বাংলাদেশের রফতানি আয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উন্নয়নে নতুন সম্ভাবনা । অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নে যে কোনো সূচকের বিচারে বাংলাদেশ বর্তমানে সবচেয়ে শক্ত অবস্থানে। গত দুই দশকে অভূতপূর্ব অগ্রগতি সাধিত হয়েছে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে। উন্নয়নের ঢেউ লেগেছে অর্থনীতির প্রতিটি ক্ষেত্রে। বেড়েছে কর্মসংস্থান, বেড়েছে সাধারণ মানুষের আয়। দারিদ্র্যের হার কমে প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
কৃষি, শিল্পবাণিজ্যসহ প্রায় সব খাতেই উল্লেখযোগ্য উন্নতি দৃশ্যমান। বিগত অর্থবছরের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো পণ্য রফতানি আয়ে অর্জিত হয়েছে নতুন মাইলফলক। দেশের রফতানি বাণিজ্যের ইতিহাসে সদ্যবিদায়ী ২০১৮-১৯ অর্থবছরে শেষ পর্যন্ত দেশের সামগ্রিক পণ্য রফতানি ৪০ বিলিয়ন বা চার হাজার কোটি মার্কিন ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করেছে। রফতানি আয়ের এ মাইলফলক অর্জন অর্থনৈতিক অগ্রগতির ধারাকে মসৃণ করবে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে দেশের সামগ্রিক উৎপাদন ও বিনিময় বাণিজ্যে বিরাট ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বাংলাদেশ রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর সর্বশেষ হালনাগাদ করা তথ্যে দেখা যায়, তৈরি পোশাক খাত, প্রক্রিয়াজাত কৃষিজ পণ্য এবং টেরিটাওয়েল পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে রফতানির পরিমাণ বেশি হওয়ায় এ মাইলফলক স্পর্শ করা সম্ভব হয়েছে। গত অর্থবছরে পণ্য রফতানির লক্ষ্যমাত্রা ছিল তিন হাজার ৯০০ কোটি ডলার, যার বিপরীতে জুলাই ২০১৮ থেকে জুন ২০১৯ পর্যন্ত মোট পণ্য রফতানি হয়েছে চার হাজার ৫৩ কোটি ডলার।
এই আয় তার আগের অর্থবছরে রফতানি হওয়া তিন হাজার ৬৬৬ কোটি ডলারের চেয়ে ১০ দশমিক ৫৫ শতাংশ বেশি, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও তিন দশমিক ৯৪ শতাংশ বেশি। এটিই এখন পর্যন্ত দেশের সর্বোচ্চ রফতানি আয়। সব মিলিয়ে বছর শেষে পণ্য রফতানি খাতে প্রবৃদ্ধি সাড়ে ১০ শতাংশ, যা নিঃসন্দেহে একটি বিরাট ব্যাপার। রফতানি আয়ের এ বিরাট লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে মূলত তৈরি পোশাক খাত। বিদায়ী অর্থবছরে মোট রফতানি আয়ের ৮৪ শতাংশ পোশাক খাত থেকে এসেছে। সব মিলিয়ে বছরটিতে তিন হাজার ৪১৩ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রফতানি হয়েছে। এই আয় ২০১৭-১৮ অর্থবছরের চেয়ে ১১ দশমিক ৪৯ শতাংশ বেশি। আর বিদায়ী অর্থবছরের পোশাক রফতানি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে চার দশমিক ৪২ শতাংশ বেশি। বাংলাদেশে তৈরি পোশাকের দ্বিতীয় বড় বাজার হলো যুক্তরাষ্ট্র। রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর এ বাজারটিতে পোশাক রফতানি একেবারেই কমে যায়।
পোশাক শ্রমিকদের অনুপযুক্ত-অনিরাপদ কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তাহীনতাসহ নানা ধরনের অভিযোগে যথাযথ মান নিয়ন্ত্রণ করে উৎপাদন হচ্ছে না বলে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল সে দেশের বড় বড় পোশাক ক্রেতা। একে একে ইউরোপের বিভিন্ন বাজার থেকেও আসছিল হতাশার বাণী। ক্রেতারা একটার পর একটা অর্ডার বাতিল করছিল। সেই সময়ে শেখ হাসিনা সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টা ও যথার্থ উদ্যোগের ফলে রফতানি ধস অনেকাংশেই ঠেকানো সম্ভব হয়েছিল, কিন্তু কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছিল না। এ বছর সেটাই সম্ভব হলো। এর পেছনে অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের চলতি বাণিজ্যযুদ্ধ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের এ বাণিজ্যযুদ্ধ বাংলাদেশের পণ্য রফতানি খাতের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। এ সুযোগ যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারলে রফতানি আয় আরও বিপুল পরিমাণ বাড়ানো সম্ভব হবে সহজেই। চলমান চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে মার্কিন ক্রেতাদের জন্য চীন থেকে পোশাক আমদানির দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে অনেক মার্কিন ক্রেতা সরাসরি ঝুঁকেছেন বাংলাদেশের দিকে। সেজন্য পোশাক কারখানায় ক্রয়াদেশ বেড়েছে। বর্ধিত ক্রয়াদেশের কারণে রফতানিও বেড়েছে। ফলে রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির সময় মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছিল যে পোশাক বাজার, গত তিন বছরের ব্যবধানে যুক্তরাষ্ট্রের বিরাট এই বাজারে ঘুরে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জানুয়ারি-মে) যুক্তরাষ্ট্রে ২৫৫ কোটি ডলারের পোশাক রফতানি করা হয়েছে। গত বছরের এই সময়ে রফতানি হয়েছিল ২২১ কোটি ডলারের পোশাক। তার মানে, চলতি বছরের পাঁচ মাসে রফতানি বেড়েছে প্রায় সাড়ে ১৫ শতাংশ।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শীর্ষ ছয় পোশাক রফতানিকারক দেশের মধ্যে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। দেশের উদ্যোক্তারা বলছেন, চলমান বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচুর ক্রয়াদেশ আসছে। অনেক নতুন ক্রেতা খোঁজখবর নিচ্ছে। সদ্যবিদায়ী অর্থবছরে পোশাকের বাইরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১০১ কোটি ৯৭ লাখ ডলারের রফতানি আয় এসেছে চামড়া খাত থেকে, যদিও দীর্ঘদিন ধরে খাতটির রফতানি আয় নি¤œমুখী। গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়া পণ্যের রফতানি কমেছে ছয় শতাংশ। তৃতীয় সর্বোচ্চ ৯০ কোটি ৮৯ লাখ ডলারের রফতানি আয় হয়েছে প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য থেকে। এই আয় গত ২০১৭-১৮ অর্থবছরের চেয়ে ৩৪ দশমিক ৯২ শতাংশ বেশি। দেশের পণ্য রফতানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে যে বর্ধিত প্রবৃদ্ধি অর্জিত হচ্ছে, তা ধরে রাখতে হবে। চীন-যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যযুদ্ধ বাংলাদেশের জন্য যে অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে, তার সদুপায় করতে হবে শতভাগ।
এই সুযোগ নষ্ট করলে চলবে না। সুযোগ যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারলে আরও বিপুল পরিমাণ রফতানি আয় বাড়ানো সম্ভব। সেজন্য রফতানি খাতগুলোর সমস্যা চিহ্নিত করে দ্রুত সমাধান করতে হবে। কাস্টমসকে ঢেলে সাজাতে হবে। রফতানি বাড়ানোর জন্য নতুন বিনিয়োগ ও শিল্পায়ন দরকার। বিনিয়োগ প্রক্রিয়াকে নিরবচ্ছিন্ন করতে হলে দেশের ব্যাংক খাতের সক্ষমতা বাড়াতে হবে সবার আগে। শিল্প মূলধন গঠনের জন্য ব্যাংক ঋণ বিরাট ভূমিকা পালন করে। দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হলে কম সুদে ঋণ নিতে পারবে উদ্যোক্তারা। নতুন বিনিয়োগসহ পুরোনো শিল্প-কারখানাগুলোর আধুনিকায়নে মনোযোগী হতে পারবে তারা। রফতানি বৃদ্ধি করতে হলে উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি করার বিকল্প নেই। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ভালো করতে হলে চীনের উদ্যোক্তারা যেসব পোশাক তৈরি করে, সেসব পোশাক তৈরির চেষ্টা করতে হবে।
সাধারণ সুতার পাশাপাশি উন্নত মানের সুতা উৎপাদনে যেতে হবে। বৃদ্ধি করতে হবে পোশাকের মান। কেবল স্বল্পমূল্যের শ্রমের ওপর নির্ভর করলে চলবে না, উৎপাদন পদ্ধতির আধুনিকায়ন ও দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের চাহিদা অনুসারে গুণগত মানসম্পন্ন পণ্য তৈরিতে নজর দিতে হবে। বর্তমান সরকার উন্নয়নের সরকার। এ সরকারের অধীনে তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে দেশের অর্থনীতি। অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে সব রকম সহায়তা দিতে শেখ হাসিনার সরকার সব সময়ই প্রস্তুত। চলতি অর্থবছরের বাজেটে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও কানাডার বাজারে পোশাক রফতানিতে এক শতাংশ হারে নগদ সহায়তা দেয়া হয়েছে। সরকারের এ উদ্যোগ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ক্রেতা ধরতে বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের সহায়তা করবে। প্রথমবারের মতো ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে নতুন উদ্যোক্তাদের সহায়তার জন্য সরকার ‘স্টার্টআপ ফান্ড’ বা ‘নতুন উদ্যোক্তা তহবিল’ গঠন করার উদ্যোগ নিয়েছে, যার মাধ্যমে নতুন উদ্যোক্তা তৈরির পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। শেখ হাসিনা সরকারের যোগ্য নেতৃত্বে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অর্জিত হচ্ছে কাক্সিক্ষত প্রবৃদ্ধি।
দেশের বিদ্যমান এ প্রবৃদ্ধিকে দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখতে হলে রফতানি আয় আরও বাড়াতে হবে। রফতানি আয় কাক্সিক্ষত মাত্রায় বাড়াতে হলে পণ্য রফতানি বহুমুখীকরণ করতে হবে। অনুসন্ধান করতে হবে নতুন বাজার। উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধিরও বিকল্প নেই। বর্তমানে দেশে যে অবকাঠামো রয়েছে, তা দিয়ে রফতানি দুই-তৃতীয়াংশ বাড়ানো সম্ভব। এজন্য তিনটি বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। তা হচ্ছেÑবাণিজ্য উদারীকরণ, বাজারভিত্তিক মুদ্রাবিনিময় হার প্রবর্তন ও বাণিজ্যের কর হার কমিয়ে আনা। সব ক্ষেত্রেই শেখ হাসিনার সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। তবে একটি কথা ভুললে চলবে না, চীন-যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য দ্বৈরথে দেশের রফতানি বাণিজ্যে এই যে অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তা চিরস্থায়ী হবে না। সাময়িক এ অনুকূল পরিবেশের পূর্ণ ব্যবহারের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে রফতানি বাজারকে বিস্তৃত করার দিকেও নজর দিতে হবে এখনই। কারণ চীন-যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংকট কেটে গেলেই এ বর্ধিত চাহিদা কমে আসতে পারে। তার আগেই তালাশ করতে হবে নতুন বাজার।
একুশ শতকে অর্থনৈতিক উন্নয়নই হবে সব রাষ্ট্র ও জাতির শ্রেষ্ঠত্ব এবং প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার অন্যতম নিয়ামক। সে জন্য রফতানি আয় বৃদ্ধি, রফতানি পণ্যের বহুমুখীকরণ, বৈচিত্র্যময়তা তৈরি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে শক্ত অবস্থান তৈরি করার মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের ধারাবাহিকতাকে টেকসই করার বিকল্প নেই।
বিজনেস বাংলাদেশ/শ




















