দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দরের ডিজিটাল অবকাঠামোকে সাইবার হামলার ঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত রাখতে অত্যাধুনিক সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। নতুন এই প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থা বন্দরের অনলাইন লেনদেন, সংবেদনশীল অপারেশনাল তথ্য এবং সার্বিক ডিজিটাল কার্যক্রমকে আরও নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
রোববার (২৮ জুন) দুপুরে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে আধুনিক এ সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস. এম. মনিরুজ্জামান।
এ সময় বন্দর কর্তৃপক্ষের বোর্ড সদস্য, প্রকল্প পরিচালক, বিভিন্ন বিভাগের প্রধান, শাখা কর্মকর্তাসহ প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কারিগরি বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান সাইবার হামলার ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর তার ডিজিটাল নিরাপত্তা জোরদারে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। বর্তমানে বন্দরের পরিচালন ব্যবস্থা, স্বয়ংক্রিয় লজিস্টিকস, ইন্টারনেটভিত্তিক সেবা, আর্থিক লেনদেন এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে কার্যক্রম যেমন আধুনিক হয়েছে, তেমনি সাইবার আক্রমণের ঝুঁকিও বেড়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে একটি শক্তিশালী ও প্রতিরোধমূলক সাইবার প্রতিরক্ষা অবকাঠামো গড়ে তুলতে গত ১১ জানুয়ারি বাংলাদেশ নৌবাহিনী পরিচালিত বিশেষায়িত প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমিটেড-এর সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। সেই চুক্তির আওতায় সর্বাধুনিক প্রযুক্তিসমৃদ্ধ সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
নতুন নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সম্ভাব্য সাইবার হুমকি ও নেটওয়ার্কের দুর্বলতা দ্রুত শনাক্ত করে তাৎক্ষণিক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সক্ষমতা রয়েছে। পাশাপাশি কঠোর তথ্য-প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে যাতে সংবেদনশীল ও গোপনীয় অপারেশনাল তথ্য শুধুমাত্র অনুমোদিত কর্মকর্তারাই ব্যবহার করতে পারেন।
এ ছাড়া ভাইরাস, ম্যালওয়্যার বা অন্যান্য ক্ষতিকর সফটওয়্যারের কারণে সিস্টেম বিকল হওয়া, সেবা ব্যাহত হওয়া কিংবা নেটওয়ার্ক লকডাউনের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনবে নতুন প্রযুক্তি। উদীয়মান এবং জিরো-ডে সাইবার হুমকি শনাক্ত করে তাৎক্ষণিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য এতে রিয়েল-টাইম সাইবার ইন্টেলিজেন্স সুবিধাও যুক্ত করা হয়েছে।
সরকারি ও বাণিজ্যিক সেবাকে অচল করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে পরিচালিত ডিস্ট্রিবিউটেড ডিনায়েল অব সার্ভিস (DDoS) হামলা প্রতিরোধে এতে উন্নত অ্যান্টি-ডিডিওএস প্রযুক্তি সংযোজন করা হয়েছে। একই সঙ্গে সন্দেহজনক বা অননুমোদিত অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত নেটওয়ার্ক কার্যক্রম সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের জন্য রয়েছে উন্নত নেটওয়ার্ক সার্ভেইল্যান্স ব্যবস্থা।
সাইবার হামলার উৎস, ভাইরাস এবং আক্রমণের বিভিন্ন প্রচেষ্টার ডিজিটাল রেকর্ড সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণের জন্য রয়েছে ফরেনসিক আর্কাইভিং সুবিধা, যা ভবিষ্যতে তদন্ত ও নিরাপত্তা পরিকল্পনা প্রণয়নে সহায়ক হবে।
এ ছাড়া ২৪ ঘণ্টা চালু থাকা সেন্ট্রালাইজড নেটওয়ার্ক অ্যান্ড সিকিউরিটি অপারেশনস সেন্টার (NOC/SOC)-এর মাধ্যমে যেকোনো নিরাপত্তা ঝুঁকি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ এবং তাৎক্ষণিকভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের মতে, এই অত্যাধুনিক সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক জাহাজ ও বন্দর নিরাপত্তা (ISPS Code) মানদণ্ড পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে বন্দরের ২৪ ঘণ্টার টার্মিনাল কার্যক্রম আরও নিরাপদ, নিরবচ্ছিন্ন ও কার্যকর হবে।
কর্তৃপক্ষ আশা করছে, নতুন এই প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে বন্দর ব্যবহারকারী, ব্যবসায়ী, আমদানিকারক-রপ্তানিকারক এবং আন্তর্জাতিক শিপিং অংশীদাররা আরও নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল সেবা পাবেন। পাশাপাশি বৈশ্বিক বাণিজ্য ও লজিস্টিক খাতে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা আরও সুদৃঢ় হবে।
ডিএস./



















