০৪:১৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬

করোনায় বন্দী চলচ্চিত্র : যা বললেন তিন নির্মাতা

মহামারী করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে একের পর এক দেশ এখন লকডাউনের ফাঁদে। থেমে গেছে যেন গোটা পৃথিবী। কোন রকম যুদ্ধ ছাড়াই বিচ্ছিন্ন হয়ে পরেছে প্রতিটি দেশ। বাংলাদেশেও বেশকিছুদিন ধরে চলছে লকডাউন। সারা দেশের মানুষ এখন গৃহবন্দী। এমন অবস্থায় বাংলাদেশী চলচ্চিত্র শিল্প পরেছে হুমকির মুখে। দেশ লকডাউনের কারনে স্বাভাবিকভাবেই বন্ধ রয়েছে চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট সকল কাজকর্ম। থেমে গেছে চলমান সকল ছবির শ্যুটিং, ডাবিং থেকে শুরু করে সবকিছু। আগামী ঈদে কোন মুভি মুক্তি পাবে কিনা এ নিয়ে পরিচালকরাই পরেছেন বেশ অনিশ্চয়তায়। আবার এভাবে সবকিছু স্থবির হয়ে পরার কারনে চলচ্চিত্র শিল্পের ক্ষতির পরিমাণটাও অনেক বড় আকার ধারণ করবে বলে আশংকা করছেন চলচ্চিত্র নির্মাতারা। আর চলচ্চিত্রের কাজ একটানা বন্ধ থাকায় প্রচন্ড বিপাকে পরেছেন এই শিল্পের সাথে সম্পৃক্ত হাজার হাজার মানুষ। প্রোডাকশন বয় থেকে শুরু করে নির্মাতা পর্যন্ত ক্যামেরার পেছনে থাকা অসংখ্য মানুষ আজ খেয়ে না খেয়ে ভীষণ দুর্দিনের সাথে বন্দী দিনযাপন করছেন। সবার ইনকামের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু প্রতিদিনের সাংসারিক ব্যয়তো বন্ধ হয়নি। তাই সবাই এই বিপদের সময়ে প্রথমেই সৃষ্টিকর্তা এবং তারপরই এদেশের সরকারের মুখের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। সিনেমা বোদ্ধারা বলছেন, করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পরেও এই শিল্পের উপর নির্ভরশীল মানুষগুলোর সুদিনের জন্য অপেক্ষা করতে হবে হয়তো আরও ৫-৬ মাস। কারণ, এই অনাকাঙ্ক্ষিত মহাসংকট কাটিয়ে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরা সাড়া দেশের প্রতিটি সাধারণ মানুষ নিজের পরিবারের অভাবের ধাক্কাটা সামলে উঠতেই খানিকটা সময় অবশ্যই নেবে। সেই সময়ে যতো ভালো মুভিই মুক্তি দেয়া হোকনা কেন, হলে গিয়ে মুভি দেখার দর্শক খুঁজে পাওয়া মুশকিল হবে নিশ্চিত। এবিষয়ে কথা বলেছেন দেশ বরেণ্য চলচ্চিত্র নির্মাতারা।

সোহানুর রহমান সোহান –
বর্তমানে করোনা ভাইরাস যেভাবে ছড়াচ্ছে, তাতে করে এখন প্রত্যেকটা মানুষেরই আসলে বাংলাদেশ সরকার যেভাবে চাচ্ছেন বা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যেভাবে বলছেন ঠিক সেভাবেই নিয়ম মেনে চলা উচিত। আসলে মানুষ মানুষের কাছ থেকে নিরাপদ দুরত্ব বজায় রাখতে হবে। কারণ, এই ভাইরাসটি খুব বেশি ছোঁয়াচে। সেই কারনে অনেক বেশি সতর্কতা অবলম্বন করে চলতে হবে আমাদের। মিনিমাম ৬ ফিট দুরত্ব বজায় রেখে সবাইকে চলার কথা বলা হয়েছে। পারিবারিক ভাবে আমরাও সেই নিয়ম ফলো করে চলছি। পাশাপাশি গোটা দেশবাসীকে অনুরোধ করবো সবাই এই নিয়ম মেনে চলুন। কারন আসলে সবার নিজেদের স্বার্থেই এই নিয়মগুলো পালন করা উচিত। আপনার নিজের কেউ এই রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলে তো আপনারই অপূরনীয় ক্ষতি। এই ক্ষতিটা কিন্তু কেউ পুশিয়ে দিতে পারবে না, সরকারও না। তাই নিজেদের ভালো টা নিজেকেই বুঝতে হবে। কারণ, কার শরীরে ভাইরাস আছে সেটাতো খালি চোখে দেখা যায়না। যেমন আমরা ৯ মাস যুদ্ধ করেছি। তখন কিন্তু আমরা দেখেছি আমাদের শত্রু কে। আমরা শত্রুকে দেখে বা চিনেই কিন্তু যুদ্ধ করেছি। কিন্তু এখন আমরা আমাদের শত্রুকে দেখতেও পারছিনা চিনতেও পারছিনা। আসলে কোন দিক থেকে কাকে আক্রমণ করবে কেউ জানিনা। তাই সবাইকে রিকুয়েষ্ট করবো- অবশ্যই নিয়মগুলো ভালোভাবে মানা, সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, পা ধোয়া এবং বাইরে থেকে এলে ভালভাবে আগে গোছল করে নেয়া বা সকল সতর্কতা সঠিকভাবে মেনে চলতে পারলেই হয়তো আমরা আল্লাহর রহমতে এ যুদ্ধেও জয়লাভ করতে পারবো ইনশাআল্লাহ। এখন পর্যন্ত আমাদের দেশে এই ভাইরাস সেভাবে এ্যাটাক করেনি। যদি এখানেও আক্রান্ত শুরু হয়ে যায় বা সারা দেশের গ্রাম গঞ্জে ছড়িয়ে পরে তাহলে প্রতিদিন মিনিমাম ২-৫ হাজার মানুষ মারা যাবে। তাই এখনই আমাদের সতর্ক ও সাবধান হয়ে চলাটাই সবচেয়ে জরুরী। যারা এখনও বিষয়টি গুরুত্ব দেয়নি বা টিভি দেখেনা, রেডিও তে খবর শোনেনা, পেপার পড়েনা বা অনলাইনে খবর দেখেনা তাদের সবাইকে সতর্ক করতেই হবে। এবং মসজিদের ইমাম সাহেবরাও যদি নিজ নিজ দায়িত্ব থেকে সবাইকে সতর্ক করেন তাহলেই হয়তো আমরা এই সংকট কাটিয়ে উঠতে পারবো ইনশাআল্লাহ। বাংলাদেশ অলি আউলিয়ার দেশ। এদেশে ইনশাআল্লাহ কিছুই হবেনা।
এদিকে আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পতো অনেকদিন ধরেই আধমরা হয়ে বেঁচে রয়েছে। সেখান থেকে উত্তরণের পথ আমরা খুঁজছি। ইনশাআল্লাহ আগামীতে এ থেকে আমরা এই শিল্পকে উত্তরণ ঘটাতে পারবো। তারপরও মোটামুটি টুকটাক কিছু কাজ চলছিল। তবে বর্তমান যে পরিস্থিতি তাতে শুধু চলচ্চিত্র শিল্প না টোটাল সব শিল্প, প্রতিষ্ঠান বা প্রত্যেকটা মানুষ তথা সবকিছু থেমে গেছে। আল্লাহ চাইলে আবার আমরা ঘুরে দাঁড়াবো। ঘুরে দাঁড়াবে বাংলাদেশ। মাঝে শুধু এই বিপদের সময়টা আল্লাহ আমাদের ভালোভাবে পার করুন এই শুধু কামনা। দেশ যখন ঘুরে দাঁড়াবে তখন সকল শিল্পের মতো এই চলচ্চিত্র শিল্পও ঘুরে দাঁড়াবে ইনশাআল্লাহ। তবে চলমান পরিস্থিতিতে আমাদের সিনেমার পিছনে যারা কাজ করে সংসার চালান তারা খুব অসহায় অবস্থায় রয়েছে। এ ব্যাপারে আমাদের চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট ১৮ টি সংগঠন নিরলশ ভাবে কাজ করছে।আমাদের পরিচালক সমিতি এবং প্রযোজক সমিতির পক্ষ থেকে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। আমাদের যারা অসচ্ছল টেকনিশিয়ান আছেন তাদের আমরা খোঁজ খবর নিচ্ছি। এছাড়াও আমরা সরকারের কাছে এবং যাদের ব্যক্তিগত ভাবে সামর্থ্য আছে তাদের সবাইকে এ ব্যাপারে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাচ্ছি। পাশাপাশি শিল্পী সমিতিকেও ধন্যবাদ দিতে হয়। তারাও এ ব্যাপারে বেশ এগিয়ে এসেছেন। পরিশেষে বলবো – মানুষ মানুষের জন্য। তাই সবাই একটু সাবধানে থাকলে এবং সবাই সবার পাশে থাকলে আমরা এই বিপদ কাটিয়ে উঠতে পারবো ইনশাআল্লাহ।

মালেক আফসারী-
ব্যক্তিগত ভাবে আমি ও আমার পরিবারের সবাই ভালো আছি আলহামদুলিল্লাহ। যদিওবা করোনার কারনে আমাদের চলচ্চিত্রের সকল কাজ বন্ধ হয়ে আছে। তবুও বলবো আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পতো অনেক আগে থেকেই সংকটে আছে। নতুন করে করোনা এসে আরও বড় সংকট তৈরি করেছে। টুকটাক যে কাজগুলো চলছিল সেগুলোও এখন বন্ধ। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও কতোদিনে এই শিল্প আবারও মাথা তুলে ঘুরে দাঁড়াবে তা একমাত্র আল্লাহ ভালো জানেন। তবে এভাবে হঠাৎ সবাই ঘরবন্দী হয়ে পরায় আমাদের চলচ্চিত্রের সাথে জড়িত সবার অবস্থা খুব খারাপের দিকেই যাচ্ছে। যদিওবা শিল্পী সমিতি এবং প্রযোজক সমিতিকে দেখছি এ ব্যাপারে বেশ তৎপর। যা সত্যিই প্রশংসনীয়। তবে এ ব্যাপারে পরিচালক সমিতির কার্যক্রম খুব কমই চোখে পরছে। তাছাড়া ব্যক্তি উদ্যোগে অনেককেই দেখছি এ ব্যাপারে এগিয়ে আসছেন। আর আসাটাও উচিৎ, বিশেষ করে যাদের সামর্থ্য আছে। কিন্তু এ বিষয়ে ফেসবুকে কিছু সমালোচনা হচ্ছে যা একদমই ঠিক হচ্ছে না। যারা বলছেন ডান হাতে সাহায্য করলে যেন বাঁ হাত না জানে তারা আসলে কয়জনকে সাহায্য করেছেন? নিজের পকেটের টাকায় খাবার কিনে অসহায় মানুষকে সাহায্য করে সেটার ছবি ফেসবুকে পোস্ট করাটা এমন দোষের কিছু দেখিনা আমি। এতে করে তো অনেকেই আরও উৎসাহিত হচ্ছে।
পরিশেষে সবার উদ্দেশ্যে বলবো- ঘরে থাকুন, ঘরে থাকুন, ঘরে থাকুন। তবে ঘরে থাকুন তো বলছি কিন্তু কতোক্ষণ ঘরে থাকবেন যদি ঘরে খাবার না থাকে! এ ব্যাপারে বিশেষকরে দেশের প্রতিটি সামর্থ্যবান মানুষকে অনুরোধ করবো এই সময়টাতে অন্তত আপনার পাশের ঘরে বা দরিদ্র পাড়া প্রতিবেশীর খবর নিন। ঘরে ঘরে উঁকি দিয়ে দেখুন কার কি অবস্থা। আর এ ব্যাপারে আসলে সরকারকেই পুরোপুরি দায়িত্ব নিয়ে কাজ করা প্রয়োজন। অন্তত সারা দেশের গরীব মানুষগুলোর খাবারের ব্যবস্থা সরকারকেই করা উচিত। আবার যাদের ঘরই নেই রেলস্টেশনে বা ফুটপাতে ঘুমায় তারা আসলে কোথায় যাবে? তাই এই সার্বিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারকেই অগ্রণী ভুমিকা পালন করতে হবে। মহান সৃষ্টিকর্তা সবাইকে নিরাপদে রাখুন, সুস্থ রাখুন এবং এই বিপদ থেকে আমাদের রক্ষা করুন। আমিন।

মোস্তাফিজুর রহমান মানিক –
দেশ লকডাউনের কারনে ব্যক্তিগত ভাবে আমিও হোম কোয়ারেন্টিনে রয়েছি। আলহামদুলিল্লাহ এখন পর্যন্ত আমরা পরিবারের সবাই ভালো ও সুস্থ আছি। তবে করোনা ভাইরাস নামক যে প্রাকৃতিক দূর্যোগ যাচ্ছে, তাতে আমি বা আমরা কেউ ভালো নেই। আমার চলমান নতুন সিনেমাগুলোর সকল কাজ বন্ধ হয়ে আছে। শুধু আমার কেন, সকলের কাজই তো বন্ধ। সবাই তো গৃহবন্দী। একমাত্র মহান আল্লাহ তাআলা জানেন যে, আমরা আবার কবে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবো। তবে এমনিতেই বাংলা চলচ্চিত্রের যে দৈন্যদশা চলছিল তাতে এই করোনার কারণে আরও অন্ধকারের দিকেই যাচ্ছে এ শিল্প। কারণ, এভাবে গৃহবন্দী অবস্থায় চলতে থাকলে কিছুদিন পরতো সাধারণ মানুষের এমনিতেই দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাবে। তারপর করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও দু-চার মাস সিনেমা হলে কোন দর্শকই আসবে না। কেননা মানুষের তো এখন ইনকামটাই বন্ধ। তখন সিনেমা দেখার টাকা পাবে কোথায়? আর আমাদের দেশে নিম্ন আয়ের মানুষই বেশি। পাশাপাশি এই সংকটের কারণে চলচ্চিত্র শিল্পের যে ক্ষতি হবে বা হচ্ছে তা আগামীতে কাটিয়ে ওঠা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে আমাদের জন্য। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে যদি কোন সহায়তা করেন এবং পাশে এসে দাঁড়ান তাহলে হয়তো এই সংকট মোকাবিলা করা আমাদের একটু সহজ হবে। চলমান এই কয়েকদিনেই ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১০০ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। এছাড়া প্রতিদিন আমরা যারা সিনেমার পিছনে কাজ করতাম তাদের অবস্থাতো বেশ শোচনীয়। এভাবে দিনের পর দিন কাজ বন্ধ হয়ে থাকলে কিছুদিন পর অনেককেই হয়তো না খেয়ে দিন কাটাতে হবে। তবে আমাদের চলচ্চিত্রের সাথে সংশ্লিষ্ট বেশকিছু সংগঠন উদ্যোগ গ্রহণ করায় তাদের সাধুবাদ জানাই। পাশাপাশি ব্যক্তিগত ভাবেও অনেকেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন। সবাইকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আমাদের পরিচালক সমিতির পক্ষ থেকেও এমন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। শ্রদ্ধেয় গুলজার ভাই ফান্ড কালেকশন করছেন। তবে এভাবে আর কয়দিন চলবে? একমাত্র আল্লাহ পাক আমাদের এই বিপদের হাত থেকে রক্ষা করা ছাড়া আর কোন পথ নেই। পরিশেষে সবাইকে বলবো, এই করোনা ভাইরাসটি কোন সাধারণ ভাইরাস নয়। এটি খুব বিপদজনক ও মারাত্মক একটি ভাইরাস। পৃথিবীর সব উন্নত দেশগুলো যেখানে এই সংকটে হিমসিম খাচ্ছে সেখানে আমাদের দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থাতো অনেক দুর্বল। সুতরাং এই ভাইরাস যদি এদেশে মহামারী আকার ধারণ করে, আমরা সবাই শেষ হয়ে যাবো। তাই আমাদের সবাইকে সতর্কতার সাথে এই সংকট মোকাবিলা করতে হবে। অনুগ্রহ করে যেভাবেই হোক সবাই সামাজিক দুরত্ব বজায় রেখে ঘরে থাকার চেষ্টা করুন। অযথা বাইরে ঘোরাঘুরি ও মেলামেশা বন্ধ করুন। একমাত্র সতর্কতাই এখন আমাদের প্রধান হাতিয়ার। ইনশাআল্লাহ আমরা আবার ঘুরে দাঁড়াবো। পৃথিবী আবারও স্বাভাবিক হবে। সবাই ঘরে থাকুন, সাবধানে থাকুন, নিরাপদ ও সুস্থ থাকুন।

বিজনেস বাংলাদেশ/বিএইচ

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

মোবাইলে কথা বলতে গিয়ে অফিসে দেরি! মহাদেবপুরে খাদ্য কর্মকর্তার অদ্ভুত যুক্তি”

করোনায় বন্দী চলচ্চিত্র : যা বললেন তিন নির্মাতা

প্রকাশিত : ০৫:২৮:০২ অপরাহ্ন, রবিবার, ৫ এপ্রিল ২০২০

মহামারী করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে একের পর এক দেশ এখন লকডাউনের ফাঁদে। থেমে গেছে যেন গোটা পৃথিবী। কোন রকম যুদ্ধ ছাড়াই বিচ্ছিন্ন হয়ে পরেছে প্রতিটি দেশ। বাংলাদেশেও বেশকিছুদিন ধরে চলছে লকডাউন। সারা দেশের মানুষ এখন গৃহবন্দী। এমন অবস্থায় বাংলাদেশী চলচ্চিত্র শিল্প পরেছে হুমকির মুখে। দেশ লকডাউনের কারনে স্বাভাবিকভাবেই বন্ধ রয়েছে চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট সকল কাজকর্ম। থেমে গেছে চলমান সকল ছবির শ্যুটিং, ডাবিং থেকে শুরু করে সবকিছু। আগামী ঈদে কোন মুভি মুক্তি পাবে কিনা এ নিয়ে পরিচালকরাই পরেছেন বেশ অনিশ্চয়তায়। আবার এভাবে সবকিছু স্থবির হয়ে পরার কারনে চলচ্চিত্র শিল্পের ক্ষতির পরিমাণটাও অনেক বড় আকার ধারণ করবে বলে আশংকা করছেন চলচ্চিত্র নির্মাতারা। আর চলচ্চিত্রের কাজ একটানা বন্ধ থাকায় প্রচন্ড বিপাকে পরেছেন এই শিল্পের সাথে সম্পৃক্ত হাজার হাজার মানুষ। প্রোডাকশন বয় থেকে শুরু করে নির্মাতা পর্যন্ত ক্যামেরার পেছনে থাকা অসংখ্য মানুষ আজ খেয়ে না খেয়ে ভীষণ দুর্দিনের সাথে বন্দী দিনযাপন করছেন। সবার ইনকামের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু প্রতিদিনের সাংসারিক ব্যয়তো বন্ধ হয়নি। তাই সবাই এই বিপদের সময়ে প্রথমেই সৃষ্টিকর্তা এবং তারপরই এদেশের সরকারের মুখের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। সিনেমা বোদ্ধারা বলছেন, করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পরেও এই শিল্পের উপর নির্ভরশীল মানুষগুলোর সুদিনের জন্য অপেক্ষা করতে হবে হয়তো আরও ৫-৬ মাস। কারণ, এই অনাকাঙ্ক্ষিত মহাসংকট কাটিয়ে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরা সাড়া দেশের প্রতিটি সাধারণ মানুষ নিজের পরিবারের অভাবের ধাক্কাটা সামলে উঠতেই খানিকটা সময় অবশ্যই নেবে। সেই সময়ে যতো ভালো মুভিই মুক্তি দেয়া হোকনা কেন, হলে গিয়ে মুভি দেখার দর্শক খুঁজে পাওয়া মুশকিল হবে নিশ্চিত। এবিষয়ে কথা বলেছেন দেশ বরেণ্য চলচ্চিত্র নির্মাতারা।

সোহানুর রহমান সোহান –
বর্তমানে করোনা ভাইরাস যেভাবে ছড়াচ্ছে, তাতে করে এখন প্রত্যেকটা মানুষেরই আসলে বাংলাদেশ সরকার যেভাবে চাচ্ছেন বা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যেভাবে বলছেন ঠিক সেভাবেই নিয়ম মেনে চলা উচিত। আসলে মানুষ মানুষের কাছ থেকে নিরাপদ দুরত্ব বজায় রাখতে হবে। কারণ, এই ভাইরাসটি খুব বেশি ছোঁয়াচে। সেই কারনে অনেক বেশি সতর্কতা অবলম্বন করে চলতে হবে আমাদের। মিনিমাম ৬ ফিট দুরত্ব বজায় রেখে সবাইকে চলার কথা বলা হয়েছে। পারিবারিক ভাবে আমরাও সেই নিয়ম ফলো করে চলছি। পাশাপাশি গোটা দেশবাসীকে অনুরোধ করবো সবাই এই নিয়ম মেনে চলুন। কারন আসলে সবার নিজেদের স্বার্থেই এই নিয়মগুলো পালন করা উচিত। আপনার নিজের কেউ এই রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলে তো আপনারই অপূরনীয় ক্ষতি। এই ক্ষতিটা কিন্তু কেউ পুশিয়ে দিতে পারবে না, সরকারও না। তাই নিজেদের ভালো টা নিজেকেই বুঝতে হবে। কারণ, কার শরীরে ভাইরাস আছে সেটাতো খালি চোখে দেখা যায়না। যেমন আমরা ৯ মাস যুদ্ধ করেছি। তখন কিন্তু আমরা দেখেছি আমাদের শত্রু কে। আমরা শত্রুকে দেখে বা চিনেই কিন্তু যুদ্ধ করেছি। কিন্তু এখন আমরা আমাদের শত্রুকে দেখতেও পারছিনা চিনতেও পারছিনা। আসলে কোন দিক থেকে কাকে আক্রমণ করবে কেউ জানিনা। তাই সবাইকে রিকুয়েষ্ট করবো- অবশ্যই নিয়মগুলো ভালোভাবে মানা, সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, পা ধোয়া এবং বাইরে থেকে এলে ভালভাবে আগে গোছল করে নেয়া বা সকল সতর্কতা সঠিকভাবে মেনে চলতে পারলেই হয়তো আমরা আল্লাহর রহমতে এ যুদ্ধেও জয়লাভ করতে পারবো ইনশাআল্লাহ। এখন পর্যন্ত আমাদের দেশে এই ভাইরাস সেভাবে এ্যাটাক করেনি। যদি এখানেও আক্রান্ত শুরু হয়ে যায় বা সারা দেশের গ্রাম গঞ্জে ছড়িয়ে পরে তাহলে প্রতিদিন মিনিমাম ২-৫ হাজার মানুষ মারা যাবে। তাই এখনই আমাদের সতর্ক ও সাবধান হয়ে চলাটাই সবচেয়ে জরুরী। যারা এখনও বিষয়টি গুরুত্ব দেয়নি বা টিভি দেখেনা, রেডিও তে খবর শোনেনা, পেপার পড়েনা বা অনলাইনে খবর দেখেনা তাদের সবাইকে সতর্ক করতেই হবে। এবং মসজিদের ইমাম সাহেবরাও যদি নিজ নিজ দায়িত্ব থেকে সবাইকে সতর্ক করেন তাহলেই হয়তো আমরা এই সংকট কাটিয়ে উঠতে পারবো ইনশাআল্লাহ। বাংলাদেশ অলি আউলিয়ার দেশ। এদেশে ইনশাআল্লাহ কিছুই হবেনা।
এদিকে আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পতো অনেকদিন ধরেই আধমরা হয়ে বেঁচে রয়েছে। সেখান থেকে উত্তরণের পথ আমরা খুঁজছি। ইনশাআল্লাহ আগামীতে এ থেকে আমরা এই শিল্পকে উত্তরণ ঘটাতে পারবো। তারপরও মোটামুটি টুকটাক কিছু কাজ চলছিল। তবে বর্তমান যে পরিস্থিতি তাতে শুধু চলচ্চিত্র শিল্প না টোটাল সব শিল্প, প্রতিষ্ঠান বা প্রত্যেকটা মানুষ তথা সবকিছু থেমে গেছে। আল্লাহ চাইলে আবার আমরা ঘুরে দাঁড়াবো। ঘুরে দাঁড়াবে বাংলাদেশ। মাঝে শুধু এই বিপদের সময়টা আল্লাহ আমাদের ভালোভাবে পার করুন এই শুধু কামনা। দেশ যখন ঘুরে দাঁড়াবে তখন সকল শিল্পের মতো এই চলচ্চিত্র শিল্পও ঘুরে দাঁড়াবে ইনশাআল্লাহ। তবে চলমান পরিস্থিতিতে আমাদের সিনেমার পিছনে যারা কাজ করে সংসার চালান তারা খুব অসহায় অবস্থায় রয়েছে। এ ব্যাপারে আমাদের চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট ১৮ টি সংগঠন নিরলশ ভাবে কাজ করছে।আমাদের পরিচালক সমিতি এবং প্রযোজক সমিতির পক্ষ থেকে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। আমাদের যারা অসচ্ছল টেকনিশিয়ান আছেন তাদের আমরা খোঁজ খবর নিচ্ছি। এছাড়াও আমরা সরকারের কাছে এবং যাদের ব্যক্তিগত ভাবে সামর্থ্য আছে তাদের সবাইকে এ ব্যাপারে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাচ্ছি। পাশাপাশি শিল্পী সমিতিকেও ধন্যবাদ দিতে হয়। তারাও এ ব্যাপারে বেশ এগিয়ে এসেছেন। পরিশেষে বলবো – মানুষ মানুষের জন্য। তাই সবাই একটু সাবধানে থাকলে এবং সবাই সবার পাশে থাকলে আমরা এই বিপদ কাটিয়ে উঠতে পারবো ইনশাআল্লাহ।

মালেক আফসারী-
ব্যক্তিগত ভাবে আমি ও আমার পরিবারের সবাই ভালো আছি আলহামদুলিল্লাহ। যদিওবা করোনার কারনে আমাদের চলচ্চিত্রের সকল কাজ বন্ধ হয়ে আছে। তবুও বলবো আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পতো অনেক আগে থেকেই সংকটে আছে। নতুন করে করোনা এসে আরও বড় সংকট তৈরি করেছে। টুকটাক যে কাজগুলো চলছিল সেগুলোও এখন বন্ধ। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও কতোদিনে এই শিল্প আবারও মাথা তুলে ঘুরে দাঁড়াবে তা একমাত্র আল্লাহ ভালো জানেন। তবে এভাবে হঠাৎ সবাই ঘরবন্দী হয়ে পরায় আমাদের চলচ্চিত্রের সাথে জড়িত সবার অবস্থা খুব খারাপের দিকেই যাচ্ছে। যদিওবা শিল্পী সমিতি এবং প্রযোজক সমিতিকে দেখছি এ ব্যাপারে বেশ তৎপর। যা সত্যিই প্রশংসনীয়। তবে এ ব্যাপারে পরিচালক সমিতির কার্যক্রম খুব কমই চোখে পরছে। তাছাড়া ব্যক্তি উদ্যোগে অনেককেই দেখছি এ ব্যাপারে এগিয়ে আসছেন। আর আসাটাও উচিৎ, বিশেষ করে যাদের সামর্থ্য আছে। কিন্তু এ বিষয়ে ফেসবুকে কিছু সমালোচনা হচ্ছে যা একদমই ঠিক হচ্ছে না। যারা বলছেন ডান হাতে সাহায্য করলে যেন বাঁ হাত না জানে তারা আসলে কয়জনকে সাহায্য করেছেন? নিজের পকেটের টাকায় খাবার কিনে অসহায় মানুষকে সাহায্য করে সেটার ছবি ফেসবুকে পোস্ট করাটা এমন দোষের কিছু দেখিনা আমি। এতে করে তো অনেকেই আরও উৎসাহিত হচ্ছে।
পরিশেষে সবার উদ্দেশ্যে বলবো- ঘরে থাকুন, ঘরে থাকুন, ঘরে থাকুন। তবে ঘরে থাকুন তো বলছি কিন্তু কতোক্ষণ ঘরে থাকবেন যদি ঘরে খাবার না থাকে! এ ব্যাপারে বিশেষকরে দেশের প্রতিটি সামর্থ্যবান মানুষকে অনুরোধ করবো এই সময়টাতে অন্তত আপনার পাশের ঘরে বা দরিদ্র পাড়া প্রতিবেশীর খবর নিন। ঘরে ঘরে উঁকি দিয়ে দেখুন কার কি অবস্থা। আর এ ব্যাপারে আসলে সরকারকেই পুরোপুরি দায়িত্ব নিয়ে কাজ করা প্রয়োজন। অন্তত সারা দেশের গরীব মানুষগুলোর খাবারের ব্যবস্থা সরকারকেই করা উচিত। আবার যাদের ঘরই নেই রেলস্টেশনে বা ফুটপাতে ঘুমায় তারা আসলে কোথায় যাবে? তাই এই সার্বিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারকেই অগ্রণী ভুমিকা পালন করতে হবে। মহান সৃষ্টিকর্তা সবাইকে নিরাপদে রাখুন, সুস্থ রাখুন এবং এই বিপদ থেকে আমাদের রক্ষা করুন। আমিন।

মোস্তাফিজুর রহমান মানিক –
দেশ লকডাউনের কারনে ব্যক্তিগত ভাবে আমিও হোম কোয়ারেন্টিনে রয়েছি। আলহামদুলিল্লাহ এখন পর্যন্ত আমরা পরিবারের সবাই ভালো ও সুস্থ আছি। তবে করোনা ভাইরাস নামক যে প্রাকৃতিক দূর্যোগ যাচ্ছে, তাতে আমি বা আমরা কেউ ভালো নেই। আমার চলমান নতুন সিনেমাগুলোর সকল কাজ বন্ধ হয়ে আছে। শুধু আমার কেন, সকলের কাজই তো বন্ধ। সবাই তো গৃহবন্দী। একমাত্র মহান আল্লাহ তাআলা জানেন যে, আমরা আবার কবে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবো। তবে এমনিতেই বাংলা চলচ্চিত্রের যে দৈন্যদশা চলছিল তাতে এই করোনার কারণে আরও অন্ধকারের দিকেই যাচ্ছে এ শিল্প। কারণ, এভাবে গৃহবন্দী অবস্থায় চলতে থাকলে কিছুদিন পরতো সাধারণ মানুষের এমনিতেই দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাবে। তারপর করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও দু-চার মাস সিনেমা হলে কোন দর্শকই আসবে না। কেননা মানুষের তো এখন ইনকামটাই বন্ধ। তখন সিনেমা দেখার টাকা পাবে কোথায়? আর আমাদের দেশে নিম্ন আয়ের মানুষই বেশি। পাশাপাশি এই সংকটের কারণে চলচ্চিত্র শিল্পের যে ক্ষতি হবে বা হচ্ছে তা আগামীতে কাটিয়ে ওঠা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে আমাদের জন্য। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে যদি কোন সহায়তা করেন এবং পাশে এসে দাঁড়ান তাহলে হয়তো এই সংকট মোকাবিলা করা আমাদের একটু সহজ হবে। চলমান এই কয়েকদিনেই ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১০০ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। এছাড়া প্রতিদিন আমরা যারা সিনেমার পিছনে কাজ করতাম তাদের অবস্থাতো বেশ শোচনীয়। এভাবে দিনের পর দিন কাজ বন্ধ হয়ে থাকলে কিছুদিন পর অনেককেই হয়তো না খেয়ে দিন কাটাতে হবে। তবে আমাদের চলচ্চিত্রের সাথে সংশ্লিষ্ট বেশকিছু সংগঠন উদ্যোগ গ্রহণ করায় তাদের সাধুবাদ জানাই। পাশাপাশি ব্যক্তিগত ভাবেও অনেকেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন। সবাইকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আমাদের পরিচালক সমিতির পক্ষ থেকেও এমন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। শ্রদ্ধেয় গুলজার ভাই ফান্ড কালেকশন করছেন। তবে এভাবে আর কয়দিন চলবে? একমাত্র আল্লাহ পাক আমাদের এই বিপদের হাত থেকে রক্ষা করা ছাড়া আর কোন পথ নেই। পরিশেষে সবাইকে বলবো, এই করোনা ভাইরাসটি কোন সাধারণ ভাইরাস নয়। এটি খুব বিপদজনক ও মারাত্মক একটি ভাইরাস। পৃথিবীর সব উন্নত দেশগুলো যেখানে এই সংকটে হিমসিম খাচ্ছে সেখানে আমাদের দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থাতো অনেক দুর্বল। সুতরাং এই ভাইরাস যদি এদেশে মহামারী আকার ধারণ করে, আমরা সবাই শেষ হয়ে যাবো। তাই আমাদের সবাইকে সতর্কতার সাথে এই সংকট মোকাবিলা করতে হবে। অনুগ্রহ করে যেভাবেই হোক সবাই সামাজিক দুরত্ব বজায় রেখে ঘরে থাকার চেষ্টা করুন। অযথা বাইরে ঘোরাঘুরি ও মেলামেশা বন্ধ করুন। একমাত্র সতর্কতাই এখন আমাদের প্রধান হাতিয়ার। ইনশাআল্লাহ আমরা আবার ঘুরে দাঁড়াবো। পৃথিবী আবারও স্বাভাবিক হবে। সবাই ঘরে থাকুন, সাবধানে থাকুন, নিরাপদ ও সুস্থ থাকুন।

বিজনেস বাংলাদেশ/বিএইচ