০৫:১০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬

টাঙ্গাইলে গ্রামবাসী নিজেরাই টাকা তুলে কিনলেন স্থায়ী খেলার মাঠের জন্য জমি

টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার দেউলী ইউনিয়নের বাবুপুর গ্রাম। গ্রামটিতে সাত শতাধিক পরিবারের বসবাস। সাড়ে ৩ হাজারের অধিক জনসংখ্যা। এদের বড় অংশ শিশু, কিশোর, যুবক। কিন্তু গ্রামে কোন খেলার মাঠ নেই। তাই ক্রীড়া চর্চায় অসুবিধা হয়। এর আগে অনেকবার এ গ্রামের মানুষ মাঠের জন্য উদ্যোগ নিয়েছেন। কিন্তু সফল হতে পারেননি। খেলার মাঠের জন্য জমি কেনার অন্যতম উদ্যোগক্তা এ গ্রামের সন্তান এসএম ইকবাল মাহমুদ। তিনি বলেন, কয়েক মাস আগে এ গ্রামের ক্রীড়ামোদি ব্যক্তিত্ব খোরশেদ আলমের সাথে পরামর্শ করি। সবাই মিলে টাকা দিয়ে খেলার মাঠের জন্য একটি জমি কেনা-যায় কি না। এ প্রস্তাবে উৎসাহ দেখান খোরশেদ আলম। পরে আমরা গ্রামের কয়েকজন বিত্তবান মানুষের সাথে কথা বলি। তাদের কাছ থেকেও ভালো সারা পাই। গত ৮ সেপ্টেম্বর এ ব্যাপারে গ্রামবাসীদের নিয়ে আনুষ্ঠানিক ভাবে মতবিনিময় সভা করি। সেখানে সবাই খেলার মাঠের জন্য জমি কেনার পক্ষে মত দেন। সবাই সামর্থ অনুযায়ী টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেন।

উদ্যোক্তাদের অন্যতম ব্যক্তি খোরশেদ আলম বলেন, আমি ও ইকবাল মাহমুদ ছাড়াও এ গ্রামের বিত্তশালীদের মধ্যে আজাহার শিকদার, সেলিম আল মামুন, মিজানুর রহমান, মজনু শিকদার, শফিকুল ইসলাম, শুভ প্রামাণিক বড় অংকের টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। গ্রামের সবার কাছেই জমি কেনার জন্য অর্থ সহায়তা চাওয়া হয়। গ্রামবাসী ২০০/৫০০, ১ হাজার, ২ হাজার থেকে ৫/১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সামর্থ্য অনুযায়ী টাকা দেন।

পরে এই গ্রামের ইকবাল হোসেন সুজনের ৬০ শতাংশ জমি কিনে নেওয়া হয়। প্রতি শতাংশ জমির দাম ধরা হয় ৫২ হাজার টাকা করে। তিনি ১ শতাংশ জমির দান মওকুফ করে দেন। বৃহস্পতিবার তিনি জমিটি বুঝিয়ে দেন। গ্রামবাসী বাদ্য বাজিয়ে গিয়ে ওই জমি বুঝে নেন। সেখানে জাতীয় পতাকা উত্তোলণ করা হয়। দিনব্যাপী চলে আনন্দ উৎসব।

বাবুপুর গ্রামে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। গ্রামের যুবকরা ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নিয়েছেন অর্থদাতা ও প্রবীন ব্যক্তিদের। জমি কেনার অন্যতম উদ্যোক্তা খোরশেদ আলম বলেন, ৬০ শতাংশ জমি মাঠের জন্য কিনেছি। পাশে আরো ৬০ শতাংশ কেনার লক্ষ্য রয়েছে। সেভাবেই আমরা কাজ করছি। ১২০ শতাংশ জমি হলে ভালো মানের মাঠ হবে। একদিন এই মাঠকে কেন্দ্র করেই গ্রামের ক্রীড়া চর্চা হবে।এই গ্রামের কিশোর হাবিবুল্লাহ সালমান বলেন, ধান কাটা হলে ক্ষেতে গিয়ে খেলতে পারতাম। আবার ফলস বুনা হলে খেলা বন্ধ হয়ে যেতো। এখন মাঠ হলো। আমরা সারা বছরই খেলতে পারবো। তাই খুব ভালো লাগছে।

অপর কিশোর রাব্বী জোহা বলেন, বাড়ির উঠানে খেলতে গেলে ফুটবলের আঘাতে ঘরের বেড়া ক্ষতি হতো। এজন্য গালাগালি শুনতে হতো। এখন মাঠে খেলতে পারবো। খেতে গিয়ে কারো ক্ষতি হবে না।প্রবীন ব্যক্তি আব্দুল মান্নান ব্যাপারী বলেন, আমরা একটা মাঠের জন্য অনেক চেষ্টা করেছি। আজ আমাদের স্বপ্নের মাঠ বাস্তবায়ন হলো। তাই খুব আনন্দ লাগছে।বাবুপুর মসজিদ কমিটির সভাপতি নজরুল শিকদার বলেন, এই মাঠে খেলাধুলা চর্চা হলে কিশোর-যুবকরা সুস্থ্য সুন্দর পরিবেশ পাবে। তারা মাদক ও সন্ত্রাস থেকে দূরে থাকবে।

বাবুপুর সরকারি প্রথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক এবং মোনালিসা উইমেন্স স্পোটর্স অ্যাকাডেমির পরিচালক মোনালিসা মুন্নি বলেন, বাবুপর গ্রামের মানুষের অনেক দিনের স্বপ্ন ছিলো একটি খেলার মাঠের। সেটির ব্যবস্থা তারা করতে পেরেছে। এটি অনেক বড় প্রাপ্তি।সরকারি মাওলানা মোহাম্মদ আলী কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ শামসুল হুদা বলেন, সরকারি-বেসরকারি কোন পর্যায়ের সাহায্য ছাড়া একটি গ্রামের মানুষেরা নিজেদের উদ্যোগে খেলার মাঠের জন্য জমি কিনেছে। এটি অনেক ভালো খবর। এদের দেখে আরো অনেক গ্রামের মানুষ অনুপ্রাণিত হবে। তারা নিজেদের উদ্যোগে নিজ নিজ গ্রামে ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক চর্চার কেন্দ্র গড়ে তুলবে।

ডিএস../

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর কার্যকর ও ফলপ্রসূ হয়েছে: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী

টাঙ্গাইলে গ্রামবাসী নিজেরাই টাকা তুলে কিনলেন স্থায়ী খেলার মাঠের জন্য জমি

প্রকাশিত : ০৫:০১:৫৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬

টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার দেউলী ইউনিয়নের বাবুপুর গ্রাম। গ্রামটিতে সাত শতাধিক পরিবারের বসবাস। সাড়ে ৩ হাজারের অধিক জনসংখ্যা। এদের বড় অংশ শিশু, কিশোর, যুবক। কিন্তু গ্রামে কোন খেলার মাঠ নেই। তাই ক্রীড়া চর্চায় অসুবিধা হয়। এর আগে অনেকবার এ গ্রামের মানুষ মাঠের জন্য উদ্যোগ নিয়েছেন। কিন্তু সফল হতে পারেননি। খেলার মাঠের জন্য জমি কেনার অন্যতম উদ্যোগক্তা এ গ্রামের সন্তান এসএম ইকবাল মাহমুদ। তিনি বলেন, কয়েক মাস আগে এ গ্রামের ক্রীড়ামোদি ব্যক্তিত্ব খোরশেদ আলমের সাথে পরামর্শ করি। সবাই মিলে টাকা দিয়ে খেলার মাঠের জন্য একটি জমি কেনা-যায় কি না। এ প্রস্তাবে উৎসাহ দেখান খোরশেদ আলম। পরে আমরা গ্রামের কয়েকজন বিত্তবান মানুষের সাথে কথা বলি। তাদের কাছ থেকেও ভালো সারা পাই। গত ৮ সেপ্টেম্বর এ ব্যাপারে গ্রামবাসীদের নিয়ে আনুষ্ঠানিক ভাবে মতবিনিময় সভা করি। সেখানে সবাই খেলার মাঠের জন্য জমি কেনার পক্ষে মত দেন। সবাই সামর্থ অনুযায়ী টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেন।

উদ্যোক্তাদের অন্যতম ব্যক্তি খোরশেদ আলম বলেন, আমি ও ইকবাল মাহমুদ ছাড়াও এ গ্রামের বিত্তশালীদের মধ্যে আজাহার শিকদার, সেলিম আল মামুন, মিজানুর রহমান, মজনু শিকদার, শফিকুল ইসলাম, শুভ প্রামাণিক বড় অংকের টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। গ্রামের সবার কাছেই জমি কেনার জন্য অর্থ সহায়তা চাওয়া হয়। গ্রামবাসী ২০০/৫০০, ১ হাজার, ২ হাজার থেকে ৫/১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সামর্থ্য অনুযায়ী টাকা দেন।

পরে এই গ্রামের ইকবাল হোসেন সুজনের ৬০ শতাংশ জমি কিনে নেওয়া হয়। প্রতি শতাংশ জমির দাম ধরা হয় ৫২ হাজার টাকা করে। তিনি ১ শতাংশ জমির দান মওকুফ করে দেন। বৃহস্পতিবার তিনি জমিটি বুঝিয়ে দেন। গ্রামবাসী বাদ্য বাজিয়ে গিয়ে ওই জমি বুঝে নেন। সেখানে জাতীয় পতাকা উত্তোলণ করা হয়। দিনব্যাপী চলে আনন্দ উৎসব।

বাবুপুর গ্রামে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। গ্রামের যুবকরা ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নিয়েছেন অর্থদাতা ও প্রবীন ব্যক্তিদের। জমি কেনার অন্যতম উদ্যোক্তা খোরশেদ আলম বলেন, ৬০ শতাংশ জমি মাঠের জন্য কিনেছি। পাশে আরো ৬০ শতাংশ কেনার লক্ষ্য রয়েছে। সেভাবেই আমরা কাজ করছি। ১২০ শতাংশ জমি হলে ভালো মানের মাঠ হবে। একদিন এই মাঠকে কেন্দ্র করেই গ্রামের ক্রীড়া চর্চা হবে।এই গ্রামের কিশোর হাবিবুল্লাহ সালমান বলেন, ধান কাটা হলে ক্ষেতে গিয়ে খেলতে পারতাম। আবার ফলস বুনা হলে খেলা বন্ধ হয়ে যেতো। এখন মাঠ হলো। আমরা সারা বছরই খেলতে পারবো। তাই খুব ভালো লাগছে।

অপর কিশোর রাব্বী জোহা বলেন, বাড়ির উঠানে খেলতে গেলে ফুটবলের আঘাতে ঘরের বেড়া ক্ষতি হতো। এজন্য গালাগালি শুনতে হতো। এখন মাঠে খেলতে পারবো। খেতে গিয়ে কারো ক্ষতি হবে না।প্রবীন ব্যক্তি আব্দুল মান্নান ব্যাপারী বলেন, আমরা একটা মাঠের জন্য অনেক চেষ্টা করেছি। আজ আমাদের স্বপ্নের মাঠ বাস্তবায়ন হলো। তাই খুব আনন্দ লাগছে।বাবুপুর মসজিদ কমিটির সভাপতি নজরুল শিকদার বলেন, এই মাঠে খেলাধুলা চর্চা হলে কিশোর-যুবকরা সুস্থ্য সুন্দর পরিবেশ পাবে। তারা মাদক ও সন্ত্রাস থেকে দূরে থাকবে।

বাবুপুর সরকারি প্রথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক এবং মোনালিসা উইমেন্স স্পোটর্স অ্যাকাডেমির পরিচালক মোনালিসা মুন্নি বলেন, বাবুপর গ্রামের মানুষের অনেক দিনের স্বপ্ন ছিলো একটি খেলার মাঠের। সেটির ব্যবস্থা তারা করতে পেরেছে। এটি অনেক বড় প্রাপ্তি।সরকারি মাওলানা মোহাম্মদ আলী কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ শামসুল হুদা বলেন, সরকারি-বেসরকারি কোন পর্যায়ের সাহায্য ছাড়া একটি গ্রামের মানুষেরা নিজেদের উদ্যোগে খেলার মাঠের জন্য জমি কিনেছে। এটি অনেক ভালো খবর। এদের দেখে আরো অনেক গ্রামের মানুষ অনুপ্রাণিত হবে। তারা নিজেদের উদ্যোগে নিজ নিজ গ্রামে ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক চর্চার কেন্দ্র গড়ে তুলবে।

ডিএস../