যার নান্দনিক অভিনয় আজও দর্শক মনে গেঁথে আছে। অনেকদিন ধরেই নেই অভিনয় কিংবা পরিচালনার সাথে। তবে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেখা মেলে তার। বলছি নন্দিত অভিনেত্রী সুচন্দার কথা।
‘জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়গুলোতে আমি চলচ্চিত্রের সঙ্গে জড়িত ছিলাম। আমি যাদের সঙ্গে কাজ করেছি তাদের অনেকেই তো এখন পৃথিবীতে নেই, তাদের কথা খুব মনে পড়ে। এখনকার সময়ের লোকদের বিভিন্ন কাজ-কর্মের কথা শুনি; দেখা তো আর হয় না, তখন তাদের কথা আরও বেশি বেশি করে মনে পড়ে। যখন কোন কাজ থাকে না, তখন সে সময়গুলোর কথা ভীষণ মনে পড়ে। আর বয়স হওয়ার কারণে কিছু সময় বিভিন্ন অবসাদেও ভুগি। ’ কথাগুলো বলছিলেন ষাটের দশকের জনপ্রিয় অভিনেত্রী সুচন্দা।
তিনি বলেন, ‘এখনকার সময়ে চলচ্চিত্রকে সত্যিকার অর্থেই ভালোবাসেন, এমন মানুষ হাতে গোনা। আর ইন্ডাস্ট্রিকে সঠিক দিক-নির্দেশনা দেওয়ার মানুষেরও বড়ই অভাব রয়েছে। যারা সত্যিকার অর্থেই চলচ্চিত্রকে ভালোবাসতেন তাদের মতো মানুষ আজ আর ইন্ডাস্ট্রিতে নেই বলেই চলে। খুবই কঠিন সময় পার করছে চলচ্চিত্রের সঙ্গে জড়িত সব ধরনের লোক। এমনও লোক আছে একদম বেকার, তাদের কথা ভাবলেও কষ্ট লাগে। এক সময় তারা কত সুন্দরভাবে কাজ করতেন’।
প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানের ‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাস অবলম্বনে সুচন্দা নির্মাণ করেছিলেন ‘হাজার বছর ধরে’ চলচ্চিত্রটি। এটি সর্বমহলে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। এই ছবিটির পর তিনি আবারও নির্মাণ করতে যাচ্ছেন নতুন ছবি ‘বরফ গলা নদী’। এটিও জহির রায়হানের নামকরা ‘বরফ গলা নদী’ উপন্যাস অবলম্বনেই নির্মিত হবে।
সূচন্দা জানান, প্রথম ছবিটির পর আমার ইচ্ছা ছিল জহির রায়হানের এই ‘বরফ গলা নদী’ উপন্যাসটি নিয়ে কাজ করবো। এটা আমার অনেক দিনের ইচ্ছে। আল্লাহ যদি আমাকে সুস্থ রাখেন তবে ছবিটি আমি করবো।
সিনেমা বানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছি বলতে কাজ অনেকটাই এগিয়েছে। স্ক্রিপ্ট লিখার কাজ শেষ হয়েছে। কিন্তু এখনই শুরু করতে পারছি না। কারণ বিভিন্ন প্রতিকূলতা তো রয়েছেই। সিনেমার বর্তমান যে অবস্থা এই সময়ে সিনেমাটা নির্মাণ নিয়ে একটু চিন্তিতই বলা যায়। এখন তো ছবি দেখার লোকও নেই, সবই শুধু মুখে মুখে। কয়জন হলে ছবি দেখতে যায়? আর যে হারে সিনেমা হল বন্ধ হচ্ছে সেটা চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির জন্য একটা বিরাট হুমকি।
একটা ফিচার ফিল্ম বানানো তো সহজ কথা হয়, অনেক বড় একটি বিষয়। অনেক টাকা লগ্নির বিষয়। ছবিটা নির্মাণের জন্য মোটামুটি প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি। শুধু একটা ভালো সময়ের অপেক্ষায় আছি। তা নাহলে তো এরকম একটা ছবি করে লস দেওয়ার মত অবস্থা আর নেই। আমি এখনই কোন নিশ্চয়তা দিতে পারছি না যে কবে নাগাদ ছবিটা করতে পারবো। এই সময়টাতে ছবিটা বানানোর সাহস করতে পারছি না আমি। সুযোগ সুবিধা মত যখন আমার করার মত অবস্থা দেখতে পাবো তখনই কাজ শুরু করবো।
সময়টা এখন আমাদের ভালো যাচ্ছে না। চলচ্চিত্রের যে দুরবস্থা যাচ্ছে এই সময়ে কেউ নতুন করে ছবি বানানোর সাহস অনেকেই পাচ্ছে না। যে কয়েকটা ছবিই মুক্তি পাচ্ছে তার কোনটাই কিন্তু ব্যবসাসফল হচ্ছে না। হলও নেই আগের মত, সব বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এরকম দু’চারটা হলে ছবি চালিয়ে তো আর ব্যবসা করা যায় না। সেদিক থেকে এটা একটা বিশাল ব্যাপার এখন। ইচ্ছে করলেই তো এখন আর ছবি বানিয়ে ফেলা যায় না। নানারকম প্রতিবন্ধকতা থাকে।
আমাদের চলচ্চিত্রের অবস্থা তো খুবই খারাপ। আল্লাহই জানে আমাদের ভাগ্য কোথায় গিয়ে পৌছাবে। চলচ্চিত্রের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের কথাই বলছি, তাদের দেখলে খুব কষ্টই লাগে। যে সমস্ত শিল্পী ও পরিচালকরা আগে রাতদিন কাজ করতেন তারা সবাই এখন বেকার বসে আছেন।
এ বছর ‘ফজলুল হক স্মৃতি পুরস্কার’ পাচ্ছেন কোহিনূর আক্তার সুচন্দা। চলচ্চিত্র পরিচালনার জন্য তিনি এই সম্মাননা পাচ্ছেন। এই সম্মাননা প্রাপ্তিতে বেশ উচ্ছ্বসিত সুচন্দা। তিনি বলেন, আমি এখনও পাইনি, পাবো। তবে এটা আমার জন্য অনেক সম্মানের। যার নামে আমাকে এই সম্মাননা দেওয়া হবে তিনি অত্যন্ত সম্মানীয়, গুণী এবং সাংঘাতিক ভালো একজন মানুষ। তার সম্পর্কে হুট করে কিছু বলাটা খুব কঠিন। তিনি প্রথম চলচ্চিত্রবিষয়ক পত্রিকা ‘সিনেমা’র সম্পাদক এবং বাংলাদেশের প্রথম শিশুতোষ চলচ্চিত্র ‘প্রেসিডেন্ট’ এর পরিচালক ছিলেন। তার নামে এই সম্মননা পাচ্ছি এটা অনেক আনন্দের। পুরস্কার একটা শিল্পীর জন্য অনেক বড় আনন্দের, খুশির। এমন একটা পুরস্কার পাচ্ছি জেনে আমি খুবই আনন্দিত। এখনও উদ্বেলিত হয়ে আছি আমি পুরস্কারটার জন্য।
ক’দিন বাদেই চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নির্বাচন। শিল্পী সমিতির যে কমিটি ছিল গত বছর, তাদের কাছ থেকে কতটা সহায়তা পেয়েছেন আপনি? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, শিল্পী সমিতি নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। আমি তো শিল্পী সমিতির সমিতির আজীবন সদস্য। এখন তো আর আগের মত শিল্পী সমিতিতে তেমন কোন কাজ হয় না। আগে যাওয়া হতো কিন্তু এখন খুব একটা যাওয়া হয় না আমার। তারপরও যা হচ্ছে সেটা একদম ‘নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো’ এরকম আর কি!
এবারের নির্বাচনেও ভোট দিবেন সুচন্দা। তবে তিনি তাকেই ভোট দিবেন যাকে যোগ্য মনে করবেন। এ নিয়ে তিনি বলেন, আমি কোন পক্ষেই নেই আবার সব পক্ষেই আছি। তবে আমি কোন বিশেষ পক্ষকে সাপোর্ট করি না। যাকে দিয়ে শিল্পী সমিতির কাজ হবে বলে আমার মনে হবে আমি তাকেই ভোট দিব। আমি কোন প্যানেল ভিত্তিক ভোট দেই না, অতীতেও দেইনি। যাকে যোগ্য মনে হবে, যাকে দিয়ে কাজ হবে তাকেই আমি ভোট দিব। আর সেটা তো আমি জানি কারা কেমন কাজ করে, শিল্পের জন্য কে কি করে! চলচ্চিত্র সম্পর্কে এতটুকু ধারণা তো আমার মধ্যে আছে।
তিনি আরও বলেন, এখন আমরা চলচ্চিত্রের ক্রান্তিলগ্নে এসে দাঁড়িয়ে আছি। এরমধ্যে যখন শুনি যে একজনের সাথে অন্যজনের নানান অভিযোগ তখন খারাপই লাগে। এখন তো এটা করার সময় না। এখন সবাই মিলে বলা উচিত’ দশে মিলে করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ’। কিন্তু এভাবে যদি একজনের বিরুদ্ধে একজন পেছনে লাগে তাহলে তো সিনেমা ধ্বংসই হয়ে যাবে কিছুদিনের মধ্যে। এমনিতেই এখন কাজ কম হচ্ছে, সেদিকে সবার নজরদারি করা উচিত। কিভাবে ইন্ডাস্ট্রিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় সেই চিন্তা করে কাজ করা উচিত। কিন্তু সবাই মেতে আছে নিজেদের নিয়ে। এটা তো ঠিক না। আর সবাইকে সমিতির লক্ষেও কাজ করা উচিত। শিল্পীদেরও শিল্পীমনা হয়ে কাজ করা উচিত।
এটা সাময়িক একটা বিষয়। যখন নির্বাচন আসে তখন হয়তো এরকম একটু হয়। এটা সবজায়গাতেই হয়, শুধু চলচ্চিত্রেই নয়। দুই দল কিংবা তিন দলের মধ্যে এরকম বাকবিতন্ডা হয়। যারা ভালো কাজ করবে তারাই জয়ী হবে। তবে এই দলাদলিটা করা উচিত নয় আমি মনে করি। আমাদের সবাইকে এক হয়েই কাজ করা উচিত, সমিতির লক্ষেই কাজ করা উচিত। শিল্পীদের মন কিন্তু অনেক উদার, তাদের মধ্যে অন্য কিছু থাকে না। সবাই মিলে একসাথে কাজ করা উচিত। শিল্পদের মধ্যে যারা অসহায়, দুস্থ তাদেরকে সহায়তা করা হোক। আমি এবারও ভোট দিতে আসবো। একটি ভোট শিল্পীর জন্য অনেক মূল্যবান।
১৯৬৪ সালে কাজী খালেক পরিচালিত একটি প্রামাণ্যচিত্রে প্রথম অভিনয় করেন সুচন্দা। ১৯৬৬ সালে প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার সুভাষ দত্ত তাকে নায়িকা করে নির্মাণ করেন ‘কাগজের নৌকা’। চলচ্চিত্রটি সফল হলে রুপালি জগতে সুচন্দার পথচলা মসৃণ হয়। একই বছর খ্যাতনামা চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান সুচন্দাকে নিয়ে নির্মাণ করেন ‘বেহুলা’। চলচ্চিত্রটি বড়মাপের দর্শক গ্রহণযোগ্যতা পায়। এরপর আশির দশক পর্যন্ত তিনি অভিনয় করেন শতাধিক চলচ্চিত্রে। ২০০৫ সালে স্বামী জহির রায়হানের ‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাসের আলোকে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন এবং সেরা প্রযোজক ও পরিচালক হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান।
বিজনেস বাংলাদেশ-বি/এইচ


























