দেশের অর্থনীতিতে এক কিংবদন্তী অর্থনীতিবিদের নাম ড. আতিউর রহমান। যিনি রাখাল ছেলে থেকে হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর। স্বাধীনতার পর গত ৫০ বছরে ইতিহাসে ব্যাংকিং খাতে তাঁর অবদান অভূতপূর্ব। এনালগ ব্যাংকিং প্রথাকে ডিজিটালে রুপান্তর করেছেন তিনি। তাঁর হাত ধরে শুরু হওয়া মোবাইল ব্যাংকিং আজ দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের ব্যাংকিং হয়ে উঠেছে।
দেশের খেটে খাওয়া কৃষক, পোশাক শ্রমিক, রিক্সাওয়াদের মত হতদরিদ্র মানুষের দোড়গোড়ায় ব্যাংকিং সেবা নিয়ে যেতে ব্যাংকগুলোকে এসএমএস বা ক্ষুদ্র বার্তা অথাবা ছোট্ট অ্যাপসের মাধ্যমে ব্যাংকিং করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন ড. আতিউরি রহমান। তাঁর প্রবর্তিত এ মোবাইল ব্যাংকিং-এ এখন গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ৬ কোটি। প্রতিদিন মোবাইল ব্যাংকিং এর মাধ্যমে অন্তত ১৫ শত কোটি টাকা লেনদেন হয়। তাঁর একান্ত প্রচেষ্টায় বিকাশ, ক্রেডিট কার্ড, এডিএম বুথ, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মত ডিজিটাল ধারণাগুলো সফলতার মুখ দেখে। ড. আতিউর রহমানের এজেন্ট ব্যাংকিং এর ধারণা সহ বিভিন্ন ব্যাংকিং সেবা উন্নীত হওয়ায় দেশের কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। যা সত্যিই অনন্য।
শেকড় থেকে শিখরে উঠে এসেও ড. আতিউর রহমান দরিদ্র গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কথা ভুলে যান নি। তিনি ব্যাংগুলোর অর্জিত মুনাফার একটি অংশ ‘সিএসআর’ নামক তহবিলের মাধ্যমে কল্যাণমূলক কাজে ব্যায় করতে বাধ্যবাধ্যকতা আরোপ করেন। এতে করে ব্যাংকিং খাত এক মানবিক খাতে রুপান্তরিত হয়। ব্যাংগুলোর স্কলারশিপ নিয়ে হত দরিদ্র মেধাবি শিক্ষার্থীরা স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পান। এতে করে হাজার হাজার শিক্ষার্থী অর্থাভাবে ঝড়ে পরা থেকে রক্ষা পায়।
তাঁর সময়ে সার্বিক অর্থনীতি, ব্যাংকিং সেক্টর, আমানত সংগ্রহ, বিনিয়োগ, আমদানি-রফতানি, রেমিট্যান্স দ্বিগুণ হয়ে যায়। ব্যাংগুলোর সেবার মানের উন্নতি ঘটে। সারাদেশে ব্যাংগুলোর শাখা বৃদ্ধি হয় আড়াই হাজার। তিনি কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ অর্থনীতি, গ্রিন ব্যাংকিং, স্কুলের শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুল ব্যাংকিং নিয়ে আসেন। বর্তমান যার জমার পরিমান ১৫ শত কোটি টাকা। ড. আতিউর রহমানের ১০ টাকার অ্যাকাউন্ট, নারী উদ্যোক্তাদের ঋণ, নতুন উদ্যোক্তাদের এসএমই ঋণ ইত্যাদি হাজার হাজার সফল উদ্যোক্তা গড়ে তুলে। দেশের অর্থনীতিতে যোগ করে এক নতুন অধ্যায়।
তাঁর সাহসী ভূমিকায় ব্যাংকিং ব্যবস্থা কৃষকবান্ধব হয়েছে। মুদ্রাস্ফীতি রোধ করে বাজার ও টাকার মূল্যমান স্থিতিশীল রেখেছিলেন। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ সর্বোচ্চ স্থানে উন্নীত হয়েছিল। সুদের হার কমিয়ে বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টি করেছিলেন। এক কথায় বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এক নতুন যুগে নিয়ে আসেন ড. আতিউর রহমান।
দেশের অর্থনীতি নিয়ে ড. আতিউর রহমানের রয়েছে বিস্তর গবেষণা। অর্থনীতি নিয়ে লিখেছেন বেশ কিছু বই। বইগুলোতে ফুটে উঠেছে দেশের মানুষের অর্থনৈতিক চাওয়া পাওয়া। বিশ্লেষণ করেছেন বিভন্ন সময়ে ও পর্যায়ে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা এবং অগ্রগতি। খেটেখাওয়া মানুষ কেমন বজেট চান এমনসব চিন্তা থেকে লিখেছেন, ‘কেমন বাজেট চাই : তৃণমূল মানুষের ভাবনা’-এর মত বই। জনগণের প্রত্যাশা এবং দারিদ্রদের দৃষ্টিভঙ্গিতে লিখেছেন ‘জনগনের বাজেট’, ‘গরিবের বাজেট ভাবনা ও দারিদ্র বিমোচন’। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক অর্থনীতি বিষয়ে বিষদ ধারণা দিয়েছেন তিনি। লিখেছেন ‘সার্ক: রাজনৈতিক অর্থনীতি’। এছাড়াও বিভিন্ন সময় ও স্তরে অর্থনীতির ভাবনা নিয়ে লিখেছেন, মানবিক উন্নয়ন, ভাষা আন্দোলন: অর্থনৈতিক পটভূমি, বাংলাদেশের উন্নয়নের সংগ্রাম, উন্নয়ন আলাপ, অধিকার ভিত্তিক উন্নয়ন প্রভৃত বই।
ড. আতিউর রহমান একজন বঙ্গবন্ধু গবেষক। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বর্ণাঢ্য জীবন ও কর্ম নিয়ে প্রতিনিয়ত গবেষণা করে যাচ্ছেন। এরই ফলস্বরুপ ২০১৯ সালে ড. আতিউর রহমানকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ‘বঙ্গবন্ধু চেয়ার’ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। উচ্চ পর্যায়ের এক সিলেকশন কমিটি তাকে ‘বঙ্গবন্ধু চেয়ার’ পদে নিয়োগের সুপারিশ করে। বর্তমানে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। তিনি একজন রবীন্দ্র ভক্ত ও গবেষকও। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিন্তায় অর্থনীতি নিয়ে লিখেছেন, রবীন্দ্র চিন্তায় দারিদ্র ও প্রগতি নামক একটি বই। যা বিশ্বকবির চিন্তায় অর্থনৈতিক বিষয়টি ফুটে উঠেছে।
১২:৪১ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম :
নতুন যুগের কারিগর ড. আতিউর রহমান
-
মামুন আল জাহিদ - প্রকাশিত : ১২:০০:৪৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৩১ মার্চ ২০২১
- 62
ট্যাগ :
জনপ্রিয়





















