ঢাকা দুপুর ২:৪৬, বুধবার, ২৫শে নভেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ, ১০ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

চাহিদা মিটিয়ে আখাউড়ার মাছ যাচ্ছে বিদেশেও

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের চাহিদা মিটিয়ে আখাউড়ার মাছ যাচ্ছে বিদেশেও। পুকুর হাল, বিল, জলাশয় ও ফসলি জমিতে বাঁধ দিয়ে বানিজ্যিক ভাবে মাছ চাষ করে বছরে ৪৫২১.২০ মে.টনের উপর মাছ উৎপদন করছে স্থানীয় চাষীরা। ফলে স্থানীয় চাহিদা পুরনসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করার পাশপাশি বিদেশেও রপ্তানি করে লাভবান হচ্ছে মৎস্যচাষী ও ব্যবসায়ীরা।

উপজেলা মৎস্য সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার ১০২.১১ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের মধ্যে ছোট বড় পুকুরসহ প্রজেক্ট রয়েছে ২ হাজার ৭৫ টি,বিল ১৩টি ,নদী ৩টি, খাল ৩টি, ও প্লাবণ ভূমি রয়েছে ৮টি। এ উপজেলায় মাছের চাহিদা রয়েছে ৩৪৯৮মে.টন। আর উৎপাদিত হচ্ছে ৪৫২১.২০ মে.টন মাছ । উদ্ধৃত থাকছে ১০২৩.২০ মে.টন। দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে মাছ চাষের পরিধি। ওইসব চাষকৃত মাছের মধ্যে রুই, কাতল, মৃগেল, পাঙ্গাস,মৃগেল পুটি,স্বরপুটি, কার্প, তেলাপিয়া, বোয়াল, গ্রাসকাপ, নাইলোটিকা, শিং, মাগুর, কৈ, সহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ রয়েছে। প্রতিদিন ভোর বেলা পৌর শহরের বড় বাজার মাছের আড়তে ৩ থেকে সাড়ে ৩শ মন বিভিন্ন প্রজাতির মাছ বিক্রি হয়। ওই জায়গায় পাইকার, ক্রেতা বিক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় লেগে থাকে। স্বল্প সময়ের মধ্যে ওইসব মাছ কেনা বেচা হয় বলে আড়ৎদাররা জানায়।

রেলপথ ও সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো থাকায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ভৈবর, নরসিংদী,ঢাকা, কুমিল্লা, লাকসাম, ফেনী, চট্রগ্রাম, মাধবপুর, শায়েস্তাগঞ্জ, শ্রীমঙ্গল,সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা পাইকার ও খুচরা বিক্রেতারা এসে ওইসব মাছ ক্রয় করে নিয়ে যায়। এ জন্য দুরের পাইকাররা রাতের মধ্যেই হাজির হন মাছ কেনার জন্য। তারপর ওইসব ব্যবসায়ীরা ট্রেন ও পণ্যবাহী ট্রাক,পিকআপ ভ্যান সিএনজি অটো রিকশার মাধ্যমে নিয়ে যাচ্ছে নিজ নিজ গন্ত্যব্যে। পাশাপাশি আখাউড়া স্থল বন্দর দিয়ে ও ভারতে রপ্তানি হচ্ছে এখানকার মাছ।

এদিকে কম শ্রমে বেশী লাভ হওয়ায় মৎস্য চাষ করে স্থানীয় চাষীরা এক নিরব বিল্পব ঘটিয়েছে। এ উপজেলার শতশত যুবক অর্থনীতি উন্নয়নে মাছ চাষ যতেষ্ট ভূমিকা রাখছেন । সেইসাথে এ চাষে পাল্টে যাচ্ছে তাদের ভাগ্যের চাকাও ।

স্থানীয় একাধিক মৎস্য চাষী জানায়, পৌর শহরের তারাগন, দেবগ্রাম, শান্তিনগর, খড়মপুর দুর্গাপুর, উপজেলার ধাতুর পহেলা, তুলাবাড়ি, কুসুমবাড়ি, টানুয়াপাড়া,হীরাপুর, বাউতলা, উমেদপুর, আজমপুর, মোগড়া,মনিয়ন্দ ধরখারসহ বিভিন্ন এলাকায় যুবকরা পুকুর হাল, বিল, জলাশয় ও ফসলি জমিতে বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ করছেন। তাদের মধ্যে কেউ করছেন নিজস্ব পুকুরে, আবার কেউ করছেন বার্ষিক ইজারা আবার কেউ মৎস্য প্রকল্পের নামে সমিতি গঠন করে করছেন এ চাষ। গত দু মাস ধরে পুরো দমে চলছে চাষকৃত মাছ স্থানীয় আড়ৎসহ বিভিন্ন স্থানে মাছ বিক্রি।
আড়ৎদার মো. বাছির খান জানায়, পৌর শহরসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকার মৎস্য চাষীরা তাদের উৎপাদিত বেশীভাগ মাছ বিক্রি করতে এখানে নিয়ে আসেন। বড় বাজার এলাকায় ১৪ জন আড়ৎদার রয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা অন্ত:ত দুশতাধিক পাইকার ও খুচরা বিক্রেতা এখান থেকে নিয়মিত মাছ ক্রয় করছেন। তিনি বলেন এখানে দৈনিক ৩শ থেকে সাড়ে ৩শ মন বিভিন্ন প্রজাতির মাছ বিক্রি হয়। তাছাড়া এখানকার মাছ দামে অনেক কম পাওয়ায় অনেকে বিয়ে শাদি,জন্মদিন,অন্যান্য অনুষ্ঠানে অতিথি আপ্যায়নের জন্য মাছ কিনতে আসেন। তাছাড়া এখানকার উৎপাদিত মাছ ভারতেও রপ্তানি হচ্ছে। এই বাজারে অন্ত:ত ২০থেকে ২৫ প্রজাতির মাছ পাওয়া যায় বলে জানায়।

কুমিল্লা থেকে আসা পাইকার মো. হোসেন মিয়া বলেন, এখান থেকে প্রতিদিন ভোরে ৫-৬ মনের উপর বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ক্রয় করে মেনি ট্রাকে করে নিয়ে তিনি নিয়মিত বিক্রি করছেন। এখানকার মাছের কদর রয়েছে বেশ ভালো। মাছ নিয়ে বাজারে বসে থাকতে হয় না।
পাইকার মো. মনির বলেন, যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো থাকায় দীর্ঘ ৪ বছর ধরে এখান থেকে মাছ ক্রয় করে বিক্রি করছি। প্রতিদিন বিভিন্ন প্রজাতির ৪-৫ মন মাছ কেনা হয়। বিক্রিতে ভালো লাভ হয় বলে জানায়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সুরুজ মিয়া বলেন, রুই,কাতল, মৃগেল পুটি, কার্প জাতীয় ছোট বড় প্রায় ৪ মন মাছ কেনা হয়। ওই মাছ গুলো খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করা হয় বলে জানায়।
মৎস্য চাষী টিপু চৌধুরী বলেন, ৩টি প্রজেক্ট ৩টি পুকুর বার্ষিক ও অর্ধ বাষিক ইজারা নিয়ে দেশীয় পদ্ধতিতে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষ করা হয় । তিনি মূলত শখের বসে মাছ চাষ শুরু করলেও বর্তমানে বানিজ্যিক ভাবে চিন্তা করছেন। এখন পুরোদমে মাছ বিক্রি তার শুরু হয়েছে। দৈনিক গড়ে ১০-১২ মন মাছ বিক্রি হয় বলে জানায়। তিনি আরো বলেন ভালো দামের আশায় স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি মনি ট্রাকে করে বিভিন্ন বাজারেও মাছ বিক্রি করা হয়।

শামসু মিয়া বলেন, তার ৫ টি পুকুর রয়েছে। রুই,কাতল, মৃগেল পুটি,স্বরপুটিসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ রয়েছে। সপ্তাহে ৪-৫ দিন মাছ বিক্রির জন্য আড়তে নিয়ে আসেন বলে জানায়।

আড়ৎদার মিন্টু মিয়া বলেন এখানকার মাছের খ্যাতি ও সুনাম দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো থাকায় ব্যবসায়ীদের দুর্ভোগে পড়তে হয়নি।

স্থানীয় মাছ ব্যবসায়ী লোকমান মিয়া জানায়, প্রতিদিন ভোরে রুই কাতলসহ ছোট আকৃতির মাছ ১ থেকে দেড় মন কিনে বাজারে খুচরা বিক্রি করছি। দীর্ঘ ৪ বছর ধরে এ ব্যবসা করছেন বলে জানায়।
উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. আব্দুস সালাম বলেন, এ উপজেলায় বানিজ্যিক ভাবে মাছ চাষে এক নিরব বিল্পব ঘটে চলছে। মৎস্য চাষে এলাকার শতশত যুবকদের যেমন বেকারত্ব দুর হয়েছে পাশাপাশি শতশত লোকের কর্মও সৃষ্টি হয়েছে। মাছ চাষের উৎপাদন বৃদ্ধিতে সব সময় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। দিন দিন মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তিনি বলেন এ উপজেলায় অনেক জমি পরিত্যাক্ত অবস্থায় বছরের পর বছর পড়ে আছে। এগুলো মাছ চাষের আওতায় আনা গেলে এবং উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারলে দেশের অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা সম্ভব।

বিজনেস বাংলাদেশ/ এ আর

 

এ বিভাগের আরও সংবাদ