমা ইন নার্সিং এন্ড ডিপ্লোমা ইন মিডওয়াইফারি বিষয়ে ভর্তি হন। ২০০৩ সালে ডিপ্লোমা ইন নার্সিং এন্ড ডিপ্লোমা ইন মিডওয়াইফারি শেষ করে ঢাকার একটি প্রাইভেট ক্লিনিকে চাকরি নেন। সেখানে তিনি ১০ বছর চাকরি করেন। পরবর্তীতে ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি নার্স পদে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে চাকরি শুরু করেন। ২০১৪ সালের জুন মাসে তিনি টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে যোগদান করেন। তারপর থেকে তিনি সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, বিশ্বমহামারি করোনাকালীন সময়ে মৃত্যুর ভয়ে টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে অনেকেই দায়িত্ব পালন করতে অনীহা প্রকাশ করেছেন। কাউকে কোন দায়িত্ব দিলেও আতঙ্কেও কারনে দায়িত্ব নিতে চায়নি। তবে ফাহিমা আক্তার করোনাকালীন সময়ে স্বেচ্ছায় দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি করোনাকারীন টানা ১৫ থেকে এক মাস পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছেন। স্বজনরা রোগির কাছে আসতে ভয় পেলেও ফাহিমা রাত দিন শত শত রোগিকে সেবা প্রদান করেছেন। তার সেবা অসংখ্য রোগি সুস্থ হয়েছেন। শুধু করোনাকালীন সময় নয়, বর্তমান সময়েও ঈদসহ যে কোন উৎসবের আনন্দ বাদ দিয়ে ফাহিমা টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালের রোগিদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। পরিবারের আপন সদস্যদের মতো ফাহিমাও রোগির পাশে দাঁড়ান। যে কারনে টাঙ্গাইলে ফাহিমা মানবিক নার্স হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন। এই সেবার ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে ফাহিমা সকলের দোয়া ও সহযোগিতা কামনা করেছেন।
লাভলু মিয়া নামের এক রোগির স্বজন বলেন, গত দুই চার বছরে তিন বার টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে রোগি নিয়ে এসেছি। যতবার ফাহিমা আপার সাথে দেখা হয়েছে ততবার তার কাছ থেকে সর্বোচ্চ সেবা পেয়েছি। অনেক সময় দেখা যায়, নার্সরা রোগির স্বজনদের সাথে খারাপ আচরণ করেন। কিন্তু ফাহিমা আপার ক্ষেত্রে সেটি কখনও পাইনি। তার উজ্জল ভবিষ্যত কামনা করি।
ফাহিমা আক্তার বলেন, অন্য পেশা থেকে সরাসরি সেবা দিতে গেলে পারিবারিক ও সামাজিকভাবে নানা কথা শুনতে হয়। সেক্ষেত্রে বাঁধাও থাকে। কিন্তু নার্স হিসেবে মানুষকে সরাসরি সেবা দিতে পারিবারিক ও সামাজিকভাবে তেমন কথা শুনতে হয় না, বাঁধাও থাকে না। সেই লক্ষ্যে মানুষকে সেবা দিতে নার্স হয়েছি। মানুষকে সেবা দিতে ভাল লাগে তাই সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি। নার্স হতে আমার বাবা মাসহ পরিবারের সকল সদস্যদের সার্বিক সহযোগিতা পেয়েছি।
তিনি আরও বলেন, করোনাকালিন সময়ে মৃত্যুর ভয়ে অনেকেই দায়িত্ব নিতে চায়নি। তবে মনে হতো ঘরে থাকলেও আমার মৃত্যু হতে পারে। তাই আমি হাসপাতালে এসে রোগিদের সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। পেছন থেকে আমার মেডামরা অনেক সাহস দিয়েছেন। এছাড়াও আমাদের টিমের সদস্য সজীব হোসাইন, আন্তাজ আলী, সেলিম মিয়া ও হামিদ মিয়াও সার্বক্ষনিক সহযোগিতা করেছেন। তাদের কারনেও সেবা দেয়া আমার পক্ষে সহজ হয়েছে।
টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালের নার্সিং সুপার ভাইজার হেলেনা খানম বলেন, আমি প্রায় ১০ বছর যাবত লক্ষ করছি ফাহিমা দায়িত্ব নিতে পছন্দ করে। নিরিবিলিভাবে কাজ করে সেই দায়িত্ব বাস্তবায়নও করেন তিনি। আমি তার আরও সফলতা কামনা করি।
হাসপাতালের উপ-সেবা তত্ত¡াবধায়ক খোদেজা খাতুন বলেন, করোনাকালীন সময়ে কেউ নিজে থেকে ডিউটি করার জন্য দায়িত্ব নিতে চাইতো না। তবে ফাহিমা নিজেই দায়িত্ব নিয়েছেন। তার অসুস্থ ছেলেকে বাসায় রেখে টানা কয়েক সপ্তাহ হাসপাতালে থেকে শত শত মানুষকে সততার সাথে সেবা দিয়েছেন। সে আসলেও একজন মানবিক নার্স।

বিজনেস বাংলাদেশ/ bh