আজ ২৪ নভেম্বর। ১৯৭১ সালে এই দিনে কাপাসিয়া হানাদার মুক্ত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে কাপাসিয়া একটি বিশেষ ভাবে স্মরনীয় ও উল্লেখযোগ্য নাম। কারণ বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে যিনি নেতৃত্ব দিয়ে গৌরবোজ্জ্বল বিজয় ছিনিয়ে আনেন। তাঁর পূন্য জন্মভূমি কাপাসিয়া। তিনি আর কেউ নন,তিনি হলেন বাংলাদেশের প্রথম প্রধান মন্ত্রী বঙ্গতাজ তাজউদ্দিন আহম্মদ। আর তাঁর পথ ধরেই কাপাসিয়ার বীর সেনানীরা মূলত বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের পর থেকে শুরু হয কাপাসিয়ায় মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি। ১৯ মার্চ ১৯৭১ মাহমুদ আলম খান বেনুর নেতৃত্বে আমরা সর্ব প্রথম শপথ গ্রহন করি Ñ জীবন দিযে হলেও মুক্তিযুদ্ধ করে বাংলাদেশকে স্বাধীন করবো। সেই থেকে শুরু হয় দেশের অভ্যন্তরে অস্ত্র সংগ্রহ ও প্রশিক্ষন। পরবর্তীতে ভারত গমন,প্রশিক্ষন শেষে অস্ত্রশস্ত্রসহ পুনরায় কাপাসিয়ায় আগমন এবং পাক সেনাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অপারেশন।২২,২৩ এবং ২৪ নভেম্বর কাপাসিয়া হানাদার মুক্ত হওয়ার ঘটনা।
১৯৭১ সালের ২১ নভেম্বর ঈদুল ফিতর। ২০ নভেম্বর ঈদের আগের দিন তরগাঁও খেয়াঘাটে পাক সেনাদের সাথে সম্মূখ যুদ্ধে অবতীর্ণ হই। আমাদের আক্রমন এত তীব্র ও কৌশলী ছিল যে,তারা নৌকা দিয়ে কাপাসিয়া পাক সেনা ক্যাম্পে পশ্চাদাচরণ করতে বাধ্য হয়েছে এবং আমাদের গুলিতে নৌকায় থাকা বেশ কয়েকজন পাক সেনা নিহত হয়। অপর দিকে তাদের গুলিতে টোকের মুক্তিযোদ্ধা নরেন এবং চরখামের মুক্তিযোদ্ধা সাহাব উদ্দিন গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন। চিকিৎসা করে তাদের গুলি বের করা হয় এবং পরে তারা সুস্থ্য হন। এরপর আমরা পরিকল্পনা করি কাপাসিয়া পাকসেনাদের ক্যাম্প আমরা আক্রমন করবো এবং কাপাসিয়া হানাদার মুক্ত করবো। সে অনুয়ায়ী পাকসেনাদের অবস্থান এবং আক্রমন রচনা করার জন্য কৌশলগত বিভিন্ন দিক ঠিক করার জন্য রায়েদ ইউনিয়নের বাগেরহাট গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা নাজিম উদ্দিনকে কাপাসিয়া পাঠাই। তিনি বাংলাদেশ রেলওয়েতে ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে চাকুরী করে বর্তমানে অবসর জীবন যাপন করছেন। তিনি ছিলেন অসীম সাহসী ও বুদ্ধিমান। ২২ নভেম্বর নাজিম উদ্দিন ছদ্মবেশে কাপাসিয়া পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে পাক সেনাদের ক্যাম্পে যান। তাদের সাথে মাঠে ফুটবল খেলেন। স্থানীয়ভাবে যারা খেলায় অংশ গ্রহণ করেছিলেন তাঁদের কাছ থেকেও প্রয়োজনীয় বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করেন। তাছাড়া আমি নিজে রাজাকারদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করি। আমিও সনমানিয়া ইউনিয়নের ধানদিয়া বটতলার মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প থেকে সাফাইশ্রী খেয়া পার হয়ে সাফাইশ্রী মোড়ে অবস্থিত কৃষি অফিসের একজন অফিসারের অফিসে অবস্থান নেই। অফিসটি সম্ভবত: কুষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের ছিল। আমার যতদুর মনে পড়ে অফিসারের বাড়ী ছিল ময়মনসিংহের গফরগাঁও। আমি ওই অফিসে বসে যে সকল রাজাকার পাকসেনা ক্যাম্প থেকে রাস্তায় টহল দেয় তাদের সাথে যোগাযোগ করি। তারা আমার সাথে দেখা করে। তাদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করি। আমার সহপাঠি ব›ন্ধুর ফজলু। বাড়ী কাপাসিয়া ইউনিয়নের জামিরারচর গ্রামে। সে রাজাকার ছিল এবং কাপাসিয়া পাক সেনাক্যাম্পে দায়িত্বরত ছিল। আমি তার সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক নিয়ে যোগাযোগ করি। তার সাথে সাক্ষাৎ এবং আক্রমনের পরিকল্পনার জন্য তার গ্রামের বাড়ীতে যাওয়ার পরিকল্পনা করি। সেমতে ২২ নভেম্বর রোজার ঈদের পরের দিন আমি এবং আমার আরেক সহযোদ্ধা মো: রফিকুল ইসলাম,বাড়ী চাঁদপুর এবং সনমানিয়া ইউনিয়নের আড়াল গ্রামের কেসলু ভাইকে নিয়ে আমার তিনজন ধানদিয়ার রফিক নায়েবের বাড়ীতে স্থাপিত মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প থেকে জামিরারচরের উদ্দেশ্যে পায়ে হেঁটে রওয়ানা দেই। দুপুর ১২টার দিকে জমিরারচরের শাহাজাহান ভাইদের বাড়ীতে যাই এবং সেখানে দুপুরের খাবার খাই। শাহজাহান ভাই একজন ব্যবসায়ী। একসময় ঢাকা বিখ্যাত ইব্রাহিম ট্রেইলার্স পরিচালনা করতেন। বিকাল ৩/৩-৩০টার দিকে পূর্বে নির্ধরিত সময় ও স্থানে আমার রাজাকার বন্ধু ফজলু আমার সাথে সাক্ষাৎ করতে আসে। আমি তাকে নিয়ে কারণে এমন একটি জায়গায় বসেছিলাম যার একটু সামনে বামে এবং ডানে জঙ্গলের মত নানা গাছগাছড়া ঝোপ। আমার নিরাপত্তার জন্য ওই ঝোপ দুটোতে মুক্তিযোদ্ধা রফিক এবং কেসলু অস্ত্র নিয়ে এ্যামবুস অবস্থানে ছিল যাতে ফজলু আমার কোন রকম ক্ষতি করতে না পারে। বন্ধু হলেও রাজাকার,সেজন্য মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে আমাকে সর্বদা সতর্ক থাকতে হয়েছে। এমতাবস্থায় আলাপচারিতার এক পর্যায়ে ফজলু একটি সিগারেট জ¦ালিয়ে আরেকটি সিগারেট আমাকে দেয় । আমি তখন তাঁর জ¦ালানো সিগারেটটি নিলাম এবং সে আমাকে যেটি দিয়েছিল সেটি তাকে জ¦ালিয়ে নিতে বললাম যা হউক তার সাথে আলাপ করে পাক সেনা ক্যাম্প আক্রমনের পুরো কৌশল নির্ধারন করলাম। ২৩ নভেম্বর রাতে পাক সেনাদের ক্যাম্প আক্রমনের সিদ্ধান্ত নিলাম। তাই,ওই রাতে বেনুদাকে সকল তথ্য সরবরাহ করি এবং কাপাসিয়া অবস্থানরত সকল গ্রুপের মুক্তিযোদ্ধাদেরকে কখন কোথায় কী ভাবে অবস্থান নিতে হবে সে বিষয়ে যেন বেনুদা সমন্বয় করতে পারেন। ২২ নভেম্বর রাতে এবং ২৩ নভেম্বর দিনে সংশ্লিষ্ট সকলকে আক্রমনে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়। সে মতে মুক্তিযোদ্ধারা ২৩ নভেম্বর রাতে বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নেয়। এমন অবস্থায় রাজাকাররা ভীত হয়ে পড়ে এবং পাক সেনারাও বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমনের তীব্রতায় মনোবল হারিয়ে ফেলে।
ফলে ২৪ নভেম্বর ভোর ৬টার দিকে পাক সেনারা কাপাসিয়া ক্যাম্প ছেড়ে ঢাকার দিকে রওয়ানা দেয়। আমি তখন জামিরারচরে শাজাহান ভাইদের বাড়ীতে ছিলাম। লোকজন এসে খবর দিল পাক সেনারা চলে যাচ্ছে। এ খবর পেয়ে জামিরারচর ব্রীজের কাছে যেয়ে দেখি স্থানীয় পাক সেনাদের দালালসহ তারা গরুর গাড়ী ও আর্মির গাড়ীতে করে চলে যাচ্ছে। তারপর আমরা পাকা রাস্তায় এন্টিটেঙ্ক মাইন পোতার সিদ্ধান্ত নেই, এ গুলো নিয়ে আমাদের আশ্রয় স্থল থেকে আসতে আসতে ইতোমধ্যে পাকসেনারা জামিরারচর ব্রীজ অতিক্রম করে রাজেন্দ্রপুরের দিকে অগ্রসর হয়ে যায়। তাদের আক্রমন করে গতিরোধ করার সুযোগ পাইনি। তবে তারা চলে যাওয়ার সাথে সাথেই জামিরারচর ব্রীজের পূর্ব পাশে অবস্থানরত রাজাকারদের ঘেরাও করি। অস্ত্রসহ তাদেরকে আত্বসমর্পন করাই। পরে তাদের মাথায় রাইফেল ও গোলাবারুদ দিয়ে কাপাসিয়ার দিকে নিয়ে আসি। তাদেরকে নিয়ে জয় বাংলা স্লোগান দিতে দিতে কাপাসিয়া পাইলট স্কুলে যেখানে পাকসেনাদের ক্যাম্প ছিল সেখানে নিয়ে আসি। তখনও কাপাসিয়া নদীর ওপারে চরে মুক্তিযোদ্ধারা অক্রমন করার অবস্থায় অবস্থানরত ছিল। আমি তখন কাপাসিয়া পাইলট স্কুলের নদীরপাড়ের আমগাছতলায় একটি উঁচু পিলারের উপর দাড়িয়ে রাজাকারদের নিয়ে “জয় বাংলা” স্লোগান দেই এবং ঘোষনা দেই কাপাসিয়া মুক্ত। সকলে ্ এ্যাম্বুস উঠিয়ে হানাদার মুক্ত কাপাসিয়া আসুন। দুপুরে সকল মুক্তিযোদ্ধারা কাপাসিয়া আসে এবং সবাই মিলে বাঙ্গালীর প্রাণের স্লোগান “জয় বাংলা”ধ্বনিতে কাপাসিয়া মুখরিত করে তুলি। এভাবে মুক্তিযুদ্ধের ২৪৪ দিনের মাথায় কাপাসিয়া হানাদার মুক্ত হয়।
বিবি / ইএম




















