০৪:৫০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৬

১০ম গ্রেড দাবিতে কর্মবিরতি: কালীগঞ্জ হাসপাতালে সেবা স্থবির, চরম ভোগান্তিতে রোগী

ন্যায্য পেশাগত মর্যাদা ও ১০ম গ্রেড বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলনের জেরে গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোববার (৩০ নভেম্বর) কার্যত থমকে যায় স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা। মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও ফার্মাসিস্টদের কর্মবিরতির কারণে সকাল থেকেই সেবা নিতে এসে চরম দুর্ভোগে পড়েন শত শত সাধারণ রোগী ও তাঁদের স্বজনরা।

ভোররাতের ডিউটি শেষে অসুস্থ জননীকে বাঁচাতে হাসপাতালের পথে ছুটেছিলেন ত্রিশোর্ধ্ব শ্রমিক আব্দুল কাদের। চার বছর ধরে কালীগঞ্জে বসবাসরত সিরাজগঞ্জের এই বাসিন্দা স্থানীয় একটি পোশাক কারখানায় কর্মরত। রোববার সকালে অসুস্থ মা জরিনা বেগমকে নিয়ে রক্ত পরীক্ষার জন্য ডোনারসহ কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে হাজির হন তিনি। কিন্তু সকাল ৮টার দিকে প্যাথলজি বিভাগের সামনে গিয়ে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন-কক্ষের দরজায় ঝুলছে তালা, ভেতরে কোনো কর্মী নেই।

কাদের বলেন, “রাতভর কাজ করে মাকে নিয়ে হাসপাতালে আসলাম। ভাবছিলাম দ্রুত পরীক্ষা করিয়ে বাসায় ফিরব। কিন্তু এসে দেখি সব বন্ধ। মাকে কষ্ট দেওয়া ছাড়া উপায় রইল না।”

অপরদিকে জামালপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা মামুন মিয়া পেটের তীব্র ব্যথা নিয়ে সকাল ৯টার দিকে চিকিৎসকের পরামর্শ নিলেও ওষুধ সংগ্রহ করতে পারেননি। হাসপাতালের ফার্মেসির সামনে প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষা শেষে জানতে পারেন-ফার্মাসিস্টদের কর্মবিরতির কারণে ওষুধ বিতরণ স্থগিত রয়েছে।

দ্বিতীয় তলায় ২২১ নম্বর কক্ষে ডিজিটাল এক্স-রে করাতে আসা রোগী ও তাঁদের স্বজনদের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। তালাবদ্ধ কক্ষের সামনে দাঁড়িয়ে এক রোগী ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, “আমাদের অসুখের কি কোনো মূল্য নেই? আন্দোলনের খেসারত বারবার আমাদেরই দিতে হয়। আমরা গরিব মানুষ, বাইরে গিয়ে টেস্ট করানোর সামর্থ্য নেই।”

মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও ফার্মাসিস্টরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে পেশাগত বৈষম্য দূরীকরণ ও প্রাপ্য মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানিয়ে আসলেও আজ পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি। বাধ্য হয়েই তাঁরা আন্দোলনে নামতে বাধ্য হয়েছেন।

১০ম গ্রেড বাস্তবায়ন পরিষদ কালীগঞ্জ উপজেলা শাখার সমন্বয়কারী মো. হাফিজুর রহমান জানান, “আজ সকাল ৯টা থেকে ১১টা পর্যন্ত দুই ঘণ্টার কর্মবিরতি পালন করা হয়েছে। দাবি বাস্তবায়ন না হলে ৩ ডিসেম্বর সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত অর্ধদিবস কর্মবিরতি এবং ৪ ডিসেম্বর পূর্ণ কর্মদিবস ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি পালন করা হবে।”

তিনি আরও বলেন, আন্দোলনের মধ্যেও জরুরি বিভাগ চালু থাকলেও অন্যান্য বিভাগে সেবা কার্যক্রম অত্যন্ত সীমিত রয়েছে।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রেজওয়ানা রশীদ বলেন, “মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও ফার্মাসিস্টদের দাবিগুলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আন্দোলনের কারণে কিছুটা সেবা ব্যাহত হলেও জরুরি চিকিৎসা সেবা সচল আছে। আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সমাধানের চেষ্টা চলছে।”

আন্দোলনকারীরা স্পষ্ট করে জানান, সরকার ১০ম গ্রেড বাস্তবায়নের কার্যকর সিদ্ধান্ত নিলে তাঁরা অবিলম্বে কর্মসূচি প্রত্যাহার করে স্বাভাবিক সেবায় ফিরবেন।

তবে দাবি আদায়ের টানাপোড়েনে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছেন দিনমজুর, শ্রমজীবী ও স্বল্প আয়ের মানুষেরা-যাদের কাছে সরকারি হাসপাতালই চিকিৎসার একমাত্র ভরসা। দ্রুত সমঝোতা ও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্তই এখন কালীগঞ্জবাসীর শেষ আশার আলো।

ডিএস

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

টাঙ্গাইলে বৃদ্ধ দম্পতিকে হত্যা, নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার লুট

১০ম গ্রেড দাবিতে কর্মবিরতি: কালীগঞ্জ হাসপাতালে সেবা স্থবির, চরম ভোগান্তিতে রোগী

প্রকাশিত : ০৩:৩৮:৪২ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩০ নভেম্বর ২০২৫

ন্যায্য পেশাগত মর্যাদা ও ১০ম গ্রেড বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলনের জেরে গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোববার (৩০ নভেম্বর) কার্যত থমকে যায় স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা। মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও ফার্মাসিস্টদের কর্মবিরতির কারণে সকাল থেকেই সেবা নিতে এসে চরম দুর্ভোগে পড়েন শত শত সাধারণ রোগী ও তাঁদের স্বজনরা।

ভোররাতের ডিউটি শেষে অসুস্থ জননীকে বাঁচাতে হাসপাতালের পথে ছুটেছিলেন ত্রিশোর্ধ্ব শ্রমিক আব্দুল কাদের। চার বছর ধরে কালীগঞ্জে বসবাসরত সিরাজগঞ্জের এই বাসিন্দা স্থানীয় একটি পোশাক কারখানায় কর্মরত। রোববার সকালে অসুস্থ মা জরিনা বেগমকে নিয়ে রক্ত পরীক্ষার জন্য ডোনারসহ কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে হাজির হন তিনি। কিন্তু সকাল ৮টার দিকে প্যাথলজি বিভাগের সামনে গিয়ে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন-কক্ষের দরজায় ঝুলছে তালা, ভেতরে কোনো কর্মী নেই।

কাদের বলেন, “রাতভর কাজ করে মাকে নিয়ে হাসপাতালে আসলাম। ভাবছিলাম দ্রুত পরীক্ষা করিয়ে বাসায় ফিরব। কিন্তু এসে দেখি সব বন্ধ। মাকে কষ্ট দেওয়া ছাড়া উপায় রইল না।”

অপরদিকে জামালপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা মামুন মিয়া পেটের তীব্র ব্যথা নিয়ে সকাল ৯টার দিকে চিকিৎসকের পরামর্শ নিলেও ওষুধ সংগ্রহ করতে পারেননি। হাসপাতালের ফার্মেসির সামনে প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষা শেষে জানতে পারেন-ফার্মাসিস্টদের কর্মবিরতির কারণে ওষুধ বিতরণ স্থগিত রয়েছে।

দ্বিতীয় তলায় ২২১ নম্বর কক্ষে ডিজিটাল এক্স-রে করাতে আসা রোগী ও তাঁদের স্বজনদের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। তালাবদ্ধ কক্ষের সামনে দাঁড়িয়ে এক রোগী ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, “আমাদের অসুখের কি কোনো মূল্য নেই? আন্দোলনের খেসারত বারবার আমাদেরই দিতে হয়। আমরা গরিব মানুষ, বাইরে গিয়ে টেস্ট করানোর সামর্থ্য নেই।”

মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও ফার্মাসিস্টরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে পেশাগত বৈষম্য দূরীকরণ ও প্রাপ্য মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানিয়ে আসলেও আজ পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি। বাধ্য হয়েই তাঁরা আন্দোলনে নামতে বাধ্য হয়েছেন।

১০ম গ্রেড বাস্তবায়ন পরিষদ কালীগঞ্জ উপজেলা শাখার সমন্বয়কারী মো. হাফিজুর রহমান জানান, “আজ সকাল ৯টা থেকে ১১টা পর্যন্ত দুই ঘণ্টার কর্মবিরতি পালন করা হয়েছে। দাবি বাস্তবায়ন না হলে ৩ ডিসেম্বর সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত অর্ধদিবস কর্মবিরতি এবং ৪ ডিসেম্বর পূর্ণ কর্মদিবস ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি পালন করা হবে।”

তিনি আরও বলেন, আন্দোলনের মধ্যেও জরুরি বিভাগ চালু থাকলেও অন্যান্য বিভাগে সেবা কার্যক্রম অত্যন্ত সীমিত রয়েছে।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রেজওয়ানা রশীদ বলেন, “মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও ফার্মাসিস্টদের দাবিগুলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আন্দোলনের কারণে কিছুটা সেবা ব্যাহত হলেও জরুরি চিকিৎসা সেবা সচল আছে। আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সমাধানের চেষ্টা চলছে।”

আন্দোলনকারীরা স্পষ্ট করে জানান, সরকার ১০ম গ্রেড বাস্তবায়নের কার্যকর সিদ্ধান্ত নিলে তাঁরা অবিলম্বে কর্মসূচি প্রত্যাহার করে স্বাভাবিক সেবায় ফিরবেন।

তবে দাবি আদায়ের টানাপোড়েনে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছেন দিনমজুর, শ্রমজীবী ও স্বল্প আয়ের মানুষেরা-যাদের কাছে সরকারি হাসপাতালই চিকিৎসার একমাত্র ভরসা। দ্রুত সমঝোতা ও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্তই এখন কালীগঞ্জবাসীর শেষ আশার আলো।

ডিএস