পাবনা জেলা শহরের সবচেয়ে পুরনো লুঙ্গীর দোকানগুলো বড় বাজার এলাকার বেনিয়া পট্টির ব্যাংক রোডে। এখানে বড় বড় প্রায় ১২/১৫টি দোকানার রয়েছে। এখানকারই একটি প্রাচীন লুঙ্গীর দোকান আরাফ লুঙ্গীর ঘর। ঈদে লুঙ্গীর বাজার ঘুরে দেখতে গিয়ে কথা হয় আরাফ লুঙ্গী ঘরের আহসানালুল্লাহ মুন্সীর সাথে। তিনি জানান, সবচেয়ে পুরনো লুঙ্গীর দোকান এটি। চাচকিয়া লুঙ্গীর জন্য পাবনায় এ দোকানের বিশেষ খ্যাতি রয়েছে। বাপ দাদারা এই ব্যবসা করেছেন। তিনিও এই প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে হাল ধরেছেন লুঙ্গী ব্যবসার। তবে সেটি কতদিন ধরে রাখতে পারবেন সেটি নিয়ে তার রয়েছে দুশ্চিন্তা। দেশের মানুষের আর্থিক সংকটের সাথে বেচা বিক্রি কমেছে। এর সাথে আবার ডলারের মান বাড়ার কারণে বেড়েছে ভারত থেকে আমদানি করা সুতার দাম। এর প্রভাব পড়েছে লুঙ্গীতেও। লুঙ্গী প্রতি দাম বেড়েছে ৫০/১০০ টাকা। বেশির ভাগ দামি সুতাগুলো ইন্ডিয়া থেকে আসে৷ একারণেই সব লুঙ্গীর দাম না বাড়লেও কিছু কিছু লুঙ্গীর দাম বাড়তি। সবমিলিয়ে ঈদকে কেন্দ্র করে মার্কেট ও বিপণী বিতানগুলোতে ক্রেতার যে উপচে পড়া ভীড়, সেটি লুঙ্গী দোকানগুলোতে যেনো অলীক কল্পনা। ডলার সংকট ও সুতার দাম বৃদ্ধি সহ দেশের অর্থনৈতিক খাতে এমন সংকটকালীন সময়ের পূর্বে অর্থাৎ কয়েকবছর আগেও ঈদকে কেন্দ্র করে লুঙ্গীর ব্যাপক চাহিদা থাকার কারণে যে বেচা বিক্রি ছিলো এখন সেটি শুধুই সোনালি অতীত।
আহসানুল্লাহ বলেন, ঈদের বাকী মাত্র সপ্তাহ খানেক। এখন আপনাদের (সাংবাদিক) সাথে কথা বলার সময়ই পাবার কথা না, অথচ ক্রেতার আশায় বিক্রয়কর্মীদের সাথে মালিকদেরও টুল নিয়ে দোকানের বাইরে বসে থাকতে হচ্ছে। এখন যদি বেচা বিক্রি না হয় তবে আর কখন হবে?
তিনি বলেন, সম্প্রতি প্রতিদিন গড়ে ১০/১৫ হাজার টাকা বিক্রি হচ্ছে। গতবছর ৩০/৩৫ হাজার টাকা বেচা বিক্রি হয়েছে। দিন যাচ্ছে লুঙ্গী ও তাঁতশিল্পজাত পণ্যের দুর্দিন আরো জেঁকে বসছে। এভাবে চললে বাপ দাদার ব্যবসা কয়দিন চালাতে পারবো তা বলা মুশকিল।
একই ধরণের দু:খ ও হতাশার গল্প আধুনিক বস্ত্রালয়ের সত্ত্বাধিকারী আলমগীর কাওছারের। তিনি বলেন, আমার কাছে শুধু চাচকিয়া নয়, ২৫০ থেকে ৭৫০ টাকা দাম পর্যন্ত প্রায় সবধরণেই লুঙ্গী রয়েছে। এটাই ঈদের বিক্রির সবচেয়ে ভালো সময়। এখনই যাকাত ফিতরা প্রদানকারীরা শাড়ী লুঙ্গী কিনে অসহায়দের দেবেন। কিন্তু এই সময়েও সর্বোচ্চ হলেও ২০-২৫ হাজার টাকা বিক্রি হয়। এটি অতিথির মত। হঠাৎ কোনো একদিন হয়। এছাড়া ১০/১৫ হাজার টাকার বেশি বিক্রি হয় না। অথচ স্বাভাবিক সময়েই ৫/৭ হাজার টাকা করে বিক্রি হতো। তাহলে নতুন করে ঈদে আমাদের কি আশা করার আছে?
তিনি বলেন, সময় পাল্টেছে। এখন ট্রাউজার আর হাফ প্যান্টেই অবসর সময় কাটান অধিকাংশরা। যার কারণে লুঙ্গীর চাহিদা কম। মানুষের ব্যাপক অভাব। লুঙ্গীর চেয়ে খাবার ও অন্যান্য সামগ্রীর চাহিদা মেটানোই দায় হয়ে পড়েছে। এদিক চিন্তায় যাকাতের ধরণও পাল্টেছে। শাড়ি লুঙ্গীর বদলে এখন নগদ টাকাই বেশি দান করছেন বিত্তবানরা। কারণ অসহায়েরা নগদ টাকাতেই অধিক খুশি। সবমিলিয়ে লুঙ্গী বাজারে ঈদ নেই।
এদিকে ক্রেতা শূন্য লুঙ্গী দোকানগুলো ঘুরে কথা হয় কয়েকজন ক্রেতার সাথে। মুশফিক আহমেদ নামের ক্রেতা জানান, পূর্বে যেমন অফিস বা কাজ শেষ করে বাসায় গিয়ে লুঙ্গী পরার হতো এখন তেমন খুব পরা হয় না। মাঝে মাঝে পরার জন্য একটি হলেই হয়। যার জন্য কেনাও হয় না তেমন।
আরেক ক্রেতা গোলাম হাসান জানান, প্রায় ২০/৩০ জনের মধ্যে ৪/৫ জন বৃদ্ধকে যাকাত হিসেবে লুঙ্গী ও ২জনকে শাড়ি দিবো। তারা চেয়েছেন। বাকীদের নগদ অর্থ-ই দিবো। নগদ অর্থেই তাদের বেশি উপকার হয় বলে জানিয়েছেন। অথচ কয়েক বছর আগেও গড়ে সবাইকে শাড়ি লুঙ্গী দেয়া হতো।
তাঁতশিল্প তথা লুঙ্গী বুননে পাবনার ঐতিহ্য পুরনো। জেলার সদর উপজেলার দোগাছি ও আটঘরিয়ার চাচকিয়া সহ বিভিন্ন উপজেলার খলিয়া, লক্ষীপুর, গোপালপুর, সুজানগর, সাদুল্লাহপুর ও রাজাপুর নতুনপাড়ায় বুনন করা হয় ঐতিহ্যবাহী লুঙ্গীগুলো। আড়াইশো থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকা দাম পর্যন্ত লুঙ্গী হয় এখানে। তবে এবার পাবনার বাজারগুলোতে বেশি চাহিদা দোগাছির দোতার লুঙ্গীর। খুচরা বাজারে এর দাম সাড়ে ৪শো টাকার মত। এরপরই রয়েছে দেশখ্যাত চাচকিয়া লুঙ্গীর চাহিদা। এর বাইরে বিত্তবানদের জন্য সাড়ে ৪ হাজার টাকা দামের ডিসেন্ট ও প্রায় ৪ হাজার টাকার ক্রিসেন্ট লুঙ্গীও রয়েছে দোকানগুলোতে। তেমন বিক্রি না থাকলেও শুধু লুঙ্গী দোকান বা বস্ত্রালয়গুলোতে নয়, ফুটপাতেও লুঙ্গীর পসরা সাজিয়ে বসেছেন অনেকেই। তবে এদের মধ্যে ফরিয়ার সংখ্যাই বেশি। তাঁতিদের থেকে ক্রয় করে পাইকারি হাটগুলোতে দোকানিদের কাছে যে দামে বিক্রয় করেন, ওই দামেই রাস্তায় খুচরা ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করেন ফরিয়ারা। এতে দোকানিরা ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে লুঙ্গীর বাজার ফেরানোর মধ্য দিয়ে তাঁতি ও দোকানিদের।




















