বিগত ২০১৩ সালে স্বৈরাচার হাসিনার বিরুদ্ধে পুরো দেশ যখন বিক্ষোভে ফেটে উঠছে। আর তখনি বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা আসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে দেশের লাইফলাইন খ্যাত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক তথা বন্দরনগরীর প্রবেশদ্বার সীতাকুণ্ড উপজেলা অচল করে দেওয়া হয়। বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধভাবে হাসিনার দুঃশাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। ফ্যাসিস্ট সরকার তার বাহিনী দিয়ে দেশের নানা স্থানে গুলি, হামলা, মামলা, গ্রেপ্তার করে আন্দোলন দমাতে সক্ষম হলেও সীতাকুণ্ডের আন্দোলন আসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে উল্কার গতিতে বাড়তে থাকে।
প্রতিদিনই সকাল থেকে সন্ধ্যা, আসলাম চৌধুরী নিজে শত শত নেতাকর্মী নিয়ে মহাসড়কে মিছিল, বিক্ষোভ, সমাবেশ, গণজমায়েত, সড়ক অবরোধ করে রাজনীতির মাঠে বিএনপিকে টিকিয়ে রেখেছিলেন। বলতে গেলে ওই সময় বিএনপি-জামায়াতের ঐক্যবদ্ধ হয়ে ঘোষিত হরতাল, অবরোধ শতভাগ বাস্তবায়ন হচ্ছিল সীতাকুণ্ডে। সরকার বুঝতে পারে যে, আসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে বিএনপি-জামায়াত কার্যত বন্দর নগরী ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অচল করে দিচ্ছে। এতে যেকোন সময় হাসিনা সরকারের পতন হতে পারে।
জাতীয় সংসদে তিন বার তিনটি অধিবেশনে শেখ হাসিনা দাঁড়িয়ে সীতাকুণ্ডের আন্দোলনের কথা তুলে ধরেন। এ সময় হাসিনা তত্ত্বাবদায়ক সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবীতে করা গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে জ্বালাও-পোড়াও ও অগ্নিসন্ত্রাস আখ্যা দিয়ে বিএনপি ও জামায়াতকে নিয়ে বিষোদগার করেন। শেখ হাসিনা সীতাকুণ্ডকে নরককুণ্ড অবহিত করে উল্লেখ করেন আসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে এসব আন্দোলন চলছে।
একপর্যায়ে তিনি গ্রেপ্তার হন। চার দফায় গ্রেপ্তার করা হলেও জামিনে মুক্ত হন আসলাম চৌধুরী। সর্বশেষ ২০১৬ সালের ১৫ মে আওয়ামী লীগ সরকারের লুটপাটের অংশ হিসেবে তিনশ মিলিয়ন ডলার অর্থ পাচার ও রাজকোষ চুরির ঘটনা সামনে আসায় বিএনপি নেতা লায়ন আসলাম চৌধুরীকে ঢাকার কুড়িল বিশ্বরোড় থেকে গ্রেপ্তার করে ওই ঘটনা ধামাচাপা দেয় হাসিনা সরকার। প্রথমে ৫৪ ধারায় তাকে গ্রেপ্তার করা হলেও পরে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে ইসরাইলের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তোলা হয়। এরপর একের পর এক মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কুমিল্লা, ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন কারাগারে বন্দী রাখা হয়। মোট ৭৬টি মামলা দেওয়া হয় তার বিরুদ্ধে। অনেক ব্যাংককে চাপ সৃষ্টি করে আসলাম চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলা দেয় সরকার এমন অভিযোগ বিএনপি নেতাদের।
২০১৬ সালের ১৫ মে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ খিলক্ষেতে যাওয়ার পথে ৩০০ ফিট রাস্তা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে। সেই থেকে আসলাম চৌধুরীর কারাগারে কেটে গেছে আট বছর পাঁচ মাস। দিন হিসেবে তিন হাজার ১শ ৮০ দিন কারাগারে কাটে এই নেতার।
সীতাকুণ্ডের বিএনপি নেতারা জানিয়েছেন, আসলাম চৌধুরীর বিরুদ্ধে হাসিনা সরকার ৭৬টি মিথ্যা মামলা দায়ের করে। জামিন পেলেও তাকে বারবার কারা ফটক থেকে আবারও পুনরায় গ্রেপ্তার করা হয়। মূলত সরকারের বিরুদ্ধে যেই নেতাই সোচ্চার ছিলেন তাকেই কারাগারে আটকে দিতো হাসিনা।
২০২২ সালের ২৮ অক্টোবর সীতাকুণ্ড উপজেলা বিএনপির আহবায়ক ও আসলাম চৌধুরীর ভাই ইসহাক কাদের চৌধুরী ইন্তোকাল করেন। তার বিরুদ্ধে বহু মিথ্যা মামলা দেয় হাসিনা সরকার।আসলাম চৌধরী তার কারা জীবনে দুই ভাইকে হারিয়েছেন। এক ভাই ইসহাক কাদের চৌধুরী ও মঈন চৌধুরী মারা যান তিনি কারাগারে থাকতেই । আদালতে প্যারোলে মুক্তির জন্য আবেদন করলেও আদালত তা মঞ্জুর করেননি। শেষ বারের মতো দুই ভাইকে দেখতে না পেয়ে আসলাম চৌধুরী দুঃখ কষ্টে কারাগারে অশ্রুতে গা ভেজান। সরকার তার প্রতি এতোটাই অমানবিক আচরণ করে যে দুই ভাইয়ের কারো জানাযায় অংশ নিতে দেয়নি। এতে তিনি কারাগারেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, আসলাম চৌধুরীর রাজনৈতিক কারণে পুরো পরিবারকেই ধ্বংস করেছে সরকার। তার আরেক বড় ভাই জসিম উদ্দিন চৌধুরী এবং ছোট ভাই আমজাদ হোসেন চৌধুরীকে ধরে নিয়ে একের পর এক মিথ্যা মামলা দিয়ে জেলে পাঠাতো ফ্যাসিস্ট সরকার। তার পরিবারের এমন কোন পুরুষ লোক নেই যাদের নামে মামলা হয়নি। এমনকি তার স্ত্রীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আসলাম চৌধুরীর পারিবারিক শিল্প প্রতিষ্ঠান রাইজিং গ্রুপ। এই প্রতিষ্ঠানের অধীনে ছোট-বড় অসংখ্য কল-কারখানা ছিল। বিশেষ করে তাকে গ্রেপ্তারের ফলে ব্যবসায় একের পর এক লোকসান গুণতে হয়। এমনকি আন্তর্জাতিকভাবে আসলাম চৌধুরীকে দেশদ্রোহী ট্যাগ দিয়ে হাসিনা তার প্রতিষ্ঠানকে জাহাজ আমদানীর ওপর কড়া নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
আসলাম চৌধুরী সীতাকুণ্ডে দু্র্বার আন্দোলন গড়ে তোলায় তার বিরুদ্ধে হাসিনা সরকার টানা ব্যবস্থা নিতে থাকে। কথিত আছে, আসলাম চৌধুরী একাই হাসিনার পতনের ব্যবস্থা করতে চেয়েছিলেন। আর হাসিনা বুঝতে পেরে তাকেই টার্গেট করে। তাকে ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের এজেন্টদের সঙ্গে বৈঠকের মাধ্যমে দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে গ্রেপ্তার করে। কার্যত দীর্ঘদিন কারাগারে থেকে তিনি দল থেকে দূরে থাকেননি। কারাগারে থেকেই চালিয়েছেন সাংগঠনিক নানা কার্যক্রম।
গত ৫ই আগস্ট ছাত্রজনতার গণ-অভ্যুত্থানে হাসিনা সরকারের পতন হলে একই বছরের ২০ আগস্ট আসলাম চৌধুরী কারাগার থেকে মুক্তি পান। ওইদিন হাজার হাজার নেতাকর্মী তাকে বরণ করে নিতে কারা ফটকে ভিড় করে। বৃষ্টি উপেক্ষা আসলাম চৌধুরী নেতাকর্মীদের ভালোবাসায় সিক্ত হন। সেদিন কয়েকশ গাড়ী আসলাম চৌধুরীকে ঘিরে রাখে। দীর্ঘ ৫০ কিলোমিটার পথে নেতাকর্মীরা তাকে ফুল ছিটাতে থাকে। বৃষ্টিতে ভিজে এই সংবর্ধনা গ্রহণ করেন তিনি। জেল গেইট থেকে সীতাকুণ্ডের বড় দারোগাহাট পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষের সাথে তার চোখাচোখি হয়। ওইদিন বিকাল পাঁচটায় তিনি ভাটিয়ারীর জলিল এলাকায় প্রবেশ করে তার বাড়ীতে যান। নারী, পুরুষ, শিশু সকল বয়সের গ্রামবাসী তাকে একনজর দেখতে উপচে পড়েন। মা-বাবা ও দুই ভাইয়ের কবর জিয়ারত করে চোখে অশ্রু নিয়ে আসলাম চৌধুরী বহু বছর পর জন্মভিটায় পা রাখেন। সেদিন তিনি নিজেই জলিলস্থ স্টেশন মসজিদে আসরের নামাজের ইমামতি করেন।
কারাগার থেকে বেরিয়ে আসলাম চৌধুরী নানান সামাজিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে চট্টগ্রাম-৪ সীতাকুণ্ড, আকবরশাহ ও পাহাড়তলী আংশিক আসন এবং সীতাকুণ্ড উপজেলার সৈয়দপুর থেকে সলিমপুর পর্যন্ত পুরো এলাকায় মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। নিজ উপজেলার পাশাপাশি দলের হয়ে হাটহাজারীতে হেফাজতের সঙ্গে বৈঠকও করেছেন তিনি। সনাতনী হিন্দু সম্প্রদায়ের দুর্গাপূজা ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তাদের পাশে থেকে আর্থিকসহ সকল ধরনের সহযোগীতা করে আসছেন। এছাড়াও পুরো উত্তর চট্টগ্রামে তার সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে শিক্ষামূলক বৃত্তি ও সমাজ সেবামূলক কার্যক্রম চালাচ্ছেন তিনি।
গত ৩ নভেম্বর গুলশান কার্যালয় থেকে জাতীয়তাবাদী দলের মহাসচিব মীর্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রাথমিকভাবে ২৩৭ টি আসনে ধানের শীষের প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেন। তবে ওই তালিকায় নাম নেই লায়ন আসলাম চৌধুরীর। এরপর থেকে তীব্র ক্ষোভ দেখাতে থাকেন নেতাকর্মীরা। ঐদিনেই টানা সাত ঘণ্টা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও রেলপথ অবরোধ করে তারা আসলাম চৌধুরীকে মনোনয়নবঞ্চিতের প্রতিবাদ করে। এরপর গত ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের জনসভায় বাড়বকুণ্ড হাই স্কুল এন্ড কলেজ মাঠে আসলাম চৌধুরীর উপস্থিতিকে ঘিরে হাজার হাজার নেতা কর্মীর ঢল নামে৷ তার পক্ষে রাস্তায় নামলে এই পর্যন্ত বিএনপি, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের আটজন শীর্ষ নেতাকে বহিষ্কার ও পদ স্থগিত করা হয়৷ এরপরও নেতাকর্মীরা ঘোষণা দিয়েছেন, আসলাম চৌধুরীর জন্য প্রয়োজনে হাজার হাজার নেতাকর্মী স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করতে প্রস্তুত রয়েছেন।
সর্বশেষ গত ২২ নভেম্বর আসলাম চৌধুরীর মনোয়নের দাবীতে সৈয়দপুর থেকে সলিমপুর পর্যন্ত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ৪০ কিলোমিটারজুড়ে মানববন্ধন করে নেতাকর্মীরা।
গণমাধ্যমকে দেওয়া এক স্বাক্ষাৎকারে আসলাম চৌধুরী বলেন, ধানের শীষ আমাদেরই থাকবে, আপনাদেরই থাকবে, ইনশাল্লাহ আমি বেঁচে থাকলে নির্বাচনে অংশ নেব।




















