০৬:২৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২৬

নওগাঁ বাইপাসে ৭৫০ তালগাছ ন্যাড়া, পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা

নওগাঁ শহরের বাইপাস সড়কের দুই পাশে সারি সারি তালগাছ যা একসময় সড়কটির সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি বজ্রপাত থেকে মানুষকে সুরক্ষা দিত। সেই গাছগুলো এখন ন্যাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বিদ্যুৎ লাইনের নিরাপত্তার অজুহাতে সড়কের দুই পাশে থাকা প্রায় ৭৫০টি তালগাছের পাতা কেটে দিয়েছে নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড (নেসকো)। এতে স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশকর্মীদের মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

পরিবেশকর্মীরা বলছেন, সরকার যেখানে বজ্রপাতজনিত মৃত্যু কমাতে তালগাছ রোপণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, সেখানে রাষ্ট্রায়ত্ত একটি সংস্থার এমন কর্মকাণ্ড পরিবেশ সংরক্ষণ নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

২০–৩০ বছরের গাছ, একদিনেই ন্যাড়া। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রামভদ্রপুর থেকে বটতলী বোয়ালিয়া পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার সড়কের দুই পাশে থাকা এসব তালগাছ স্থানীয় কয়েকজন সচেতন ব্যক্তি নিজেদের উদ্যোগে রোপণ করেছিলেন। বিভিন্ন এলাকা থেকে তালের বীজ সংগ্রহ করে লাগানো এসব গাছের বয়স বর্তমানে ২০ থেকে ৩০ বছর। গাছগুলো বড় হওয়ার ফলে সড়কটি যেমন দৃষ্টিনন্দন হয়েছিল, তেমনি বজ্রপাত প্রতিরোধেও কার্যকর ভূমিকা রাখছিল।

কিন্তু সম্প্রতি পাতা ও শীর্ষ কেটে দেওয়ায় অনেক গাছ মারা যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এর আগেও সড়ক সংস্কারের নামে নির্বিচারে গাছ কাটা হয়েছিল। এবার বিদ্যুৎ লাইনের অজুহাতে অবশিষ্ট তালগাছগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত করা হলো। এতে এলাকার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন পরিবেশবিদরা।

নওগাঁ পরিবেশ উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক মাহমুদুন্নবী বেলাল বলেন, “দিন দিন তালগাছ হারিয়ে যাচ্ছে। এসব গাছ এক দিনে বড় হয়নি। বিদ্যুতের লাইন পরিষ্কারের নামে নির্বিচারে পাতা কাটা হয়েছে। চাইলে বিদ্যুতের খুঁটি দু–তিন হাত সরিয়ে নেওয়া যেত। কিন্তু তা না করে গাছের ক্ষতি করা হলো।”

পরিবেশকর্মী পারুল আক্তার বলেন, “নওগাঁ প্রতিবছর বজ্রপাতপ্রবণ জেলা হিসেবে পরিচিত। বজ্রপাতের ক্ষতি এড়াতে তালগাছ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকার যেখানে তালগাছ লাগানোর কর্মসূচি হাতে নিয়েছে, সেখানে এভাবে গাছ ন্যাড়া করা পরিবেশবিধ্বংসী আচরণ।”

পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, তালগাছ উঁচু ও শক্ত হওয়ায় বজ্রপাত শোষণ করে নেয়, ফলে মানুষের প্রাণহানি কমে। একই সঙ্গে এসব গাছ কার্বন শোষণ, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে।

এ বিষয়ে নেসকোর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. কালাম বলেন, “বিদ্যুৎ লাইনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঝুঁকিপূর্ণ গাছের ডাল ও মাথা কাটা হয়েছে। এটি নিয়মিত প্রক্রিয়া।”

তবে পরিবেশকর্মীদের প্রশ্ন নিয়মিত প্রক্রিয়ার নামে কি পরিবেশ ধ্বংস করা গ্রহণযোগ্য?

পরিবেশবিদদের মতে, এই কর্মকাণ্ড বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫, জাতীয় বননীতি, ২০১৬ এবং জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG-১৩ ও SDG-১৫)-এর পরিপন্থী। পরিকল্পনাহীনভাবে গাছ ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বজ্রপাতের ঝুঁকি এবং পরিবেশের ভারসাম্যহীনতা আরও বাড়বে।

নওগাঁবাসীর দাবি, বিদ্যুৎ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় পরিবেশবান্ধব বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ, ক্ষতিগ্রস্ত তালগাছ রক্ষায় জরুরি পদক্ষেপ এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের কর্মকাণ্ডে দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

সবুজ ধ্বংস করে উন্নয়ন নয় পরিকল্পিত উন্নয়নই পারে পরিবেশ ও মানুষের জীবন সুরক্ষিত রাখতে।

ডিএস./

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

আপনাদের একটি ভোটই পারে বিএনপিকে ক্ষমতায় নিয়ে আসতে: ব্যারিস্টার ফারজানা শারমিন পুতুল

নওগাঁ বাইপাসে ৭৫০ তালগাছ ন্যাড়া, পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা

প্রকাশিত : ০৩:৪৮:৪৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ২০ ডিসেম্বর ২০২৫

নওগাঁ শহরের বাইপাস সড়কের দুই পাশে সারি সারি তালগাছ যা একসময় সড়কটির সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি বজ্রপাত থেকে মানুষকে সুরক্ষা দিত। সেই গাছগুলো এখন ন্যাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বিদ্যুৎ লাইনের নিরাপত্তার অজুহাতে সড়কের দুই পাশে থাকা প্রায় ৭৫০টি তালগাছের পাতা কেটে দিয়েছে নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড (নেসকো)। এতে স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশকর্মীদের মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

পরিবেশকর্মীরা বলছেন, সরকার যেখানে বজ্রপাতজনিত মৃত্যু কমাতে তালগাছ রোপণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, সেখানে রাষ্ট্রায়ত্ত একটি সংস্থার এমন কর্মকাণ্ড পরিবেশ সংরক্ষণ নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

২০–৩০ বছরের গাছ, একদিনেই ন্যাড়া। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রামভদ্রপুর থেকে বটতলী বোয়ালিয়া পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার সড়কের দুই পাশে থাকা এসব তালগাছ স্থানীয় কয়েকজন সচেতন ব্যক্তি নিজেদের উদ্যোগে রোপণ করেছিলেন। বিভিন্ন এলাকা থেকে তালের বীজ সংগ্রহ করে লাগানো এসব গাছের বয়স বর্তমানে ২০ থেকে ৩০ বছর। গাছগুলো বড় হওয়ার ফলে সড়কটি যেমন দৃষ্টিনন্দন হয়েছিল, তেমনি বজ্রপাত প্রতিরোধেও কার্যকর ভূমিকা রাখছিল।

কিন্তু সম্প্রতি পাতা ও শীর্ষ কেটে দেওয়ায় অনেক গাছ মারা যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এর আগেও সড়ক সংস্কারের নামে নির্বিচারে গাছ কাটা হয়েছিল। এবার বিদ্যুৎ লাইনের অজুহাতে অবশিষ্ট তালগাছগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত করা হলো। এতে এলাকার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন পরিবেশবিদরা।

নওগাঁ পরিবেশ উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক মাহমুদুন্নবী বেলাল বলেন, “দিন দিন তালগাছ হারিয়ে যাচ্ছে। এসব গাছ এক দিনে বড় হয়নি। বিদ্যুতের লাইন পরিষ্কারের নামে নির্বিচারে পাতা কাটা হয়েছে। চাইলে বিদ্যুতের খুঁটি দু–তিন হাত সরিয়ে নেওয়া যেত। কিন্তু তা না করে গাছের ক্ষতি করা হলো।”

পরিবেশকর্মী পারুল আক্তার বলেন, “নওগাঁ প্রতিবছর বজ্রপাতপ্রবণ জেলা হিসেবে পরিচিত। বজ্রপাতের ক্ষতি এড়াতে তালগাছ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকার যেখানে তালগাছ লাগানোর কর্মসূচি হাতে নিয়েছে, সেখানে এভাবে গাছ ন্যাড়া করা পরিবেশবিধ্বংসী আচরণ।”

পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, তালগাছ উঁচু ও শক্ত হওয়ায় বজ্রপাত শোষণ করে নেয়, ফলে মানুষের প্রাণহানি কমে। একই সঙ্গে এসব গাছ কার্বন শোষণ, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে।

এ বিষয়ে নেসকোর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. কালাম বলেন, “বিদ্যুৎ লাইনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঝুঁকিপূর্ণ গাছের ডাল ও মাথা কাটা হয়েছে। এটি নিয়মিত প্রক্রিয়া।”

তবে পরিবেশকর্মীদের প্রশ্ন নিয়মিত প্রক্রিয়ার নামে কি পরিবেশ ধ্বংস করা গ্রহণযোগ্য?

পরিবেশবিদদের মতে, এই কর্মকাণ্ড বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫, জাতীয় বননীতি, ২০১৬ এবং জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG-১৩ ও SDG-১৫)-এর পরিপন্থী। পরিকল্পনাহীনভাবে গাছ ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বজ্রপাতের ঝুঁকি এবং পরিবেশের ভারসাম্যহীনতা আরও বাড়বে।

নওগাঁবাসীর দাবি, বিদ্যুৎ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় পরিবেশবান্ধব বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ, ক্ষতিগ্রস্ত তালগাছ রক্ষায় জরুরি পদক্ষেপ এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের কর্মকাণ্ডে দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

সবুজ ধ্বংস করে উন্নয়ন নয় পরিকল্পিত উন্নয়নই পারে পরিবেশ ও মানুষের জীবন সুরক্ষিত রাখতে।

ডিএস./