০৫:৪৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬

গাজীপুরে আন্দোলনের ষষ্ঠ দিনেও উত্তপ্ত দুই মহাসড়ক: বাসন থানায় হামলার চেষ্টা, ৩৫ কারখানা বন্ধ

ন্যূনতম মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে গাজীপুর শিল্পাঞ্চলে আন্দোলনের ষষ্ঠ দিনেও বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ, মহাসড়ক অবরোধ, দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। বুধবার (৪ নভেম্বর) সকাল থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলনে গাজীপুর মহানগরীর বড়বাড়ী, সাইনবোর্ড, ভোগড়া বাইপাস এবং রাজেন্দ্রপুরের বাংলাবাজার এলাকা রণাঙ্গনে পরিণত হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ, বিজিবি ও যৌথ বাহিনী ব্যাপক টিয়ারশেল এবং সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে অন্তত ৩৫টি তৈরি পোশাক কারখানা আজকের মতো বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বুধবার সকাল ৯টা পর্যন্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনরত শ্রমিকেরা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বোর্ডবাজারের বড়বাড়ী, সাইনবোর্ড, ছয়দানা, মালেকের বাড়ি ও ভোগড়া বাইপাস এলাকায় জড়ো হতে থাকেন। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে তারা সড়কের ওপর অবস্থান নিয়ে সব ধরনের যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেন।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের সড়ক থেকে সরিয়ে দিতে গেলে আন্দোলনকারীরা পুলিশ ও বিজিবিকে লক্ষ্য করে ব্যাপক ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করেন। এ সময় বড়বাড়ী এলাকায় একপর্যায়ে কিছু বিক্ষুব্ধ শ্রমিক ও দুষ্কৃতকারী নগরীর বাসন থানায় হামলার চেষ্টা চালায়। তারা লাঠিসোঁটা নিয়ে থানার ভেতরে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করলে পুলিশ কয়েক রাউন্ড টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে হামলাকারীদের পিছু হটতে বাধ্য করে। পরবর্তীতে আন্দোলনকারীরা মহাসড়কের দুপাশের বিভিন্ন অলিগলিতে অবস্থান নিয়ে পুলিশের ওপর হামলা চালানোর চেষ্টা করলে পুলিশ গলির মুখে টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

এদিকে মঙ্গলবার গাজীপুরের বাংলাবাজার এলাকায় শ্রমিক আন্দোলনের দৃশ্য ভিডিও ধারণের সময় বহিরাগতদের হামলায় গুরুতর আহত ‘লায়লা স্টাইলস লিমিটেড’-এর কাটিন সেকশনের শ্রমিক তৌফিক শেখের (২১) রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়। তৌফিকের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে বুধবার সকালে রাজেন্দ্রপুর-বাংলাবাজার সড়কের অ্যাপিলিয়ন গার্মেন্টসের সামনে লায়লা স্টাইলসসহ আশপাশের কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা বিক্ষোভ মিছিল বের করেন।

আন্দোলনরত শ্রমিকদের অভিযোগ, মিছিল বের করলে কিছু বহিরাগত দুর্বৃত্ত আবার তাদের মিছিলে বাধা দেয় এবং কয়েকজন শ্রমিককে মারধর ও নির্যাতন করে। এ সময় যৌথ বাহিনী ও পুলিশ উপস্থিত হয়ে সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারশেল ছুড়ে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে দিলে সেখানে থমথমে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, কালিয়াকৈর, কোনাবাড়ী, বাসনা ও গাছা থানায় গত কয়েক দিনের ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও মহাসড়ক অবরোধের ঘটনায় ইতোমধ্যে পৃথক চারটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলায় নামধারীসহ অন্তত ১০ সহস্রাধিক অজ্ঞাতপরিচয় শ্রমিক ও বহিরাগত দুষ্কৃতকারীকে আসামি করা হয়েছে।

সহিংস পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গাজীপুরজুড়ে বিপুল পরিমাণ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। গাজীপুর জেলা প্রশাসনের ২৫ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের প্রত্যক্ষ পরিচালনায় ১২ প্লাটুন বিজিবি, ৫ প্লাটুন আনসার ও ৮ প্লাটুন এসআরবি (স্পেশাল রিজার্ভ ব্যাটালিয়ন) শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন সংবেদনশীল পয়েন্টে টহল ও অবস্থান জোরদার করেছে।

গাজীপুর শিল্পাঞ্চল-২ এর পুলিশ সুপার মো. আমজাদ হোসাইন জানান, সকালে কিছু কারখানায় শ্রমিকেরা কাজে যোগ দিলেও পরবর্তীতে বহিরাগতদের উসকানিতে ভোগড়া, চান্দনা চৌরাস্তা ও সাইনবোর্ডসহ বিভিন্ন পয়েন্টে সড়ক অবরোধের চেষ্টা করা হয়। বিজিবি ও পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড এবং টিয়ারশেল ব্যবহার করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে ৩৫টির মতো কারখানা আজ ছুটি দেওয়া হয়েছে।

গাজীপুর মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার তাহেরুল হক চৌহান এবং বাসন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হারুন অর রশিদ জানান, দুপুরের পর থেকে ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে এবং বহিরাগত নাশকতামূলক তৎপরতা রুখতে কৌশলগত মোড়গুলোতে পুলিশ কঠোর নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছে।

ডিএস./

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

এইচএসসির সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষা শুরু ১ ডিসেম্বর, দুই বিষয়ে সুযোগ

গাজীপুরে আন্দোলনের ষষ্ঠ দিনেও উত্তপ্ত দুই মহাসড়ক: বাসন থানায় হামলার চেষ্টা, ৩৫ কারখানা বন্ধ

প্রকাশিত : ০৪:৫০:০৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬

ন্যূনতম মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে গাজীপুর শিল্পাঞ্চলে আন্দোলনের ষষ্ঠ দিনেও বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ, মহাসড়ক অবরোধ, দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। বুধবার (৪ নভেম্বর) সকাল থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলনে গাজীপুর মহানগরীর বড়বাড়ী, সাইনবোর্ড, ভোগড়া বাইপাস এবং রাজেন্দ্রপুরের বাংলাবাজার এলাকা রণাঙ্গনে পরিণত হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ, বিজিবি ও যৌথ বাহিনী ব্যাপক টিয়ারশেল এবং সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে অন্তত ৩৫টি তৈরি পোশাক কারখানা আজকের মতো বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বুধবার সকাল ৯টা পর্যন্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনরত শ্রমিকেরা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বোর্ডবাজারের বড়বাড়ী, সাইনবোর্ড, ছয়দানা, মালেকের বাড়ি ও ভোগড়া বাইপাস এলাকায় জড়ো হতে থাকেন। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে তারা সড়কের ওপর অবস্থান নিয়ে সব ধরনের যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেন।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের সড়ক থেকে সরিয়ে দিতে গেলে আন্দোলনকারীরা পুলিশ ও বিজিবিকে লক্ষ্য করে ব্যাপক ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করেন। এ সময় বড়বাড়ী এলাকায় একপর্যায়ে কিছু বিক্ষুব্ধ শ্রমিক ও দুষ্কৃতকারী নগরীর বাসন থানায় হামলার চেষ্টা চালায়। তারা লাঠিসোঁটা নিয়ে থানার ভেতরে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করলে পুলিশ কয়েক রাউন্ড টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে হামলাকারীদের পিছু হটতে বাধ্য করে। পরবর্তীতে আন্দোলনকারীরা মহাসড়কের দুপাশের বিভিন্ন অলিগলিতে অবস্থান নিয়ে পুলিশের ওপর হামলা চালানোর চেষ্টা করলে পুলিশ গলির মুখে টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

এদিকে মঙ্গলবার গাজীপুরের বাংলাবাজার এলাকায় শ্রমিক আন্দোলনের দৃশ্য ভিডিও ধারণের সময় বহিরাগতদের হামলায় গুরুতর আহত ‘লায়লা স্টাইলস লিমিটেড’-এর কাটিন সেকশনের শ্রমিক তৌফিক শেখের (২১) রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়। তৌফিকের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে বুধবার সকালে রাজেন্দ্রপুর-বাংলাবাজার সড়কের অ্যাপিলিয়ন গার্মেন্টসের সামনে লায়লা স্টাইলসসহ আশপাশের কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা বিক্ষোভ মিছিল বের করেন।

আন্দোলনরত শ্রমিকদের অভিযোগ, মিছিল বের করলে কিছু বহিরাগত দুর্বৃত্ত আবার তাদের মিছিলে বাধা দেয় এবং কয়েকজন শ্রমিককে মারধর ও নির্যাতন করে। এ সময় যৌথ বাহিনী ও পুলিশ উপস্থিত হয়ে সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারশেল ছুড়ে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে দিলে সেখানে থমথমে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, কালিয়াকৈর, কোনাবাড়ী, বাসনা ও গাছা থানায় গত কয়েক দিনের ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও মহাসড়ক অবরোধের ঘটনায় ইতোমধ্যে পৃথক চারটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলায় নামধারীসহ অন্তত ১০ সহস্রাধিক অজ্ঞাতপরিচয় শ্রমিক ও বহিরাগত দুষ্কৃতকারীকে আসামি করা হয়েছে।

সহিংস পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গাজীপুরজুড়ে বিপুল পরিমাণ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। গাজীপুর জেলা প্রশাসনের ২৫ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের প্রত্যক্ষ পরিচালনায় ১২ প্লাটুন বিজিবি, ৫ প্লাটুন আনসার ও ৮ প্লাটুন এসআরবি (স্পেশাল রিজার্ভ ব্যাটালিয়ন) শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন সংবেদনশীল পয়েন্টে টহল ও অবস্থান জোরদার করেছে।

গাজীপুর শিল্পাঞ্চল-২ এর পুলিশ সুপার মো. আমজাদ হোসাইন জানান, সকালে কিছু কারখানায় শ্রমিকেরা কাজে যোগ দিলেও পরবর্তীতে বহিরাগতদের উসকানিতে ভোগড়া, চান্দনা চৌরাস্তা ও সাইনবোর্ডসহ বিভিন্ন পয়েন্টে সড়ক অবরোধের চেষ্টা করা হয়। বিজিবি ও পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড এবং টিয়ারশেল ব্যবহার করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে ৩৫টির মতো কারখানা আজ ছুটি দেওয়া হয়েছে।

গাজীপুর মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার তাহেরুল হক চৌহান এবং বাসন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হারুন অর রশিদ জানান, দুপুরের পর থেকে ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে এবং বহিরাগত নাশকতামূলক তৎপরতা রুখতে কৌশলগত মোড়গুলোতে পুলিশ কঠোর নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছে।

ডিএস./