লাভজনক একটি প্রতিষ্ঠান বেসিক ব্যাংক। কীভাবে মাত্র পাঁচ বছর সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয় তার জলজ্যান্ত উদাহরণ এই ব্যাংক। ২০০৯ সালে বেসিক ব্যাংকের নিট মুনাফা ছিল ৬৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। সেই ব্যাংকটিই ২০১৪ সালে মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে নিট লোকসান করে বসে ১১০ কোটি টাকা। এর কারণ হিসেবে সেই সময়ের ব্যাংক কর্তৃপক্ষের ‘সীমাহীন অনিয়ম ও দুর্নীতি’কে চিহ্নিত করেছে বর্তমান কর্তৃপক্ষ।
জাতীয় সংসদের অনুমিত হিসাব সম্পর্কিত তিন নম্বর কমিটির বিশেষ বৈঠক মঙ্গলবার। এ বৈঠকে সরকারি শতভাগ নিয়ন্ত্রণে থাকা বেসিক ব্যাংকের সার্বিক কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনা হবে। বৈঠকে বেসিক ব্যাংক সম্পর্কে কিছু দিক নির্দেশনা দেওয়া হতে পারে।
সূত্র জানায়, এই কমিটির বৈঠকের জন্য বেসিকের পক্ষ থেকে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে ব্যাংকটির বর্তমান ব্যবস্থাপনা। এতে বলা হয়েছে, ‘শতভাগ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বেসিক ব্যাংক এক সময় লাভজনক ব্যাংক ছিল। ২০০৯ সালে বেসিক ব্যাংকের নিট মুনাফা ছিল ৬৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। সেই ব্যাংকটিই ২০১৪ সালে মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে নিট লোকসান করে বসে ১১০ কোটি টাকা। সেই সময়ের ব্যাংক কর্তৃপক্ষের ‘সীমাহীন অনিয়ম ও দুর্নীতি’র কারণেই লাভজনক প্রতিষ্ঠানটি লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেসিক ব্যাংক লিমিটেড ১৯৮৯ সালের ২১ জানুয়ারি তার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করে। সূচনালগ্ন হতে ২০০৯ সাল পর্যন্ত আর্থিক সূচকসমূহের ক্রমোন্নতির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি ব্যাংকিং সেক্টরে একটি স্বচ্ছ ও লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি অর্জন করে। কিন্তু ২০১০-১৪ সময়ে সীমাহীন অনিয়ম ও দুর্নীতির ঘটনা ব্যাংকের সার্বিক কর্মকাণ্ডের ওপর চরম নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে এবং বিভিন্ন সূচকে চরম অবনতি হয়। ফলে ২০০৯ সাল শেষে যেখানে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ১৪১ কোটি ২৩ লাখ টাকা। ২০১৪ সাল শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮ হাজার ১০৮ কোটি টাকা।
একই সঙ্গে ২০০৯ সাল শেষে ব্যাংকটিতে কোনো মূলধন ঘাটতি এবং প্রভিশন ঘাটতি ছিল না। ২০১৪ সালে ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতি দাঁড়ায় ৩ হাজার ৫১৬ কোটি টাকা এবং প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়ায় ৩ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা।
খেলাপি ঋণের বিষয় বলা হয়েছে, গত ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকটির মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ১৪ হাজার ২১৮ কোটি টাকা। যার মধ্যে অশ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৮৮৯ কোটি টাকা। যা মোট ঋণের ৪১ দশমিক ৪২ শতাংশ। অন্যদিকে, একই সময় শ্রেণিকৃত বা খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৪৫ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৫৬ দশমিক ৫৯ শতাংশ। শ্রেণিকৃত ঋণের মধ্যে আবার বিরূপমানের শ্রেণিকৃত ২১৬ কোটি টাকা। সন্দেহজনক ২৭৮ কোটি টাকা এবং মন্দ ও ক্ষতিজনক ঋণ ছিল ৭ হাজার ৫৫১ কোটি টাকা।
তবে বেসিক ব্যাংক বলেছে, বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনার কারণে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ কমে আসছে। কারণ ২০১৪ সালে যখন শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল মোট বিতরণকৃত ঋণের ৬৮ শতাংশ। এখন তা কমে হয়েছে ৫৬ দশমিক ৫৯ শতাংশ।
সরকারি মালিকানাধীন বেসিক ব্যাংক ২০০৯ সাল পর্যন্ত একটি লাভজনক ব্যাংক ছিল। কিন্তু এরপর ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান পদে শেখ আব্দুল হাই বাচ্চুকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর থেকেই ব্যাংকটির আর্থিক অনিয়মের সূত্রপাত ঘটে। চেয়ারম্যান ও পরিচালনা পর্ষদের প্রত্যক্ষ মদদে বেসিক ব্যাংকে একে একে ঘটে যায় অনেকগুলো আর্থিক কেলেঙ্কারি। এই কেলেঙ্কারিতে আত্মসাৎ করা হয় প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা। যা ফেরত পাবার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদনে এই চিত্র ফুটে ওঠেছে।
বেসিক ব্যাংকের অর্থ কেলেঙ্কারির বিষয়টি বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত করছে। এরই মধ্যে কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত সন্দেহে পরিচালনা পর্ষদের সাবেক চেয়ারম্যানকে দুদক কয়েক দফা জিজ্ঞাসবাদ করেছে।


























