বালিশ কান্ডের মত লাগামহীন দুর্নীতির অভিযোগ ওঠেছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের প্রকল্প পরিচালক এমদাদুল হক ও তার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের অধীনে বাস্তবায়িতব্য পিপিআর রোগ নির্মূল এবং ক্ষুরা রোগ নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক এমদাদুল হক ও তার সিন্ডিকেট মিলে প্রায় ১৯৬ কোটি টাকা লুটপাটের মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে।
দেশের ৪টি জেলায় বরিশাল, ভোলা, সিরাজগঞ্জ ও মানিকগঞ্জ) ক্ষুরা রোগ ও পিপিআর রোগ নির্মূলের লক্ষ্যে পরীক্ষামূলক ভাবে কাজ করার জন্য প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের অধীনে একটি প্রকল্প চলতি বছর একনেকে পাশ হয়। ৪ বছর মেয়াদী এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৪৫ কোটি ২ লক্ষ ৯৯ হাজার টাকা ব্যয়ে। প্রকল্পটি পাশের পরই শুরু হয় রদবদল। প্রথমেই প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে একজন দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত অনভিজ্ঞ কর্মকতাকে নিয়োগ দেয়া হয়। সেই কর্মকর্তা অর্থাৎ ডা. মো: এমদাদুল হক বিগত ২/৭/২০১৯ ইং তারিখ ২১৮নং স্মারকে এখানকার প্রকল্প পরিচালক বা পিডি নিয়োগ করা হয়। মূলত সেখান থেকেই অনিয়মের সূচনা।
স্বাভাবিক নিয়ম ও আইন অনুযায়ী প্রকল্পের মেয়াদ শেষে ন্যুনতম ৬ মাসের চাকুরী থাকবে এমন কর্মকতাকে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেয়ার কথা। কিন্তু একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট প্রশাসনকে ম্যানেজ করে নিয়ম বহির্ভুতভাবে এমদাদুল হককে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগে সমর্থ হয়। এই পকল্পের মেয়াদ ২০২৩ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো নিয়োগপ্রাপ্ত এমদাদুল হকের চাকুরী আছে ২০২২ সালের আগস্ট পর্যন্ত। অর্থাৎ প্রকল্প শেষ হওয়ার ১০ মাস আগেই নিয়োগকৃত পিডির চাকুরী শেষ হয়ে যাবে। ফলে মাঝপথে প্রকল্প মুখ থুবড়ে পড়বে এবং নতুন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দিতে হবে। শুধু তাই নয়, প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের ৮ মাস অতিবাহিত হলেও প্রকল্পের অগ্রগতি প্রায় শূন্য। এর পেছনে মূল কারণ হচ্ছে এই পরিচালকের এ ধরনের কাজ সম্পর্কে কোনো অভিজ্ঞতা বা ধারনা নেই।
এদিকে এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য পিপিআর ও এফএমডি নিয়ন্ত্রন করার লক্ষ্যে ভ্যাকসিন ক্রয় করা। ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) অনুযায়ী পিপিআর রোগের জন্য ২.৯২ কোটি ছাগল ভেড়ার জন্য ২ ডোজ করে টিকা ধরে মোট ৪৬ কোটি ৭২ লক্ষ টাকার ভ্যাকসিন কেনার কথা। একই সঙ্গে ক্ষুরা রোগের জন্য নির্বাচিত এলাকায় ০.৩৫ লক্ষ গবাদিপশুর জন্য ৪ বছরে মোট ২.৮০ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন ট্রাইভালেন্ট টীকা। পাশ্ববর্তী দেশ হতে ক্রয়ের জন্য ১৯৬ কোটি টাকার সংস্থান রয়েছে। ডিপিপির সংস্থান অনুযায়ী প্রতি বছর প্রতিটি গবাদিপশুর জন্য ২ ডোজ করে খাওয়ানোর কথা। এবং সে হিসাবে প্রতি বছর ৪৯ কোটি টাকার ভ্যাকসিন ক্রয়ের কথা। কিন্তু আলচ্য দরপত্রে ৯৬ কোটি টাকার ভ্যাকসিন ক্রয়ের জন্য দরপত্র আহব্বান করা হয়েছে।
এখানেই শেষ নয়। বাংলাদেশে বর্তমানে ক্ষুরা রোগের জন্য যে সকল ভ্যাকসিন ব্যবহার করা হয় তার মধ্যে ৬৫% ভ্যাকসিন পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত হতে ১৫% সরকারীভাবে উৎপাদন, বাকী ২০% অন্যান্য দেশ হতে আমদানী করা হয়ে থাকে। এরমধ্যে রাশিয়া হতে ‘অন ফার্মা’ নামক একটি প্রতিষ্ঠান ৫% ভ্যাকসিন আমদানী করে থাকে। প্রকল্প পরিচালকের নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট রাশিয়ার তৈরী ভ্যাকসিন আমদানী করার লক্ষ্যে মন্ত্রণালয়ের উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করে বিশ্ব বিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরকে দিয়ে রাশিয়ার তৈরী ভ্যাকসিন আমদানী করার লক্ষ্যে NSP (non stactural protin) free ভ্যাকসিন আমদানী করার পক্ষে মতামত প্রদান করেছে।
উল্লেখ্য যে, পাশ্ববর্তী দেশ ভারতে বা বাংলাদেশে যে ভ্যাকসিন (সরকারী/বে-সরকারী) তৈরী এবং ব্যবহার করা হচ্ছে তার কোনটিই NSP free নয়। সিন্ডিকেটের উদ্দেশ্য এককভাবে রাশিয়ার ভ্যাকসিন যাতে বাংলাদেশের আমদানী কারক ‘অন ফার্মার’ মাধ্যমে সরবরাহ নেয়া হয়। আর সে উদ্দেশ্যে প্রকল্প পরিচালক বিগত ১৯/১/২০২০ ইং তারিখে আহব্বানকৃত দরপত্রে প্রদত্ত স্পেসিফিকেশন পরিবর্তন করে ঘঝচ ভৎবব সহ অন্যান্য শর্ত (যা রাশিয়ার ভ্যাকসিনের পক্ষে যায়) পরিবর্তন করে নতুনভাবে স্পেসিফিকেশন করার প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে প্রেরন করেছে। এ ভ্যাকসিনের সাথে সম্পৃক্ত একাধিক প্রতিষ্ঠানের মালিক জানান তারা দরপত্রে অংশ গ্রহন করলেও তাদের দরপত্র বিভিন্ন অজুহাতে নন রেসপনসিভ করে রাশিয়ার ভ্যাকসিন এর জন্য প্রদত্ত দরপত্রই রেসপনসিভ করা হবে।
সুত্রটি আরোও জানায় রাশিয়ার ভ্যাকসিন আমদানীকারক অন ফার্মা” অভিজ্ঞতা না থাকায় এবং আর্থিকভাবে সচ্ছল না হওয়ায় JENTECH INTERNATIONAL LTD নামক একটি প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে এবং তাকে দিয়ে দরপত্র জমা দেয়ার কথা। এ নিয়ে প্রকল্প পরিচালক একাধিকবার সিন্ডিকেট সদস্যদের নিয়ে মিটিং করেছে বলে একাধিক সুত্র জানিয়েছে। দরপত্র জমাদানানের তারিখ নিয়েও চলেছে অনিয়ম। একাধিকবার তারিখ পরিবর্তন করে সর্বশেষ দরপত্র জমাদানের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ মার্চ ২০২০। মূলত প্রভাবশালী মহলকে ম্যানেজ করে প্রকল্প পরিচালক এমদাদুল হক ও তার সিন্ডিকেট এই অর্থ লুটপাটের জন্যই এ তারিখ পরিবর্তন করেছেন।
এফ এন এফ নামক দেশীয় ক্ষুরা রোগের টীকা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এর মালিক জনাব মোকলেসুর রহমান নিলু প্রতিবেদককে জানান, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিগত ১১/৭/২০১১ ইং তারিখের ১৩৯ নং স্বারকে মন্ত্রণালয়ের ঔষধ প্রশাসন-১ শাখা হতে জারিকৃত পত্রে উল্লেখ রয়েছে যে, ক্ষুরা রোগ ভ্যাকসিন যেহেতু স্থানীয়ভাবে বেসরকারী পর্যায়ে উৎপাদন করা হচ্ছে এবং উৎপাদন সক্ষমতাও দেশের চাহিদা মেটাতে সক্ষম বিধায় ক্ষুরা রোগ ভ্যকসিন স্থানীয়ভাবে ক্রয় করার জন্য মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরকে অনুরোধ করা হয়।
উক্ত পত্রের কপি আবেদন পত্রের সাথে মন্ত্রণালয়কে প্রদান করা হয়েছে এবং কপি পিডিকে প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু পিডি সেটি আমলে না নিয়ে তার নিজের সিন্ডিকেটের স্বার্থসাপেক্ষে রাশিয়ান কোম্পানি থেকে সব ভ্যাকসিন কেনার চেষ্টা চালাচ্ছেন।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে কর্মরত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা জানান যে, ক্ষুরা রোগ নিয়ন্ত্রন না করে NSP free ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা হলে কোন কাজ হবে না। এছাড়া রাশিয়ার আবহাওয়া ও বাংলাদেশের আবহাওয়া এক নয়। রাশিয়া এফএমডি ফ্রি হওয়ায় তারা এনএসপি ফ্রি ভ্যাকসিন তৈরী করছে। তারা আরোও জানান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ভারতের তৈরী ভ্যাকসিনই উপযুক্ত। শুধুমাত্র সরকারী অর্থ নয়-ছয় করার জন্যই রাশিয়া থেকে ভ্যাকসিন ক্রয়ের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ফলে সরকার যে উদ্দেশ্যে বিশাল অংকের এই টাকা খরচ করতে চাইছে সে উদ্যোগটি কোনোমতেই সফল হবে না। স্থানীয় একাধিক ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এ বিষয়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
শুধু তাই নয় ক্রয়ের এমন স্পসিফিকেশন পরিবর্তন বিষয়ে এমদাদুল হকের কোনো অফিশিয়াল বক্তব্য পাওয়া যায়নি। । স্থানীয় একাধিক ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে প্রথমবারের স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী একাধিক প্রতিষ্ঠানের দরপত্র জমাদানের সুযোগ ছিল। ফলে লুটপাট করতে সমস্যা হতো। পরবর্তীতে দরপত্রের স্পেসিফিকেশন এমনভাবে পাল্টে ফেলা হয় যেন এমদাদুল হকের সিন্ডিকেট সমর্থিত রাশিয়ান কোম্পানি ছাড়া আর কেউ দরপত্রই জমা দিতে না পারে।
কেননা দরপত্রের নির্দিষ্ট স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী ভ্যাকসিন সরবরাহ করতে না পারলে দরপত্রে অংশগ্রহণের কোনো সুযোগ নেই। দরপত্র আহবানের পূর্ববর্তী স্পেসিফিকেশন ও বর্তমান স্পেসিফিকেশন এর তুলনামূলক বাস্তবায়ন করলেই এ বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। ফলে একনেক, বিশেষজ্ঞ ও উপর মহলের ধোঁয়া তুলে প্রকল্প পরিচালক এমদাদুল হক ও তার সহযোগীরা পুরো টাকা লুটপাটের মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছেন।
এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক এমদাদুল হকের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি।
বিজনেস বাংলাদেশ/বিএইচ

























