পূর্ণাঙ্গ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর চেয়েও ভালো ব্যবসা করছে কনভেনশনাল (প্রচলিত) ব্যাংকের ইসলামি শাখাগুলো। এসব শাখায় অন্য ব্যাংকের তুলনায় আমানত সংগ্রহের হার বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। আমানত বেশি পাওয়ায় এসব ব্যাংকের শাখা ঋণও বিতরণ করছে অন্য ব্যাংকের দ্বিগুণেরও বেশি হারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে এতথ্য তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, এ বছরের জুন পর্যন্ত সময়ে যেখানে সাধারণ ব্যাংকের ১০ শতাংশ হারেও আমানত বাড়ছে না, সেখানে কনভেনশনাল ব্যাংকের ইসলামি শাখাগুলোতে আমানত বেড়েছে ২৮ দশমকি ২২ শতাংশ। আর প্রচলিত ব্যাংকের ইসলামি উইন্ডোরগুলোতে আমানত বেড়েছে ২৪ দশমিক ৫৬ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এই ব্যাংকগুলো শুধু সাধারণ ব্যাংকের চেয়ে বেশি হারে আমানত পাচ্ছে এমনটিই নয়, শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর চেয়েও এরা বেশি হারে আমানত পাচ্ছে। এ বছরের জুন পর্যন্ত সময়ে পূর্ণাঙ্গ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোতে আমানত বেড়েছে মাত্র ১১ দশমিক ৮০ শতাংশ।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষক ড. জায়েদ বখত বলেন, ‘সাধারণ ব্যাংকে আমানতে সুদ হার কমে যাওয়ার কারণে অনেকেই কনভেনশনাল ব্যাংকের ইসলামি শাখা ও ইসলামি উইন্ডোরগুলোর দিকে ঝুঁকছে।’ মূলত, বেশি লাভের আশায় মানুষজন এই শাখাগুলোতে আমানত রাখছে বলেও মনে করেন তিনি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে— সাধারণ ব্যাংকে বার্ষিক ঋণ বিতরণ ১১ শতাংশ হারে বাড়লেও কনভেনশনাল ব্যাংকের ইসলামি শাখাগুলোতে ঋণ বিতরণ বেড়েছে ২৪ দশমকি ৮৭ শতাংশ। আর প্রচলিত ব্যাংকের ইসলামি উইন্ডোরগুলোতে ঋণ বেড়েছে ২০ দশমিক ৯১ শতাংশ। এ বছরের জুন পর্যন্ত সময়ে পূর্ণাঙ্গ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোতে ঋণ বিতরণ বেড়েছে মাত্র ১২ দশমিক ৫৭ শতাংশ। যদিও গত জুলাই পর্যন্ত বেসরকারি খাতে (পুরো ব্যাংক খাতে) ঋণ বিতরণ বেড়েছে মাত্র ১১ দশমিক ২৬ শতাংশ। বর্তমানে দেশে পুরোদমে ইসলামি ব্যাংকিং কার্যক্রম চালাচ্ছে ৮টি ব্যাংক। ৯টি প্রচলিত (কনভেনশনাল) ব্যাংকের ১৯টি শাখা এবং ৮টি প্রচলিত ব্যাংকের ২৫ উইন্ডোর মাধ্যমে ইসলামি ব্যাংকিং চলছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব মতে, ইসলামি ব্যাংকিং করছে এমন ব্যাংগুলোর মোট আমানতের পরিমাণ ২ লাখ ৫৩ হাজার ৫৮ কোটি টাকা। এক বছর আগে এর পরিমাণ ছিল ২ লাখ ২৪ কোটি ৭৫৬ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে ইসলামি ব্যাংকিংয়ে আমানতের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ১৩ শতাংশ। অবশ্য জুন পর্যন্ত সময়ে দেশের পুরো ব্যাংক খাতে মোট আমানতের স্থিতি ছিল ১০ লাখ ৬৪ হাজার ৫৩৬ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ ত্রৈমাসিক (এপ্রিল-জুন) প্রতিবেদনে দেখা যায়— এ বছরের জুন পর্যন্ত পুরো ব্যাংক খাতের বিতরণ করা ঋণ ছিল ১০ লাখ ১০ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলো বিতরণ করেছে ছিল দুই লাখ ৪৫ হাজার ১৮৮ কোটি টাকা। জুন পর্যন্ত দেশের ব্যাংক খাতের বিতরণ করা কৃষিঋণের স্থিতি ছিল ৪২ হাজার ৯৭৪ কোটি টাকা।
এর মধ্যে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা কৃষিঋণের পরিমাণ ছিল মাত্র ১২৬ কোটি ১০ লাখ টাকা, যা ব্যাংক খাতের মোট বিতরণ করা কৃষিঋণের মাত্র তিন দশমিক ৩১ শতাংশ। আর মার্চ পর্যন্ত ব্যাংক খাতের মোট বিতরণ করা কৃষিঋণের মধ্যে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর অংশগ্রহণ ছিল ৯ দশমিক শূন্য ছয় শতাংশ। পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমানে দেশে ৫৯টি ব্যাংকের মধ্যে পুরোদমে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং কার্যক্রম চালাচ্ছে আটটি ব্যাংক। এছাড়া, প্রচলিত ধারার ৯টি ব্যাংকের ১৯টি শাখা এবং সাতটি ব্যাংকের ৪১ উইন্ডোর মাধ্যমে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং চলছে। পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকগুলো হলো— ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড, ফার্স্ট সিকিউরিটিজ ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক লিমিটেড, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড, এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক অব বাংলাদেশ লিমিটেড (এক্সিম), সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড ও ইউনিয়ন ব্যাংক লিমিটেড।
যেসব কনভেনশনাল ব্যাংকের ইসলামি শাখা রয়েছে — সিটি ব্যাংক, এবি ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, ব্যাংক আল-ফালাহ ও এইচএসবিসি। এর বাইরে ইসলামি উইন্ডো রয়েছে এমন ব্যাংক— সোনালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া ও স্ট্যান্ডার্ড চাটার্ড।






















