০৩:৩৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৬

৫ আগস্ট থেকে ২৪৩ সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি মামলা

গণঅভ্যুত্থানের পর ৫ আগস্ট থেকে গত ১১ মাসে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মোট ৩৯৯টি মামলা করেছে—অর্থাৎ, গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ৩৬.২৭টি। এসব মামলায় মোট এক হাজার ২৬৪ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে, যার ২৭.১৩ শতাংশ বা ২৪৩ জন সরকারি কর্মকর্তা।

সম্প্রতি দুদকের প্রকাশিত এক পরিসংখ্যান প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা যায়।গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এবং ৮ আগস্ট অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দুদক দৃশ্যমানভাবে সক্রিয় হতে শুরু করে।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রথম তিন মাস দুদকের নেতৃত্বে ছিলেন মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ, যিনি আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নিয়োগপ্রাপ্ত ছিলেন। ২০২৪ সালের ২৯ অক্টোবর তিনি ও কমিশনের অন্য সদস্যরা পদত্যাগ করলে প্রায় দেড় মাস পরে ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের নেতৃত্বে একটি নতুন কমিশন দুদকের দায়িত্ব গ্রহণ করে।

এ বিষয়ে দুদকের মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) মো. আক্তার হোসেন আজকের বিজনেস বাংলাদেশ’কে বলেন, ‘দুদক আইনের আওতায় আনতে সরকারি কর্মকর্তাদের অপরাধের বিষয়টিকে আমরা অগ্রাধিকার দিচ্ছি। কারণ, দুর্নীতির মামলাগুলোর অধিকাংশ অভিযুক্তই তারা।’

৫ আগস্ট থেকে এখন পর্যন্ত দুটি কমিশন মিলিয়ে মোট ৭৬৮টি অভিযোগ প্রাথমিক তদন্তের জন্য গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে ৩৯৯টি মামলা দায়ের, ২৩১টি অভিযোগপত্র দাখিল ও নয়টি চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। কমিশন ২২৩টি সম্পদ বিবরণী জমার নোটিশও দিয়েছে। ড. মোমেন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর এ বছরের জানুয়ারিতে একক মাসে সর্বোচ্চ ৭০টি মামলা হয়েছে।

মামলাগুলোতে এক হাজার ২৬৪ জন অভিযুক্তের মধ্যে ২৪৩ জন সরকারি কর্মকর্তা, ১১৪ জন ব্যবসায়ী, ৯২ জন রাজনীতিবিদ, ৪৪৭ জন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী এবং ৩১ জন জনপ্রতিনিধি।

অভিযুক্তদের তালিকায় রয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত ও পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ ও মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ, বোন শেখ রেহানা, রেহানার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি, রেহানার মেয়ে আজমিনা সিদ্দিক রূপন্তি ও টিউলিপ রিজওয়ানা সিদ্দিক।

তালিকায় আরও রয়েছেন সাবেক মন্ত্রী, সাবেক সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ খ্যাতনামা ব্যবসায়ীরা।দুদক সূত্র জানায়, মামলাগুলোর মধ্যে ক্ষমতার অপব্যবহার, বৃহৎ সরকারি প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতি, অবৈধভাবে প্লট বরাদ্দ ও বৈধ আয়ের বাইরে সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। কয়েকজনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, টেন্ডারে কারচুপি ও অবৈধভাবে জমি দখলের অভিযোগও রয়েছে।

তাদের বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থপাচার এবং যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সুইজারল্যান্ড ও কানাডায় বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান করার অভিযোগও রয়েছে।

অনেকের বিরুদ্ধে শেয়ারবাজারে কারসাজি, বিনিয়োগকারীদের হাজার কোটি টাকা প্রতারণার মাধ্যমে আত্মসাৎ এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংক থেকে ভুয়া ঋণের মাধ্যমে বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুদকের কয়েকজন কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, কিছু মামলায় তাড়াহুড়ো করে তদন্ত করা হয়েছে এবং যথাযথ অনুসন্ধান ছাড়াই মামলা করা হয়েছে।
তারা সতর্ক করে বলেন, এ ধরনের ত্রুটির কারণে আদালতে অভিযোগ প্রমাণের সম্ভাবনাকে দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
গত ১১ মাসে দুদকে মোট ১২ হাজার ৮২৭টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এর মধ্যে শুধু গত বছরের নভেম্বরে জমা পড়েছে তিন হাজার ৪০৬টি। দুদক চেয়ারম্যানের দপ্তর ও অন্যান্য দপ্তর থেকে পাওয়া প্রায় তিন হাজার ৫০০টি অভিযোগ নিয়েও কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

 

ডিএস./

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

বিগত সময়ে সবচেয়ে বেশি অপরাধ ও অন্যায় করা হয়েছে সাতক্ষীরায়: ডা. শফিকুর রহমান

৫ আগস্ট থেকে ২৪৩ সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি মামলা

প্রকাশিত : ০৪:৩৬:৫৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ জুলাই ২০২৫

গণঅভ্যুত্থানের পর ৫ আগস্ট থেকে গত ১১ মাসে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মোট ৩৯৯টি মামলা করেছে—অর্থাৎ, গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ৩৬.২৭টি। এসব মামলায় মোট এক হাজার ২৬৪ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে, যার ২৭.১৩ শতাংশ বা ২৪৩ জন সরকারি কর্মকর্তা।

সম্প্রতি দুদকের প্রকাশিত এক পরিসংখ্যান প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা যায়।গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এবং ৮ আগস্ট অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দুদক দৃশ্যমানভাবে সক্রিয় হতে শুরু করে।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রথম তিন মাস দুদকের নেতৃত্বে ছিলেন মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ, যিনি আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নিয়োগপ্রাপ্ত ছিলেন। ২০২৪ সালের ২৯ অক্টোবর তিনি ও কমিশনের অন্য সদস্যরা পদত্যাগ করলে প্রায় দেড় মাস পরে ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের নেতৃত্বে একটি নতুন কমিশন দুদকের দায়িত্ব গ্রহণ করে।

এ বিষয়ে দুদকের মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) মো. আক্তার হোসেন আজকের বিজনেস বাংলাদেশ’কে বলেন, ‘দুদক আইনের আওতায় আনতে সরকারি কর্মকর্তাদের অপরাধের বিষয়টিকে আমরা অগ্রাধিকার দিচ্ছি। কারণ, দুর্নীতির মামলাগুলোর অধিকাংশ অভিযুক্তই তারা।’

৫ আগস্ট থেকে এখন পর্যন্ত দুটি কমিশন মিলিয়ে মোট ৭৬৮টি অভিযোগ প্রাথমিক তদন্তের জন্য গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে ৩৯৯টি মামলা দায়ের, ২৩১টি অভিযোগপত্র দাখিল ও নয়টি চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। কমিশন ২২৩টি সম্পদ বিবরণী জমার নোটিশও দিয়েছে। ড. মোমেন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর এ বছরের জানুয়ারিতে একক মাসে সর্বোচ্চ ৭০টি মামলা হয়েছে।

মামলাগুলোতে এক হাজার ২৬৪ জন অভিযুক্তের মধ্যে ২৪৩ জন সরকারি কর্মকর্তা, ১১৪ জন ব্যবসায়ী, ৯২ জন রাজনীতিবিদ, ৪৪৭ জন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী এবং ৩১ জন জনপ্রতিনিধি।

অভিযুক্তদের তালিকায় রয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত ও পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ ও মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ, বোন শেখ রেহানা, রেহানার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি, রেহানার মেয়ে আজমিনা সিদ্দিক রূপন্তি ও টিউলিপ রিজওয়ানা সিদ্দিক।

তালিকায় আরও রয়েছেন সাবেক মন্ত্রী, সাবেক সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ খ্যাতনামা ব্যবসায়ীরা।দুদক সূত্র জানায়, মামলাগুলোর মধ্যে ক্ষমতার অপব্যবহার, বৃহৎ সরকারি প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতি, অবৈধভাবে প্লট বরাদ্দ ও বৈধ আয়ের বাইরে সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। কয়েকজনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, টেন্ডারে কারচুপি ও অবৈধভাবে জমি দখলের অভিযোগও রয়েছে।

তাদের বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থপাচার এবং যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সুইজারল্যান্ড ও কানাডায় বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান করার অভিযোগও রয়েছে।

অনেকের বিরুদ্ধে শেয়ারবাজারে কারসাজি, বিনিয়োগকারীদের হাজার কোটি টাকা প্রতারণার মাধ্যমে আত্মসাৎ এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংক থেকে ভুয়া ঋণের মাধ্যমে বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুদকের কয়েকজন কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, কিছু মামলায় তাড়াহুড়ো করে তদন্ত করা হয়েছে এবং যথাযথ অনুসন্ধান ছাড়াই মামলা করা হয়েছে।
তারা সতর্ক করে বলেন, এ ধরনের ত্রুটির কারণে আদালতে অভিযোগ প্রমাণের সম্ভাবনাকে দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
গত ১১ মাসে দুদকে মোট ১২ হাজার ৮২৭টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এর মধ্যে শুধু গত বছরের নভেম্বরে জমা পড়েছে তিন হাজার ৪০৬টি। দুদক চেয়ারম্যানের দপ্তর ও অন্যান্য দপ্তর থেকে পাওয়া প্রায় তিন হাজার ৫০০টি অভিযোগ নিয়েও কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

 

ডিএস./